Saturday, May 28, 2022

এরশাদ শিকদার এখনও ঘৃণার প্রতীক

নিজস্ব প্রতিবেদক: একে একে ১৮টি বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু খুলনার এরশাদ শিকদারের নাম আজো ভোলেনি মানুষ। মানুষের মাঝে এই নামটি জীবিত থাকার পেছনে কোন সুখ্যাতি নেই, কুখ্যাতির স্মৃতি হিসেবে তার নামটি কেউ ভোলেনি।

অসংখ্য হত্যার অভিযোগ তার বিরুদ্ধে। এর মধ্যে ৩৪ মামলা হয় এবং সাতটি মামলায় ২০০৪ সালের ১০ মে তার তার ফাঁসি হয়।

এরশাদ শিকদারের বাড়ি ঝালকাঠির নলছিটিতে। ১৯৬৭ সালে সে খুলনায় এসে রেলস্টেশনে কুলির কাজ নেয়। এই কাজের আড়ালে সে রেললাইনের পাত চুরি করে বিক্রি করত। যার কারণে লোকে তাকে ‘রাঙ্গা চোর’ বলতো। সে একটি সন্ত্রাসী বাহিনী গঠন করে খুলনা রেল স্টেশন ও চার ও পাঁচ নম্বর ঘাট এলাকায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড শুরু করে। পরে সে খুলনা ডকইয়ার্ডের একজন সাধারণ কুলি হিসাবে কাজ শুরু করে। পরবর্তীতে সেখানে সে ঘাট সর্দার বা কুলিদের সর্দার হয়ে ওঠে। এরপর ১৯৮২ সালে এইচএম এরশাদের সামরিক সরকার ক্ষমতায় আসার পর ভংকর রূপে আবির্ভূত হয় এরশাদ শিকদার।

তার বিরুদ্ধে অন্তত ৩৪ জনকে হত্যার অভিযোগ ছিল। অনেককেই সে হত্যা করে মৃতদেহ গুম করে ফেলত। ফলে মৃতদেহও পাওয়া যেতো না, কোন মামলাও হতো না। কিন্তু ১৯৯৯ সালে খুলনার একজন যুবলীগ নেতাকে হত্যার অভিযোগ ওঠার পর পরিস্থিতি পাল্টে যায়। তার বিরুদ্ধে রাজস্বাক্ষী হয় তার নিজের দেহরক্ষী। সেই হত্যার অপরাধে তার মৃত্যুদণ্ড হয়।

১৯৮২ সালে হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ক্ষমতায় আসার পর জাতীয় পার্টিতে যোগ দেয় এরশাদ শিকদার। সেই সময় খুলনা জাহাজ ঘাটেতিন-চার হাজার শ্রমিক কাজ করতো। এদের রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করতে শুরু করেন এরশাদ শিকদার।

জাতীয় পার্টির সভা-সমাবেশে ঘাট থেকে সে শ্রমিকদের কর্মী হিসাবে সরবরাহ করতো।
এ কারণে রাজনৈতিক দলে তার কদর ছিল। পরে বিএনপি বা আওয়ামী লীগ সরকারের সময়েও সেই সুবিধা পেয়েছে। ফলে সে নিজে তো বটেই, অন্যরাও মনে করতে শুরু করেছিল যে, এরশাদ শিকদার সব আইনের ধরাছোঁয়ার বাইরে ।

এভাবে রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে ক্ষমতার পাশাপাশি খুলনা শহরে স্বর্ণকমল নামের প্রাসাদোপম বাড়িসহ বিপুল সম্পত্তির মালিক হয়ে ওঠে এরশাদ শিকার।

১৯৮০ সালে খুলনার ২১ নম্বর ওয়ার্ডের কমিশনারও নির্বাচিত হয় এরশাদ শিকদার। ফাঁসিতে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ওই ওয়ার্ডের কমিশনার ছিলো। কিন্তু কমিশনার হওয়ার পর তার অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থামেনি।
রেলওয়ের সম্পত্তি দখল করা,ব্যক্তিগত সম্পত্তি দখল করা, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, ধর্ষণ, হত্যাকাণ্ডের অসংখ্য অপরাধে সে জড়িয়ে পড়ে।

এইচএম এরশাদের পতনের পর বিএনপিতে যোগ দেয় এরশাদ শিকদার। আবার ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগে যোগ দেয়। নিজের এতো অপরাদের মধ্যেও এরশাদ শিকদারকে গ্রেপ্তার হতে হয়নি।

খুলনার কেন্দ্রস্থলে স্বর্ণকমল নাম একটি বাড়ি তৈরি করেছিল এরশাদ শিকদার, সেটিও তার নির্যাতনের অন্যতম কেন্দ্র বলে মনে করা হতো। সেই বাড়িতে অভিযান চালিয়ে অস্ত্রশস্ত্রও উদ্ধার করেছিল পুলিশ।

এরশাদ শিকদারের বিরুদ্ধে ২৪টি হত্যাকাণ্ড করার সাক্ষ্য দিয়েছেন তার দেহরক্ষী। কিন্তু তার জবানবন্দিতে উল্লেখ করা হয়েছে, এরশাদ শিকদার ৬০টি হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে বলে তার ধারণা।

এসব মৃতদেহ বস্তায় ভরে নদীতে ফেলে দেয়া হতো অথবা ইটের ভাটায় পুড়িয়ে ফেলা হতো।
কিন্তু যুবলীগ নেতা খালিদ হোসেনের হত্যাকাণ্ড তাকে টেনে নিয়ে যায় ফাঁসির কাষ্ঠে।
১৯৯২ সালের ১১ আগস্ট চার নম্বর ঘাট এলাকায় গিয়েছিলেন যুবলীগ নেতা খালিদ হোসেন, ব্যবসায়ী সৈয়দ মনিরসহ চারজন।

তাদের ওপর হামলা করে বেধড়ক পেটানো হয়। পরে খালিদ হোসেনকে হত্যার পর বস্তায় ভরে সংলগ্ন ভৈরব নদে ফেলে দেয়া হয়। মৃতদেহের সঙ্গে তাদের মোটরসাইকেল এবং প্রাইভেট কারও ফেলে দেয়া হয়। পরবর্তীতে খালিদ হোসেনের মৃতদেহ পাওয়া যায়।

সেই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এরশাদ শিকারের বিরুদ্ধে মামলা হয়। কিন্তু মামলায় কোন সাক্ষি পাওয়া যাচ্ছিল না। এমনই এক সময় এরশাদ শিকদারের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে এগিয়ে আসেন তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও দেহরক্ষী নূরে আলম।

তখনকার আওয়ামী লীগ নেতাদের আশ্বাসে ১৯৯৯ সালের নভেম্বর মাসে আত্মসমপর্ণ করে এরশাদ শিকদার। তার ধারণা ছিল, কিছুদিন পরেই আবার জামিনে বেরিয়ে আসবে। কিন্তু সেই যে কারাগারে ঢুকলো, এরপর একেবারে ফাঁসির পর লাশ হয়ে তাকে বের হতে হয়েছে।

নূরে আলমের স্ত্রী সুন্দরী ছিল। তাকে ধর্ষণ করতে শুরু করেছিল এরশাদ শিকদার। এমনকি তার উপস্থিতিতেই শারীরিক নির্যাতন করতো। ভয়ে সেটা মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল নূরে আলম। কিন্তু গোপনে সে বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। এর পরেই নূরে আলম এরশাদ শিকদারের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

ভয় কাটাতে পুলিশ লাইনে সাক্ষীদের এনে ভুরিভোজ করান পুলিশ কমিশনার আনোয়ারুল ইকবাল। এরপর তাদের সামনে এরশাদ শিকদারকে এনে পেটানো হয়। সাক্ষিদের বলা হয়, তোমরাও মারো। এভাবে তাদের ভয় ভাঙিয়ে দেয়া হয়। তারপর তারা সাক্ষ্য দিতে রাজি হন।

২০০০ সালের ৩০ এপ্রিল এরশাদ শিকদারের মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করেন খুলনার আদালত। আপিল এবং রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণ ভিক্ষার পর্ব পার হয়ে সেই ফাঁসি কার্যকর হয় ২০০৪ সালের ১০ মে।
তিনি বলছেন, রাত ১২টা এক মিনিটে এরশাদ শিকদারের ফাঁসি কার্যকর করা হয়।

ফাঁসি কার্যকরের পরে কিছুক্ষণের জন্য কারাগারের প্রধান ফটকের সামনে এরশাদ শিকদারের মৃতদেহ রাখা হয়।

এর কারণ বাইরে গুজব ছিল যে, এরশাদ শিকদারের ফাঁসি হয়নি, তার বদলে অন্য আরেকজনকে ফাঁসি দেয়া হয়েছে ইত্যাদি। সেইসব সন্দেহ সংশয় নিরসনের জন্য মৃতদেহ গেটের বাইরে রাখার সিদ্ধান্ত নেয়া, যাতে সাংবাদিকরা দেখে অন্তত নিশ্চিত হতে পারে।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

সর্বশেষ

প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে কটূক্তির প্রতিবাদে শার্শা ছাত্রলীগের বিক্ষোভ

নিজস্ব প্রতিবেদক: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে কটূক্তির প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল করেছে শার্শা উপজেলা ছাত্রলীগ।...

বর্ণিল আয়োজনে ‘ভোরের সাথীর’ ১৬ বছর উদযাপন

নিজস্ব প্রতিবেদক: বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা, কেক কাটা, আলোচনাসভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে যশোরে পালিত...

সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশে ভারতে স্বীকৃতি পেল যৌন পেশা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ভারতে যৌন পেশাকে আর বেআইনি বলা যাবে না। বৃহস্পতিবার (২৬ মে) এই...

বিশ্বের খর্বকায় কিশোরের স্বীকৃতি পেলেন দোর বাহাদুর

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: নেপালের ১৭ বছর বয়সি দোর বাহাদুর ক্ষেপাঞ্জিই এখন বিশ্বের সবচেয়ে খর্বকায় কিশোর।...

‘বলিউডে কাজ পেতে হলে আমাকে আরও সময় দিতে হবে’

বিনোদন ডেস্ক: টেলিভিশনের জনপ্রিয় তারকা উরফি জাভেদ। যিনি নিজের অদ্ভুত সব ফ্যাশনের জন্য পরিচিত...

টেস্টে ২ হাজারের ঘরে ছন্দে থাকা লিটন

ক্রীড়া ডেস্ক: শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে প্রথম টেস্টে ৮৮ রান করার পর, ঢাকায় দ্বিতীয় টেস্টের প্রথম...