সোমবার, অক্টোবর ৩, ২০২২

অতি দরিদ্রদের টাকা জনপ্রতিনিধিদের পকেটে

নিজস্ব প্রতিবেদক :

যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলায় ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির মধ্য দিয়ে অতি দরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচির (ইজিপিপি) প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ শেষ হয়েছে। ৪০ দিনের এ কর্মসূচিতে কাজ হয়েছে মাত্র ৯ থেকে ১৬ দিন। অথচ বিল তোলা হয়েছে ২৩ দিনের। বেশি দিন কাজ দেখিয়ে উত্তোলন করা টাকা থেকে শ্রমিকদের কিছু টাকা দিয়ে অবশিষ্ট টাকা ভাগ বাটোয়ারা করে নেয়া হয়েছে। এমনকি শ্রমিকদের মোবাইল অ্যাকাউন্টের সিম ইউপি সদস্যরা জমা রেখে দিয়েছেন। এতে অনেকের মাঝে সিম পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

অতি দরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচি (ইজিপিপি) সর্বশেষ পরিপত্র অনুযায়ী মজুরি পরিশোধের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্রের সাথে মিল রেখে প্রত্যেক শ্রমিকের নিজস্ব মোবাইল অ্যাকাউন্ট থাকতে হবে। একজন শ্রমিক দিনে ৪০০ টাকা পাবেন এবং জবকার্ডে তা উল্লেখ করতে হবে। প্রকল্পের কাজের তদারকি করবেন সংশ্লিষ্ট ট্যাগ অফিসার ২৫ শতাংশ, প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ৪০ শতাংশ, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ১০ শতাংশ, জেলা ত্রাণ দুর্যোগ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা ১০ শতাংশ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর ১০ শতাংশ এবং স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক ৫ শতাংশ। এ ছাড়া দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের কর্মসূচি প্রশাসন শক্তিশালীকরণ প্রকল্পের উপসহকারী প্রকৌশলী শতভাগ কাজ তদারকি করবেন।

নিয়মানুযায়ী, প্রকল্পের সভাপতি মাস্টার রোল তৈরি করে তাতে স্বাক্ষর করবেন। এরপর তদারকি কর্মকর্তা, প্রকল্পের উপসহকারী প্রকৌশলী ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার স্বাক্ষর নিয়ে তা অনলাইনে হিসেবে জমা দেবেন। পরে শ্রমিকেরা মোবাইল অ্যাকাউন্ট থেকে তাদের টাকা তুলবেন।

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২১-২০২২ অর্থবছরে বাঘারপাড়া উপজেলায় অতি দরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচিতে (দ্বিতীয় পর্যায়) ২৭টি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। ১ কোটি ৭২ লাখ ৭০ হাজার টাকা ব্যয়ে কর্মসূচির কাজ গত ২৯ এপ্রিল শুরু হয়ে ৩০ জুন শেষ হয়। এ জন্য উপজেলার নয় ইউনিয়নের ১ হাজার ৭৬ জন শ্রমিক নির্বাচন করা হয়। প্রতিটি প্রকল্পে সর্বোচ্চ ৪০ দিন কাজ করা যাবে। সূত্র জানায়, বাঘারপাড়া উপজেলায় অতি দরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচিতে (দ্বিতীয় পর্যায়) ২৩ দিন কাজ করা হয়।

শ্রমিকেরা অভিযোগ করেছেন, মোবাইল অ্যাকাউন্ট তাদের নামে। কর্মসূচির মজুরির টাকা তাদের অ্যাকাউন্টে জমা হয়। কিন্তু তাদের অধিকাংশের কাছে মজুরির টাকা উঠানোর মোবাইল অ্যাকাউন্ট সিম নেই। কাজ শুরুর আগে বেশিরভাগ শ্রমিকের মোবাইল অ্যাকাউন্ট সিম ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যরা নিয়ে গেছেন। ওই সিম দিয়ে অ্যাকাউন্ট থেকে মজুরির টাকা তুলে ইউপি সদস্যরা তাদের দিয়েছেন।

উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নের শ্রমিকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, উপজেলার কোনো ইউনিয়নে ২৩ দিন কাজ হয়নি। ইউনিয়ন ভেদে সর্বনি¤œ ৮ থেকে সর্বোচ্চ ১৬ দিন কাজ হয়েছে।

দোহাকুলা ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের শ্রমিক বলেন, দোহাকুলা ইউনিয়ন কাউন্সিল থেকে আমরা সব শ্রমিক একসাথে মোবাইল সিম কিনেছিলাম। মোবাইল অ্যাকাউন্টে মজুরির টাকা আসার পর জসিম মেম্বার আমার কাছ থেকে সিম নিয়ে নেন। বর্তমানে সিম তার কাছে আছে। এইবার আমি নয় দিন কাজ করেছি। জসিম মেম্বার আমার সিম দিয়ে টাকা তুলে আমাকে ৩৫০০ টাকা দিয়েছেন।

জানতে চাইলে ইউপি সদস্য জসিম উদ্দীন বলেন, আমি কোনো প্রকল্পের সভাপতি না। আমাকে পরিষদ থেকে টাকা দেয়া হয়েছে, সেই টাকা আমি আমার ওয়ার্ডের শ্রমিকদের দিয়েছি। সিম কার কাছে থাকে আমি জানি না, সিম ম্যানেজমেন্টের দায়িত্ব আমার না।

বন্দবিলা ইউনিয়নের একজন নারী শ্রমিক জানান, আমি এইবার ১০ দিন কাজ করেছি। চেয়ারম্যানের প্রতিনিধি পরিচয় দিয়ে জিকু খান নামে একজন আমার মোবাইল সিম নিয়ে নিয়েছে। তিনি আমার সিম দিয়ে টাকা তুলে আমাকে ৩ হাজার ২০০ টাকা দিয়েছেন।
জানতে চাইলে জিকু খান বলেন, ইউনিয়নে ১৪৪ জন শ্রমিক আছে। যে শ্রমিক যে কয়দিন কাজ করেছে তাকে সেইভাবে টাকা দেয়া হয়েছে। যার যার সিম তার তার কাছে আছে। আমার কাছে বর্তমান ৮-১০ টি সিম আছে।

রায়পুর ইউনিয়নের একজন শ্রমিক বলেন, আমি রাস্তায় নয় দিন কাজ করিছি। পলাশ মেম্বার আমার সিম দিয়ে টাকা তুলে আমাকে আট দিনের মজুরি ৩ হাজার ২০০ টাকা দিয়েছেন। তিনি আমাকে সিম ফেরত দেননি।

ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য সদস্য এসএম সাইফুল ইসলাম পলাশ বলেন, আমার ওয়ার্ডে আট-নয় জন শ্রমিক কাজ করে। আমি তাদের টাকা দিয়েছি। টাকা তিনি কীভাবে তুললেন জানতে চাইতে তিনি বলেন, টাকা মানে সিম আমি তাদের দিয়েছি। আমার কাছে সিম নেই, সিম তাদের কাছে আছে।

বাসুয়াড়ি ইউনিয়নের একজন শ্রমিক জানান, আমরা ১৬ জন শ্রমিক নয় দিন কাজ করেছি। ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার শিমুল হোসেন আমাকে ৩ হাজার ৬০০ টাকা দিয়েছেন। সিম কার কাছে আছে, আমি জানি না।

ইউপি সদস্য শিমুল হোসেন বলেন, শ্রমিকেরা মোবাইল থেকে টাকা তুলতে পারতেন না। এজন্য চেয়ারম্যানের অনুরোধে আমি প্রথম পর্যায়ের টাকা তুলে দিয়েছিলাম। দ্বিতীয় পর্যায়ের টাকা চেয়ারম্যান তুলে দিয়েছেন।

বাসুয়াড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আমিনুর রহমান সরদার বলেন, ঈদের সময় আমি নিজের টাকা থেকে শ্রমিকদের টাকা দিয়েছিলাম। পরে সেই টাকা আমি তুলে নিয়েছি। যার সিম তার কাছেই আছে।

দরাজহাট ইউনিয়নের একজন শ্রমিক জানান, আমাদের প্রকল্পে আমরা প্রতিদিন ১২-১৩ জন করে ১৬ দিন কাজ করেছি। শামসুর মেম্বার আমাকে ৬ হাজার ৪০০ টাকা দিয়েছেন। সিম মেম্বারের কাছে আছে।

ইউনিয়নের ৮ ওয়ার্ডের সদস্য শামসুর রহমান বলেন, আমার ওয়ার্ডের শ্রমিকেরা আমারে খুব বিশ্বাস করেন, তারা এ কথা আমার বিরুদ্ধে কোনোদিন বলতেই পারে না।

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) ফিরোজ আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, উপজেলায় ২৩দিন কাজ হয়েছে। শ্রমিকেরা মজুরির টাকা মোবাইল অ্যাকাউন্টে পেয়েছেন। কাজ কম এবং মজুরি কম পাওয়ার বিষয়টি আমার নলেজে আসেনি। বিষয়টি খোঁজ নেয়া হচ্ছে। এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ জাকির হাসান বলেন, বিষয়টি তদন্ত করা হবে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

রায়পুর ইউনিয়নে তিনটি প্রকল্পে মোট শ্রমিক ছিল ১৩২ জন। প্রকল্পের একটি হলো রামকৃষ্ণপুর হামিদের দোকান হতে আজমেহেরপুর লতিফের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা মেরামত। প্রকল্পে শ্রমিক ছিল ৪৩ জন। প্রকল্পের সভাপতি ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আব্দুল জলিল।

প্রকল্পের একজন নারী শ্রমিক বলেন, রাস্তায় ৪০ দিন কাজ করার কথা ছিল। আমরা ১৫-১৬ জন শ্রমিক নয় দিন কাজ করার পর পলাশ মেম্বর কাজ বন্ধ করে দেন। পরে তিনি আমাকে আট দিনের ৩ হাজার ২০০ টাকা দিয়েছেন। সিম পলাশ মেম্বরের কাছে আছে।

প্রকল্পের সভাপতি ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আব্দুল জলিল বলেন, প্রকল্পে পুরো কাজ হয়নি। ২৩ দিন কাজ হয়েছিল। সবদিন সব শ্রমিক কাজে আসেন না। কোনোদিন ৩০ জন আবার কোনোদিন ৩৫ জন শ্রমিক কাজ করেছেন।

বাসুয়াড়ি ইউনিয়নে তিনটি প্রকল্পে মোট শ্রমিক ছিল ১১০ জন। একটি প্রকল্প হলো ‘দক্ষিণ শ্রীরামপুর আজাদের বাড়ি হতে ইটের রাস্তা পর্যন্ত রাস্তা মাটি দ্বারা মেরামত’। প্রকল্পে শ্রমিক ছিল ৩০ জন। প্রকল্পের সভাপতি ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য তোরাপ হোসেন।

তালিকায় নাম আছে শুনে অপর একজন শ্রমিক বিস্ময় প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, আমি কাজ করতেও পারি আবার নাও করতে পারি। তালিকায় নাম যখন আছে ধরে নেন আমি নয় দিন কাজ করেছি।

প্রকল্পের সভাপতি ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য তোরাপ হোসেন বলেন, ‘২৮ জন শ্রমিক ১৮দিন কাজ করেছিলেন। কিন্তু বিল করা হয়েছিল ২৩ দিনের। শ্রমিকদের টাকা আগেই দিয়ে দেয়া হয়েছিল। পরে চেয়ারম্যান শ্রমিকদের টাকা তুলেছেন। সিম চেয়ারম্যানের কাছেই আছে।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

সর্বশেষ

 কারা পাচ্ছেন নোবেল পুরস্কার, আজ থেকেই জানা যাবে

কল্যাণ ডেস্ক: বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদার নোবেল পুরস্কার ঘোষণা শুরু হচ্ছে আজ থেকে। আগামী ১০...

বাঙালির স্মৃতি থেকে মুছে যাবে ইলিশ

গ্রাম্য মাদ্রাসার শিক্ষক আনোয়ারুজ্জান ২০ বছর আগে ইলিশ মাছের ভবিষ্যৎ নিয়ে যা ভেবেছিলেন, আজ...

জাতীয় ক্রাশ রাশমিকার জীবনে টার্নিং পয়েন্ট ‘পুষ্পা’

বিনোদন ডেস্ক: তেলেগু ‘পুষ্পা: দ্য রাইজ’ সিনেমাতে অভিনয় করে ভারতজুড়ে খ্যাতি পেয়েছেন রাশমিকা মান্দানা।...

পাঁচ ঘরোয়া উপায়ে দূর করুন অ্যাসিডিটি

কল্যাণ ডেস্ক: অ্যাসিডিটির সমস্যা নেই এমন মানুষ খুব কমই আছে। নিয়মিত ওষুধ তো খান,...

যশোরের ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ ঢাকায় গ্রেফতার

নিজস্ব প্রতিবেদক : যশোরের ঝিকরগাছা এলাকার ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ নুরুজ্জামান বাবুকে ঢাকা থেকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব।...

ব্যাটিং ব্যার্থতায় পাকিস্তানের কাছে হারলো বাংলাদেশের মেয়েরা

ক্রীড়া ডেস্ক : থাইল্যান্ডকে উড়িয়ে দিয়ে ঘরের মাঠে নারী এশিয়া কাপ শুরু করেছিল বাংলাদেশ। তবে...