Sunday, May 29, 2022

ইতিহাস-ঐতিহ্য
গরুর রাখাল হলো দেশের রাজা

শাহোকা শফি মাহমুদ: যশোরের এক পল্লীর গৃহস্থ বাড়ির রাখাল বালক গৌড়-বাংলার শ্রেষ্ঠ নৃপতি হয়েছিলেন। তার সিংহাসনে আরোহণে ২৭ বছরের অশান্ত বাংলায় শান্তির সুবাতাস বইতে শুরু করে, যা অব্যাহত ছিল যোগ্য পিতার যোগ্য সন্তানের শাসনামল পর্যন্ত প্রায় ৪০ বছর। তাদের রাজত্বকাল বাংলার ইতিহাসে এক স্বর্ণোজ্জ্বল যুগ। পিতা আলাউদ্দিন হুসেন শাহ ও পুত্র নাসির উদ্দিন নসরত শাহ এই কৃতী দুই শাসকের গর্বিত অধ্যায়ের জন্য বৃহত্তর যশোর ও খুলনা জেলার প্রায় ৫০০ বছর ধরে তাদের স্মৃতিগাথা গেয়ে চলেছে। যশোরের বিল সোনামুখী, বাগেরহাটের ১০ দম্বুজ মসজিদ ও ঝিনাইদহের শৈলকূপার শাহী মসজিদ আজো স্মৃতির স্মারক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।

ইতিহাসবিদ সতীশচন্দ্র মিত্র রিয়াজ-উস-সালাতিন গ্রন্থের উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছেন, আলা উদ্দিন হুসেন শাহ তুর্কিস্তানের তিরমিজ শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম সৈয়দ আশরাফুল হুসেন। যে কারণেই হোক তিনি হুসেন শাহকে সঙ্গে নিয়ে বাংলায় আসেন। একপর্যায়ে তিনি দারুণ অর্থকষ্টে পড়েন। সে সময় নিরুপায় হয়ে তিনি যশোরের শার্শ উপজেলার কাগজপুকুর গ্রামের শান্তিধরের বাড়িতে আশ্রয় নেন। পরে সেখান থেকে চলে যাওয়ার সময় বালক পুত্র হুসেন শাহকে শান্তিধরের কাছে রেখে যান। তিনি সেখানে রাখাল হিসেবে শান্তিধরের গরু চরাতেন। ওই সময় খান জাহান আলী ইসলাম প্রচারের জন্য যশোর আসেন। ঘটনাক্রমে তিনি হুসেন শাহর পরিচয় জানতে পেরে তাকে খলিফাতাবাদে (বাগেরহাট) নিয়ে যান। সেখানে হুসেন শাহ চাঁদপুরের কাজীদের কাছে লেখাপড়া শেখেন। পরে তিনি মুর্শিদাবাদের চাঁদপাড়ার জমিদার সুবুদ্ধি রায়ের অধীনে চাকরি গ্রহণ করেন। কিছুদিন পর চাকরি ছেড়ে তিনি গৌড়ে চলে যান এবং নিজ প্রতিভা বলে গৌড় রাজের উজির নিযুক্ত হন। ওই সময় গৌড়ে ভীষণ অরাজকতা চলছিল। ১৪৬০ সালে সুলতান মাহমুদ শাহর মৃত্যুর পর তার পুত্র বার্বাক শাহ গৌড়াধিপতি হন। তিনি আবেসিনীয় বা হাবসি দাসদের রাজকাজে অংশগ্রহণের সুযোগ দেন। এ সুযোগে হাবসিরা শক্তিশালী অশ্বারোহী ও পদাতিক বাহিনী গঠন করে এবং ব্যাপকভাবে তারা গৌড়ে প্রবেশ করে। এভাবে শক্তি সঞ্চয় করে ইচ্ছামতো একজনকে হত্যা করে আর একজনকে ক্ষমতায় বসাতে থাকে। ১৪৬০ সাল থেকে ১৪৮৭ সাল পর্যন্ত ২৭ বছর এভাবে গুপ্ত হত্যার মাধ্যমে রাজবংশ ধ্বংস করে এবং হাবসি বংশীয় মুজাফফর শাহকে গৌড়ের ক্ষমতায় বসায়। এবার হাবসিদের অত্যাচার সারা বাংলায় ছড়িয়ে পড়ে। অত্যাচার-নির্যাতনে দেশবাসী দাবানলের মতো জ্বলে ওঠে। ১৪৯৩ সালে তারা সুলতান মুজাফফর শাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। এ বিদ্রোহে বহু লোক মারা যায়। এক পর্যায়ে মুজাফফর শাহও নিহত হন। তখন সবাই মিলে হুসেন শাহকে ক্ষমতায় বসান।

আলা উদ্দিন হুসেন শাহ সম্পর্কে ইতিহাসবিদ সতীশচন্দ্র মিত্রের সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন বাংলার বিদ্রোহসহ বহু গ্রন্থপ্রণেতা বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও গবেষক হোসেনউদ্দিন হোসেন। তিনি লিখেছেন যশোরের শার্শা উপজেলার কাগজপুকুর গ্রামে শৈশবে পিতার সঙ্গে আগমন এবং গরু চরানোর ঘটনাকে কেউ কেউ হাস্যকর ও অসম্ভব বলে উড়িয়ে দিয়ে নিজেদের মত প্রতিষ্ঠার অপচেষ্টা করেছেন। কোনো অনুসন্ধিৎসু ব্যক্তির পক্ষে এ মানসিকতা পোষণ করা ঠিক নয়। ইতিহাস লেখার সময় কোনো প্রচলিত কাহিনীকে অবজ্ঞা করা যায় না। তার মধ্যকার সারবস্তু উদ্ধার করার চেষ্টা করা বাঞ্ছনীয়।

আলা উদ্দিন হুসেন শাহর ২৫ বছর ব্যাপী (১৪৯৩-১৫১৮) রাজত্বকাল বাংলার ইতিহাসে এক স্মরণীয় কাল। এ সময় দেশে অনাবিল শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রজাদের সুখ-সমৃদ্ধি অর্জিত হওয়ার পাশাপাশি ধর্ম ও সাহিত্যেরও প্রভূত উন্নতি হয় এ সময়। রাজ্য বিস্তৃত হয় বিহার, উড়িষ্যা, আসাম ও আরাকান পর্যন্ত। তিনি রাজতক্তে বসার পর বাল্যকালে কাগজপুকুর গ্রামের শান্তিধরের কাছে পালিত হওয়ার কৃতজ্ঞতাস্বরূপ তাকে নিষ্কক জমিদারি প্রদান করেন এবং রাজা রামচন্দ্র খাঁ খেতাব দেন। তা ছাড়াও গৌড় থেকে বহু ধনসম্পদ বিশেষ করে সোনা কৌশলে ইটের ভেতর ঢুকিয়ে নৌকাযোগে তার কাছে পাঠান। ওই নৌকা স্থানীয় একটি বিলে প্রবেশ করলে দুর্যোগে পড়ে সবকিছু বিলের অথৈ পানিতে তলিয়ে যায়। ওই সময় ইছামতি নদীর সঙ্গে বিলের সংযোগ ছিল। পরে শান্তিধর বিল থেকে ইট সংগ্রহ করে সোনা উদ্ধার করেন। সেই থেকে বিলের নাম হয় সোনামুখী বিল। সে নাম এখনো প্রচলিত আছে। ওই সোনা পেয়ে শান্তিধর ঐশ্বর্যশালী হন। তিনি কাগজপুকুর গ্রামে রাজবাড়ি নির্মাণ করেন। অতীত দিনের এসব গৌরবোজ্জ্বল কাহিনী এখনো এলাকার মানুষের মুখে মুখে ফেরে।

হুসেন শাহর হাজারো কীর্তির মধ্যে বাগেরহাটের ১০ গম্বুজ মসজিদ অত্যতম। এই মসজিদের ভেতরের মাপ ৬৩ফুট ২৪ ফুট এবং গম্বুজগুলোর তলদেশের মাপ ১২ ফুট ১২ ফুট। প্রতি সারিতে পাঁচটি করে দুই সারিতে ১০ টি গম্বুজ স্থাপিত। স্থাপত্য বিষয়ে মসজিদটি খান জাহান আলীর ষাটগম্বুজ মসজিদসহ অন্যান্য মসজিদের মতো। এই মসজিদের পাশে বৃহৎ একটি দিঘিও আছে।

আলা উদ্দিন হুসেন শাহর শাসন আমলে গৌড়ের রাজ দরবারে মুসলমান ও হিন্দুর সমান মর্যাদা নিশ্চিত করা হয়। উভয় ধর্মাবলম্বীর উচ্চ রাজপদে নিযুক্ত করে তিনি দেশে মুসলমান হিন্দুদের মধ্যে সৌভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। ১৪৯৩ সাল থেকে দীর্ঘ ২৫ বছর সুনাম সুখ্যাতির সঙ্গে রাজ্য শাসন করে বাংলাকে শান্তি-সমৃদ্ধির দেশে পরিণত করে ১৫১৮ সালে ইন্তেকাল করেন। তার মৃত্যুর পর পুত্র নসরত শাহ নাসির উদ্দিন নসরত শাহ উপাধি গ্রহণ করে গৌড়ের সিংহাসনে বসেন। তার আমলে পর্তুগীজ জলদস্যুরা নদীপথে যশোর ও খুলনার বিভিন্ন স্থানে এসে লুটতরাজ করে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। নসরত শাহ সফলভাবে দস্যুদের দমন করে এই এলাকার মানুষের কাছে পিতার মতো জননন্দিত হয়ে ওঠেন। শুধু এই এলাকা নয়, গোটা গৌড় রাজত্বে তিনি পিতার মতো দক্ষতার সঙ্গে শাসন কাজ পরিচালনা করে পিতার সুনাম-সুখ্যাতি, আদর্শ-ঐতিহ্য সমুন্নত রাখেন। এ কৃতী শাসকের অন্যতম স্মৃতি আজো দাঁড়িয়ে আছে বর্তমান ঝিনাইদহ জেলার শৈলকূপায়। শাহী মসজিদ নামে নসরত শাহের এই স্মৃতিতে প্রায় ৫০০ বছর ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা প্রতিদিন পাঁচবার আল্লাহর সান্নিধ্য লাভে হাজিরা দিয়ে আসছেন। নসরত শাহ গৌড় থেকে ঢাকা যাওয়ার পথে শৈলকূপায় যাত্রাবিরতি করেন। তার সঙ্গে ছিলেন খ্যাতনামা দরবেশ মাওলানা মোহাম্মদ আরব। তিনি এই স্থানটি দরবেশ আরবকে নিষ্কর দান করে এবাদত-বন্দেগি করতে এবং এলাকায় ইসলাম প্রচারের কেন্দ্র হিসেবে মসজিদটি নির্মাণ করে দেন। গৌড় ও পান্ডুয়ার স্থাপত্য শিল্পের মতো এ মসজিদটিও কারুকার্য সমৃদ্ধ।

১৪৯৩ সাল থেকে ১৫১৮ সাল পর্যন্ত ২৫ বছর আলা উদ্দিন হুসেন শাহ এবং ১৫১৮ সাল থেকে ১৫৩২ সালে মৃত্যু পর্যন্ত ১৪ বছর নাসির উদ্দিন নসরত শাহ, পিতা-পুত্রের ৪০ বছরের শাসনামল বাংলার ইতিহাসে স্বর্ণযুগ। এ ইতিহাসের সঙ্গে বৃহত্তর যশোর-খুলনা একই সুতায় গাঁথা।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

সর্বশেষ

খুলনা-কলকাতা রুটে বন্ধন এক্সপ্রেস আজ ফের চালু

নিজস্ব প্রতিবেদক: আজ রোববার থেকে ফের কলকাতা-খুলনা রুটে ‘বন্ধন এক্সপ্রেস’ রেল চলাচল শুরু হবে।...

রসুনের গায়ে আগুন!

সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিতে বেড়েছে ৫০ টাকা ক্ষুব্ধ ক্রেতা, স্বস্তিতে নেই কিছু বিক্রেতাও জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক: এবার ভোক্তার...

আনারসের পাতা থেকে সুতা সৃজনশীল কাজে পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন

অপার সম্ভাবনার দেশ বাংলাদেশ। কিন্তু হলে কি হবে। সম্ভবনা থাকলেই তো আর আপনা আপনি...

দড়াটানার ভৈরব পাড়ে মাদকসেবীদের নিরাপদ আঁখড়া

নিজস্ব প্রতিবেদক: যশোর শহরের ঘোপ জেলরোড কুইন্স হাসপাতালের পূর্ব পাশে ভৈরব নদের পাড়ে মাদকসেবীদের...

আজকের মধ্যে অবৈধ ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক বন্ধ না হলে ব্যবস্থা

কল্যাণ ডেস্ক: দেশে অনিবন্ধিত ও নবায়নহীন অবস্থায় পরিচালিত অবৈধ বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার...

নিরপেক্ষ সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে : মির্জা ফখরুল

ঝিনাইদহ প্রতিনিধি: বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, দেশে আওয়ামী লীগের অধীনে আর...