মঙ্গলবার, অক্টোবর ৪, ২০২২

ইতিহাস-ঐতিহ্য মধ্যযুগের শহর যশোহর

সাজেদ রহমান: 
মধ্য যুগে যে সব শহর এই উপমহাদেশে গড়ে উঠেছিল তার মধ্যে রয়েছে যশোহর। তবে এই যশোহর বর্তমানে আমাদের যশোহর শহর নয়। এটা বর্তমানে পড়েছে সাতক্ষীরা ধুমঘাট এবং ইশ্বরীপুর এলাকায়।

ষোড়শ শতাব্দির মাঝামাঝি থেকে গৌড় রাজনৈতিক অস্থিরতা আরও বেশি বেড়ে যায় মোগলদের বাংলা বিজয় করার পর। মনে হয় পুরনো আফগান অভিজাত ও সরকারি কর্মচারীরা পুর্ববাংলায় চলে আসেন, যার ফলে পুর্ববাংলায়, বিশেষত উপকুল অঞ্চলে জনবসতি বেড়ে যায়। এদের মধ্যে সবগুলো শহরে রূপান্তরিত হয়নি। অনেকগুলিই ছিল কবসা জাতীয়-বাজার শহর। প্রধানত কাপড়, চাল, চিনি ও মোম ইত্যাদি উৎপাদন করে রফতানি করা হতো, যার জন্য পুর্তুগিজ বণিক ও অন্যান্য ভারতীয় বণিকরা আসতেন। এসব শহর গৌড় শহরের মতো পাঁচিলঘেরা শহর নয়-গ্রাম ও শহরের পরিষ্কার কোন বিভাজন নেই।

সপ্তদশ শতাব্দির প্রথম দিকে ছাপা জোয়াও দ্য ব্যারোসের মানচিত্রে দেখা যায়, উপকুল এলাকায় ৫টি শহর ছিল। যার মধ্যে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ ছিল যশোহর। ষষ্ঠদশ শতকের শেষ দিকে জেসুইট পাদরিরা বলেছেন যে, যশোহর-এর রাজধানী ছিল চ্যান্ডিকান-যে নামে ওরা সারা দেশকেই অভিহিত করেছেন। এ নাম নিয়ে অবশ্য বির্তক আছে। যদিও বলা হয় যে প্রাক্তন শাসক চাঁদ খানের জমিদারি থেকে এই নাম এসেছে। ১৬০০ সালের পেট্রিয়াস বারটিয়াসের মানচিত্রে দেখা যায় যে চ্যান্ডিকানের সীমানা ভাগীরথী পর্যন্ত ছিল। পাদরিদের লেখা থেকে এর সমর্থন মেলে। পাদরিদের সময়ে প্রতাপাদিত্য ছিলেন যশোহর এর জমিদার। সপ্তদশ শতাব্দির প্রথম দিকের মোগল সাক্ষ্যে প্রতাপাদিত্যকে বাংলার প্রধান জমিদারদের অন্যতম বলে বলা হচ্ছে। উপকুল এলাকায় তিনি ছিলেন প্রধান জমিদার এ বিষয়ে সন্দেহ নেই।

প্রতাপাদিত্যর বাবা শ্রীহরি ছিলেন সুলতান দাউদ কাররানির প্রধান অভিজাতদের অন্যতম ও তার কোষাধ্যক্ষ। মোগল ইতিহাসের এর কথা পাওয়া যায়। দায়ুদের মৃত্যুর পর তিনি তিনি ধনরতœ নিয়ে যশোহরে পালিয়ে এসেছিলেন বলে বলা হয়। কিন্তু ধনরতœ নিতে পেরেছিলেন কি না সন্দেহ আছে। ভাগীরথী পর্যন্ত তার জমিদারির সীমানা ছিল বলে ধরা যেতে পারে। কারণ কলকাতার কালিঘাট মন্দিরের সঙ্গে শ্রীহরির ভাই বসন্ত রায়ের ঘনিষ্ঠ সুসর্ম্পক ছিল বলে জানা যায়। এমনকি বেহালার কিছু অংশও এই জমিদারির মধ্যে ছিল। ১৫৯৯ সালের আগেই শ্রীহরির মৃত্যু হয়েছিল। কারণ ওই সময়ে পাদরিরা বলেছেন যে প্রতাপাদিত্যই জমিদার।

ভাটি অঞ্চলে পুর্ব বাংলার উপকুল অঞ্চলে যে তখন নতুন পত্তন হচ্ছে সেটা প্রত্যক্ষ করেছেন ১৬০০ সালে জেসুইট পাদরি ফনসেকা। তিনি জানুয়ারি মাসে বাকলা থেকে নৌকা করে সুন্দরবনের মধ্যে দিয়ে যশোহর আসছিলেন। এক পাড়ে তিনি ধানের চাষ হতে দেখেছেন। অন্য পাড়ে বন্য জন্তু ঘুরে বেড়াচ্ছে। একটা বাঘ বহুক্ষণ নৌকার পাশে পাশে আসছিল। এছাড়া পুর্তগীজ জলদস্যুদের অতর্কিত আক্রমণের ভয় ছিল। এসব থেকে বাঁচার জন্য উপকুলের জমিদাররা পর্তুগিজদের জায়গির দিয়ে নিজেদের জমিদারিতে বসিয়েছিলেন। যশোহরে প্রতাপাদিত্য একজন পর্তুগিজকে পুলিশের প্রধান করে বসালে পর্র্তুগিজ ও আফগানদের মধ্যে দাঙ্গা শুরু হয়। এই পর্তুগিজদের নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য এই সব জমিদাররা জেসুইট পাদরিদের আমন্ত্রণ করেছিলেন। যশোহরে তারা একটা গির্জা বানায় এবং প্রতাপ ওই গির্জাতে গিয়েছিলেন। পাদরিরা লিখছেন যে গির্জার আশেপাশের জমির খাজনা পাদরিদের দেবার জন্য প্রতাপ একটা পাট্রাও দিয়েছিলেন। প্রতাপ শুধু খ্রিস্টানদের প্রতি উদার ছিলেন তা নয়, তিনি বৈষ্ণব মন্দিরও করেছেন। যার সঙ্গে বসন্ত রায়ের যোগাযোগ ছিল এ কথা মন্দিরের শিলালিপিতে উৎকীর্ণ করা হয়েছিল। কিন্তু প্রতাপের উত্থানের সঙ্গে কালীর যোগাযোগ সম্পর্কে পরস্পরা রয়েছে। কবি ভারতচন্দ্র অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি প্রতাপকে ‘বরপুত্র ভবানীর’ বলে উল্লেখ করেছেন।
প্রতাপের রাজধানী কোথায় ছিল এ নিয়ে বির্তক ছিল। ঐতিহাসিক নিখিলনাথ রায় সাগরদ্বীপকেই প্রতাপের রাজধানী বলে অভিহিত করেছেন। কিন্তু হেনরি বেভারিজ ও সতীশচন্দ্র মিত্র প্রতœতাত্ত্বিক অনুসন্ধান করে অন্য মত দিয়েছেন। তাঁরা যমুনা ও ইছামতির সঙ্গমস্থলে ধুমঘাটকে রাজধানী বলে ধরেছেন, যার সমর্থন মির্জা নাথান এর বাহারিস্তান ই ঘায়েবিতে পাওয়া যায়।

মিত্র দেখাচ্ছেন যে শ্রীহরির রাজধানী ছিল ধুমঘাট থেকে কিছু দুরে মুকুন্দপুরে। এখানে প্রাচীন দুর্গের ধ্বংসাবশেষ ও কয়েকটা বাড়ির চিহৃ পাওয়া যায়। এটি ধুমঘাট এর দশ মাইল উত্তরে। ধুমঘাটে নতুন রাজধানী স্থাপন হবার পর এই দশ মাইল বসতিপূর্ণ হয়ে যায়। এই সব জায়গাই যশোহর নামে পরিচিত ছিল।

ধুমঘাটের দুর্গের পাঁচিলের ও বুরুজের ভগ্নাংশ সতীশচন্দ্র মিত্র দেখেছিলেন বিংশ শতাব্দির প্রথম দিকে। এর কাছে যশোরেশ্বরী কালীমূর্তির মন্দির। তিনি এই সব বুরুজের নিচের মাটিতে কামানের গোলা পেয়েছিলেন। দুর্গের উত্তরে যমুনা ও দক্ষিণে ইছামতি অন্য দুই দিকে পরিখা। পশ্চিম দিকের অঞ্চলকে কামারখালি বলা হতো। লোহার কারিগরদের এলাকা। ওখান থেকে প্রচুর পরিমানে লোহার টুকরা পাওয়া গিয়েছে। প্রতাপের পতনের পর জায়গাটি পরিত্যক্ত হয়ে যায়- আবার অষ্টাদশ শতাব্দির শেষে বসতি শুরু হয়।

দুর্গের পুর্ব দিকে রাজবাড়ি বলে। বাড়ির ধ্বংসাবশেষের চিহৃস্বরূপ ইটের টুকরো প্রচুর ছড়িয়ে ছিল। ভেতরে পুকুর। এখানে যশোরেশ্বরী মন্দিরে যাবার চিহৃ রয়েছে। এই ধ্বংসবশেষের সামনে বারদুয়ারি যার সামনে একটা পুকুর আছে। সামনে যশোরেশ্বরী মন্দির-উত্তর দিকে প্রধান দরজা, দুপাশে বাড়ি। সামনে নাটমন্দির। মন্দিরের দক্ষিণের ধ্বংসাবশেষকে মিত্র হাবসিখানা বলেছেন। তখনও একটা অংশ দাঁড়িয়ে ছিল। মিত্র একে হাম্মাম বা স্নানঘর বলেছেন। পরস্পরা এই যে প্রতাপের পতনের পর মোগল ফৌজদার এ বাড়িতে থাকতেন। এর পাশে কয়েকটা বাড়ির ধ্বংসাবশেষ রয়েছে। এই বাড়ি গুলোর উত্তরে পায় ৫ মাইল দুরে জাহাজখানা। হাম্মামের দক্ষিণ-পশ্চিমে টেঙ্গা মসজিদ যা তখনও দাঁড়িয়ে ছিল। পূর্ব দিকে বড় উঠোন এবং চারপাশে কবর রয়েছে। মসজিদের উত্তর দিকে আটকোনা বাড়ি। হিন্দুদের মতে লক্ষ¥ীর মন্দির, মুসলমানরা বলে বিবির আস্তানা অর্থাৎ মহিলাদের প্রার্থনা করার জায়গা। মিত্র দ্বিতীয়টা গ্রহণ করেছিলেন। ধুমঘাটের উত্তরে ইছামতির তীরে গির্জার ধ্বংসাবশেষ দেখা যায়। এর কাছেই রয়েছে কবরখানা। একেই মিত্র ধুমঘাটের গির্জা বলে ধরেছেন যদিও এ সম্পকে সন্দেহের নিরসন হয়নি।

ইশ্বরীপুর ও ধুমঘাটের ধ্বংসাবশেষ দেখলে মনে হয় যে এটি সমকালীন শহরের মতো, যার পাঁচিল চারপাশের জমি থেতে একে স্বতন্ত্র করে রেখেছে। এর ফলে রাজার যে চেহারাটা আমরা সমকালীন ইতিহাসে পাই তার সঙ্গে মিল আছে। অধিকাংশ দুর্গগুলো দক্ষিণে থাকায় মনে হয়ে যে যশোহরের প্রধান ভয় ছিল পুর্তগিজ ও আরাকান আক্রমণের। সমকালীন ইতিহাস বাহারিস্তান পড়লে মনে হয় যে প্রতাপ আরাকান আক্রামণের আশঙ্কা করেছিলেন অনেক বেশি। ফলে উত্তরের দুর্গ তৈরি করা বিশেষ হয়েনি, যার জন্য মুঘল আক্রমণ সহজেই সাফল্য লাভ করেছিল। বাকলা এর তুলনায় অন্য রকম। ওখানে রাজধানী ও চারপাশের মধ্যে কোথাও পাঁচিল সহজ যাতায়াত বন্ধ করেনি। এই উত্তরণের ফলে যশোহরের পতনের পথ ত্বরান্তিত হয়েছিল কিনা সেটা বিবেচনার বিষয়। এখানকার প্রজারা রাজার জন্য বিশেষ যুদ্ধ করেছিল এ রকম প্রমাণ নেই। ষোড়শ শতাব্দীর প্রথম দিকে প্রতাপের পতনের পর পূর্ব বাংলায় মোগল নিয়ন্ত্রণ অনেক শক্ত হয়ে বসে, যার সন্ধিক্ষণ থেকে ঢাকা শহরের উদ্ভব।

তথ্যসূত্র: মধ্যযুগের ভারতীয় শহর-অণিরুদ্ধ রায়।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

সর্বশেষ

যশোরে শিশু সানজিদা হত্যার প্রতিবাদে হাজারো মানুষের মানববন্ধন

নিজস্ব প্রতিবেদক : শিশু সানজিদা আক্তার মিষ্টিকে হত্যা ঘটনায় ফুঁসে উঠেছে গ্রামবাসী। হত্যার ঘটনায়...

‘চাঁদ’ নেমে আসছে দুবাইয়ে, খরচ ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার

কল্যাণ ডেস্ক প্রেমিকাকে আকাশের চাঁদ এনে দিতে চান? ভাবছেন কী উল্টো-পাল্টা কথা! এ আবার সম্ভব...

চাঁচড়ায় রনি হত্যাকাণ্ডে ১২ জনের নামে মামলা

নিজস্ব প্রতিবেদক : যশোর শহরতলীর চাঁচড়ায় রনি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় কোতোয়ালি থানায় মামলা হয়েছে। নিহত রনির...

মাতৃদেবীজ্ঞানে আসন নেয় সৃজিতা ঘোষাল

এসআই ফারদিন : সোমবারের সকালটা জেগে উঠেছে ঢাক-বাদ্যের তালে। আর এই ঢাকের তাল বলছে মহা...

এলজিইডি যশোর অফিসের মধ্যে ঠিকাদারকে লাঞ্ছিতের অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক : স্থানীয় সরকার অধিদপ্তর (এলজিইডি) যশোর অফিসের মধ্যে হারুণ অর রশিদ নামে এক...

সম্প্রীতি ধরে রাখার আহ্বান এমপি নাবিলের

নিজস্ব প্রতিবেদক : সম্প্রীতি ধরে রাখতে নৌকায় ভোট দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন যশোর-৩ আসনের সংসদ সদস্য...