মঙ্গলবার, অক্টোবর ৪, ২০২২

ইতিহাসের বরপুত্র

মোহাম্মাদ বাবুল আকতার :

স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের মহান স্থপতি ও বাঙালির জাতিসত্তা বিকাশের পুরোধা ব্যাক্তিত্ব বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান । তিনি আমাদের জাতির জনক। সংগ্রাম ও অবদানে নিজ নিজ জাতির মুক্তিদাতা হিসেবে মানুষের মধ্যে আছে আমেরিকার জর্জ ওয়াশিংটন, তুরস্কের কামাল আতাতুর্ক, ভারতের মহাত্মাূ গান্ধী, দক্ষিণ আফ্রিকার নেলসন মেন্ডেলা, কিউবার ফিদেল ক্যাস্ট্রো প্রমুখ নেতা। আর আছেন বাংলাদেশের শেখ মুজিবুর রহমান। দীর্ঘ সংগ্রাম ও সাধনার মধ্য দিয়ে তিনি ইতিহাসের বরপুত্র হিসেবে মর্যাদা লাভ করেছেন। তাঁর জীবনাদর্শে আমরা সংগ্রামী চেতনা ও কর্মনিষ্ঠার পরিচয় পায়।

১৯২০ সালে ১৭ই মার্চ বর্তমান গোপালগঞ্জ (তৎকালীন ফরিদপুর) জেলার টুঙ্গিপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহন করেন শেখ মুজিবুর রহমান । বঙ্গবন্ধুর পিতার নাম শেখ লুৎফর রহমান এবং মায়ের নাম সায়েরা খাতুন। পিতা কাজ করতেন গোপালগঞ্জের মহকুমা আদালতে। টুঙ্গিপাড়া নামক এই গ্রামে প্রকৃতির নিবিড় আশ্রয়ে জল-মাটি -কাঁদায় হেসে -খেলে শৈশব কাটে শেখ মুজিবুর রহমানের।

বঙ্গবন্ধুর শৈশব কাটে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায়। ছোটোবেলা থেকেই শেখ মুজিব খুব চটপটে স্বভাবের ছেলে ছিলেন। বাড়ির সবাই এজন্য তাঁকে সবাই খোকা বলে ডাকত। দেখতে তিনি ছিলেন ছিপছিপে গড়নের । কিন্তু তাঁর ছিল অদম্য প্রাণশক্তি। নদীতে-খালে-বিলে ঝাঁপ দিয়ে সাঁতরিয়ে সবাইকে মাতিয়ে তুলতেন। খেলাধুলায় বেশ ভালো ছিলেন তিনি। স্কুলের ফুটবল দলেও তাঁর পাকা স্থ্না ছিল। ছোট বেলা থেকেই শেখ মুজিবের মধ্যে দারিদ্র -বঞ্চিতদের জন্য ভালেবাসার প্রকাশ দেখা যায়। বিদ্যালয়ের ওপরের ক্লাসে এসে তাঁর প্রতিবাদী চেতনার পরিচয়ও মেলে। একবার অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক ও মন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মিশনারী স্কুল পরিদর্শনে আসেন। সবার হয়ে স্কুলের দাবি হওয়ায় কথা তুলে ধরেন তিনি। তাঁর জোরালো বক্তব্য সমস্যা নিরসনে সাহায্য করেন। ছোট বেলা থেকে তার মধ্যে সুস্পষ্ট প্রতিবাদী ব্যাক্তিত্বের পরিচয় পাওয়া যায়। সাত বছর বয়সে বঙ্গবন্ধু ভর্তি হন গিমাডাঙ্গা প্রাথমিক স্কুলে। পরে পিতার কর্মস্থল গোপালগঞ্জ মিশনারী স্কুলে থেকে ১৯৪২ সালে ম্যাট্টিক পাশ করেন। চোখের অসুখ হওয়াতে প্রায় চার বছর তাঁর লেখাপড়ায় ছেদ পড়েছিল। ১৯৪২ সালে শেখ মুজিবুর রহমান কলকাতায় ইসলামিয়া কলেজে ভর্তি হন। তখন ব্রিটিশ ভারতের রাজনীতির এক জটিল সময় চলছিল। নানা কারণে ভারতে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদ ও অবিশ্বাস দানা বেঁধে উঠেছিল।

১৯৪৭ সালে ভারতে ব্রিটিশ শাসনের অবসান হয় এবং ভারত ও পাকিস্তান নামে দুই রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা ঘটে। শেখ মুজিব কলকাতা থেকে ঢাকায় এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হন। অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে শেখ মুজিবুর থাকতেন সামনের কাতারে । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারিদের দাবি আদায়ের আন্দোলন করার জন্য তাকে জরিমানা করা হয়। তরুণ মুজিব অন্যায়ভাবে ধার্য্য করা জরিমানা প্রদানে অস্বীকৃতি জানান। ফলে তাঁর ছাত্রত্ব খারিজ হয়ে যায় এবং এখানেই তার ছাত্র জীবনের ইতি ঘটে।

ছাত্রজীবনে থেকেই বঙ্গবন্ধু রাজনীতি ও দেশব্রতে যুক্ত হন। ভাষা আন্দেলনসহ বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে যোগ দিয়ে তিনি বহুবার কারাবরণ করেছেন। কলকাতায় ইসলামিয়া কলেজে থাকাকালীন ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে তৎকালীন মুসলিম লীগে যোগ দেন। গোপালগঞ্জের দূর গ্রাম থেকে কলকাতায় এসে অল্প সময়ে নেতৃত্বের ভূমিকা নিতে সামর্থ হয়েছিলেন শেখ মুজিব। এ সময়ে তিনি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ঘনিষ্ঠ সহচর্যে আসেন।

১৯৪৭ সালে ভারতে ব্রিটিশ শাসনের অবসান হয় এবং ভারত পাকিস্তান নামে দুই রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা ঘটে। ১৯৪৭ সালে উর্দু ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার প্রতিবাদে বিক্ষোভ করে ছাত্রসমাজ এবং গ্রেফতার হন শেখ মুজিবুর রহমানসহ ও অন্যান্য নেতা। ছাত্রদের বলিষ্ঠ প্রতিবাদের ফলে কিছুদিন পরেই তিনি ছাড়া পান। ১৯৪৯ সালের মধ্যভাগে খাদ্যের দাবিতে আন্দোলন করার জন্য শেখ মুজিবকে গ্রেফতার করা হয়।সরকার বিরোধী রাজনৈতিক দল গঠনের প্রস্তুতি চলছিল। আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠিত হলে কারাবন্দি তরুণ নেতা শেখ মুজিবকে করা হয় দলের যুগ্মœ সম্পাদক। মুক্তি পেয়ে তিনি দল গঠনের কাজে ব্রতী হন। আওয়ামী লীগ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান ছিল অসামান্য। এটা শাসকগোষ্ঠীও বুঝতে পারে। তাই ১৯৫০ সালে জানুয়ারিতে আবারও তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। এবার তাঁকে সহজে মুক্তি দেওয়া হয় না। জেলে থাকলে ১৯৫২ সালে ভাষা অন্দেলনের সময় তিনি অনশন পালন করেন। দুই বছরেরও বেশী সময় কারাগারে থাকার পর তিনি আবার মুক্তি পান। জেল থেকে বের হয়ে আবার তিনি সারা দেশে দলকে সংগঠিত করার কাজে ঝাঁপ দেন। তাঁর দল ‘আওয়ামী লীগ’ ধর্ম নিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদী চেতনার বাহক ‘আওয়ামী লীগ’ হিসেবে আবির্ভুত হয়।

১৯৫৪ সালে পূর্ব পাকিস্তানে সাধারণ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের বিজয় ঘটলে শেখ মুজিব মন্ত্রী হন। পাকিস্তান সরকার যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা ভেঙে দেয়। তখন তাঁকে আবারও কিছুদিনের জন্যে জেলে যেতে হয়। এরপর তিনি পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। আবারও তিনি ১৯৫৬ সালে পূর্ব পাকিস্তানের মন্ত্রী হন। কিন্তু আওয়ামী লীগকে সংগঠিত করার কাজে সময় দেবেন বলে মন্ত্রিসভা থেকে তিনি পদত্যাগ করেন।

১৯৬৬ সালে শেখ মুজিব বাঙালির মুক্তির সনদ ৬ দফা কমূর্সচি ঘোষনা করেন।১৯৬৮ সালে জেলে থাকা অবস্থায় তাঁর বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা করা হয়।

নির্যাতন-নিষ্পেষণ যত বৃদ্ধি পেতে থাকে ৬ দফা কর্মসূচী দিন দিন ততই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ১৯৬৯ সালে প্রবল আন্দেলনের মুখে আইযুব খান শেখ মুজিবকে মুক্তি দিতে বাধ্য হন। বন্দিদশা থেকে মুক্তির পর ২৩ ফেব্র“য়ারি ঢাকা রেসকোর্স ময়দানে ছাত্র-জনতার বিশাল জনসভায় তাঁকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। ১৯৭১ সালের ২মার্চ থেকে ২৫মার্চ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর আাহবানে সারা বাংলায় সর্বাত্বক অসহযোগ আন্দোলন পরিচালিত হয়।

এরই মধ্যে ৭ই মার্চ তৎকালীন ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) প্রায় দশ লক্ষ লোকের উপস্থিতিতে বঙ্গবন্ধু এক ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। ১৮ মিনিটের ঐ তেজোদীপ্ত ভাষণে তিনি বাঙালির মুক্তি না হওয়ার পর্যন্ত স্বাধীনতা সংগ্রামের আহবান জানান। তিনি দৃপ্ত কন্ঠে বলে ওঠেন- ‘এবারে সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’

১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভ করে। পাকিস্তানি কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু তাঁর প্রিয় দেশবাসীর কাছে ফিরে আসেন। চরম প্রতিকূল পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে শুরু হয় দেশগড়ার নতুন সংগ্রাম। বাংলার মহান অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামল বাংলাদেশের ইতিহাসে এক স্মরনীয় অধ্যায়। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা সংগ্রামের সূচনাকালীন ১০ই এপ্রিলের স্বাধীনতার ঘোষনাপত্রের বলে ১৭ই এপ্রিল হতে আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রপতি করে কুষ্টিয়া জেলার মুজিব নগরে স্বাধীন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের বিপ্লবী সরকার গঠনের মাধ্যেমে বাংলাদেশের শাসনভার গ্রহণ করেন। মুক্তিযুদ্ধ সমাপ্তির পর ১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানি কারাগার হতে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন এবং ১১ই জানুয়ারি অস্থায়ী সংবিধানে আদেশ জারি করে বাংলাদেশের সাংবিধানিক যাত্রার শুভ সূচনা করেন। এ সময় দেশে সংসদীয় সরকার পদ্ধতি চালু করে তিনি প্রধানমন্ত্রী পদ অলংকৃত করেন। সময়ের দিক হতে তাঁর শাসনামল অতি স্বল্পকালীন হলেও সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত এবং বিধ্বস্থ দেশের পুনর্গঠনে তার অবদান অনস্বীকার্য।

মাত্র সাড়ে তিন বছরের মধ্যে যুদ্ধ বিধ্বস্থ দেশ গড়ে তোলার প্রাথমিক কাজ সম্পাদন করেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। কিন্তু কে জানতো স্বাধীনতা বিরোধী ঘাতকেরা রাতের অন্ধকারে অস্ত্র শানিয়ে তুলছে । ১৯৭৫ সালের ১৫ ই আগস্ট সামরিক বাহিনীর কতিপয় বিপথগামী সদস্যের হাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বপরিবারে নিহত হন।

বাঙালি জাতির জীবনে যে অল্প কয়েকজন মানুষ ইতিহাস সৃষ্টি করতে পেরেছেন তাঁদের মধ্যে প্রধানতম পুরুষ, বাঙ্গালী জাতির ইতিহাসের বরপুত্র বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, মণিরামপুর মহিলা ডিগ্রি কলেজ, যশোর।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

সর্বশেষ

চাঁচড়ায় রনি হত্যাকাণ্ডে ১২ জনের নামে মামলা

নিজস্ব প্রতিবেদক : যশোর শহরতলীর চাঁচড়ায় রনি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় কোতোয়ালি থানায় মামলা হয়েছে। নিহত রনির...

মাতৃদেবীজ্ঞানে আসন নেয় সৃজিতা ঘোষাল

এসআই ফারদিন : সোমবারের সকালটা জেগে উঠেছে ঢাক-বাদ্যের তালে। আর এই ঢাকের তাল বলছে মহা...

এলজিইডি যশোর অফিসের মধ্যে ঠিকাদারকে লাঞ্ছিতের অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক : স্থানীয় সরকার অধিদপ্তর (এলজিইডি) যশোর অফিসের মধ্যে হারুণ অর রশিদ নামে এক...

সম্প্রীতি ধরে রাখার আহ্বান এমপি নাবিলের

নিজস্ব প্রতিবেদক : সম্প্রীতি ধরে রাখতে নৌকায় ভোট দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন যশোর-৩ আসনের সংসদ সদস্য...

যশোরে বাবা ও চাচার বিরুদ্ধে মেয়ের মামলা

নিজস্ব প্রতিবেদক : যশোর শহরতলীর শেখহাটিতে পথ রোধ করে হত্যার উদ্দেশ্যে মারপিট করে জখম, শ্লীলতাহানি...

যশোর বঙ্গবন্ধু প্রথম বিভাগ ফুটবল লিগের ‘খ’ গ্রুপের সেরা রাহুল

নিজস্ব প্রতিবেদক : গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে রেলিগেশন এলাকায় থাকা নওয়াপাড়া খেলোয়াড় কল্যাণ সমিতির কাছে...