গতিপথ বদলাচ্ছে ঘূর্ণিঝড় ‘অশনি’

 উপকূলে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি
 প্রস্তুত আশ্রয় কেন্ত্র ও স্বেচ্ছাসেবকরা
 বন্দরে ২ নম্বর সর্তক সংকেত

কল্যাণ ডেস্ক: ঘূর্ণিঝড় ‘অশনি’ এখনো বাংলাদেশ উপকূল থেকে হাজার কিলোমিটার দূরে রয়েছে। তবে এই ঝড়ের কেন্দ্র থেকে ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘ বাংলাদেশের উপকূলে ভেসে এসেছে। এর প্রভাবে দেশের উপকূলীয় এলাকাগুলোতে এরই মধ্যে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। শেষ পর্যন্ত ঘূর্ণিঝড়টি বাংলাদেশ উপকূলে আঘাত হানবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

আবহাওয়াবিদেরা বলছেন, ঘূর্ণিঝড়টি খানিকটা উত্তরপশ্চিম দিকে সরে গিয়ে ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ২০ কিলোমিটার গতিতে এগোচ্ছে। এখন পর্যন্ত এর গতিমুখ ভারতের অন্ধ্র উপকূলের দিকে আছে। তবে আজ মঙ্গলবার তা আরও খানিকটা দিক পরিবর্তন করতে পারে। শেষ পর্যন্ত ঝড়টি কোন দিক ধরে ঊপকূলের দিকে এগোবে তা দুপুর নাগাদ বলা যাবে। এমনকি ঘূর্ণিঝড় দুর্বল হয়ে বঙ্গোপসাগরেই বিলীন হয়ে যেতে পারে বলেও মনে করছে ভারতের আবহাওয়া অধিদপ্তর।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ ছানাউল হক ম-ল সোমবার দুপুরে বলেন, ঘূর্ণিঝড়টি আগামীকালের মধ্যে তার গতিমুখ বদলাতে পারে। এর পর ঝড়টি বাংলাদেশ বা ভারত যে দেশের দিকে মুখ করে এগিয়ে আসুক না কেন, তা কিছুটা দুর্বল হয়ে যেতে পারে।

এদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তর থেকে এখন পর্যন্ত চট্টগ্রাম, মোংলা, পায়রা বন্দর ও কক্সবাজার সমুদ্র উপকূলে ২ নম্বর দূরবর্তী হুঁশিয়ারি সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত নৌযানগুলোকে উপকূলের কাছাকাছি এসে সাবধানে চলাচল করতে বলা হয়েছে।

শরণখোলা প্রতিনিধি জানান, ঘূর্ণিঝড় অশনির প্রভাবে শরণখোলাসহ উপকূলীয় এলাকায় থেমে থেমে দমকা হাওয়া ও গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। উপকূলীয় এলাকার নদীতে স্বাভাবিকের চেয়ে ২/৩ ফুট পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। নদী ও সমুদ্র উত্তাল হয়ে উঠেছে। মাছ ধরার সকল নৌকা ও ট্রলার নিরাপদে আশ্রয় নিয়েছে।
সোমবার সকালে বাগেরহাট জেলা প্রশাসকের সভাকক্ষে ও দুপুরে উপজেলা পর্যায়ে এবং বিকালে ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির পৃথক পৃথক প্রস্তুতি সভার খবর পাওয়া গেছে।
খোন্তাকাটা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জাকির হোসেন খান মহিউদ্দিন জানান, তার ইউনিয়নে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ওয়ার্ড পর্যায় সভা করার জন্য ইউপি সদস্যদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

শরণখোলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নুর ই আলম সিদ্দিকী জানান, সোমবার দুপুরে উপজেলা পর্যায়ের সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ সভায় ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায় দুর্যোগ প্রস্তুতি কমিটির সভা করে প্রস্তুতিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ ও উপজেলার ৯১ টি সাইক্লোন শেল্টারসহ স্বেচ্ছাসেবকদের প্রস্তুত থাকার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
শরণখোলা ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি আবুল হোসেন জানান, ঘূর্ণিঝড় অশনি’র আগাম সংকেত পেয়ে নদী ও সমুদ্রে মাছ ধরার সকল নৌকা ও ট্রলার আগে ভাগেই নিরাপদে আশ্রয় নিয়েছে।
সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের ডিএফও বেলায়েত হোসেন জানান, ঘূর্ণিঝড় অশনির কারণে পূর্ব বিভাগ জুড়ে বিশেষ সতর্কতার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। তুলনামূলক দূর্বল অবকাঠামোর ক্যাম্প ও ফাঁড়ির বনরক্ষীদের অবস্থা বুঝে পাশের ক্যাম্প বা অফিসে আশ্রয় নেয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

মোংলা প্রতিনিধি জানান, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিন্মচাপটি ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিয়ে বন্দরসহ উপকূলের দিকে এগিয়ে আসছে। মাংলা বন্দরে ২ নম্বর স্থানীয় সর্তক সংকেত দেখাতে বলেছে আবহাওয়া অফিস। মোংলা শহর ও গ্রামাঞ্চলে সোমবার ভোর রাত থেকেই গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। ঘুর্ণিঝড় মোকাবেলায় সকল প্রস্তুতি নিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। প্রস্তুত রয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ, কোস্টগার্ড, নৌবাহিনী ও বন বিভাগ। ঘুর্ণিঝড় অশনির প্রভাবে বন্দর ও উপকুলীয় অঞ্চলে দুর্যোগপুর্ণ ও বৈরি আবহাওয়ার প্রভাবে মোংলা বন্দরের পশুর নদীতে দুপুরের জোয়ারে স্বাভাবিকের তুলনায় জোয়ারের পানি কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে।

মোংলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কমলেশ মজুমদার বলেন, ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় পৌরসভা ও উপজেলা প্রশাসন ১০৩টি আশ্রয় কেন্দ্র পরিস্কার পরিছন্ন করে রেখেছে। এদিকে সোমবার দুপুর ১২টার দিকে উপজেলা পরিষদে জরুরি মিটিং করে উপকূলবাসীকে সচেতন এবং উদ্ধার করার জন্য ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচি (সিপিপি)’র এক হাজার তিনশ ২০ জন স্বেচ্ছাসেবককে প্রস্তুত রেখেছে। মজুদ করে রাখা হয়েছে জরুরি ভিত্তিতে শুকনো খাবার।

মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের হারবার মাস্টার কমান্ডার শেখ ফখর উদ্দিন জানান, মোংলা সমুদ্র বন্দরে খাদ্যবাহীসহ ৪টি বাণিজ্যিক জাহাজ অবস্থান করছে। এছাড়া বহির্নোঙ্গরেও পণ্যবাহী জাহাজ রয়েছে। আমরা ঘূর্ণিঝড় প্রচন্ডতা এবং আবহাওয়ার খবর পর্যবেক্ষণ করছি। যদিও এটি আমাদের দিকে আঘাত হানার খুব বেশি সম্ভাবনা নেই। তবে বাতাসের প্রচন্ডতা বাড়লে দেশি-বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজ ও কার্গো লাইটারগুলোকে নিরাপদে সরিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা করা হবে। তবে বৃষ্টির কারণে খাদ্যবাহী জাহাজের পণ্য খালাস কিছুটা ব্যাহত হলেও বন্দরের অন্য সকল পণ্য খালাস-বোঝাই কার্যক্রম স্বাভাবিক আছে বলে জানান বন্দরের এ কর্মকর্তা।
শ্যামনগর ও সাতক্ষীরা প্রতিনিধি জানান, ঘূর্ণিঝড় অশনি মোকাবেলায় উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরায় সার্বিক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। প্রস্তুত করা হয়েছে ১৯৭টি সরকারি আশ্রয়কেন্দ্র। এছাড়াও ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধে চলছে সংস্কার কাজ।

সাতক্ষীরার ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক মাশরুবা ফেরদৌস জানান, সোমবার দুপুরে ভার্চুয়ালি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। ইতোমধ্যে জেলার সরকারি ১৯৭টি আশ্রয়কেন্দ্র ব্যবহার উপযোগী করা হয়েছে। এছাড়া ৭৪০টি স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসাসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠান দুর্যোগকালীন সময়ে ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। এসব আশ্রয়কেন্দ্রে সাড়ে তিন লাখ লোক আশ্রয় নিতে পারবেন।

তিনি আরও জানান, স্বাস্থ্য বিভাগের ৮৬টি মেডিকেল টিম প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এছাড়া দুর্যোগকালীন সময়ে মানুষকে আশ্রয় কেন্দ্রে সরিয়ে নিতে ট্রলার প্রস্তুত করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রায় তিন হাজার স্বেচ্ছাসেবক প্রস্তুত রয়েছে।
এদিকে, সোমবার সকাল থেকে জেলাব্যাপী গুড়িগুড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। সাতক্ষীরা আবহাওয়া অফিসের সিনিয়র পর্যবেক্ষক জুলফিকার আলী জানান, অশনির অগ্রভাগের মেঘমালার কারণে উপকূলীয় এলাকায় বৃষ্টি হচ্ছে।
সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শামীম হাসনাইন জানান, সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতায় ৮০০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ রয়েছে। এর মধ্যে ৪৪টি পয়েন্টের বেড়িবাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। সোমবার থেকে এসব স্থানে জিওব্যাগ ফেলা হচ্ছে।

সিপিপির স্বেচ্ছাসেবক জিএম মাসুম বিল্লাহ বলেন, অশনির দূরবর্তী হুশিয়ারি সংকেত পেয়ে ইতোমধ্যে প্রচারণা চালানো হয়েছে। প্রতিটি ইউনিটে প্রস্তুতি সভা সম্পন্ন হয়েছে। সাইক্লোন শেল্টার প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
পদ্মপুকুর ইউনিয়ন সিপিপির টিম লিডার জি এম মহিবুল্লাহ বলেন, ইউনিয়ন পরিষদের সাথে সমন্বয় করে আশ্রয়কেন্দ্রগুলো প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশ পেলে সাথে সাথে পতাকা উড়ানো হবে, মাইকে প্রচার করা হবে।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে