বুধবার, নভেম্বর ৩০, ২০২২

চাঁচড়া মৎস্য পোনা বিক্রয় কেন্দ্র মাদকের আখড়া

বহন ক্ষমতার বাইরে বরাদ্দ ব্যয়
১৬ কোটি টাকা খরচ করেও কাজে আসছে না

সালমান হাসান
নির্মাণ শেষের দুই বছর পরও চালু হয়নি যশোরের চাঁচড়ার মৎস্য পোনা বিক্রয় কেন্দ্রটি। প্রকৃত চাষি ও ব্যবসায়ীরা বরাদ্দ না পাওয়ায় এটি চালু হচ্ছে না। ফলে ১৬ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে নির্মিত কেন্দ্রটি অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকায় পরিণত হয়েছে মাদকের আখড়ায়। সেখানে মাদক সেবনসহ বেচাবিক্রি চলে। আর সেই আগের মতই চারা মাছের কেনাবেচা চলছে রাস্তায়।

বহুল প্রত্যাশিত এই পোনা বিক্রয় কেন্দ্রটি ঘিরে অনেক স্বপ্ন ছিলো। নিরাপদ ও স্থায়ী একটি পোনার বাজার হয়ে উঠবে কেন্দ্রটি। এমনটিই ভেবেছিলেন মৎসপল্লী চাঁচড়ার মাছ চাষি ও ব্যবসায়ীরা। কিন্তু প্রত্যাশা ও স্বপ্নের কোনটাই পূরণ হয়নি তাদের।

কেন্দ্রের বরাদ্দ প্রাপ্তদের অধিকাংশই মাছ চাষি না। এমনকি পোনা বিক্রির কারবারের সাথেও তাদের কোন সম্পৃক্ততা নেই। মোদ্দা কথা হলো প্রকৃত অর্থে মৎস চাষি ও ব্যবসায়ী নন তারা। নীতিমালা অনুযায়ী বরাদ্দ পাওয়ার ক্যাটাগরিতে পড়েন না। দৈনিক কল্যাণের সাথে মৎসপল্লী চাঁচড়ার অনেক মাছ চাষি এমই অভিযোগই করেছেন। তবে তাদের কেউ নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি।

পোনা উৎপাদন ও বিক্রির সাথে সম্পৃক্ততা না থাকলেও জনপ্রতিনিধি ও রাজনীতিকদের প্রভাবে তারা কেন্দ্রের বরাদ্দ পেয়েছেন। ভুয়া কাগজপত্র দিয়ে কেন্দ্রের বরাদ্দ নিয়েছেন। ফলে কেন্দ্রটি চালু হচ্ছে না। এসব ভুয়াদের বরাদ্দ বাতিল করে প্রকৃতদের কাছে হস্তান্তর না করলে কেন্দ্রটি চালুর সম্ভাবনা নেই। কারণ কেন্দ্রের সিস্টার্ন ও স্থান বরাদ্দ প্রাপ্তদের বেশির ভাগেরই মাছ উৎপাদন ও ব্যবসায়ের ৫ বছরের অভিজ্ঞতা নেই। অথচ বরাদ্দের ক্ষেত্রে নীতিমালায় এমন শর্তের উল্লেখ রয়েছে।

হাতে গোনা কয়েকজন মাছ চাষি ও পোনা বিক্রেতা কেন্দ্রের বরাদ্দ পেলেও সেখানে যেতে আগ্রহী না। বিদ্যুত ও গার্ডের বিলসহ অন্যান্য খরচের ভয়ে সেখানে ব্যবসায় পরিচালনায় আগ্রহ নেই তাদের। এছাড়া কেন্দ্রে যেসব সুবিধার কথা বলা হয়েছে প্রকৃত অর্থে সেসবের কিছুই এখানে নেই। পানির অবস্থাও ভালো না। পানিতে আয়রনের পরিমান অনেক বেশি।

পোনা বিক্রয় কেন্দ্রটি নির্মাণের জন্য ৮ কোটি ৮৪ লাখ টাকা ব্যয়ে ৮০ শতক জমি কেনা হয়। চাঁচড়ার মাগুরপট্টিতে এই জমি কেনে বাংলাদেশ মৎস্য অধিদফতর। জমি কেনার পর ৮ কোটি ৪ লাখ টাকা ব্যয়ে পোনা বিক্রয় কেন্দ্রটি নির্মাণ করা হয়। ২০১৯ সালের মে মাসে কেন্দ্রের নির্মাণ কাজ শুরু হয়। শেষ হয় ওই বছরের ৩১ ডিসেম্বর। বৃহত্তর যশোর জেলায় মৎস্য চাষ উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থায়নের নির্মাণ হয় কেন্দ্রটি। ওই বছরই প্রকল্পটির মেয়াদও শেষ হয়। এরপর দুই বছর পেরোতে গেলেও কেন্দ্রটি চালু করতে পারেনি যশোরের মৎস্য বিভাগ। এমনকি অব্যবহৃত পড়ে থাকা কেন্দ্রটির কোন খোঁজও রাখেন না জেলা মৎস্য দফতরে কর্মরতরা। কেন্দ্রটির কোন তথ্যই তাদের কাছে নেই।

তবে মুঠোফোনে যোগাযোগ করে তৎকালীন উপ-প্রকল্প-পরিচালক মাহাবুবুর রহমানের কাছ থেকে কেন্দ্রটি সর্ম্পকে বিস্তারিত জানা যায়। তিনি জানান, কেন্দ্রের নিচতলায় ৫১ সিস্টার্ন আছে। এগুলো হ্যাচারির চারকোনা হাউসগুলোর মত। একেকটি সিস্টার্ন লম্বায় আট ফুট ও চওড়ায় তিন ফুট। উচ্চতা ৪ ফুট। আর ওপর তলায় হাড়ি পেতে ৬০ জনের মাছ বিক্রির সংস্থান রয়েছে। প্রতি তলায় একটি করে পানির ট্যাংক আছে। এখানে পানির রিসাইক্লিং সুবিধাও রয়েছে। আছে রিসাইক্লিংয়ের মাধ্যমে ব্যবহৃত পানি রিফাইন (পরিশোধন) পুনরায় ব্যবহারের বন্দোবস্তও।

তিনি জানান, হাউস ভাড়ার ব্যাপারে মন্ত্রনালয়ের একটি নীতিমালা আছে। সেই মোতাবেক বরাদ্দপ্রাপ্তদের বার্ষিক ভাড়া দিতে হবে। এক্ষেত্রে একেকটি সিস্টার্নের ভাড়া বছরে ৬ হাজার টাকা। হাড়ি পেতে মাছ বিক্রির যারা বরাদ্দ পেয়েছেন তাদের বাৎসরিক ভাড়ার পরিমাণ ২৪০০ টাকা। সিস্টার্ন ও হাড়ি নিয়ে মাছ বিক্রির জায়গারও বরাদ্দ প্রক্রিয়া সম্পন্নও হয়েছে।

আল্লার দান ফিস প্রকল্পের সত্বাধীকারি ও দেশি শিং-মাগুর বিক্রেতা সমিতির কার্যনির্বাহী সদস্য সেলিম হোসেন জানান, পোনা বিক্রয় কেন্দ্রটিতে ব্যবসার কোন পরিবেশ নেই। ওখানকার পানির অবস্থা একদমই ভালো না। পানিতে প্রচুর পরিমাণ আয়রন। ওয়াটার রিসাইক্লিং সুবিধার কথা বলা হলেও আদতে সেরকম কোন সুবিধা নেই। তিনি জানান, ২০ বছর ধরে মাছের ব্যবসার সাথে সম্পৃক্ততা তার। কিন্তু সেখানকার বরাদ্দ নেননি। জেলা পরিষদ নির্মিত মার্কেটের একটি দোকান ভাড়া নিয়ে সেখানে দুটো হাউস নির্মাণ করে পোনা বিক্রয় করেছেন।
চাঁচড়ার মৎস চাষি কল্যাণ সমিতির সহ-সভাপতি মিজানুর রহমান বাবলু জানান, পোনা বিক্রয় কেন্দ্রের বরাদ্দের ক্ষেত্রে ২০ হাজার টাকা অফেরতযোগ্য জামানত নেয়া হয়েছে। তারা দাবি জানিয়েছিলেন ফেরতযোগ্য ১০ হাজার টাকা জামানত রাখার। এছাড়াও বিদুৎ বিলের খরচ মৎস বিভাগ বহন করবে। এমনও প্রস্তাবও রেখেছিলেন। কিন্তু তাদের দাবির কোনটিই আমলে নেয়া হয়নি। তিনি বলেন, চাঁচড়ায় হ্যাচারি, হাপা ও মৎস চাষিদের আলাদা তিনটি সমিতি আছে। সমিতিগুলোর সাথে সমন্বয় করে মৎস বিভাগ কেন্দ্রটির বরাদ্দ দিলে এটির উদ্দেশ্য ও লক্ষ পূরণ হবে।

হ্যাচারি মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জাহিদুর রহমান গোলদার মনে করেন, পোনা বিক্রয় কেন্দ্রটি এই অঞ্চলের মাছ চাষিদের জন্য খুব একটা উপকারে আসবে না। চাঁচড়ায় মাছ উৎপাদন ও বিক্রির সাথে বহুসংখ্যক মানুষ জড়িত। সেই দিক বিচেনায় বিপুল সংখ্যক মাছ চাষি এটির সুবিধা বঞ্চিত হবেন। তিনি জানান, দেশের মৎস রাজধানী বলে পরিচিত চাঁচড়া। তাই এতো ছোট একটি সেলস সেন্টার প্রত্যাশার সামান্যও পূরণ করবে না। উচিত ছিলো শহরের বাইরে আরো বেশি জায়গা নিয়ে এটি তৈরি করা। তিনি মনে করেন, সেন্টারটির আদতেও চালুর কোন সম্ভাবনা নেই। যারা বরাদ্দ নিয়েছেন তাদেরও এটি ফেলে পালানোর উপক্রম। ২০ হাজার টাকা করে জামানত না দিলে তারা সেন্টারমুখিও হতেন না।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ফিরোজ আহাম্মেদ জানান, আনুষ্ঠানিকভাবে পোনা বিক্রয় কেন্দ্রটির হস্তান্তর সম্পন্ন হয়েছে। আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে মাছের নতুন মৌসুম শুরু হচ্ছে। আশা করা যাচ্ছে কেন্দ্রটি তখন পুরোদমে চালু হবে।

জেলার মৎস বিভাগ সূত্র জানা যায়, দেশে উৎপাদিত মোট রেণু-পোনার ৬০ ভাগই যশোরের চাঁচড়ার হ্যাচারি ও নার্সারিগুলোতে উৎপাদন হয়। উৎপাদনের এই বাৎসরিক পরিমাণ প্রায় ৬৮ হাজার কেজি রেণু। এই পোনা বিক্রির নির্ধারিত কোনো বাজার না থাকায় রাস্তার পাশের খোলা স্থানে বেচাকেনা করেন মাছ চাষিরা। এতে দুর্ঘটনা-হয়রানির শিকার হতে হয় তাদের। এ কারণে দীর্ঘদিন ধরে তারা বিশেষায়িত একটি সরকারি মাছ বিক্রয় কেন্দ্র নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছিলেন।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

সর্বশেষ

মেসিকে হুমকি দেওয়া মেক্সিকান বক্সারকে পেটাবেন আর্জেন্টাইন ফাইটার

ক্রীড়া ডেস্ক: আর্জেন্টাইন ফাইটার ফ্রাঙ্কো তেনাগ্লিয়াকে তেমন খ্যাতিমান কেউ নন। লাইটওয়েট শ্রেণিতে লড়াই করেন...

আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ থেকে বাদ পড়লে ব্রাজিলকে সমর্থন দেবেন স্কালোনি!

ক্রীড়া ডেস্ক: আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি বলেছেন, আর্জেন্টিনা কাতার বিশ্বকাপ থেকে বাদ পড়ে গেলে...

মাগুরায় স্কুলছাত্রীর আত্মহত্যা

মাগুরা প্রতিনিধি : মাগুরা শহরের পশু হাসপাতাল পাড়ায় মিম (১৩) নামের এক স্কুলছাত্রী গলায়...

শতভাগ পাস ঝিকরগাছায় শীর্ষে বিএম হাইস্কুল

নিজস্ব প্রতিবেদক: যশোরের ঝিকরগাছা বদরুদ্দীন মুসলিম হাইস্কুলের শতভাগ পাসের সাফল্য এবারও উপজেলার শীর্ষে রয়েছে।...

শ্রীপুরে বীরমুক্তিযোদ্ধার বাড়ি ভাঙচুরের অভিযোগ

মাগুরা প্রতিনিধি: মাগুরা শ্রীপুর প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মরহুম মিয়া মাজেদুর...

পাইকগাছায় আইন শৃংখলা কমিটির সভা অনুষ্ঠিত

পাইকগাছা প্রতিনিধি :পাইকগাছা উপজেলা আইন শৃংখলা ও মাসিক সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। মঙ্গলবার সকালে...