Sunday, May 29, 2022

কোভিড-১৯ এর তৃতীয় ঢেউ এবং শিক্ষার্থীদের উদ্বেগ

“যখন অন্যান্য ক্ষেত্রে শিক্ষা কার্যক্রম পূর্ণাঙ্গ ভাবে শুরু হয়েছে ঠিক সেই সময় কোভিড-১৯ এর তৃতীয় ঢেউ বাংলাদেশ হানা দিতে শুরু করেছে। ২০২১ সালের নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে দক্ষিণ আফ্রিকায় চিহ্নিত করোনার ওমিক্রন ভেরিয়েন্ট এর প্রভাবে পৃথিবীর উন্নত দেশগুলো যখন উদ্বেগজনক অবস্থার মধ্যে দিয়ে দিন অতিবাহিত করছে, ঠিক সেই সময় বাংলাদেশে পরিস্থিতি তিন সপ্তাহ মোটামুটি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে ছিল। কিন্তু তৃতীয় ঢেউ ভারতে বিপদজনকভাবে আঘাত হানলে বাংলাদেশেও গত দুই সপ্তাহ থেকে রোগীর সংখ্যা বাড়তে শুরু করে”

ড. প্রণব কুমার পান্ডে: কোভিড-১৯ অতিমারির প্রভাবে শিক্ষাখাত ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে উন্নত বিশ্বে শিক্ষা কার্যক্রম অনলাইনে রূপান্তরের মাধ্যমে ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হলেও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে খুব বেশি অগ্রগতি সাধিত হয়নি। কোভিড-১৯ এর প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রাথমিক, মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীরা। প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের মধ্যে-বিশেষ করে মেয়েদের মধ্যে-শিক্ষা জীবন থেকে ঝরে পরার হার অনেক। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে ছেলেরাও পড়াশোনা বাদ দিয়ে বিভিন্ন কর্মকা-ে লিপ্ত হয়েছে।

তবে বিভিন্ন গবেষণায় এই সম্পর্কে যে তথ্য পাওয়া গেছে সেটি এখন পর্যন্ত উদ্বেগজনক অবস্থায় পৌঁছেনি। গত দুই বছরে সরকার-বিশেষ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়-চেষ্টা করে গেছে, কিভাবে এই পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা জীবনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়। তবে তাদের বিভিন্ন প্রচেষ্টা সত্ত্বেও শিক্ষার্থীরা যে সমস্যায় পরেছে সেটি নির্দ্বিধায় বলা যায়। কোভিড-১৯ এর দ্বিতীয় ঢেউ নিয়ন্ত্রণের পরে যখন পরিস্থিতি মোটামুটি স্বাভাবিক হতে শুরু করে, তখনই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খুলে দেয়া হয়। পাশাপাশি এসএসসি ও এইচএসসি শিক্ষার্থীদের ফাইনাল পরীক্ষা গ্রহণ করা হয়েছে। এই দিক থেকে বিচার করলে এসএসসি এবং এইচএসসি শিক্ষার্থীরা মোটামুটিভাবে তাদের খারাপ সময়টা পার করে এসেছে।

যখন অন্যান্য ক্ষেত্রে শিক্ষা কার্যক্রম পূর্ণাঙ্গ ভাবে শুরু হয়েছে ঠিক সেই সময় কোভিড-১৯ এর তৃতীয় ঢেউ বাংলাদেশ হানা দিতে শুরু করেছে। ২০২১ সালের নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে দক্ষিণ আফ্রিকায় চিহ্নিত করোনার ওমিক্রন ভেরিয়েন্ট এর প্রভাবে পৃথিবীর উন্নত দেশগুলো যখন উদ্বেগজনক অবস্থার মধ্যে দিয়ে দিন অতিবাহিত করছে, ঠিক সেই সময় বাংলাদেশে পরিস্থিতি তিন সপ্তাহ মোটামুটি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে ছিল। কিন্তু তৃতীয় ঢেউ ভারতে বিপদজনকভাবে আঘাত হানলে বাংলাদেশেও গত দুই সপ্তাহ থেকে রোগীর সংখ্যা বাড়তে শুরু করে।

বর্তমানে প্রতিদিনের রোগীর সংখ্যা ৪০০০ ছাড়িয়েছে এবং দৈনিক সংক্রমণের হার প্রায় ১০ শতাংশের বেশি। এই অবস্থায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় কোভিড-১৯ জাতীয় কারিগরি কমিটির সাথে সভা করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো খুলে রেখে পরিস্থিতি মোকাবেলায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। পাশাপাশি ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের টিকা কার্যক্রম ত্বরান্বিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই দুটোই যৌক্তিক সিদ্ধান্ত। তবে আমাদের মনে রাখা উচিত যে এই মুহূর্তে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যে পরিমাণ ওমিক্রন রোগী পাওয়া যাচ্ছে তার মধ্যে বড় একটি অংশ হচ্ছে শিশুরা। যদিও বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত ৩১ জনের শরীরে ওমিক্রণ শনাক্ত হয়েছে, তবে অধিক মাত্রায় জিনোম সিকুয়েন্স করলে এর পরিমাণ বাড়তে পারে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে যে ডেল্টার তুলনায় ওমিক্রনে আক্রান্তদের মৃত্যুঝুঁকি কম। তবে ভারতের মতো বাংলাদেশও যদি ডেল্টা ব্যাপকভাবে আঘাত হানে,তবে পরিস্থিতি আবার গত বছরের মাঝামাঝির মত হয়ে যেতে পারে।

এমতাবস্থায় শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের মধ্যে এক ধরনের অনিশ্চয়তা দেখা যাচ্ছে। শিক্ষার্থীদের অভিবাবকরা এক ধরনের উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে দিন যাপন করছেন। কারণ শিশুরা যদি করোনায় আক্রান্ত হয় তাহলে একদিকে যেমন তারা স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে থাকবে,ঠিক তেমনিভাবে তাদের মাধ্যমে পরিবারের অন্যান্যদের সংক্রমিত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে। তাছাড়া আমাদের মনে রাখতে হবে, বড়রা যেভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে পারে,শিশুদের পক্ষে স্কুলে গিয়ে বন্ধু-বান্ধবের সংস্পর্শে আসার পরে তেমনভাবে স্বাস্থ্যবিধি মানা খুবই কঠিন। তাছাড়া বাংলাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে যে পরিবেশে পাঠদান করা হয়,সেই পরিবেশে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক সুপারিশকৃত করোনা সুরক্ষা ব্যবস্থা পুরোপুরি মেনে চলাটা একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ। ফলে এই মুহূর্তে শিক্ষার্থীদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় জড়িত শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ অনান্য অনুঘটকদের শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন এবং স্বাস্থ্যগত দিকের মধ্যে ভারসাম্য নিশ্চিত করার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা জরুরি বলে মনে করি।

প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের মত উচ্চ শিক্ষা স্তরে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এক ধরনের উদ্বেগ দেখা যাচ্ছে শিক্ষার্থীদের মধ্যে। আমরা জানি যে শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে অথবা বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন মেসে অবস্থান করে। ক্লাস রুমগুলিতে মাস্ক পরিধান বাধ্যতামূলক করা গেলেও শিক্ষার্থীদের আবাসস্থলে বা হলে স্বাস্থ্য বিধি মেনে অবস্থান নিশ্চিত করা একটি জটিল কাজ। ফলে,কোন একজন শিক্ষার্থী হলে কোভিড আক্রান্ত হলে তা ছড়িয়ে পড়বে সেই হল এবং পার্শ্ববর্তী সকল অঞ্চল এবং সেই সংক্রমণ তাদের মাধ্যমে সহপাঠীদের মাধ্যে ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আমরা ইতোমধ্যেই লক্ষ্য করেছি যে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় অফলাইন ক্লাস বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এই বিষয়ে চিন্তাভাবনা শুরু করেছে। অতএব যেহেতু করোনার তৃতীয় ঢেউয়ের সংক্রমণ এখন পর্যন্ত ব্যাপক আকার ধারণ করেনি,ফলে এখনই সময় সেটি নিয়ন্ত্রণ করার। যদি আমরা এই সংক্রমণ নিয়ে পরীক্ষা করি, তাহলে আমাদের গত বছরের দ্বিতীয় ঢেউয়ের অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হবে।

আমার মনে হয় এই বিষয়টি অনুধাবন করেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রাথমিক পর্যায় পর্যন্ত অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে নির্দেশনা প্রদান করেছেন। গত দুই বছরের কোভিড-১৯ গতি প্রকৃতি এবং অন্যান্য একই রকম ভাইরাসের গতি প্রকৃতি বিবেচনায় নিয়ে আমরা বলতে পারি না যে এই বছরই আমরা করোনামুক্ত হব। কবে আমরা করোনামুক্ত হব সেই বিষয়ে এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। অতএব সাধারণভাবে ধরে নেওয়া যায় যে ভাইরাসটি দুর্বল হতে আরো ১/২ বছর লাগতে পারে। এই অনিশ্চয়তার মধ্যে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেই জন্য অফলাইন এর পাশাপাশি অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমকে প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত করতে হবে। এটা না করতে পারলে অনেক শিক্ষার্থীর স্কুল জীবন শেষ হয়ে যেতে পারে। আমরা এটাও জানি যে বাস্তবতা হচ্ছে গ্রামীণ দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় ডিভাইস এবং ইন্টারনেটের খরচ বহন করা কঠিন। তাছাড়া প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক স্তরের অনেক শিক্ষক রয়েছেন যাদের এখন পর্যন্ত অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার সক্ষমতা তৈরি হয়নি। এটি যেমন একটি বাস্তবতা,অন্য আরেকটি বাস্তবতা হচ্ছে, সরকার গত প্রায় দুই বছরে বিভিন্ন ধরনের নীতি বাস্তবায়ন করেছে এই সমস্ত শিক্ষার্থীদের অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমের মধ্যে নিয়ে আসার জন্য। শিক্ষকদের ট্রেনিং দেওয়া হয়েছে এবং শিক্ষার্থীদের ডিভাইস ক্রয়ের জন্য ঋণ প্রদান করা হয়েছে। আবার শিক্ষার্থীদের জন্য ইন্টারনেটের খরচ কমিয়ে দেয়া হয়েছে। সার্বিকভাবে বলতে গেলে এই ধরনের সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়নের ফলে হয়তো সমস্যা অনেকটাই দূরীভূত হয়েছে।

পাশাপাশি এটিও ঠিক যে, এখন পর্যন্ত ব্যাপক সংখ্যক শিক্ষার্থী অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমের বাইরে রয়েছে। অতএব কিভাবে পিছিয়ে পড়া গোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের অনলাইনের আওতায় নিয়ে আসার মাধ্যমে তাদের শিক্ষাজীবন রক্ষা করা যায়, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সব চেয়ে জরুরি। আমরা সাধুবাদ জানাই শিক্ষার্থীদের শিক্ষা জীবন রক্ষা করার জন্য নেওয়া সরকারের সামগ্রিক প্রয়াসকে। তাছাড়া ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সি শিক্ষার্থীদের ভ্যাকসিনের দুই ডোজ প্রদান করা সম্ভব হলে সংক্রমণের ঝুঁকি কমবে যা নিশ্চিত ভাবেই বলা যায়। অতএব সব মিলিয়ে টিকা কার্যক্রমকে ত্বরান্বিত করার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য ঝুঁকি বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা রাখার এবং শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা প্রয়োজন। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা এখন উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে দিনযাপন করছে। আমাদের মনে রাখতে হবে যে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়ার চেয়েও তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা বেশি জরুরি। ফলে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমের উপর বেশি জোর দেওয়া এই মুহূর্তে একমাত্র বিকল্প বলে আমি মনে করি।

লেখক : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের প্রফেসর।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

সর্বশেষ

দুই বছর পর যাত্রা শুরু করলো ‘বন্ধন এক্সপ্রেস’

আইয়ুব হোসেন পক্ষী,বেনাপোল প্রতিনিধি: করোনার জেরে দু’বছর ধরে বন্ধ ছিল খুলনা-কলকাতা বন্ধন এক্সপ্রেস। তবে...

ছাত্রনেতা শাহীর মুক্তির দাবিতে প্রধানমন্ত্রীর কাছে খোলা চিঠি 

নিজস্ব প্রতিবেদক: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি খোলা চিঠি লিখেছেন যশোর...

খুলনা-কলকাতা রুটে বন্ধন এক্সপ্রেস আজ ফের চালু

নিজস্ব প্রতিবেদক: আজ রোববার থেকে ফের কলকাতা-খুলনা রুটে ‘বন্ধন এক্সপ্রেস’ রেল চলাচল শুরু হবে।...

রসুনের গায়ে আগুন!

সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিতে বেড়েছে ৫০ টাকা ক্ষুব্ধ ক্রেতা, স্বস্তিতে নেই কিছু বিক্রেতাও জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক: এবার ভোক্তার...

আনারসের পাতা থেকে সুতা সৃজনশীল কাজে পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন

অপার সম্ভাবনার দেশ বাংলাদেশ। কিন্তু হলে কি হবে। সম্ভবনা থাকলেই তো আর আপনা আপনি...

দড়াটানার ভৈরব পাড়ে মাদকসেবীদের নিরাপদ আঁখড়া

নিজস্ব প্রতিবেদক: যশোর শহরের ঘোপ জেলরোড কুইন্স হাসপাতালের পূর্ব পাশে ভৈরব নদের পাড়ে মাদকসেবীদের...