Saturday, July 2, 2022

চুকনগর গণহত্যা
জেনোসাইড হিসাবে জাতিসংঘের স্বীকৃতি চাই

কাজী বর্ণ উত্তম
কাজী বর্ণ উত্তম

কাজী বর্ণ উত্তম: চলুন ফিরে যাই সেই ১৯৭১ সালে। চারিদিকে অন্ধকার অনিশ্চয়তা, নিজের বসত বাড়ি ছেড়ে মানুষ ছুটছে অজানার উদ্দেশ্যে। এক কোটিরও বেশী শরণার্থী বাংলার মাটি ছেড়ে ভারত যাওয়া নিয়ে অ্যালেন গিন্সবার্গের ঐতিহাসিক কবিতা ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ কবিতাটি মনে পড়ে। তিনি লিখেছেন –

 

‘ঘরহীন ওরা ঘুম নেই চোখে, যুদ্ধে ছিন্ন ঘর বাড়ী দেশ,
মাথার ভিতরে বোমারু বিমান, এই কালোরাত কবে হবে শেষ।
শত শত মুখ হায় একাত্তর যশোর রোড যে কত কথা বলে,
এত মরা মুখ আধমরা পায়ে পূর্ব বাংলা কোলকাতা চলে।

কবি সেপ্টেম্বর মাসে এসেছিলেন বলে সেপ্টেম্বর মাস রুপক অর্থে লিখেছেন।

১৯৭১ সালের মে’ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে খুলনা, বাগেরহাট,গোপালগঞ্জ, পিরোজপুর,ঝালকাঠি,নড়াইল,যশোর,মাগুরাসহ নানা এলাকার চার লখের অধিক মানুষ নৌকায়,পায়ে হেঁটে ভারতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে চুকনগর হয়ে যাচ্ছিল। খবরটি পৌছে যায় পাকিস্তান আর্মির কাছে। তাদের দোসর আলবদর-আলসামস-রাজাকার- পিসকমিটির সদস্যরা খরবটি পাকিস্তান সেনাদের কাছে পৌছে দেয়। ২০শে মে’ ১৯৭১,তখন সকাল ১১টা। সাতক্ষীরা থেকে তিনটি পাকিস্তান আর্মির ট্রাক আসে। শুরু হয় মহাপ্রলয়, চারিদিকে গুলির শব্দ,কেউ নৌকায়, কেউ ধান ক্ষেতে,কেউ বাড়ির কোনায় আশ্রয় নিয়ে চাল সেদ্ধ করে খাওয়ার ব্যবস্থা করছিল। মুহুর্তের মধ্যে লন্ডভন্ড হয়ে যায়, চারিদিকে অস্ত্রহীন নিরীহ মানুষকে গুলি করতে করতে বিকেল হয়ে যায়….. চুকনগরের মাঠ, ঘাট, ভদ্রা নদী আর ভঙ্গর নদীর পানি মানুষের রক্তে লাল হয়ে যায়। এলাকার মানুষের বক্তব্য থেকে উঠে এসেছে মাত্র ৪ ঘন্টায় দশ থেকে বিশ হাজার মানুষ হত্যা করা হয় সেই দিন। ২১ শে মে ‘৭১ স্থানীয় চেয়ারম্যান চল্লিশ থেকে ষাট জন মানুষকে দ্বায়িত্ব দেন লাশ গুলো নদীতে ফেলে দিতে। বিনিময়ে লাশ প্রতি দুই আনা দেয়া হবে। দেড়দিন পর্যন্ত তাঁরা লাশ গোনে চুয়াল্লিশশো। এর পর আর গোনা হয়নি কিন্তু লাশ ফেলা হয় ছয়দিন ধরে, লাশ না গোনার কারন হিসাবে প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য লাশের সাথে যে সোনাদানা, টাকা পয়সা যা পেয়েছিল তা অনেক বেশী ছিল।

প্রত্যক্ষদর্শীর কথা
গ্রামের অন্ধ বৃদ্ধ মহিলা বিলাসী। বয়স আশির ওপরে। নববধূ বিলাসীর হাতের মেহেদীর রং তখনও শুকায়নি। ৭১ সালে ১৯ মে ভারতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে নৌকায় করে চুকনগর পৌঁছান। ২০শে মে সকাল ১১টায় শুরু হয় নারকীয় হত্যাকাণ্ড।

পাকিস্তানের হানাদার বাহিনী তখনও মহিলাদের ওপর আক্রমণ করেনি, সেই সুযোগে নিজের স্বামীকে লুকাতে সাহায্য করেস। তিনি আলাদা হয়ে যান এবং ভাবতে থাকেন স্বামী হয়তো অনেক দূরে চলে গিয়েছেন । গেরুয়া একজন লোক এসে বলেন, তোমরা কেউ এদিক সেদিক যেও না। তোমরা এখানেই থাকো তোমাদের কেউ কিছু বলবে না। কিছুক্ষণ পর দেখেন ৬ জন সমান উচ্চতার পাকিস্তানি আর্মি আসেন ।

তাদের হাতে অনেক গুলো ছিদ্র যুক্ত অস্ত্র থাকে যেটা দিয়ে গুলি করতে থাকে। তারা ৬ জন এক সাথে অনেক লোককে মেরে ফেলে । মুহূর্তের ভেতর মারা যায় হাজার হাজার মানুষ। রক্ত আর লাশের পাহাড়ের উপর দিয়ে অর্ধ নগ্ন অবস্থায় খুঁজতে থাকেন স্বামীকে । খুজে পাচ্ছিলেন না। গ্রামের দিকে খোঁজ করতে থাকেন ।

অবশেষে তিনি দেখেন তার স্বামী রাস্তার পাশে মরে পরে আছে । তার সামনে থাকা ৪ ফুট উঁচু তাঁরকাটার বেড়ার উপর দিয়ে লাফিয়ে স্বামীর নিথর রক্তাক্ত দেহের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। তার শরীরের অনেক অংশ কাটা তারে কেটে যায়। স্বামীর রক্তে তখন তার হাতের মেহেদীর রঙ ধুয়ে যেতে থাকে।

স্বামীর কাছে থাকা টাকা-পয়সা গহনা কিছুই নেন না । তিনি ভাবেন স্বামী নেই তো টাকা গহণা দিয়ে কি করবো। তখন টাকা-পয়সা গহণা ও তার স্বামীর লাশ ফেলে রেখে তিনি ফিরে আসেন তার নিজ গ্রাম আউশখালীতে। সেই নরম কোমল মেয়েটি হয়ে যান পাথরের মতো। স্বামী হারানোর শোকের শক্তিতে পরিণত হয়ে সাহায্য করেন মুক্তিযোদ্ধাদের । কখনো রান্না করে কখনো অন্য ভাবে ।

তারপর স্বাধীন দেশে স্বামীহারা বিলাসীর জীবন যুদ্ধ শুরু। হ্যাঁ তিনি হয়তো নিজে পরাজিত। স্বামীর শোকে আজ তার দু চোখে অন্ধ, পরনের কাপড় ছেঁড়া, রাস্তায় রাস্তায় ভিক্ষা করেন কিন্তু তার আত্মত্যাগ দিয়ে গেছে আজকের বাংলাদেশ ।

আর এক প্রত্যক্ষদর্শী
তেলীখালী গ্রামের এক মা তার সন্তান ও স্বামীদের নিয়ে পাড়ি দিচ্ছিলেন ভারতের উদ্দেশ্যে। পথে ক্ষুধার্ত বাচ্চা ভাত খেতে চায়। স্বামী বলে এখন তো আর্মি নেই এখানেই খর কুটু দিয়ে রান্না করে নাও । মা তখন কোনো উপায় না পেয়ে মাঠের ভেতর রান্না করতে শুরু করেন । এরপর কিছুক্ষণের মধ্যে গোলাগুলি শুরু হয়। ভাত চুলোয় থাকতেই ঘাতকদের গুলিতে নিহত হয় স্বামী ও ছেলে। ভাতের হাড়ি ও স্বামী-সন্তানের রক্তাক্ত দেহ ফেলে ফিরে আসেন নিজের গ্রামে । ওই মা তারপর থেকে নিজের মুখে আর ভাত তুলে নেননি । তিনি বলেন যে ভাত তার স্বামী সন্তান খেতে পারেনি, কি ভাবে তিনি সেই ভাত খাবেন ।

আমার কাছে বাংলাদেশ মানে বিলাসীর ৪ ফুট তাঁরকাটার উপর দিয়ে লাফিয়ে পড়ে স্বামীর গলা জড়িয়ে ধরে কান্নার দৃশ্য, মুক্তিযোদ্ধাদের পাশে দাড়ানো বা সেই মায়ের বাকি জীবন ভাত না খেয়ে থাকার আত্মত্যাগের গল্প। এই বিলাসিনীরাই আমার কাছে স্বাধীনতার প্রতিচ্ছবি, এই বিলাসিনীরাই বাংলাদেশ ।

আমরা ৭১ এর উদ্যোগে যশোর উদীচী সংহতি প্রকাশ করে একাবিংশ সম্মেলনের প্রথম দিন ১৯ মে। এরশাদ আলী মোড়লকে দিয়ে উদ্ধোধন করা হয় সম্মেলন। এরশাদ আলীর মোড়লের স্মৃতি চারণের সময় উপস্থিত সকলের চোখ ছলছল করছিল, কিছু সময়ের জন্য আমরা চলে গেলাম সেই ৭১ সালের ২০মে’র রক্তাত্য প্রান্তরে। সেই গণহত্যায় তিনি তাঁর পিতা কে হারান। রক্তাত্য প্রান্তর থেকে তিনি কুড়িয়ে পান এক হিন্দুধর্মালম্বী কন্যাশিশু সন্তান। লালন পালন করে বিবাহ পর্যন্ত দেন তিনি। এটাই অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের ছবি।

দ্বিতীয় দিন ২০শে মে চুকনগরের ভদ্রা নদীতে সকাল ১১টায় গোলাপের পাঁপড়ি ছিটিয়ে শ্রদ্ধাঞ্জলির দৃশ্য মনে হচ্ছিল ২০শে মে ‘৭১ এর সেই নদীতে বহমান হাজারও মানুষের রক্ত। আমাদের সকলের দাবি এত অল্প সময়ে এত সংখ্যক গণহত্যাকে জেনোসাইড হিসাবে জাতিসংঘ থেকে স্বীকৃতি দিতে হবে। বিচার করতে হবে গণহত্যার সকল কলাকুশিলবদের।

( লেখক : সাংস্কৃতিক সম্পাদক, যশোর জেলা আওয়ামী লীগ ও সহ সভাপতি, যশোর উদীচী)

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

সর্বশেষ

কেন বিয়ে করেননি, জানালেন সুস্মিতা

বিনোদন ডেস্ক: কেন বিয়ে করেননি সাবেক বিশ্বসুন্দরী ও বলিউড অভিনেত্রী সুস্মিতা সেন; এমন প্রশ্ন...

করোনায় নতুন শনাক্ত ১৮৯৭, মৃত্যু ৫ জনের

কল্যাণ ডেস্ক: দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় (গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে আজ শুক্রবার সকাল...

বাংলাদেশ জঙ্গিবাদ দমনে যে ভূমিকা দেখিয়েছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়

কল্যাণ ডেস্ক: বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত পিটার ডি হাস বলেছেন, বাংলাদেশ জঙ্গিবাদ দমনে...

যশোরের কেশবপুরে নরসুন্দর যুবককে কুপিয়ে হত্যা

কেশবপুর প্রতিনিধি : জেলার কেশবপুর উপজেলায় নরসুন্দর এক যুবকের গলা ও পেট কেটে হত্যা করেছে...

হতদরিদ্রদের চালের দামও বাড়ল ৫ টাকা

ঢাকা অফিস: খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় দেশের ৫০ লাখ হতদরিদ্র মানুষের কাছে বিক্রি করা চালের...

নির্দলীয় সরকার নিয়ে উত্তপ্ত সংসদ

ঢাকা অফিস: বৃহস্পতিবার সংসদে নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে তুমুল বিতর্ক হয়েছে। বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা...