Tuesday, August 9, 2022

গডফাদার – হারুন উর রশীদ

“বাংলাদেশটা কোনো উপন্যাসের চরিত্রের হাতে জিম্মি নয়। সেটা হতে পারে না। নারায়ণগঞ্জেও সেটা হবে বলে মনে করিনা। মনে করি জনগণ যা চাইবে তাই হবে। এই আশা এখানো ত্যাগ করিনি। তাই গডফাদারের কথা বলে আর ভয় দেখানো নয়। আমরা ভয়কে জয় করতে চাই। আমাদের সাহস দিন। আমরা সাহসী হতে চাই।”

নারায়ণগঞ্জ নির্বাচনে এবার সব ছাপিয়ে আলোচনায় “গডফাদার”। তবে এই গডফাদারের কিন্তু আপেক্ষিক বিষয় আছে। কারোর কাছে আশঙ্কা, ভোটের হারার ভয়। আবার কারোর কাছে আশীর্বাদ, ভোটে জেতার অবলম্বন।

এই গডফাদার নিয়ে সেলিনা হায়াৎ আইভী আর তৈমূর আলম খন্দকারের মাঠ গরমের পর স্বয়ং শামীম ওসমানও সংবাদ সম্মেলন করলেন। তিনি অবশ্য এই “গডফাদার” শব্দে তেমন মাইন্ড করেননি। তিনি বলেছেন, ‘এখন যদি কারোর ইচ্ছা হয় আজকে আমাকে গডফাদার বলবে, দুইদিন আগে যার ইচ্ছা হয়েছে আমাকে ফাদার বলেছেন। তিনদিন আগে বলতে ইচ্ছে হয়েছে, ব্রাদার বলেছেন। ভাই যা ই বলার বলেন, গডমাদার বলবেন না। আই ডোন্ট কেয়ার কে কী বলল। এতে আমার কিছু যায় আসে না।”

এই তীব্র গডফাদার যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে আইভী অবশ্য প্রকাশ্যে সুবিধার আশ্বাস পেয়েছেন। শামীম ওসমান সোমবার বলেছেন, নৌকার জন্য তিনি মাঠে নেমে গেলেন।

তাহলে আইভী কথা বলেছিলেন? তিনি বলেছিলেন,“উনি (তৈমূর) শামীম ওসমান ও সেলিম ওসমানের প্রার্থী। উনি অন্য কারোর প্রার্থী নন, বিএনপিরও নন, স্বতন্ত্রও নন। তৈমূর আলম খন্দকার যে গডফাদার শামীম ওসমানের প্রার্থী তার প্রমাণ হয়েছে।”

এর জবাবও দিয়েছেন হাতি প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী এবং বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পদ থেকে সদ্য অব্যাহতি পাওয়া তৈমূর আলম খন্দকার। তিনি বলেছেন, “আমি তো আওয়ামী লীগের ভোটও চাই। প্রধানমন্ত্রীর ভোটও চাই। যাদের উনি গডফাদার বলেছেন তারা তো এমপি, জনপ্রতিনিধি তাদের সমর্থনও তো আমি চাই। তাদের সাথে আমার পার্সোনাল কোনো আন্ডারস্ট্যান্ডিং নাই।”

তাদের এই তীব্র গডফাদার বিতর্ককে পাশে রেখে একটু ইতিহাসের দিকে নজর দিই। গডফাদার শব্দটি পরিচিতি পায় মূলত একটি অপরাধ বিষয়ক উপন্যাস থেকে। যার নাম “দ্য গডফাদার”। ইতালীয়-মার্কিন লেখক মারিও পুজোর লেখা এই উপন্যাস ১৯৬৯ সালে প্রকাশিত। উপন্যাসটি নিউ ইয়র্ক সিটির এক কাল্পনিক মাফিয়া পরিবার ও তার কর্তা ভিটো কর্লিয়নির কাহিনী। উপন্যাসের সময়কাল ১৯৪৫ থেকে ১৯৫৫।এই উপন্যাস অবলম্বনে একাধিক চলচ্চিত্র তৈরি হয়েছে। দ্য গডফাদার হলো পৃথিবীর সেরা মাফিয়া থ্রিলার।

আর এর মূল কথা হলো- Behind every successful fortune ; there is a crime.
এবার আবার ফিরে আসি নারায়ণগঞ্জের নির্বাচনে। কয়েকটি প্রশ্ন করা যাক।
১.আইভী ও তৈমূর দুই পক্ষ এত বিতর্কের পরও কেন গডফাদারকে পক্ষে চান?
২.তারা কেউই কি নিজেদের ওপর আস্থা রাখতে পারছেন না?
৩.ভোট কে দেবে ভোটার, না গডফাদার?
৪.তারাও কি মনে করেন প্রত্যেক সফল ভাগ্যের পেছনে একটি করে অপরাধ আছে?
৫.তারা কি নির্বাচন করছেন না থ্রিলার উপন্যাসের চরিত্রে অভিনয় করছেন?
৬.তারাও কি ভোটের বাজারে গডফাদার চাইছেন না?

সবদিক বিবেচনায় এখন শামীম ওসমানকেই তারা নারায়ণগঞ্জের ভোটের বাজারে ফ্যাক্টর মনে করছেন। তাই যদি মনে না করবেন তাহলে তাকে নিয়ে তাদের এত উদ্বেগ কেন? আমরা এখনো প্রকাশ্যে নারায়ণগঞ্জের ভোটে কোনো গডফাদারের মাফিয়া তৎপরতা দেখছি না। তাহলে দুই প্রার্থী কেন বাজার গরম করছেন? তারা কেন টেনে আনছেন গডফাদার ফ্যাক্টর।

তৈমূর তো বলেই দিয়েছেন তিনি সবার ভোট চান। এমন কি আওয়ামী লীগেরও। শামীম ওসমানের ভোটও চান। আর আইভীও কিন্তু সবার ভোট চান। যদিও কৌশলে বলছেন দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে শামীম ওসমান অবস্থান নিলে তাতে তার দলীয় কর্মীদের মধ্যে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হবে। সেই কারণেই সমর্থন চান। তাহলে কী দাঁড়ালো? মুখে গডফাদার বললেও আশীর্বাদ চান সবাই।

কিন্তু ভোটের জন্য তো ভোটারের আশীর্বাদ নিতে হবে। সমর্থন নিতে হবে। সময় সেই কাজেই ব্যয় করতে হবে। সেটা না করে তারা গডফাদারের পেছনে কেন সময় ব্যয় করছেন?

এখানেই নিজের ওপর, ভোটারের ওপর অস্থাহীনতার প্রকাশ পায়। একজন দুইবার মেয়র হয়েছেন এর আগে। আরেকজন মেয়র না হলেও বড় নেতা। সাধারণ মানুষের পালস তাদের নিশ্চয়ই বোঝার কথা। সেটা না বুঝে মাঠের রাজনীতিতে নতুন উপাদান আমন্ত্রণ করে আনা কোনো কাজের কথা নয়।

শুধু রাজনীতি কেন? প্রায় সবখানেই আমরা দেখছি নৈতিক শক্তির পরিবর্তে বিকল্প শক্তির ওপর নির্ভর করার প্রবণতা। নারায়ণগঞ্জের এবারের নির্বাচন সেটাকে যেন আরো শক্ত অবস্থানের ওপর দাঁড় করাতে যাচ্ছে। যদি তাই হয়, তাহলে সেটা হবে এই নির্বাচনের সবচেয়ে খারাপ দিক।

আমাদের নিজের আয়নায় মুখ দেখার সময় এসেছে। কাউকে কোনো নিন্দিত শব্দের আড়ালে ঢেকে চাপ সৃষ্টি করে সুবিধা নেয়ার কৌশল কোনো নন্দিত কৌশল নয়। এই কৌশল কোনো ভালো ফল বয়ে আনে না। আর যারা ডাবল স্ট্যান্ডার্ড খেলতে চান তারাও শেষ পর্যন্ত ধরা পড়ে যান।

বাংলাদেশটা কোনো উপন্যাসের চরিত্রের হাতে জিম্মি নয়। সেটা হতে পারে না। নারায়ণগঞ্জেও সেটা হবে বলে মনে করিনা। মনে করি জনগণ যা চাইবে তাই হবে। এই আশা এখানো ত্যাগ করিনি। তাই গডফাদারের কথা বলে আর ভয় দেখানো নয়। আমরা ভয়কে জয় করতে চাই। আমাদের সাহস দিন। আমরা সাহসী হতে চাই।
লেখক : সাংবাদিক

 

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

সর্বশেষ

যশোরে ভাবগাম্ভীর্যের মধ্যদিয়ে পালিত হয়েছে পবিত্র আশুরা

নিজস্ব প্রতিবেদক: ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্যদিয়ে যশোরে পালিত হয়েছে পবিত্র আশুরা। কারবালার শোক ও হৃদয়বিদারক...

নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তায় তাজিয়া মিছিল

কল্যাণ ডেস্ক : আজ ১০ মহররম, পবিত্র আশুরা দিবস। দিবসটি উদযাপন উপলক্ষে রাজধানীজুড়ে নিশ্ছিদ্র...

দুই পক্ষের বিরোধ,সাতক্ষীরা থেকে বাস চলাচল বন্ধ

সাতক্ষীরা জেলা প্রতিনিধি : শ্রমিক ইউনিয়নের দুই পক্ষের বিরোধকে কেন্দ্র করে সাতক্ষীরা থেকে দূরপাল্লার...

এবার পশ্চিমতীরে ইসরায়েলের হামলা, ৪২ ফিলিস্তিনি হতাহত

কল্যাণ ডেস্ক : ফিলিস্তিনের অধিকৃত পশ্চিমতীরে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। এতে দু’জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।...

জীবন জীবিকায় জ্বালানির জ্বালা

নিজস্ব প্রতিবেদক : পণ্য পরিবহনের ভাড়া বাড়িয়েছে ট্রাক মালিকরা। বাস মালিকরা বাড়িয়েছেন যাতায়াত ভাড়া। সবজি...

পবিত্র আশুরা আজ

নিজস্ব প্রতিবেদক : আজ মঙ্গলবার ১০ মহররম। পবিত্র আশুরা। কারবালার শোকাবহ ঘটনাবহুল এ দিনটি মুসলমানদের...