Sunday, May 29, 2022

কোন পাপে শীতেও শিলাবৃষ্টি, সামনে কী?

“একই সময়ে একই দেশের কোথাও হিম শীত, কোথাও কড়া রোদ। আবার শৈত্য প্রবাহের মাঝেই শিলাবৃষ্টি। অনেকের কাছে তা বাপের জনমেও না দেখার ঘটনা। অনেকের কাছে কুদরতি তেলেসমাতি। বিজ্ঞান বলছে, এটাই প্রকৃতির বাস্তবতা। প্রকৃতি তার নিয়মের বাইরে কখনো কিছু করে না। করেনি। করবেও না। এটি জলবায়ু এবং প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের ক্রিয়াকর্মের প্রতিদান। অ্যাকশনের রিঅ্যাকশন। কনকনে শীতে উত্তরবঙ্গের কোথাও কোথাও শিলাবৃষ্টি ঝরিয়ে সেই রিঅ্যাকশনে বা নিরপেক্ষতারই জানান দিল প্রকৃতি”

মোস্তফা কামাল: একই সময়ে একই দেশের কোথাও হিম শীত, কোথাও কড়া রোদ। আবার শৈত্য প্রবাহের মাঝেই শিলাবৃষ্টি। অনেকের কাছে তা বাপের জনমেও না দেখার ঘটনা। অনেকের কাছে কুদরতি তেলেসমাতি। বিজ্ঞান বলছে, এটাই প্রকৃতির বাস্তবতা। প্রকৃতি তার নিয়মের বাইরে কখনো কিছু করে না। করেনি। করবেও না। এটি জলবায়ু এবং প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের ক্রিয়াকর্মের প্রতিদান। অ্যাকশনের রিঅ্যাকশন। কনকনে শীতে উত্তরবঙ্গের কোথাও কোথাও শিলাবৃষ্টি ঝরিয়ে সেই রিঅ্যাকশনে বা নিরপেক্ষতারই জানান দিল প্রকৃতি।

ঘটনা আচমকা-আচানক-অনাকাঙ্খিত হলেও কি অন্যায্য? শীতে বিপর্যস্ত কুয়াশা ঢাকা উত্তরবঙ্গে শিলাবৃষ্টি নামতে পারে-এমন পূর্বাভাস দিয়েছিল আবহাওয়া দফতর। তা আমল পায়নি। উপরন্ত এ নিয়ে হাস্যরস হয়েছে। এ হাস্যরসকে অমূলক হতে সময় লাগেনি। দিন দুয়েকের মধ্যেই শীতে জবুথবু দিনাজপুর, নীলফামারী, লালমনিরহাট, ঠাকুরগাঁও,পঞ্চগড় ও কুড়িগ্রামে আঘাত হানে ঝড় ও শিলাবৃষ্টি। উড়িয়ে নিয়ে যায় ২৫ হাজার টিনের ঘর। করেছে ফসলের অকল্পনীয় ক্ষতি। অর্ধশত মানুষ আহত হয়েছে। আর মন্দের মধ্যে ভালো খবর হচ্ছে কেউ মারা যায়নি। এ চ-ালকর্মে প্রকৃতি যে একটি চরম সতর্কবার্তা যে দিয়ে গেছে তা বুঝতে পরিবেশবিদ বা আবহাওয়া বিশেষজ্ঞ হওয়া কি জরুরি?

সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানের মানুষও বুঝতে পারছেন ‘ষড়ঋতুর বাংলাদেশ’ এখন পাঠ্যপুস্তক বা কাজীর গোয়ালের তথ্যের মতো। বাস্তবে তা গোয়ালে তা নেই।

গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত, বসন্ত মিলিয়ে ছয় ঋতুর প্রকৃতি এখন বলার জন্য বলা। লেখার জন্য লেখা। বাস্তবতার আমোঘ নিষ্ঠুরতা হচ্ছে, প্রতি দুই মাসের চক্রে ঋতুর আবেশ নেই। সরকার থেকে জলবায়ু পরিবর্তনের জের সম্পর্কে প্রতিনিয়তই বলা হচ্ছে। বিশ্ব ফোরামেও জলবায়ু পরিবর্তন ও কার্বন নিঃসরণসহ পরিবেশের ওপর ধনী দেশগুলোর অবিরাম নিপীড়নের ব্যাপারে সোচ্চার প্রধানমন্ত্রী। মাত্রাতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণের কারণে শুধু বাংলাদেশ নয়, গোটা বিশ্বই এখন তপ্ত-উষ্ণ। জলবায়ু পরিবর্তনের জেরে অসময়ে বন্যা, বৃষ্টি, খরা, আগাম বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতবিক্ষত বাংলাদেশ। তারওপর হাট বাজার গ্রাম উন্নয়ন, নগরায়ন, অফিস আদালত, বসতবাড়ি নির্মাণে আবাদি জমি, গাছগাছালি কেবল কমছেই। এতে প্রকৃতিকে রীতিমতো হত্যা করা হচ্ছে। এর বিপরীতে মানুষ বাড়ছে। অক্সিজেন-নাইট্রোজেনের ভারসাম্য নেই।

যুক্তরাষ্ট্রসহ উন্নত দেশগুলোর কার্বন নিঃসরণের মাত্রা নিয়ে অবিরাম কথামালা চলতে থাকলেও তা অবিরাম বেড়েই চলছে। তাদের পরিবেশ বিধ্বংসী কর্মকা-ের খেসারত টানতে হচ্ছে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোকে। তারওপর দেশের অভ্যন্তরে পরিবেশের সর্বনাশের যতো আয়োজন। মনুষ্যসৃষ্ট এই প্রভাবের কারণে দিন দিন প্রকৃতি তার নিজস্ব গতি হারিয়ে ফেলছে। শীতেও গরম পড়ছে। আবার শৈত্যপ্রবাহের মধ্যে শিলাবৃষ্টির আচানক কা-। পরিবেশ এবং জলবায়ুর মধ্যে কিছুটা তফাৎ আছে। কোনও একটি জায়গায় বছরের পর বছর ধরে আবহাওয়ার গড়-পড়তা ধরনকে বলা হয় জলবায়ু। আবহাওয়ার সেই চেনাজানা ধরন বদলে যাওয়াকেই বলা হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন। এর অনিবার্য পরিনতি হচ্ছে- বন্যা, খরা, ঝড়, পানির সঙ্কট, দাবানল, খাদ্য উৎপাদনে অস্থিরতা, সমুদ্রের পানি বেড়ে বহু এলাকা তলিয়ে যাওয়া। এক মৌসুমে খাদ্য উৎপাদন বাড়ে তো, আরেক মৌসুমে সর্বনাশ।

প্রাকৃতিক কারণে জলবায়ুতে স্বাভাবিকভাবেই কিছু পরিবর্তন আরোপ হয়েছে। তবে, যে মাত্রায় তাপমাত্রা বাড়ছে তার পেছনে মানুষের কর্মকা-ই প্রধানত দায়ী। মানুষ যখন থেকে কল-কারখানা এবং যানবাহন চালাতে বা শীতে ঘর গরম রাখতে তেল, গ্যাস এবং কয়লা পোড়াতে শুরু করল সেই সময়ের তুলনায় পৃথিবীর তাপমাত্রা এখন ১.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে গেছে। বায়ুম-লে অন্যতম একটি গ্রিন হাউজ গ্যাস কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ উনবিংশ শতকের তুলনায় ৫০ শতাংশ বেড়ে গেছে। গত দুই দশকে বেড়েছে ১২ শতাংশ। বনাঞ্চল ধ্বংসের কারণেও বায়ুম-লে গ্রিনহাউজ গ্যাসের নির্গমন বাড়ছে। গাছপালা কার্বন ধরে রাখে। ফলে, সেই গাছ যখন কাটা হয় বা পোড়ানো হয়, সঞ্চিত সেই কার্বন বায়ুম-লে নিঃসরণ হয়।

শিল্প বিপ্লব শুরুর আগে বিশ্বের যে তাপমাত্রা ছিল তার থেকে বৃদ্ধির মাত্রা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখা গেলে বড় ধরনের বিপদ এড়ানো যাবে বলে ধারণা বিজ্ঞানীদের কারো কারো। নইলে বিপজ্জনক হয়ে পড়বে প্রকৃতি, পরিবেশ এবং মানুষের জীবন।

বিজ্ঞানীদের আরেকটি মহলের আশঙ্কা ভয়ঙ্কর এই পরিণতি ঠেকানোর আর কোনো উপায় নেই এবং চলতি শতকের শেষে গিয়ে বিশ্বের তাপমাত্রা তিন ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে যাবে। তখন কী হবে বা হতে পারে, তা ধারণার বাইরে। তবে, আবহাওয়ায় পরিবর্তন এবং প্রকৃতির একেকটি অ্যাকশন সেই ধারণার কিছু ইঙ্গিত দিচ্ছে। শীত ও বৃষ্টির মধ্যে বেশ তারতম্যহীনতা তারই জের। রাতের তাপমাত্রা কয়েক বছরের তুলনায় কম। আর এ কারণে শীতের অনুভূতি আসছে। যা আসলে শীত নয়। আবার দিনে বেশ তাপমাত্রা দেখা যাচ্ছে। বাতাসে গরম হাওয়া বয়ে থাকে। আবার ক্ষণিকের জন্য বৃষ্টি হচ্ছে। বাংলাদেশে মাটির তাপমাত্রা বেশ বেড়েছে, লীয় বাষ্পের পরিমাণ বেড়েছে। প্রকৃতির স্বাভাবিকতাই এলোমেলো হয়ে কখনো অনাবৃষ্টি হচ্ছে। কখনো হঠাৎ বৃষ্টি । তা এসে ঠেকেছে শীতের মধ্যে শিলাবৃষ্টিতে। ভবিষ্যতে দেশে বিশ্বের অনান্য দেশের মতো বরফ ঝরতে শুরু করে কি-না বা মরুময়তায় দাবানল ঘটতে পারে কি না- শঙ্কা থাকলেও জবাব নেই। যদিও তুষার পড়ার মতো যেসব উপাদান প্রয়োজন তা আমাদের দেশের সীমানায় নেই। কিন্তু, প্রকৃতির স্বাভাবিক বিচার বা প্রতিদান অনিবার্য। এ বছর শীতের ধরনে বেশ পরিবর্তন। একে বৈশ্বিক সমস্যা বলে পাশ কাটালে তা হবে ঝড় থেকে বাঁচতে উটের মরুভূমিতে মাথা লুকানোর মতো চাতুরি। গ্রাম বাংলায় যাকে বলে ‘কাকা চালাকি’। প্রকৃতি গ্লোবাল সীমা মানে না-এ নিষ্ঠুর বিজ্ঞান মানতেই হবে।

লেখক : সাংবাদিক; বার্তা সম্পাদক, বাংলাভিশন।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

সর্বশেষ

দুই বছর পর যাত্রা শুরু করলো ‘বন্ধন এক্সপ্রেস’

আইয়ুব হোসেন পক্ষী,বেনাপোল প্রতিনিধি: করোনার জেরে দু’বছর ধরে বন্ধ ছিল খুলনা-কলকাতা বন্ধন এক্সপ্রেস। তবে...

ছাত্রনেতা শাহীর মুক্তির দাবিতে প্রধানমন্ত্রীর কাছে খোলা চিঠি 

নিজস্ব প্রতিবেদক: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি খোলা চিঠি লিখেছেন যশোর...

খুলনা-কলকাতা রুটে বন্ধন এক্সপ্রেস আজ ফের চালু

নিজস্ব প্রতিবেদক: আজ রোববার থেকে ফের কলকাতা-খুলনা রুটে ‘বন্ধন এক্সপ্রেস’ রেল চলাচল শুরু হবে।...

রসুনের গায়ে আগুন!

সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিতে বেড়েছে ৫০ টাকা ক্ষুব্ধ ক্রেতা, স্বস্তিতে নেই কিছু বিক্রেতাও জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক: এবার ভোক্তার...

আনারসের পাতা থেকে সুতা সৃজনশীল কাজে পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন

অপার সম্ভাবনার দেশ বাংলাদেশ। কিন্তু হলে কি হবে। সম্ভবনা থাকলেই তো আর আপনা আপনি...

দড়াটানার ভৈরব পাড়ে মাদকসেবীদের নিরাপদ আঁখড়া

নিজস্ব প্রতিবেদক: যশোর শহরের ঘোপ জেলরোড কুইন্স হাসপাতালের পূর্ব পাশে ভৈরব নদের পাড়ে মাদকসেবীদের...