সোমবার, অক্টোবর ৩, ২০২২

খুলনা এলজিইডি অফিসে সক্রিয় কমিশন ও দুর্নীতির সিন্ডিকেট

খুলনা ব্যুরো :

খুলনা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী কামরুজ্জামানের নেৃতত্বে চলছে অনিয়ম, ঘুষ, কমিশন ও দুর্নীতির সিন্ডিকেটের বাণিজ্য।

নানাভাবে সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের তহবিলের ও ঠিকাদারদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এলজিইডির তালিকাভুক্ত ঠিকাদারদের কাছ থেকে নানান খাত ও অজুহাত দেখিয়ে অবৈধভাবে ৩ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশ কমিশন নেয়া, ঠিকাদারদের নাম ব্যবহার করে অফিসের মেরামতসহ বিভিন্ন কাজ অফিসের কর্মচারীদের সিন্ডিকেটের মাধ্যমে যেনতেনভাবে করিয়ে সরকারি টাকা আত্মসাত এবং বিজ্ঞাপন প্রদান ও বিল দিতে কমিশন বাণিজ্যের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে এই চক্র। কামরুজ্জামানের নেতৃত্বে হিসাব সহকারী আমিরুল ইসলাম, মাস্টার রোল কর্মচারী কার্য-সহকারী নাসির উদ্দিন, ম্যাকানিক্যাল ফোরম্যান নরেশ চন্দ্রসহ ৪/৫ জন জড়িত এই সিন্ডিকেটে।

নির্বাহী প্রকৌশলী কামরুজ্জামান যোগদান করার পর এই সিন্ডিকেট কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে গাড়ি, বাড়িসহ বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়েছেন। সিন্ডিকেটের হাত থেকে মুক্তির জন্য ও বিচার দাবিতে এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী ও দুর্নীতি দমন কমিশনসহ বিভিন্ন দপ্তরে একাধিক ঠিকাদার অভিযোগ দায়ের করেছেন।

অভিযোগে জানা যায়, ২০২০ সালের অক্টোবরে খুলনা এলজিইডিতে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে কামরুজ্জামান যোগদান করেন। যোগদানের পর থেকে তিনি অফিসের অনিয়ম ও দুর্নীতির সাথে জড়িত বেশ কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীকে আস্থায় নিয়ে চরম অনিয়ম-দুর্নীতি শুরু করেন। ইতিমধ্যেই নির্বাহী প্রকৌশলী কামরুজ্জামান খুলনা এলজিইডির সবগুলো প্রকল্প থেকে গত প্রায় দুই বছরে কমিশন ও ঘুষ নিয়ে কোটি কোটি টাকার মালিক বনেছেন। কিনেছেন দামি গাড়ি, করেছেন বাড়িসহ অঢেল সম্পদ।

দপ্তরের প্রতিটি কাজ থেকে ৩ থেকে ১০ শতাংশ কমিশন নিয়ে থাকেন তিনি। বিশেষ করে গত এক বছরে (২০২১-২২ অর্থবছরে) কেবিএস-আরআইডিপি, কেডিআরআইডিপি, টিইউএলও বা থানা ইউনিয়ন ল্যান্ড অফিস নির্মাণ প্রকল্প, এফডিআরআইডিপি বা বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ গ্রামঢু অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প, পিইডিপি-৪ বা প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন প্রকল্প-৪, এনবিডিআইএনএনজিপিএস বা নতুন জাতীয়করণকৃত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় উন্নয়ন প্রকল্প, এনবিআইডিজিপিএস বা জাতীয়করণকৃত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় উন্নয়ন প্রকল্প, সিআরএমআইডিপি বা বাজার উন্নয়ন প্রকল্প (পাইকগাছা ও বটিয়াঘাটাসহ ৪টি উপজেলায়), ভিআরআরপি, আইআরআইডিপি-৩, ইউটিএমআইডিপি বা ননমিউনিসিপ্যাল অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প, ইউএমসি বা উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স নির্মাণ প্রকল্প ও সিএএফডিআরআইআরপি বা ঘূর্ণিঝড় আমপান ক্ষতিগ্রস্থ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পসহ ১৩টি প্রকল্প থেকে শতাধিক কোটি টাকা হাতিয়েছেন। এ সকল প্রকল্পে গত অর্থবছরে প্রায় এক হাজার ৯শ’ কোটি টাকার বরাদ্দ এসেছে বলে জানা গেছে।

ঠিকাদারদের অভিযোগে আরো যানা যায়, ঠিকাদার ফান্ডের টাকা দিতে রাজি না হলে তাদের বিল মাসের পর মাস আটকে রেখে হয়রানি করা হয়।

গত ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরের ২ তারিখ ঠিকাদার ম্যানেজমেন্ট সভায় বিষয়গুলো তুলে ধরলে নির্বাহী প্রকৌশলী কামরুজ্জামান সেই সব ঠিকাদারকে ধমক দিয়ে শায়েস্তা করেন। এভাবে সবার মুখ বন্ধ রেখে তার সিন্ডিকেট চরমভাবে ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে সরকারের কোটি কোটি টাকা লোপাট করে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০২০-২১ এবং ২০২১-২২ অর্থবছরে মোবাইল মেইন্টেনেন্স, আবাসিক ও অনাবাসিক ভবন মেরামত কাজ ঠিকাদারদের নাম দিয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী নিজে যতসামান্য কাজ করে ৫ কোটি টাকা আত্মসাত করেছেন। এছাড়া মেকানিক্যাল ফোরম্যান নরেশ চন্দ্র সাহা জ্বালানী ও মোটরযান মেরামতের ভুয়া বিল করে আরো দুই কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। সরকারি প্রতিটি রোলার বরাদ্দ নিলে ফোরম্যান নরেশ সাহাকে ঘুষ দিতে হয় ১০ হাজার টাকা। আর রোলার চললে নরেশ সাহাকে প্রতিদিনের জন্য ৫ হাজার টাকা করে ঘুষ দিতে হয়। মেসার্স সুন্দরবন এন্টারপ্রাইজের মালিক মনজুর হোসেন লাবলু জানান, তিনি গত ২০২০-২১ বা ২০২১-২২ অর্থবছরে কোন মেরামত ও সংস্কার কাজ করেননি। তার লাইসেন্স ও প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে নির্বাহী প্রকৌশলী ও তার সিন্ডিকেটের সদস্য হিসাব সহকারী আমিরুল ইসলাম করেছেন। এ বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। এভাবে নির্বাহী প্রকৌশলী ও তার সিন্ডিকেটের সদস্যরা বছরের পর বছর ধরে সরকারি কোটি কোটি টাকা যেমন আত্মসাত করছেন। তেমনি ঠিকাদারদের হয়রানি ও দুর্ব্যবহার করে বিভিন্ন ফান্ড ও কর্মকর্তাদের নাম ব্যবহার করে কোটি কোটি টাকা লুটে নিচ্ছে বলে ঠিকাদাররা অভিযোগ। যার কারণে বেশ কিছু ঠিকাদার ইতিমধ্যেই পথে বসেছে। অনেকেই আবার এলজিইডিতে ঠিকাদারি ছেড়ে দেয়ার কথাও বলেছেন।

অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘ ২১ বছরের মাস্টাররোল কর্মচারী কার্যসহকারী নাসির উদ্দিন সংবাদপত্রে এলজিইডির যেসব বিজ্ঞাপন দেয়া হয় সেগুলো থেকে টাকার বিনিময়ে অখ্যাত সব পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেয়। এছাড়া বিজ্ঞাপন বিল দেয়ার সময়ও সেই সব পত্রিকার প্রতিনিধিদের কাছ থেকে আবারও কমিশন নেয়। এভাবে নাসির উদ্দিনকে তার চাহিদামত টাকা না দিলে যেমন কোন পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেয়া হয় না। তেমনি বিজ্ঞাপনের বিলের চেক দেয়ার সময়ও নাসির উদ্দিন নির্দিষ্ট হারে কমিশন নিয়ে থাকে বলে অভিযোগ দীর্ঘদিনের। খুলনার স্থানীয় ও জাতীয় পত্রিকার একাধিক প্রতিনিধি ও সাংবাদিক অভিযোগ করে বলেন, এলজিইডিতে বিজ্ঞাপন প্রদানের ক্ষেত্রে নাসির উদ্দিনকে টাকা দিতেই হবে। যা নির্বাহী প্রকৌশলী অবগত। তাই স্থানীয় সাংবাদিক ও জাতীয় পত্রিকার প্রতিনিধিরা নাসিরের কাছে অসহায় হয়েই টাকা দিয়ে বিজ্ঞাপন নিতে বাধ্য হয়। এছাড়া বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী মাস্টাররোল কর্মচারী নাসির উদ্দিনকে দিয়েই ঠিকাদারদের পাশবই, চুক্তিপত্র ইত্যাদির কাজ করিয়ে থাকে। যে কারণে ঠিকাদাররা নাসিরকে কমিশন দিতে বাধ্য হয়। এভাবে মাস্টাররোল একজন কর্মচারী দীর্ঘ ২১ বছর ধরে এ কাজ করে যাচ্ছেন নির্বাহী প্রকৌশলীদের ঘুষ, কমিশন ও দুর্নীতির হাতিয়ার হিসেবে। এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নাসির উদ্দিনও কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। ইতিমধ্যেই নাসির তার গ্রামের বাড়িতে ৭০-৮০ বিঘা জমি কিনেছেনে। এছাড়া খুলনা শহরের ৯৯ সাউথ সেন্ট্রাল রোডে বহুতল বাড়ি করছেন। এবং সোনাডাঙ্গার হাফিজনগর রোডে তার স্ত্রীর নামেও জমি কিনেছেন। এভাবে নির্বাহী প্রকৌশলী ও তার সিন্ডিকেটের সদস্য নরেশ চন্দ্র সাহা, হিসাব সহকারী আমিরুল ইসলামগংরা সরকারের অর্ধশতাধিক কোটি টাকা লোপাট করছে বলে ঠিকাদাররা অভিযোগ করেছেন। এই সিন্ডিকেটের মূল হোতা নির্বাহী প্রকৌশলীসহ তার সহযোগীদের এ অনিয়ম, ঘুষ ও কমিশন বাণিজ্য এবং দুর্নীতির বিষয়ে তদন্তপূর্বক বদলিসহ কঠোর ব্যবস্থা নিতে প্রধান প্রকৌশলী ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মন্ত্রীর কাছে দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী ঠিকাদাররা। অনিয়ম, ঘুষ, কমিশন বানিজ্য ও দুর্নীতির বিষয়ে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মাষ্টারোল কর্মচারী নাসির উদ্দিন। তবে তিনি তার বিষয়ে আরও খোজ খবর নেয়ার অনুরোধ করেছেন। এলজিইডির হিসাব সহকারী আমিরুল ইসলামের সাথে অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে তার মোবাইলে ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। তবে নির্বাহী প্রকৌশলী কামরুজ্জামান অনিয়ম, ঘুষ, কমিশন বানিজ্য ও দুর্নীতির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার বিষয়ে কোন কথা বলেননি। তিনি মিটিংয়ে আছেন বলে এ বিষয়ে কথা বলতে বুধবার তার অফিসে দেখা করার জন্য অনুরোধ জানান।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

সর্বশেষ

যশোর শহরে ফের ওএমএস’র আটা বিক্রি শুরু, অনিয়মের প্রমাণ মিললেই লাইসেন্স বাতিল

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক : যশোর পৌর এলাকায় ফের ওএমএস’র আটা বিক্রি শুরু হয়েছে। রোববার আটা বিক্রি...

যশোর সিটি কর্পোরেশন কতদূর

তবিবর রহমান : ২০১২ সালের ২০ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী যশোর এসেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেদিন শহরের...

 কারা পাচ্ছেন নোবেল পুরস্কার, আজ থেকেই জানা যাবে

কল্যাণ ডেস্ক: বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদার নোবেল পুরস্কার ঘোষণা শুরু হচ্ছে আজ থেকে। আগামী ১০...

বাঙালির স্মৃতি থেকে মুছে যাবে ইলিশ

গ্রাম্য মাদ্রাসার শিক্ষক আনোয়ারুজ্জান ২০ বছর আগে ইলিশ মাছের ভবিষ্যৎ নিয়ে যা ভেবেছিলেন, আজ...

জাতীয় ক্রাশ রাশমিকার জীবনে টার্নিং পয়েন্ট ‘পুষ্পা’

বিনোদন ডেস্ক: তেলেগু ‘পুষ্পা: দ্য রাইজ’ সিনেমাতে অভিনয় করে ভারতজুড়ে খ্যাতি পেয়েছেন রাশমিকা মান্দানা।...

পাঁচ ঘরোয়া উপায়ে দূর করুন অ্যাসিডিটি

কল্যাণ ডেস্ক: অ্যাসিডিটির সমস্যা নেই এমন মানুষ খুব কমই আছে। নিয়মিত ওষুধ তো খান,...