কবে ভালো কিছু খেয়েছেন মনে নেই তার

কবে ভালো কিছু খেয়েছেন মনে নেই তার
অদম্য সুরত আলীর সত্যি গল্প

সালমান হাসান
দিনকার খোরাকির আয় যোগাতেই সুরত আলীর হিমশিম দশা। ঠিক কবে দুটো ভালোমন্দ খেয়েছেন মনে করতে পারেন না। তিন বেলার মধ্যে দু বেলার অন্ন যেটুকু জোটে তাও আধপেটা। জীবনের শেষ বেলায়ও জীবিকার কঠিন সংগ্রাম করছেন এই সত্তরোর্ধ।

বাকে ঝোলানো ঝুরি ভর্তি কচু কাঁধে চাপিয়ে লাঠি ভর দিয়ে হেঁটে চলছেন এক বৃদ্ধ। মুজিব সড়কসহ যশোর শহরের বিভিন্ন প্রান্তে প্রায়শ তার দেখা মেলে। ডোবা ও জলার পাশ থেকে কচু তুলে এনে ঘুরে ঘুরে বিক্রি করেন। অনেক দিন বাজারেও নিয়ে যান। খুচরা বিক্রেতারা তার কাছ থেকে এগুলো কিনে নেন।

দিনকয়েক আগে সুরত আলীর সাথে দেখা হয় প্রেসক্লাবের সামনে। কিছুক্ষণ পর পর কাঁধ থেকে বাক নামিয়ে জিরিয়ে নিচ্ছিলেন। বোঝা বয়ে দীর্ঘ পথ হেঁটে আসার ক্লান্তি ভর করেছিলো তাকে। কথোপকথনের সময়ও হাপিয়ে উঠছিলেন। তার পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে চলে আলাপচারিতা।

তিনি বলেন, খড়কির কলাবাগান পাড়ার একটি ডোবার পাশ থেকে কচুগুলো সংগ্রহ করেছেন আজ। এগুলো বিক্রি করতে বেরিয়েছেন। কয়েকটি পাড়া-মহল্লায় ঘুরবেন। এরপর যেটুকু অবশিষ্ট থাকবে চুয়াডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ড বাজারে নিয়ে যাবেন। সেখানকার খুচরা সবজি বিক্রেতারা তার কাছ থেকে এগুলো কেনেন।

সুরত আলী জানান, কচু বিক্রি করে এভাবে কোনরকমে খেয়ে পড়ে বেঁচে আছেন। দিনে দেড়’শ থেকে দুই’শ টাকার মতন আয় হয়। তাও সেটি প্রতিদিন নয়। শরীর ভালো না থাকলে সেদিন বের হতে পারেন না। করোনা মহামারি শুরুর পর থেকে তার কষ্টের দিন যেন আর যাচ্ছে না। জীবনের তার কাছে বোঝা হয়ে উঠেছে। এই ভার বহন করা তার জন্য কষ্টসাধ্য।

সুরত বলেন, চার ছেলে তিন মেয়ের কেউ তাদের দেখে না। ধর্মতলা বৌবাজারে হোটেলগুলোর পেছনে একটি ঘর ভাড়া নিয়ে স্ত্রীসহ বসবাস করেন। এমনও হয় অনেক মাসের ভাড়া দিতে পারে না। তিনি ও তার স্ত্রী দুইবেলা আধপেটা খেয়ে থাকেন। বয়স্ক ভাতার তার একটি কার্ড আছে। তিন মাস অন্তর ১৫০০ টাকা পান। এভাবে বেঁচে থাকা কঠিন।

আলাপচারিতায় জানা যায়, অনেক দূরের পথ থেকে কচু সংগ্রহ করে আনেন সত্তরোর্ধ এই বৃদ্ধ। কখনও চাঁচড়ার মাহিদিয়া, কখনও সাড়াপোলে রোডের কালাবাগান। এরকম অনেক দূরের পথ ঘুরে কচু, কখনও কলমিলতা, শাপলা যোগাড় করে আনেন। তারপর সেগুলো ঘুরে ঘুরে বিক্রি করেন।দিনযাপনের এই কষ্ট এই কষ্টের কথাগুলো বলতে গিয়ে গলা ভার হয়ে আসে তার। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, জীবনতো আর চলে না। এই কয়টাকা দিয়ে কি করে চলতিছি, এক ওপর আল্লাহ জানেন। সকালে কটা খেয়ে বেরোই, বিকেলে এসব বেচে কিনে বাড়ি যাই। তখন কয়ডা দানা পেটে পড়ে। আবার পরের দিন সকালে খায়। কতদিন ভালোমন্দ কিছু খাইনি-বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন সুরত আলী।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে