Wednesday, July 6, 2022

আজ যশোর মুক্ত দিবস ।। গোলাগুলি ছাড়াই নিরবে শত্রুবাহিনীর পলায়ন

সাজেদ রহমান: 
ছাইদানীতে অর্ধদগ্ধ সিগারেট, একই অবস্থা ছিল পরিত্যক্ত ব্রিগেড সদর দফতরের। সেখানকার কেরানীরা তাদের টাইপরাইটার থেকে কাগজ বের করে আনার সময়ও পায়নি। উনুনে সবজি রান্না হচ্ছে, খাবার টেবিলে ভাতের পাত্র, জামা-কাপড় রোদে শুকানো। সে গুলো খাবার সময় পায়নি তারা। দেয়ালে টাঙানো যুদ্ধের ম্যাপ।

সেটিও নিতে পারেননি পাক বাহিনী। ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর মুক্তি ও মিত্র বাহিনী দুপুরের পর যশোর ক্যান্টনমেন্টে প্রবেশ করে এমন দৃশ্য দেখতে পান। মুক্তি ও মিত্র বাহিনীর যৌথ আক্রমনে প্রাণ ভয়ে কার্যত কোন গুলি না ছুড়েই পাক বাহিনী তার নবম ডিভিশনকে ৬ ডিসেম্বর যশোর থেকে প্রত্যাহার শুরু করে। যশোর ছিল মুক্তিযুদ্ধের আট নম্বর সেক্টরভুক্ত। সেক্টর ঘোষনার সময় এর এলাকা ছিল কুষ্টিয়া, যশোর, ফরিদপুর এবং খুলনার দৌলতপুর সাতক্ষীরা সড়ক পর্যন্ত। পরে এলাকা সংকুচিত করে কুষ্টিয়া ও যশোর, খুলনা সদর ও সাতক্ষিরা মহকুমা এবং ফরিদপুরের উত্তরাংশ পর্যন্ত অপারেশন এলাকা নির্ধারণ করা হয়। মোট সাতটি সাব সেক্টরে ভাগ করা হয়েছিল গোটা এলাকাকে। সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধের প্রথম দিকে ৩০ মার্চ ক্যাপ্টেন হাফিজ উদ্দিনের নেতৃত্বে যশোর সেনানিবাসের প্রথম বেঙ্গল রেজিমেন্ট বিদ্রোহ করেন। এর আগে থেকেই ইপিআর এর যশোরস্থ সেক্টর দফতর মুক্তিকামী জনতার প্রতিরোধ যুদ্ধ কেন্দ্র হয়ে ওঠে। চুয়াডাঙ্গাস্থ ইপিআর-এর উইং কমান্ডার মেজর আবু ওসমান চৌধুরীও বিদ্রোহ করে স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তিনিই ১৯৭১ সালের ১৫ আগষ্ট পর্যন্ত আট নম্বর সেক্টরের অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেন। পরে দায়িত্ব পালন করেন মেজর মঞ্জুর। আট নম্বর সেক্টরের গুরুত্ব ছিল দু’টি কারণে। প্রথমতঃ এই এলাকাতে যশোরই ছিল একমাত্র বিমান ঘাঁটি এবং প্রধান সেনানিবাস। হানাদার বাহিনীর যে শক্তি দেশের পশ্চিমাঞ্চলে সমাবেশ করা হয়েছিল, তার উলেখযোগ্য অংশ ছিল যশোরে। দ্বিতীয়তঃ সাবেক বৃটিশ ভারতে এই এলাকা ছিল কলকাতার পশ্চাৎভুমি। কলকাতার অবস্থানও যশোর শহর থেকে মাত্র ১শ’১০ কিলোমিটার দূরে এবং সেখানে ভারতীয় সেনাবাহিনীর পুর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের সদর দফতর। তাই গোটা এলাকায় সামরিক গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। যশোরে ছিল হানাদার পাক বাহিনীর নবম পদাতিক ডিভিশন এবং যুদ্ধের চুড়ান্ত লগ্নে এর অধিনায়ক ছিলেন মেজর জেনারেল
আনসারী। ওই বাহিনীকে বিতাড়িত করার জন্য ক্যাপ্টেন খোন্দকার নজমুল হুদা, ক্যাপ্টেন শফিকউলাহ, ক্যাপ্টেন সালাউদ্দিন, ক্যাপ্টেন শাহাবুদ্দিন, ক্যাপ্টেন এ আর আযম চৌধুরী, ক্যাপ্টেন
মোস্তাফিজুর রহমান, ক্যাপ্টেন আব্দুল হালিম, ক্যাপ্টেন তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরী এবং লেফটন্যান্ট জাহাঙ্গীর গোটা নয় মাস অসংখ্য যুদ্ধ পরিচালনা করেন। হানাদার বাহিনীর ধারনা ছিল মুক্ত বাহিনী ও মিত্র বাহিনী যশোর দখলে চুড়ান্ত আঘাত হানবে কলকাতা-বেনাপোল-যশোর, কৃষনগর-
দর্শনা-চুয়াডাঙ্গা এবং মুর্শিদাবাদ-রাজাপুর-কুষ্টিয়া অক্ষরেখা ধরে। তারা সেই ধারনা অনুযায়ী ওই তিনটি অক্ষরেখা বরাবর দুর্ভেদ্য প্রতিরক্ষা লাইন গড়ে তোলে। কিন্তু মুক্তি বাহিনী ও মিত্রবাহিনী
হানাদার বাহিনীকে সম্পূর্ন বোকা বানিয়ে ১৩ নভেম্বর বয়রা সাব সেক্টর হয়ে সরাসরি যশোর সেনানিবাস থেকে মাত্র ১৫ কিলোমিটার পশ্চিমে গরীবপুর এলাকায় এসে অবস্থান নেয়। এটি ছিল চৌগাছার দক্ষিণ-পুর্বে। গরীবপুর এলাকা এবং সেনানিবাসের মধ্যে একটি বিশাল বিল থাকায় হানাদার বাহিনী ভেবেছিল প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতাই তাদেরকে রক্ষা করবে। কিন্তু ১৯ নবেম্বর যখন তারা গরীবপুর এলাকায় মুক্তি ও মিত্র বাহিনীর উপস্থিতি জানতে পারে তখন হতভম্ব হয়ে যায়। শুরু হয় দু’পক্ষে প্রচন্ড যুদ্ধ। ট্যাঙ্ক, সাঁজোয় বহর, ভারী কামান এবং বিমান যুদ্ধও হয় এখানে। এমনকি হাতাহাতি লড়াইও চলে দু’পক্ষে। শত্রু বাহিনীর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। ২২ নবেম্বর ‘চৌগাছা যুদ্ধ’ চুড়ান্ত পরিণতিতে পৌঁছায়। হানাদার বাহিনী পিছিয়ে এসে তাদের নতুন প্রতিরক্ষ ব্যুহ তৈরি করে। উভয় পক্ষে গোলা বিনিময় চলে ৬ ডিসেম্বর ভোর পর্যন্ত। এরপর ওই দিনই সুরক্ষিত দুর্গ যশোর সেনানিবাস ছেড়ে পাক বাহিনী পালিয়ে যায় দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে মাগুরা ও খুলনার দিকে। যশোর দুর্গ থেকে পাল্টা কোন গুলির আওয়াজ ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। যশোর প্রথম মুক্ত কোন জেলা শহর শুধূ ছিলনা, এটি ছিল একটি দুর্ভেদ্য দুর্গ এবং যেখানে ছিল একটি বড় বিমান ঘাঁটি। যশোর পতনে হানাদার বাহিনীর মনোবল একেবারে ভেঙে পড়ে। চুড়ান্ত মুক্তি তরান্বিত করতে যা পালন করে সহায়ক ভূমিকা। ‘প্রায় অক্ষত অবস্থায় যশোর দূর্গ দখল’ শিরোনামে ৯ ডিসেম্বর যুগান্তর পত্রিকায় একটি রিপোর্ট প্রকাশ হয়। যেটি লিখেছিলেন সুখরঞ্জন সেনগুপ্ত। রিপোর্টটি তিনি পাঠান ৮ ডিসেম্বর যশোর থেকে। তিনি লেখেন-‘ভারতীয় বাহিনী যশোর শহরের পূর্ণ কতৃত্ব গ্রহণ করেছেন এবং অসামরিক জনগণ শহরের রাস্তায় রাস্তায় ভারতীয় জওয়ানদের হর্ষমূখর অভিনন্দন জানাচ্ছেন। যশোর শহর পশ্চিম পাকিস্তানিদের হাত থেকে মুক্ত হবার ঠিক ২৪ ঘন্টা পরে আজ দুপুরে যখন যশোর ক্যান্টনমেন্টে প্রবেশ করি তখনও নড়াইল ও রুপদিয়ার সড়কে পশ্চিম পাকিস্তানিদের সঙ্গে ভারতীয়
বাহিনীর যুদ্ধ হচ্ছিল। যশোর সেক্টরে ভারতীয় বাহিনীর জিওসি মেজর জেনারেল দলবীর সিং যশোর শহরে প্রবেশকারী প্রথম ভারতীয় ও বিদেশী সাংবাদিকদের জানান যে, যশোর ক্যান্টনমেন্ট আমি প্রায় বিনা যুদ্ধেই দখল করেছি। পশ্চিম পাকিস্তানি সৈন্য বাহিনীর ৯ নম্বর আর্মাড ডিভিশনের সদর দফতর যশোর ক্যান্টনমেন্টের একটি কক্ষে দাঁড়িয়ে ভারতীয় বাহিনীর ৯ নম্বর ডিভিশনের অধিনায়ক মেজর জেনারেল দলবীর সিং বলেন, আমি প্রায় সব কিছুই অক্ষত অবস্থায় দখল করেছি। আমার সৈন্যরা ক্যান্টনমেন্টে প্রবেশ করার আগেই পশ্চিম পাকিস্তানিরা ফরিদপুর, গোয়ালন্দ ও খুলনার দিকে পলায়ন করেছে। ক্যান্টনমেন্টের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা খুবই শক্তিশালী ছিল। পশ্চিম পাকিস্তান সৈন্যদের দুটি অতিকায় সামরিক মানচিত্রের সামনে দাঁড়িয়ে জেনারেল বলেন, সৈনিক হিসাবে আমি বলছি যে, যশোর আসার পথে যে সকল পশ্চিম পাকিস্তানিদের সঙ্গে আমাদের মোকাবিলা হয়েছে সে সকল ক্ষেত্রে তারা বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করেছে এবং ওই সকল জায়গায় তারা যুদ্ধ করার পর ঘাঁটি ত্যাগ করেছে। তবে ক্যান্টনমেন্টে কেন এমন হলো এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন আমার মনে হয় যে, এখানে পশ্চিম পাকিস্তানি সৈন্যদের পরিচালনা করার মত উর্ধতন নেতৃত্ব ছিল না। তিনি স্বীকার করেন যে যশোর ক্যান্টনমেন্টের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা খুবই শক্তিশালী ছিল।’

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

সর্বশেষ

পিঠে ছুরিবিদ্ধ খোকন নিজেই গাড়ি ভাড়া করে আসেন যশোর হাসপাতালে

নিজস্ব প্রতিবেদক : পিঠে বিদ্ধ হওয়া ছুরি নিয়ে নিজেই যশোর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেছেন...

নায়কদের নামে কোরবানির গরু, আপত্তি জানালেন ওমর সানি

কল্যাণ ডেস্ক : আগামী ১০ জুলাই পবিত্র ঈদুল আজহা। মুসলিম সম্প্রদায় এই ঈদে পশু কোরবানির...

এশিয়ার বাইরের উইকেটের যে কারণে অসহায় মোস্তাফিজ

ক্রীড়া ডেস্ক : মোস্তাফিজুর রহমানের বোলিং দেখে ক্যারিয়ারের শুরুতে অনেকে তাকে বলতেন, 'জোর বল করা...

নতুন ২৭১৬ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত

কল্যাণ ডেস্ক : শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উভয় বিভাগের আওতায় আরও ২ হাজার ৭১৬টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করার...

নওয়াপাড়া বন্দরে অবৈধ তালিকায় ৬০ ঘাট

অবৈধভাবে গড়ে উঠা ঘাটের কারণে কমছে নদীর নাব্যতা ৫ বছরে অর্ধশত জাহাজ ডুবিতে ক্ষতিগ্রস্ত...

মণিরামপুরে জমজমাট কোরবানির পশু হাট

আব্দুল্লাহ সোহান, মণিরামপুর : দক্ষিণবঙ্গের অন্যতম হাট মণিরামপুরের গরু-ছাগলের হাট। প্রতি শনি ও মঙ্গলবার এখানে...