Tuesday, August 16, 2022

চুকনগর গণহত্যার বিশ্ব স্বীকৃতির দাবি

বাস্তবায়ন করতে ‘আমরা একাত্তর’র ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ

বৃষ্টির মতো চলে গুলি পাখির মতো মরে মানুষ

নিজস্ব প্রতিবেদক ও ডুমুরিয়া প্রতিনিধি: বর্তমানে গণহত্যা আন্তর্জাতিক অপরাধ হিসেবে স্বীকৃত। মানবতাবিরোধী এ অপরাধের কোনো ক্ষমা নেই। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে একাত্তরে আমাদের মাতৃভূমি বাংলাদেশে যত নৃশংসতম গণহত্যা ঘটেছিল বিশ্বে আর কোথাও ঘটেনি। এমনই একটি গণহত্যার ঘটনা ঘটে ১৯৭১ সালের ২০ মে চুকনগরে। এখানে ৪ ঘন্টার ব্যবধানে ১০ থেকে ১২ হাজার মানুষকে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করা হয়। সঠিক ইতিহাসের প্রয়োজনে এই একক গণহত্যার বিশ্ব স্বীকৃতির দাবিতে মানুষ আজ সোচ্চার।

খুলনা জেলার পশ্চিম সীমান্তে অবস্থিত চুকনগর। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এটি একটি নৃশংসতম গণহত্যা। কেউ কিছু অনুধাবন করার আগেই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর অস্ত্র দিয়ে বের হতে থাকে গুলি আর গুলি। বৃষ্টির মতো গুলি করা হয়। পাখির মতো মরতে থাকে মানুষ। চার ঘন্টা স্থায়ী হয় পাকিস্তানি বাহিনীর তা-বলীলা। পাশে ভদ্রা নদীতে ফেলে দেয়া হয় কয়েক হাজার মরদেহ। শহিদদের তাজা রক্তে লাল হয়ে যায় এ নদীর পানি।

এদিন অনেক শিশু মায়ের কোলে দুধ পান করছিল, সে অবস্থায়ই চলে ঘাতকের বুলেট। এতে মায়ের বুকে বিদ্ধ হয়ে শহিদ হয়েছেন মা, কিন্তু অবুঝ শিশু তখনও মায়ের স্তন মুখের মধ্যে রেখে ক্ষুধা নিবারণের চেষ্টা করেছে। আবার মৃত শিশু মৃত মায়ের কোলে, বাবার কোলে। স্ত্রী তার স্বামীর কোলে- এ রকম চিত্র ছিল সেদিন।

চুকনগরে গণহত্যায় কত বাঙালি শহীদ হয়েছিল তার প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব রয়েছে। সঠিক সংখ্যা নিরূপণ করা না গেলেও চুকনগরে ১০ থেকে ১২ হাজার মানুষ গণহত্যার শিকার হয়েছিল বলে প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা থেকে ধারণা করা যায়।

খুলনা জেলার ডুমুরিয়া থানার অন্তর্গত চুকনগর একটি ছোট্ট ব্যবসাকেন্দ্রিক এলাকা তথা বাজার। ভদ্রা, কাজীবাছা, খড়িয়া, ঘ্যাংরাইল প্রভূতি নদী ও শাকা নদী পথে এবং কাঁচা রাস্তায় দাকোপ, বটিয়াঘাটা, রামপাল, তেরখাদা ও ফকিরহাঠ থেকে খুলনা-ডুমুরিয়া হয়ে চুকনগর ছিল সে সময়কার বিবেচনায় ভারতমুখী সর্বাধিক নিরাপদ পথ। অসংখ্য নদী দ্বারা বিচ্ছিন্ন ও সংকীর্ণ কাঁচা মাটির ওই পথে পাকিস্তানি বাহিনীর চলাচল সম্ভব ছিল না। ফলে লোকজন ওই পথ বেছে নেয়। পার্শ্ববর্তী জেলা থেকে নদীপথে সহজেই শরণার্থীরা চুকনগরে পৌঁছে যেত।

অন্যদিকে এলাকাটি সীমান্তের কাছাকাছি হওয়ায় ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যস্ততা লেগেই থাকত। এছাড়া এলাকাটি ছিল কর্মমুখর। চুকনগর খুলনা শহর থেকে ৩২ কি.মি.পশ্চিমে ভদ্রা নদীর তীরে অবস্থিত।

চুকনগরের ফসলি জমিতে আজও পাওয়া যায় সেদিনের শহিদদের হাড়গোড়, তাদের শরীরে থাকা বিভিন্ন অলঙ্কার। স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা যায়, ভদ্রা নদীতে লাশ ফেলার দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল স্থানীয় প্রায় ২৫ জনকে। প্রতি লাশের জন্য দু আনা প্রদান করা হবে- এ ধরনের ঘোষণা দেয়া হয়। লাশের গায়ে যেসব সোনা-গয়না ও নগদ অর্থ যা পেয়েছে তার কারণে গুনে গুনে লাশ ফেলানোর গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে লাশ ফেলায় নিয়োজিত ব্যক্তিরা। এ ব্যক্তিবর্গের মধ্যে এখনও জীবিত রয়েছে কেউ কেউ। তাদের মতে যতগুলো লাশ প্রথমদিকে গুনে রাখা হয়েছিল তার চেয়ে বেশি লাশ ভদ্রা নদীতে ফেলা হয়।
যেভাবে সংঘটিত হয়

নারকীয় হত্যাযজ্ঞ
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মে মাসের মাঝামাঝি সময় বৃহত্তর খুলনার বাগেরহাট, রামপাল, মোড়েলগঞ্জ, কচুয়া, শরণখোলা, মংলা, দাকোপ, বটিয়াঘাটা, ডুমুরিয়া, চালনাসহ বিভিন্ন অঞ্চলের কয়েক হাজার মানুষ ভারতে যাবার উদ্দেশ্যে রওনা হয়। তারা খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার চুকনগর থেকে সাতক্ষীরা হয়ে ভারতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এ জন্যে একে অপরের সাথে যোগাযোগ করে ১৯ মে রাতের মধ্যে সবাই চুকনগরে এসে পৌঁছায়।

খুলনা জেলা সদর থেকে ৩০ কি.মি. দূরে অবস্থিত চুকনগর। ওই দিন রাতে কয়েক হাজার মানুষ চুকনগরের পাতোখোলা বিল, কাঁচাবাজার, মাছবাজার, কাপুড়িয়া পট্টি, গরুহাটা, কালী মন্দিরসহ বিভিন্নস্থানে অবস্থান করতে থাকে। রাতটা এখানে পার করে সকালে কিছু মুখে দিয়ে রওনা হবে ভারতের উদ্দেশ্যে।

পর দিন ২০ মে খুব ভোরে কেউ কেউ চুকনগর ছেড়ে রওনা হয়ে যায় তবে অধিকাংশরা সকালের খাওয়া দাওয়া শেষে রওনার সিদ্ধান্ত নেন। এজন্যে সকালে তারা রান্নার প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। কারও রান্না ততক্ষণে শেষও হয়েছে। কেউ বা ভাতের থালা নিয়ে বসে পড়েছে। ঠিক এমনই মুহূর্তে সাতক্ষীরা থেকে পাক বাহিনীর ১টি ট্রাক ও ১টি জিপ চুকনগর সাতক্ষীরা সড়ক ধরে মালতিয়া মোড়ের ঝাউতলায় এসে হঠাৎ থেমে যায়।

রাস্তার পাশে পাট ক্ষেতে কাজ করছিলেন মালতিয়া গ্রামের চিকন আলী মোড়ল নামে এক বৃদ্ধ। গাড়ির শব্দে তিনি উঠে দাঁড়ালে পাকবাহিনী তাকে প্রথমে গুলিতে হত্যা করে। এরপর একই গ্রামের সুরেন্দ্রনাথ কুন্ডুকেও গুলি করে মারা হয়। এরপর তারা বাজারের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে ঘুরে ব্রাশ ফায়ারে হত্যা করতে থাকে নিরিহ মানব সন্তানদের। নারী, শিশু, বৃদ্ধ কাউকে তারা রেহাই দেয়নি সেদিন। গুলির শব্দে আর এখানে জড়ো হওয়া নারী-পুরুষের আর্তচিৎকারে আতংকিত হয়ে পড়ে আশ পাশের গ্রামের মানুষ। ভারী হয়ে ওঠে সমগ্র এলাকার পরিবেশ। চারিদিকে শুধু কান্নার রোল, হুড়োহুড়ি আর দৌড়াদৌড়ি। এরপর সবকিছুই একসময় নিরব হয়ে যায়। তখন চারিদিকে তাকাতেই চোখে পড়ে লাশ আর রক্ত।

পাকিস্তানী হানাদাররা সেদিন চুকনগর বাজার, কালী মন্দিরসহ পার্শ্ববর্তী এলাকায় ঢুকে নিরস্ত্র নিরীহ মানুষকে অকাতরে গুলি করে মেরেছে। কোথাও লুকিয়ে ওদের হাত থেকে কেউ রেহাই পায়নি। চুকনগর সেদিন এক মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়। সেদিন মানুষের আর্তচিৎকার ও দৌড়া দৌড়িতে পায়ের তলায় পিষ্ট হয়েও মরেছে অনেক শিশু ও বৃদ্ধ। কিন্তু তারা কেউ বাঁচতে পারেনি। অনেক শিশু মৃত মায়ের বুকের উপর স্তন পান করেছে।

কিন্তু সে বুঝতে পারেনি যে ততক্ষণে তার জন্মধাত্রী মা চলে গেছে না ফেরার দেশে। অসহায় মায়ের কোলে শিশুর লাশ। মাকে হারিয়ে কত শিশু অসহায়ের মত বসে কাঁদছে এমনই সব দৃশ্য সেদিন দেখেছিল এলাকার মানুষ। পাক সেনাদের তা-বে চুকনগরের ধুসর মাটি আর সবুজ ঘাস মুহূর্তের মধ্যে লাল হয়ে উঠেছিল। চুকনগর বাজারের চুকনগর বাজারের পাশ দিয়ে বয়ে চলা ভদ্রা নদীতে ছিল লাশের বহর। ভদ্রা নদীর পানির সাথে একাকার হয়ে গিয়েছিল মানুষের তাজা রক্ত। কোথাও পা দেয়ার জায়গা নেই। চুকনগর বাজারের অলিতে গলিতে শুধু লাশ আর লাশ।

হানাদার বাহিনীর বর্বর পৈশাচিক হত্যাযজ্ঞের পর চুকনগর বাজার শকুন ও কুকুরের দখলে চলে যায়। মৃতপ্রায় ব্যক্তিকে নিয়ে টানাটানি করেছে শকুন আর কুকুর। সেদিন চুকনগরে ১০ থেকে ১২ হাজার মানুষকে তারা নির্বিচারে হত্যা করা হয়। চুকনগরের এ নৃশংস ঘৃন্যতম দৃশ্য পৃথিবীর ইতিহাসে সব গণহত্যার চেয়ে বর্বর বলে অনেক বিশেষজ্ঞরা বলেছেন। পৃথিবীর ইতিহাসে এটি নিষ্ঠুর ও জঘন্যতম দিন।

অনেক বিশেষজ্ঞ বলেছেন, পৃথিবীর ইতিহাসে এটি নিষ্ঠুর ও জঘন্যতম দিন। এ দিনটি শুধু চুকনগরের জন্য নয় বাংলাদেশের জন্য একটি ভয়াল ও শোকাবহ দিন। কিন্তু অবিশ্বাস্য হলেও সত্য চুকনগর গণহত্যার ঘটনাটি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে স্থান পায়নি। এ জন্যে ২০ মে কে জাতীয় গণহত্যা দিবস হিসাবে স্বীকৃতি দেয়ার দাবি জানিয়েছেন এলাকার সর্বস্তরের মানুষ।

একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির খুলনা জেলা সভাপতি ডা. শেখ বাহারুল আলম বলেন, চুকনগর গণহত্যা ছিল বাংলাদেশে পাকিস্তানি হানাদারদের করা গণহত্যার একক বৃহত্তম ঘটনা।

এদিকে চুকনগর গণহত্যা দিবস উপলক্ষে ডাকসুর সাবেক জিএস ও আমরা একাত্তরের অন্যতম উদ্যোক্তা সংগঠক মাহাবুব জামান বলেন, চুকনগর গণহত্যা পৃথিবীর সবচাইতে বড় গণহত্যা, একই স্থানে এত মানুষ খুনের ঘটনা তার জানা নেই। তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের জঘন্যতম জেনোসাইডের বিশ্ব স্বীকৃতি চাই। ৫১ বছর পরে হলেও প্রকৃত ইতিহাসের প্রয়োজনে এই স্বীকৃতি আমাদের দরকার।
আজকেরে কর্মসূচি

দিবসটি উপলক্ষে আমরা একাত্তর নামের সংগঠনটি ব্যাপক কর্মসূচি নিয়েছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে সকাল ৯ টায় চুকনগর বধ্যভূমিতে পুষ্পার্ঘ অর্পন। বেলা ১১ টায় ভদ্রা নদীতে গোলাপের পাপড়ি ছিটানো, ভন্দ্রা নদীর ঘাটপাড়ে আলোচনা, বিকেল ৫টায় বধ্যভূমিতে আলোচনা, সাউন্ড অ্যান্ড লাইট শো এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানটি পরিবেশন করবে যশোর উদীচী।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন চুকনগর গণহত্যা একাত্তর স্মৃতিরক্ষা পরিষদের সভাপতি অধ্যক্ষ এবিএম শফিকুল ইসলাম। প্রধান অতিথি থাকবেন সংসদ সদস্য নারায়ন চন্দ্র চন্দ, আরও থাকবেন ডাকসুর সাবেক জিএস ও আমরা একাত্তরের সংগঠক মাহবুব জামান, ডাকসুর সাবেক জিএস ও আমরা একাত্তরের অন্যতম সংগঠক প্রকৌশলী হিলাল উদ্দীন(হিলাল ফয়েজী), আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সমন্বয়ক সানাউল হক, উদীচীর কেন্দ্রীয় ও যশোরের নেতৃবৃন্দ। এছাড়া আমরা একাত্তর যশোরের সংগঠক আজীজুল হক মনি।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

সর্বশেষ

যশোরে ইয়াবাসহ নারী গ্রেফতার

নিজস্ব প্রতিবেদক : র‌্যাব-৬ যশোর ক্যাম্পের সদস্যরা সোমবার রাতে শহরের মুজিব সড়ক সার্কিট হাউজের সামনে...

যশোরে জুয়ার আস্তানা থেকে ছয়জন গ্রেফতার

নিজস্ব প্রতিবেদক : যশোর সদর উপজেলার চুড়ামনকাটি ইউনিয়নের ইসলামপুর গ্রামের এক পরিত্যক্ত টিনের ঘরের মধ্যে...

স্বামী স্ত্রী হিসেবে মেলামেশা, যশোরে চিকিৎসকের বিরুদ্ধে মামলা

নিজস্ব প্রতিবেদক : তালাকের কাগজ ছয় বছর গোপন করে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে মেলামেশার এক পর্যায় তালাকের...

দেশের উন্নয়নে শেখ হাসিনার বিকল্প নেই : এমপি নাবিল

নিজস্ব প্রতিবেদক : যশোর-৩ আসনের সংসদ সদস্য কাজী নাবিল আহমেদ বলেছেন, দেশের মানুষের জন্য যা...

প্রেমবাগে শতাধিক নারীকে ফ্রি চিকিৎসা দিলেন ডা. নিকুঞ্জ

নিজস্ব প্রতিবেদক : যশোরের অভয়নগর উপজেলার প্রেমবাগ ইউনিয়নের দুস্থ ও অসহায় নারী রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা...

নওয়াপাড়ায় ৬০ অবৈধ ঘাটের মধ্যে উচ্ছেদ ৪৭

কামরুল ইসলাম, অভয়নগর : নওয়াপাড়া নৌবন্দরে অবৈধ ঘাট উচ্ছেদ অভিযানের তৃতীয় দিনে ১৮ টি অবৈধ...