ঋতু পরিক্রমায় শীতের ১ম মাস বিদায় নিচ্ছে আসছে বাঘ কাঁপানো মাঘের শৈত্যপ্রবাহ

যশোরে ঘনকুয়াশা আর হিমেল বাতাস বাড়িয়ে দিয়েছে শীতের তীব্রতা । যশোর শহরের ঈদগাহ মোড় থেকে তোলা। ছবি : কল্যাণ
শীতবস্ত্র ও প্রসাধনী পণ্যের দোকানে উপচেপড়া ভীড়

সুনীল ঘোষ: ক্যালেন্ডারের পাতায় শেষের পথে পৌষ। দরজায় কড়া নাড়ছে মাঘ। প্রবাদ রয়েছে মাঘের শীতে বাঘ কাঁপে। বিদায়ক্ষণে পৌষ যেন জানান দিচ্ছে আমি যাচ্ছি ঠিকই, কিন্তু যাচ্ছে না শীত। উল্টো প্রকৃতিতে মাঘ আনবে অস্বাভাবিক পরিবর্তন। শীত আসবে। বেড়ে যাবে আদ্রতা। এর ফলে গাছের পাতা ঝরে যাবে। মানবদেহে ক্ষতের সৃষ্টি করবে উস্কশুস্ক ও রুক্ষতা। এজন্য ত্বকের যত্ন নেয়া জরুরী হবে। কিন্তু সাধ থাকলেও সেই সাধ্য বা সামর্থ সিংহভাগ মানুষের নেই।

গত দু’দিন যশোরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হয়েছে। বিদায়ের বেলায় পৌষ যেন মাঘকে আমন্ত্রণ জানিয়ে যাচ্ছে। এরইমধ্যে শীতের তীব্রতা বেড়েছে। বেড়েছে বাতাসের আদ্রতাও।

ফের শুরু হয়েছে হাড় কাঁপানো শীত। কনকনে ঠান্ডা বাতাসে দক্ষিণ জনপদে স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় বিপর্যয় ডেকে এনেছে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষ পড়েছেন সচেয়ে বেশি বিপাকে। তাদের না আছে প্রয়োজনীয় শীতবস্ত্র, না আছে কেনার সামর্থ্য। অন্যদিকে ছিন্নমুল মানুষের অবস্থা আরো করুণ। খড়কুটো জ¦ালিয়ে তারা শীত নিবারণের চেষ্টা করছেন কিন্তু শীত প্রকৃতিতে যে আমুল পরিবর্তন বয়ে এনেছে, তাতে শীত নিবারণই শেষ কথা না। ত্বকের যতœ নেয়াও জরুরী। ত্বককে আর্দ্র, নরম ও মসৃণ রাখতে যেসব প্রসাধনী পণ্যের প্রয়োজন, তার দাম বছরের ব্যবধানে প্রায় আকাশ ছুঁয়েছে। কোম্পানি ভেদে দাম বেড়েছে ডাবল। কিন্তু শীতবস্ত্রই যেখানে জুটছে না, সেখানে ত্বকের যতেœর কথা ভাবা আর দুঃস্বপ্ন দেখার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।

শীত এলেই বদলে যায় প্রকৃতি। রুক্ষ-শুষ্ক মেজাজের শীতের প্রভাব গোটা প্রকৃতিকেই গ্রাস করে। নদ-নদী, খাল-বিল, বৃক্ষ, পশু-পাখি, মানুষ-কেউই এর প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে পারে না। যেকারণে ক্ষতিকর প্রভাব থেকে পরিত্রাণে মানুষ বেছে নেয় নানা কৌশল ও পদ্ধতির। শীতবস্ত্রের পাশাপাশি ধনীক শ্রেনির মানুষ ত্বকের যতেœ প্রসাধনী নানা পণ্যের ব্যবহার করেন। যে ময়েশ্চারাইজার ত্বককে আর্দ্র, নরম ও মসৃণ রাখে সেসব পণ্য ব্যবহারে কমতি রাখেন না ধনী ও বিত্তবানেরা।

ত্বক আর্দ্র থাকলে এর স্থিতিস্থাপকতা যেমন বজায় থাকে তেমনি ত্বকের বিভিন্ন সমস্যাও দূর হয়। তবে বাজারে অসংখ্য প্রসাধনীর মাঝে কোন ময়েশ্চারাইজারটা ভাল এবং সাশ্রয়ী তা খুঁজে পাওয়া বেশ দুস্কর। পাশাপাশি পণ্যের দাম যদি সাধ্য ও সামর্থ্যরে বাইরে চলে যায়, তাহলে কম দামের ভেজাল পণ্যের বাজার সয়লাব হয়। এরফলে প্রতারিত হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

বুধবার দিনভর যশোরের আকাশ ছিল মেঘাচ্ছন্ন। দেশের বিভিন্ন স্থানে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি নেমেছে। মঙ্গলবার রাতে যশোরে সামান্য বৃষ্টি হয়। এতেই বাতাস বয়ে এনেছে কনকনে শীত। ফুটপাথের দোকানে উপড়ে পড়া ভীড় দেখা গেছে।

বাজার ঘুরে দেখা গেছে বছরের ব্যবধানে যশোরের বাজারে প্রসাধনী পণ্যের দাম আকাশ ছুঁয়েছে। ত্বকের যতেœ পেট্রোলিয়াম জেলি বেশ উপকারী। নিন্মবিত্ত ও কম আয়ের মানুষ বেছে নেন সাধারণত গ্লিলিসারিন জাতীয় পণ্য। কিন্তু এবার দাম বেশির কারণে অনেকে হতাশ হয়ে শূন্য হাতে বাড়ি ফিরছেন।

যশোর বড়বাজারের হাট চান্নি, ফেন্সি মার্কেট ও চুড়িপট্টির বড় দোকানগুলো সাজিয়ে বসে আছে প্রসাধনী পণ্যের পসরা।

মাকালি ভান্ডারের সত্বাধিকারী মধুসুদন পালের সাথে কথা হয়। তিনি মনে করেন প্রসাধনী পণ্যের দাম খুব বেশি বাড়েনি।

তবে তার বক্তব্যের সাথে একমত না দরিদ্র শ্রেণির মানুষ। রহিমা খানম নামে এক তরুণী জানান, গত বছর যে মেরিল কিনেছেন ১০ টাকায়, এবার তার দাম হয়েছে ২০ টাকা। এবিষয়ে মধুসুদন পাল বলেন, তিনি ১০০ গ্রাম ওজনের মেরিল বিক্রি করছেন ৯০ টাকায়। যার গায়ের রেইট দেয়া আছে ১১০ টাকা। ৫০ গ্রাম ওজনের মেরিলের কৌটায় কোম্পানী রেইট লিখেছে ৫৫ টাকা, ১৫ গ্রাম ওজনের মেরিলের দাম করা হয়েছে ২০ টাকা। তবে তিনি প্রতিটি পণ্যে গায়ের রেইটের চেয়ে ১০ থেকে ১৫ টাকা কম বিক্রি করেন। ২০০ গ্রাম পন্ডস লোশনের গায়ে কোম্পানির দাম ১৮০ টাকা করা হয়েছে।

১০০ গ্রাম ওজনের কিউট ক্রিমের কোম্পানির দাম ৯০ টাকা। ৫০ গ্রামের দাম দিয়েছে ১০৫ টাকা। তিববত কোম্পানি ৫০ গ্রামের দাম হাকিয়েছে ৫৫ টাকা। ১৫ গ্রামের কৌটার দাম করা হয়েছে ২০ টাকা। ১০০ গ্রাম গ্লিসারিন ৯০ টাকা ও ৫০ গ্রামের দাম করা হয়েছে ৪৫ টাকা। লিভার ব্রাদার্সের ২৫ গ্রাম ওজনের ফেয়ার এন্ড লাভলীর (উইন্টার) কোম্পানি দাম হাকিয়েছে ৭২ টাকা।

জাবির স্টোরের মালিক আব্দুল মুকিত জানান, তিনি নিভিয়া কোম্পানির পণ্য বিক্রি করেন। এবার ১০০ গ্রাম ওজনের নিভিয়া স্পট (ভারতীয়) ১৫৯, ৫০ গ্রামের ৯০, ২৫ গ্রামের কৌটা বিক্রি করছেন ৪৫ টাকায়। নিভিয়ার কোল্ড ক্রিম ৬০ গ্রাম ১২০ ও ৩০ গ্রাম ওজনের ক্রিম ৫৫ টাকা দরে বিক্রি করছেন এই দোকানী।

বাবু নামে আরেক দোকানী জানান, এবার ৭৫ গ্রাম ওজনের ডাব ক্রিমের দাম হাকানো হয়েছে ৭৫ টাকা।

বাজারে প্রসাধনী পণ্য কিনতে আসেন তরফনওয়াপাড়ার বাসিন্দা রাজু দম্পতি। অভিযোগে তারা বলেন, শীতে ব্যবহারের জন্য ভ্যাসলিন জাতীয় পণ্য কিনতে এসেছেন। কিন্তু প্রতিটার দাম বছরের ব্যবধানে বেড়ে ডাবল, কোম্পানি ভেদে তিন-চার গুণ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। গায়ের রেইট থেকে বড়বাজারের দোকানীরা ২/৫ টাকা কম রাখেন। তবে শহরের বাইরে গায়ের রেইট দিয়েই কিনতে হয়।

হাশিমপুর গ্রামের বাসিন্দা রহিমা খাতুন ও বাগেরহাটের বাসিন্দা জেরিন পেশায় চাকরিজীবী। তারা একসঙ্গে কোল্ড ক্রিমসহ কিছু কসমেটিক্স পণ্য কিনতে এসেছেন কিন্তু দাম দেখে তারা হতাশ। এক বছরের ব্যবধানে প্রতিটা পণ্যের দাম কয়েকগুণ বাড়ানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তারা।

মাহিদিয়া গ্রামের রহমত, বারবাজার বেলাট গ্রামের বাসিন্দা ও কলেজছাত্রী খুকু ও জহুরপুর গ্রামের রায়হানসহ অনেক ক্রেতাই দাম বৃদ্ধি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তারা অভিযোগে আরও বলেন, ভারতীয় পণ্যে বাজার সয়লাব। নকল আর আসল পণ্য চেনা কঠিন হয়ে পড়েছে। তারা বলেন, অভিযোগ আছে স্থানীয়ভাবে তৈরি প্রসাধনী পণ্যের গায়ে নামী-দামী কোম্পানির লেভেল লাগিয়ে লোক ঠকানো হচ্ছে। যশোরের বেশকিছু প্রেসে এসব লেভেল প্রকাশ্যেই তৈরি হচ্ছে জানিয়ে তারা বলেন, এসব দেখার কেউ নেই। একদিকে অস্বাভাবিক দাম অন্যদিকে নকল পণ্য কিনে ঠকছেন মানুষ।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে