মঙ্গলবার, অক্টোবর ৪, ২০২২

উপকূলে পাউবোর উদাসীনতায় জলে ৩৫০ কোটি টাকা!

গুরুত্ব দেয়া হয়নি স্থানীয়দের দাবিকে, নির্মিত বাঁধে তিন মাসে ধস

খুলনা ব্যুরো :

টেকসই বেড়িবাঁধের জন্য কয়েক যুগ অপেক্ষা করছে খুলনা উপকূলের মানুষ। দীর্ঘ দাবি-দাওয়ার পর ঝড় আর জোয়ারে ভাসা উপকূলের মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষায় এগিয়ে আসে বিশ্বব্যাংক। প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে পুনঃনির্মাণ হয় খুলনার দাকোপ উপকূলের দুটি বাঁধ (৩২ ও ৩৩নং পোল্ডার)। গত ৩০ জুন কাঙ্খিত সেই বাঁধের কাজ শেষ হয়েছে।

অথচ কাজ শেষ হওয়ার তিন মাসের মধ্যেই ধসে যাচ্ছে নতুন বাঁধ। গত আগস্ট মাসে দাকোপ উপজেলার ৩২ নম্বর পোল্ডারের একাধিক জায়গায় বাঁধ ধসে গেছে। ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে আরও ৫টি এলাকা। সর্বশেষ গত ১৫ সেপ্টেম্বর বাজুয়া ইউনিয়নের চুনকুড়ি খেয়াঘাটের পাশে ১০০ মিটার বাঁধ (৩৩নং পোল্ডার) নদীতে ধসে যায়। এতে দোকানপাটসহ বেশকিছু ঘর চুনকুড়িতে ভেসে গেছে।

স্থানীয়রা জানান, বাঁধের কাজ শুরু হওয়ার পর আশায় বুক বেধেঁছিলেন তারা। কিন্তু যতো বড় প্রকল্প, কাজ ততো ভালো হয়নি। বেশিরভাগ স্থানে পুরাতন বাঁধের ওপর মাটি দিয়ে নতুন বাঁধ তৈরি করা হয়েছে। চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ পেলেও প্রায় এলাকায় কাজ করেছে, তাদের নিয়োগকৃত দেশীয় উপ-ঠিকাদাররা। সেই কাজেও মনিটরিং ব্যবস্থা ছিলো দুর্বল।

তারা জানান, এতো টাকা খরচের আগে নদী ভাঙনের বিষয়টিকে কোনো গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। বাঁধ নির্মাণের কাজ চলা অবস্থায় গ্রামের মানুষ ও জনপ্রতিনিধিরা একাধিকবার সংবাদ সম্মেলন, মানববন্ধন করে নদী শাসনের (কংক্রিটের ব্লক ফেলে নদী ভাঙন ঠেকানো) দাবি তোলেন।
তাদের ভাষ্য ছিলো, উপকূলের খরস্রোত নদীগুলো শাসন না করে বাঁধ নির্মাণ করলে এই বাঁধ টিকবে না। বাঁধের পেছনে শত কোটি টাকা খরচের আগে নদী শাসন জরুরী। কিন্তু ওই অঞ্চলের পানি-মাটিতে বেড়ে ওঠা গ্রামের মানুষের কথাকে গুরুত্ব দেননি রাজধানীতে থাকা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কর্মকর্তারা।

তবে কাজ শেষ হওয়ার মাত্র দুই মাসের মধ্যে বিভিন্ন এলাকায় ভাঙন দেখা দেওয়ায় টনক নড়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের। বাঁধের ভাঙন ঠেকাতে এখন নদী শাসনের নতুন প্রকল্প নিচ্ছে সংস্থাটি। ভাঙন কবলিত ৭ কিলোমিটার অংশে নদী শাসন করতে আপাতত ব্যয় ধরা হয়েছে ১৫২ কোটি টাকা। এই ব্যয় আরও বাড়তে পারে।

গত কয়েকদিন ওই এলাকা ঘুরে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলেছে এ প্রতিবেদক। উপকূলীয় এলাকার মানুষ এখনও বলছেন, মাত্র ৭ কিলোমিটার অংশ নদী শাসন করে পুরো বাঁধ রক্ষা করা সম্ভব নয়। কারণ প্রতিবছরই নতুন জায়গায় বাঁধ ভাঙছে। কিছু এলাকায় নদী শাসন করলে অন্য এলাকায় ভাঙন বাড়বে কিনা, তা নিয়েও কোনো সমীক্ষা হয়নি। সাড়ে তিনশ’ কোটি টাকার এই বাঁধ, উপকূলের মানুষ ও সম্পদ বাঁচাতে ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিটি অংশে নদী শাসন জরুরি। পাশাপাশি যে সব এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছে, ওই অংশ দ্রুত মেরামত করতে হবে। কিন্তু এবারও স্থানীয়দের কথা কানে তুলছেন না কর্মকর্তারা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, খুলনাসহ উপকূলীয় ৬টি জেলার টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের জন্য প্রকল্প নেওয়া হয় ২০১৩ সালে। উপকূলীয় বাঁধ উন্নয়ন প্রকল্প (সিইআইপি) ফেজ-১ নামের এই প্রকল্পে অর্থায়ন করেছে বিশ্ব ব্যাংক। প্রকল্পের আওতায় ৩ হাজার ২৮০ কোটি টাকা দিয়ে ১৭টি বাঁধ (পোল্ডার) নির্মাণ করা হয়েছে।

এর আওতায় খুলনার দাকোপ উপজেলার ৩২নং পোল্ডারে ৪৯ দশমিক ৬৬ কিলোমিটার এবং ৩৩নং পোল্ডারে প্রায় ৫০ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। ২০১৭ সালে শুরু হওয়ায় এই কাজ শেষ হয়েছে গত ৩০ জুন। খুলনার অংশে প্রকল্প ব্যয় প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা।

বাঁধ নির্মাণ ছাড়াও প্রকল্পের আওতায় ৩২নং পোল্ডারে ১৫টি কালভার্ট ও স্লুইচ গেট নির্মাণ, ৩ দশমিক ৩০০ কিলোমিটার বাঁধের ঢাল সংরক্ষণ, ১৭ কিলোমিটার খাল খনন এবং ২ কিলোমিটার নদী শাসন করা হয়েছে। ৩৩নং পোল্ডারে বাঁধ নির্মাণের পাশাপাশি ৬২ কিলোমিটার খাল খনন, ২১টি কালভার্ট ও স্লুইচ গেট, ৪ কিলোমিটার ঢাল সংরক্ষণ এব ১ দশমিক ৩০০ কিলোমিটার নদী শাসন করা হয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রতিবেদন বলছে, গত ৩০ জুনের মধ্যে ৩২ নম্বর পোল্ডারের ৯৮ দশমিক ২০ শতাংশ এবং ৩৩ নম্বর পোল্ডারের ৯৯ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে।

সম্প্রতি এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কাজ শেষ হওয়ার তিন মাস যেতে না যেতেই বাঁধের বিভিন্ন অংশ বড় ফাঁটল দেখা দিয়েছে। ওই সব এলাকায় বালু ভর্তি জিও ব্যাগ ফেলে বাঁধের ভাঙন রক্ষায় কাজ করছে পরামর্শক সংস্থা।

স্থানীয়রা জানান, গত ২৪ আগস্ট গুনারী কালিবাড়ি অংশে ৫০ মিটার ধসে যায়। এর আগে ধসে গেছে পাশের ১০০ মিটার বিভিন্ন অংশ। ধসে যাওয়া অংশের দুই পাশে মাটিতে বড় ধরনের ফাটল ধরেছে। ভাঙন ধরেছে গুনারী, কালীবাড়ী, নলিয়ান, জালিয়াখালী, কালাবগী, সুতারখালী, কামারখোলা জোড়াগেট এলাকায়। দ্রুত ভাঙন ঠেকাতে পদক্ষেপ নেওয়া না হলে বাঁধ ভেঙে যাওয়ার আশংকা দেখা দিয়েছে।

স্থানীয়রা আরও জানান, কাজ চলা অবস্থায় অনেক এলাকায় বাঁধ ভেঙ্গে গেছে। গত বছর কালাবাগী গ্রামের বৃহস্পতি বাজারের কিছুটা উত্তর দিকে বাউলি বাড়ির সামনে বাঁধের ৫০ থেকে ৬০ হাত সুতারখালী নদীতে বিলীন হয়ে যায়। বাজুয়া ইউনিয়নের চুনকুড়ি খেয়াঘাটের পাশে ১০০ মিটার বাঁধ নদীতে ধসে যায়।

সুতারখালী পূর্বপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সভাপতি নিরেন্দু মন্ডল বলেন, বেড়িবাঁধের কাজ শুরু হলে আমরা এলাকার মানুষ আশায় বুক বেঁধেছিলাম। কিন্তু কাজ শুরুর পর আমরা হতাশ হয়েছি। কিছু এলাকায় ভালো কাজ হয়েছে, কিছু এলাকায় যাচ্ছে তাই। আমার বাড়ির সামনেই পুরাতন বাঁধের দু’পাশে মাটি দিয়ে কোনো রকম কাজ করেছে।

দাকোপ উপজেলার গুনারী শীতল চন্দ্র মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আদিত্য নারায়ণ সরদার বলেন, নতুন এই বাঁধ নিয়ে আমাদের সবারই স্বপ্ন ছিলো। কিন্তু সব নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কাজ শুরুর সময়ই নদী শাসনের দাবিতে আমরা আন্দোলন করেছি। কিন্তু আমাদের কথা শুনলো না। কোটি কোটি টাকা খরচের পর সেই টাকা পানিতে চলে যাচ্ছে।

সুতারখালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মাসুম আলী ফকির বলেন, বাঁধে ধস লাগলে আমরা পাউবো কর্মকর্তাদের খবর দেই। কালিবাড়ি এলাকায় বাঁধ ধসার খবর আগে জানিয়েছি, তারা গুরুত্ব দেয়নি। বাঁধ ভেঙে যাওয়ার আগ পর্যন্ত পাউবোর লোকেরা এলাকায় আসেন না।

উপকূলীয় বাঁধ উন্নয়ন প্রকল্পের (সিইআইপি) নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে খুলনায় দায়িত্ব পালন করছেন আশরাফুল আলম। তিনি বলেন, এই অঞ্চলের নদীর গতি প্রকৃতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রকল্পের সমীক্ষা করা হয়েছিল ২০১২-১৩ অর্থবছরে। ওই সময়ের নদীর গতি প্রকৃতির সঙ্গে বর্তমানের কোনো মিল নেই। কাজ শুরুর সময় এসব এলাকায় ভাঙনের কোনো লক্ষ্মণ ছিলো না। নদীর স্রোত দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে-যার কারণে নতুন নতুন এলাকায় ভাঙন বাড়ছে।

প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্বে রয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (পুর) সৈয়দ হাসান ইমাম। তিনি ঢাকা পানি ভবনে বসেন। তার বক্তব্য নিতে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু তিনি সাড়া দেননি।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

সর্বশেষ

চাঁচড়ায় রনি হত্যাকাণ্ডে ১২ জনের নামে মামলা

নিজস্ব প্রতিবেদক : যশোর শহরতলীর চাঁচড়ায় রনি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় কোতোয়ালি থানায় মামলা হয়েছে। নিহত রনির...

মাতৃদেবীজ্ঞানে আসন নেয় সৃজিতা ঘোষাল

এসআই ফারদিন : সোমবারের সকালটা জেগে উঠেছে ঢাক-বাদ্যের তালে। আর এই ঢাকের তাল বলছে মহা...

এলজিইডি যশোর অফিসের মধ্যে ঠিকাদারকে লাঞ্ছিতের অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক : স্থানীয় সরকার অধিদপ্তর (এলজিইডি) যশোর অফিসের মধ্যে হারুণ অর রশিদ নামে এক...

সম্প্রীতি ধরে রাখার আহ্বান এমপি নাবিলের

নিজস্ব প্রতিবেদক : সম্প্রীতি ধরে রাখতে নৌকায় ভোট দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন যশোর-৩ আসনের সংসদ সদস্য...

যশোরে বাবা ও চাচার বিরুদ্ধে মেয়ের মামলা

নিজস্ব প্রতিবেদক : যশোর শহরতলীর শেখহাটিতে পথ রোধ করে হত্যার উদ্দেশ্যে মারপিট করে জখম, শ্লীলতাহানি...

যশোর বঙ্গবন্ধু প্রথম বিভাগ ফুটবল লিগের ‘খ’ গ্রুপের সেরা রাহুল

নিজস্ব প্রতিবেদক : গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে রেলিগেশন এলাকায় থাকা নওয়াপাড়া খেলোয়াড় কল্যাণ সমিতির কাছে...