Saturday, May 28, 2022

গরম বাজারে ভর্তুকি পণ্য লাপাত্তা

টিসিবি-ওএমএস’র পণ্য কালোবাজারে
ছোট হয়ে আসছে বাজারের তালিকা

সুনীল ঘোষ:
দাম নাগালের মধ্যে রাখতে যশোরে চলমান রয়েছে টিসিবি ও ওএমএস’র পণ্য বিক্রি কার্যক্রম। কিন্তু ভর্তুকি মূল্যের এসব পণ্য লাপাত্তা হয়ে যাচ্ছে। কালোবাজারে বিক্রির ফলে সাশ্রয়ী দামের পণ্য কেনার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সীমিত আয়ের মানুষ। ডিলারদের একটি বড় অংশ সরকারের ভর্তুকি দামের পণ্য নিয়ে ‘নয়-ছয়’ করে ফায়দা লুটছে। অথচ নিয়মবর্হিভূত এসব কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে তদারক ও নিয়ন্ত্রণ সংশ্লিষ্টরা শাস্তিমূলক কোন ব্যবস্থা নিচ্ছে না ।

লাগামহীন এমন দাম বৃদ্ধির পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়ে অনেকে বাজারের তালিকা ‘শটকাট’ করেছেন। প্রয়োজনের তুলনায় কম পণ্য কিনে কোন রকমে দিনাতিপাতের চেষ্টা করছেন। টিসিবি ছাড়াও ওএমএসের মাধ্যমেও চাল ও আটা বিক্রি করা হচ্ছে। কিন্তু সেটির পরিসরও সীমিত।

টিসিবির মাধ্যমে ভর্তুকি মূল্যে সয়াবিন তেল, পেঁয়াজ, মসুর ডাল বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু যার প্রভাব যশোরের খোলা বাজারে পড়েনি। অভিযোগ রয়েছে, যশোরে টিসিবির পণ্যের সিংহভাগ কালোবাজারে বিক্রি করে অধিক মুনাফা লুটে নিচ্ছেন ডিলাররা। যশোর শহরসহ জেলায় ডিলার সংখ্যা ৭২ জন। তাদের অধিকাংশই ক্ষমতাসীন দলের। যার কারণে সরকারি বিধি বিধানের প্রতি তোয়াক্কা করছেন না তারা। বরাদ্দের সিংহভাগ পণ্য কালোবাজারে বিক্রি করে দিচ্ছেন। ফলে সরকারের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য মাঠেই মারা যাচ্ছে।

নিয়ন্ত্রক সংশ্লিষ্টরাও ভর্তুকি পণ্য বিক্রিতে অনিয়মের বিষয়টির সত্যতা স্বীকার করেছেন। মুঠোফোনে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক ওয়ালিদ বিন হাবিব বলেছেন, বেশকিছু দিন আগে টিসিবির পণ্য কালোবাজারে বিক্রির অভিযোগ পেয়েছিলাম। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে দেখা হয়েছে। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ পেয়েছিলাম তাদের সতর্ক করে দেয়া হয়েছে। তবে এখন এধরণের অভিযোগ নেই। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

যশোর বড়বাজারের লোকনাথ ভান্ডারের সত্ত্বাধিকারী ও টিসিবির ডিলার গৌরাঙ্গনাথ বাবু পাল জানান, বর্তমানে পণ্যের বরাদ্দ একেবারে কম। প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। বরাদ্দ আগের চেয়ে তিন ভাগের দুই ভাগ কমে গেছে। যার কারণে সবাইকে ন্যায্য মুল্যের পণ্য দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। নিয়ম মেনেই পণ্য বিক্রি করে থাকেন।
বাবু পাল জানান, বর্তমানে ডিলার প্রতি বরাদ্দ পেঁয়াজ ৪শ থেকে ৫শ কেজি, চিনি ২শ থেকে ৩শ কেজি, মসুর ডাল ৪শ’ থেকে ৫শ কেজি এবং বোতলজাত সোয়াবিন তেল ৪শ’ থেকে ৫শ কেজি। মাসে এক থেকে দুইবার বরাদ্দ পাওয়া যায়।

জেলা বাজার কর্মকর্তা সুজাত হোসেন খান বলেন ভিন্ন কথা। তিনি বলেন, বেশকিছু দিন দায়িত্বে নেই। তবে যতদিন পর্যন্ত দায়িত্বে ছিলাম, তখন টিসিবি’র পণ্য কালোবাজারে বিক্রির কোন প্রমাণ পাইনি। প্রয়োজনের তুলনায় টিসিবির পণ্যের বরাদ্দ কম। তাই সবাই টিসিবির পণ্য পাচ্ছেন না।

যশোর শহরে ওএমএস ডিলারের সংখ্যা ১৩। এসব ডিলার মাসে ৯ দিন চাল ও আটা বরাদ্দ পান। প্রত্যেক ডিলারকে ৩ টন চাল ও ৩ টন আটা বরাদ্দ দেয় সরকার। টিসিবির মতন ওএমএস’র ডিলারদের বিরুদ্ধেও রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। তাদের দোকানের সামনে সকাল থেকে দুপুর ১২ টা পর্যন্ত নারী-পুরুষের লম্বা লাইন দেখা যায়। কিন্তু অনেকেরই বাড়ি ফিরতে হয় খালি হাতে। অভিযোগ রয়েছে এসব রেশন ডিলাররা বরাদ্দের সিংহভাগ চাল-আটা কালোবাজারে বিক্রি করে অধিক মুনাফা হাতিয়ে নিচ্ছেন।

নেপথ্য কারণ হিসেবে অভিযোগকারীরা বলছেন- খোলাবাজারে ‘লুজ’ আটার কেজি সর্বোচ্চ ৩৬ টাকা। আর ওএমএস ডিলার পয়েন্টে দোকানে আটা পাওয়ায় ১৮ টাকা দরে। বাজারে ৪২-৪৫ টাকার নিচেই মোটা চাল নেই। ওএমএসের দোকানে এই চাল বিক্রি করা হয় ৩০ টাকা কেজি দরে। খোলাবাজার ও ওএমএস’র দামের ব্যবধান বেশি হওয়ায় বরাদ্দের সিংহভাগ চাল-আটা চলে যাচ্ছে কালোবাজারে। যদিও এটি নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে কিছু ডিলারের।

যশোর শহরের রাসেল চত্বর (চারখাম্বা মোড়) এলাকার ডিলার তোতা মিয়া জানান, আমি বরাদ্দের সব আটা-চাল নিয়ম মেনেই বিক্রি করি। আমার দোকানে এসে কেউ খালি হাতে ফেরে না। কালোবাজারে রেশনের চাল-আটা বিক্রির প্রশ্নই ওঠে না দাবি করে তিনি বলেন, অন্যরা কি করে-তা আমার জানা নেই। তবে এই অভিযোগ তিনি আগেও শুনেছেন-যোগ করেন ওএমএস ডিলার তোতা মিয়া।

যশোর বড়বাজারে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, খোলা সোয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে ১৫৪ থেকে ১৬০ টাকা কেজি। আর বোতলজাত দুই লিটার তেল কিনতে হচ্ছে সর্বনিন্ম ৩শ টাকায়। অর্থাৎ প্রতি লিটার সোয়াবিন কিনতে হচ্ছে ১৫০ টাকায়। একইভাবে বেড়েছে মসুর, ছোলা, মুগ, কলাই ও বুটসহ সব ধরনের ডালের দাম। প্রতিকেজি ৬ থেেক ৩০ টাকা পর্যন্ত বেশি দাম দিয়ে কিনতে হচ্ছে। কিছুদিন আগেও আমদানিকৃত মোটা মুসুর ডালের কেজি ছিল ৫০ থেকে ৫২ টাকা, এখন সেই ডাল কিনতে হচ্ছে ৮৪ থেকে ৯০ টাকায়। এভাবে সব রকমের ডালে দাম বেড়েছে।

রোপা আমন ধান ঘরে উঠলেও তার প্রভাব এখনো পড়েনি চালের বাজারে। মোটা স্বর্ণা চাল বিক্রি হচ্ছে ৪৩ থেকে ৪৭ টাকা কেজি। আঠাশ ধানের চাল ৫০ টাকার নিচেই নেই। বাঁশমতি প্রতি কেজি কিনতে হচ্ছে ৬৮ টাকা দরে। জিরে মিনিকেট এখনো বিক্রি হচ্ছে ৫৫ থেকে ৫৭ টাকা কেজি দরে।

সবজির বাজারে প্রতিকেজিতে ন্যুনতম ১০ থেকে ৪০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। ৪০ টাকা কেজির টমেটো এখন ১শ’ টাকায় কিনতে হচ্ছে। গাজর, বেগুন, পটল, উচ্ছে, শশা, বরবটি আলু, ঢেঁড়শ, কচুরমুখী, কুমড়া, লাল ও সবুজ শাকেও দামও বেড়েছে অস্বাভাবিক হারে। লাউয়ের পিচে বেড়েছে ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত।

খুচরা বিক্রেতা নজরুল ইসলাম জানান, সবজির দাম আরও বাড়বে। গত ৩দিনের টানা বর্ষণে সবজির ক্ষেত তলিয়ে গেছে। পানি সরে যাওয়ার পর কিছু সবজি পাওয়া যাবে কিন্তু তা যেমন হবে না ভালমানের, তেমনি দাম হবে বেশি। নতুন করে সবজি বীজ বপন করা হলেও তা বাজারজাত করতে কমপক্ষে ২৫ থেকে ৩০ দিন সময় লাগবে।

স্বস্তি নেই মাছ ও মাংসের বাজারেও। যশোরে প্রকার ভেদে রুই, কাতলা, টাকি, শিং, শোল, তেলাপয়িাসহ সব ধরণরে কার্প জাতীয় মাচের দাম ২০ থেেক ১২০ টাকা র্পযন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। ভরা মৌসুমেও ইলিশের দাম ছিল আকাশ ছোয়া। এখনো যশোরের বাজারে কেজি কেজি ওজনের ইলিশ ১৩শ’ থেকে ১৪শ’ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। হাঁস, মুরগী, গরু ও খাসীসহ সব ধরণের মাংসে ৬০ থেকে ৩শ’ টাকা র্পযন্ত বেড়েছে। সর্বোচ্চ ৩শ’ টাকা বেড়েছে রাজ হাঁসের দাম।

মসলার বাজারেও আগুন। জিরা, এলাচ, দারুচিনি, আদাসহ সব ধরণরে মসলার দামে যেন আগুন ধরেছে। প্রতি কেজিতে বেড়েছে ২০ টাকা থেকে ১ হাজার টাকা র্পযন্ত। এরইমাঝে কয়েক দফা বাড়ানো হয়েছে গ্যাসের দাম। গত দেড় মাসের ব্যবধানে হাজার টাকার গ্যাস সিলিন্ডার দাম বাড়িয়ে ১৪শ’ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করা হয়েছে। তবে এখন প্রতি সিলিন্ডার গ্যাস বিক্রি করা হচ্ছে সাড়ে ১২শ’ থেকে সাড়ে ১৩শ’ টাাকা পর্যন্ত।

ব্যবসায়ী আদনান সিদ্দিকী জানান, ৪ জনের সংসারে আগে পাঁচ-সাড়ে সাড়ে পাঁচ হাজার টাকায় মাছ, মাংস, মসলা, সবজি কিনে খাওয়া যেতো। ৩ হাজার টাকার চালের সাথে এক সিলিন্ডার গ্যাস আর ৪ লিটার তেলে মাস চলে যেতো। অর্থাৎ ১২-১৩ হাজার টাকায় ৪ জনের মধ্যবত্তি একটি শহুরে সংসার চলে যেেতা। এখন ওই একই পণ্য কিনতে প্রায় ৪-৫ হাজার টাকা অতিরিক্ত লাগছে। বাড়তি এই টাকার যোগাড় করতে সঞ্চিত অর্থে হাত পড়েছে। এভাবে চলতে থাকলে খুব কম সময়ের মধ্যে পথে বসতে হবে-জানান এই ব্যবসায়ী।

চাকরিজীবী নাজমুল হোসনে বলেন, এমন কোন নিত্য পণ্য নেই, যার দাম বাড়েনি। সংসার চালাতে হিমশমি খেতে হচ্ছে। যেকারণে স্ত্রী-সন্তানদের গ্রামের বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছি।

সবজি বিক্রেতা আব্দুর রহমান জানান, আমরা আড়ত থেকে যে দামে কিনি, তার থেকে ২/৩ টাকা বেশি দরে বিক্রি করি। অনুরুপ মন্তব্য করেন পাইকারী বিক্রেতা ইলিয়াস হোসেন।

তিনি বলেন, তৃণমূল থেকে ক্রেতা পর্যন্ত দাম বৃদ্ধির জন্য একাধিক মধ্যসত্ত¦ভোগী আর সিন্ডিকেট দায়ী। এছাড়া সম্প্রতি ডিজেলের দাম বৃদ্ধির কারণে পণ্য সরবরাহে পরিবহন খরচ বেড়েছে। যা নিত্য পণ্যের মূল্য বৃদ্ধির আকেকটি কারণ-মনে করেন এই সবজি বিক্রেতা।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

সর্বশেষ

প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে কটূক্তির প্রতিবাদে শার্শা ছাত্রলীগের বিক্ষোভ

নিজস্ব প্রতিবেদক: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে কটূক্তির প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল করেছে শার্শা উপজেলা ছাত্রলীগ।...

বর্ণিল আয়োজনে ‘ভোরের সাথীর’ ১৬ বছর উদযাপন

নিজস্ব প্রতিবেদক: বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা, কেক কাটা, আলোচনাসভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে যশোরে পালিত...

সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশে ভারতে স্বীকৃতি পেল যৌন পেশা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ভারতে যৌন পেশাকে আর বেআইনি বলা যাবে না। বৃহস্পতিবার (২৬ মে) এই...

বিশ্বের খর্বকায় কিশোরের স্বীকৃতি পেলেন দোর বাহাদুর

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: নেপালের ১৭ বছর বয়সি দোর বাহাদুর ক্ষেপাঞ্জিই এখন বিশ্বের সবচেয়ে খর্বকায় কিশোর।...

‘বলিউডে কাজ পেতে হলে আমাকে আরও সময় দিতে হবে’

বিনোদন ডেস্ক: টেলিভিশনের জনপ্রিয় তারকা উরফি জাভেদ। যিনি নিজের অদ্ভুত সব ফ্যাশনের জন্য পরিচিত...

টেস্টে ২ হাজারের ঘরে ছন্দে থাকা লিটন

ক্রীড়া ডেস্ক: শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে প্রথম টেস্টে ৮৮ রান করার পর, ঢাকায় দ্বিতীয় টেস্টের প্রথম...