ই-কমার্সের সংকট সমাধান হবে কবে?

নাসিমা আক্তার নিশা

“দারাজের মতো বড় এবং বিদেশি বিনিয়োগ নির্ভর প্রতিষ্ঠান এখনো লাভের মুখ দেখেনি। এখনো প্রতিনিয়ত লোকসান গুনছে। এটা নেতিবাচক বিষয় নয় কারণ ইন্ডাস্ট্রি প্রবৃদ্ধিতে আছে…”

নাসিমা আক্তার নিশা
বাংলাদেশে ই-কমার্সের সম্ভাবনা সবসময় উজ্জ্বল ছিল, এখনো আছে। বিভিন্ন নিয়ামক এই প্রবৃদ্ধিতেতে ভূমিকা রেখেছে। সেগুলোর উন্নয়ন যেহেতু থেমে নেই সুতরাং ই-কমার্সের উন্নতিও থামবে না। যেমন ইন্টারনেটের ব্যবহার বেড়েছে এবং ইন্টারনেটের দামও কমেছে। স্মার্টফোনের মাধ্যমে সবাই এখন ইন্টারনেট ব্যবহার করছে।
সারাদেশে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন বা লোডশেডিং-এর দিনও শেষ হয়ে এসেছে। আর দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থা অনেক উন্নত হয়েছে। যা অনেকে কল্পনা করেনি। তাই ই-কমার্সের সম্ভাবনা এবং প্রবৃদ্ধি দুটোই গতিশীল থাকবে।

কিন্তু সত্যি কথা বলতে, বর্তমানে ই-কমার্স একটা বড় ধরনের হোঁচট খেয়েছে। সম্পূর্ণরূপে যা মূল ব্যবসার উপর প্রভাব ফেলেছে। ২০২১ সালের শেষে বা ২০২২ সালের শুরুতে ই-কমার্সের বাজার ২৪ হাজার কোটি টাকার হবে বলে যে প্রত্যাশা করা হয়েছে, তা পূরণ হবে না।

ডিজিটাল লেনদেনের ক্ষেত্রেও সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে। মোট ই-কমার্স লেনদেনের ১০ শতাংশ থেকে বেড়ে করোনাকালীন সময়ে এটা ৩০ শতাংশ ছাড়িয়ে গিয়েছিল। তা বর্তমানে ৫ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। কিন্তু বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবসা, প্রতারণার অভিযোগ ও ভুল ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তের কারণে ই-কর্মাসের বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

একটা কথা আমাদের মনে রাখতে হবে। দারাজের মতো বড় এবং বিদেশি বিনিয়োগ নির্ভর প্রতিষ্ঠান এখনো লাভের মুখ দেখেনি। এখনো প্রতিনিয়ত লোকসান গুনছে। এটা নেতিবাচক বিষয় নয় কারণ ইন্ডাস্ট্রি প্রবৃদ্ধিতে আছে। প্রবৃদ্ধির যে হার সেটা কিছুটা বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

দারাজে প্রায় ৩০ হাজারের বেশি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তাদের পণ্য বিক্রি করছে। যেকোনো মার্কেটপ্লেস ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য একটি বিকল্প প্ল্যাটফর্ম। দারাজও তার ব্যতিক্রম নয়।

দারাজের মতো বড় প্রতিষ্ঠান যদি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য সহায়ক হয় আমরা অবশ্যই তাদের সহায়ক হবো। কিন্তু দেশীয় বা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য যদি ঝুঁকি তৈরি করে তাহলে অবশ্যই আমাদেরকে সতর্ক হতে হবে। এজন্য ই-ক্যাব থেকে সরকারকে দুটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

প্রথমত, কোনো মার্কেটপ্লেস মোট পণ্যের ২৫ শতাংশের বেশি কোনো একক প্রতিষ্ঠানের হতে পারবে না। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশি মার্কেটপ্লেসে পণ্য বিক্রির জন্য বাংলাদেশে নিবন্ধিত হতে হবে। এই মুহূর্তে আমাদের কিছু বিদেশি বিনিয়োগও হুমকির মুখে পড়েছে।

ফুড ডেলিভারি সেবার ক্ষেত্রে আমাদের এখানে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২০০ শতাংশ। কিন্তু করোনাকালীন কোনো কোনো দেশে এটা ৬০০ শতাংশ গ্রোথও হয়েছে। তাই এশিয়ার কিছু দেশে এই খাতে প্রচুর বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে আমাদের এখানে তা যৎসামান্য।

সরকার কিন্তু নীতিগতভাবে এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি যাতে ই-কমার্স বন্ধ বা বাধাগ্রস্ত হয়। সরকার একটি স্থায়ী সমাধানের পথ খুঁজছে এজন্য সবার সাথে আলোচনা করছে…
আমাদের মতো দেশে দক্ষ জনশক্তি তৈরি, ই-কর্মাস খাতের উন্নয়নের জন্য বিদেশি বিনিয়োগ উন্নয়নের একটা অংশ। তবে তা অবশ্যই দেশীয় ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের স্বার্থ রক্ষা করে হওয়া উচিত।

বর্তমানে প্রতিদিন ২ লাখ ৫০ হাজার ডেলিভারি হয়। এর মধ্যে যে কয়টাতে সমস্যা হয় তা মোট ডেলিভারির ১ শতাংশও হবে না। আবার সব সমস্যার জন্য কিন্তু উদ্যোক্তা নিজে দায়ী নন। এছাড়া ই-কমার্স যে ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবসা বা প্রতারণার অভিযোগ এসেছে তা কিন্তু মাত্র দশমিক ৫ শতাংশ। মনে রাখতে হবে, এ ধরনের কিছু সমস্যা সব সেক্টরেই আছে। তাই বলে পুরো সেক্টরকে প্রশ্নবিদ্ধ করা ঠিক নয়। এই বার্তাটি আমরা উই থেকে সরকার এবং মিডিয়াকে দিয়েছি।

আমাদের একটা বিষয় খেয়াল রাখতে হবে, সরকার কিন্তু নীতিগতভাবে এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি যাতে ই-কমার্স বন্ধ বা বাধাগ্রস্ত হয়। সরকার একটি স্থায়ী সমাধানের পথ খুঁজছে এজন্য সবার সাথে আলোচনা করছে।

আশাকরি, আমরা এই সংকট কাটিয়ে উঠতে পারব। নেতিবাচক ভাবনা এবং নেতিবাচক প্রচারণা থেকেও বের হয়ে আসতে হবে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে ফেসবুকে পেইজে যেসব অভিযোগ আসে তার ৮৫ শতাংশ দ্রুত নিষ্পত্তি হয়।

ভুল বোঝাবোঝির কারণেও অনেক সময় সমস্যা হয়। এজন্য আমরা বলছি, ক্রেতারা যেন প্রথমবার সরকারি এজেন্সির কাছে অভিযোগ করার আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে যেন প্রথম অভিযোগ করে। এটা সচেতনতার একটা অংশ।
লেখক : প্রেসিডেন্ট, ওমেন অ্যান্ড ই-কমার্স ফোরাম (উই)

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে