Thursday, July 7, 2022

ঝিকরগাছায় অর্থ তছরুপের অভিযোগ : প্রাথমিক বিদ্যালয়ের স্লিপ ফান্ড

নিজস্ব প্রতিবেদক: যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলা প্রাথমিক বিদ্যালয় ভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনা (স্লিপ) ফান্ডের অর্থ তছরুপের অভিযোগ উঠেছে। অধিকাংশ স্কুলেই কোনো রকম কাজ করে উপজেলা শিক্ষা অফিসের কর্মকর্তাদের যোগসাজসে অর্থ আত্মসাত করা হয়েছে।

অভিযোগ মতে, ঝিকরগাছা উপজেলার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে স্লিপ ও ক্ষুদ্র মেরামতের বরাদ্ধকৃত টাকা লুটপাট হচ্ছে অনেক বছর ধরেই। গত তিন বছরে স্লিপের বরাদ্দকৃত প্রায় ১৮ লক্ষ টাকা ভাগবাটোয়ারা করে নিয়েছে উপজেলা শিক্ষা অফিস। ২০১৯-২০২০, ২০২০-২০২১ ও ২০২১-২০২২ অর্থ বছরে উপজেলার ১৩১ স্কুলের স্লিপ ও ক্ষুদ্র মেরামতের টাকা উত্তোলন করলেও অধিকাংশ স্কুলে কোন রকম কাজ হয়েছে। কিছু কিছু স্কুলে নামমাত্র মেরামত বা ক্রয় করেই পুরো অর্থের ব্যয় দেখানো হচ্ছে। আবার কোন কোন বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক জোড়াতালি দিয়ে কাজ করে ভুয়া বিল ভাউচার দেখিয়ে উপজেলা শিক্ষা অফিসের যোগসাজসে উত্তোলন করেছেন পুরো টাকা। সংশ্লিষ্ট ক্লাস্টারের সহকারী শিক্ষা অফিসার ও প্রধান শিক্ষকের যোগসাজশে বিভিন্ন কাজের অর্থ এভাবে আত্মসাতের ঘটনা ঘটছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেশ কয়েকটি বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা জানান, বিদ্যালয় উন্নয়নে সরকারি বরাদ্দে কত টাকা আসে এবং কত টাকা ব্যয় হয়-এসব তাদের কিছুই জানি না। প্রধান শিক্ষক তাদের কিছুই জানান না।

বিগত কয়েক বছর সরকার প্রতিটি বিদ্যালয়ে উন্নয়নের জন্য শিক্ষার্থী সংখ্যার অনুপাতে পঞ্চাশ হাজার থেকে এক লক্ষ টাকা করে বরাদ্দ দেয়। বিদ্যালয়ের স্লিপ কমিটি ও ম্যানেজিং কমিটি বিদ্যালয়ের চাহিদার ভিত্তিতে বাজেট প্রণয়ন করে; যা উপজেলা শিক্ষা অফিসার কর্তৃক অনুমোদিত হয়ে থাকে।

২০২১-২০২২ এই অর্থবছরে ঝিকরগাছা উপজেলার প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বরাদ্দকৃত অর্থের মধ্যে স্লিপ ফান্ডের অর্থ থেকে প্রধান শিক্ষককে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল শেখ রাসেল কর্নার বাবদ দশ হাজার টাকা বরাদ্দ রাখতে। পরবর্তীতে উপজেলা শিক্ষা অফিস ওই অর্থ আহসানুল হাবিব শিপলু নামের একজন অব্যবসায়ীকে টাকা দিতে বাধ্য করে। এই কর্নার বাবদ যে আলমারি প্রদান করা হয় তার বাজার মূল্য সাড়ে তিন হাজার টাকা। এই আলমারির জন্য টেন্ডার ডাকা হয়নি এবং ভাউচারও দেয়নি। এর আগে গত ২০২০-২০২১ অর্থবছরে স্লিপ ফান্ডের অর্থ থেকে প্রধান শিক্ষককে নির্দেশনা দেওয়া হয় ইনফ্রারেড থার্মোমিটার বাবদ দুই হাজার দুইশত টাকা বরাদ্দ রাখতে। পরবর্তীতে উপজেলা শিক্ষা অফিস একইভাবে থার্মোমিটার সরবরাহকারী ব্যক্তি আহসানুল হাবিব শিপলুকে টাকা দিতে নির্দেশ দেয়। নির্দেশ অনুযায়ী প্রধান শিক্ষক টাকা দিতে বাধ্য হয়। উল্লেখ্য, থার্মোমিটারের বাজার মূল্য পাঁচশত টাকা। এক্ষেত্রে প্রায় দুই লক্ষ বাইশ হাজার টাকা হরিলুট হয়েছে।

এছাড়াও গত ২০১৯-২০২০ অর্থ বছরে ঝিকরগাছা উপজেলার প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বরাদ্দকৃত অর্থের মধ্যে মৌখিকভাবে উপজেলা শিক্ষা অফিস প্রতিটি বিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধু কর্নার তৈরি করার জন্য স্লিপ বাজেটে দশ হাজার দুইশত টাকা অন্তর্ভূক্ত করার নির্দেশ দেয়। পরবর্তীতে টেন্ডারবিহীন বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারবর্গের ছবি ও অন্যান্য ব্যক্তিবর্গের ছবি যশোরের এক ব্যবসায়ী বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের নিকট হস্তান্তর করে এবং টাকার ভাউচার না দিয়ে নিয়ে চলে যায়। এক্ষেত্রে সরবরাহকারীকে অর্থ দেওয়ার জন্য শিক্ষা অফিস বাধ্য করে। যে ছবিগুলো বিদ্যালয়ে সরবরাহ করেছে তার আনুমানিক বাজার মূল্য পাঁচ হাজার টাকা।

শিক্ষা অফিসারের মৌখিক নির্দেশের আগে স্লিপ বাজেটের অর্থ অধিকাংশ বিদ্যালয় অনুমোদিত বাজেটের অর্থ খাত অনুসারে ব্যয় করা সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধু কর্ণারের ছবি বাবদ দশ হাজার দুইশত টাকা প্রধান শিক্ষকের নিজস্ব তহবিল থেকে দিতে বাধ্য করে। এক্ষেত্রে প্রায় ছয় লক্ষ একাশি হাজার টাকা দুর্নীতি হয়েছে।

বালিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যলয়, কায়েমকোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যলয়, মাগুরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যলয়, পাল্লা-রাজাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যলয়, বোধখানা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যলয়, বর্ণি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যলয়, নাভারন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যলয়, লাউজানী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যলয়, নির্বাসখোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যলয়, মাটিকোমরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যলয়, উলাকোল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যলয়, বাঁকড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যলয়, ঝিকরগাছা বাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যলয়সহ বেশ কয়েকটি বিদ্যালয় ঘুরে জানা গেছে সরবরাহকৃত মালামাল বাজার মূল্যের চেয়ে দ্বিগুণের বেশি দামে কেনা হয়েছে। বেশির ভাগ বিদ্যালয়ে তেমন কোন কাজ নেই। শুধু বরাদ্দের টাকা হরিলুট করতে নানান উন্নয়নের বলি ছুড়েছে। বাজারে একটি আলমারি মূল্য ৩৫শ’ টাকা হলেও স্থানীয় শিক্ষা অফিস দাম ধরেছে ১০ হাজার টাকা, বাজারে ইনফ্রারেড থার্মোমিটার দাম পাঁচশ টাকা হলেও দাম ধরা হয়েছে দুই হাজার দুইশত টাকা। এছাড়াও বাজারে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারবর্গের ছবি ও অন্যান্য ব্যক্তিবর্গের ছবি সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার টাকায় পাওয়া গেলেও তার দাম ধরা হয়েছে দশ হাজার দুইশত টাকা।

এ বিষয়ে ঝিকরগাছা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ইসমত আরা পারভীন বলেন, স্লিপের টাকা আত্মসাতের কোন সুযোগ নেই। স্লিপের টাকা ব্যাংকের মাধ্যমে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের ব্যাংক একাউন্টে প্রদান করা হয়। শিক্ষকগণ কার কাছ থেকে; কোন ঠিকাদারের মাধ্যমে ক্রয় করবেন সেটা তাদের ব্যাপার। আহসানুল হাবিব শিপলুকে টাকা দেওয়ার বিষয়টি তিনি অস্বীকার করে বলেন, তার সাথে আমার কোন সংযোগ নেই। আমাকে ফাঁসানোর জন্যই এমনটা বলা হচ্ছে।

এ ব্যাপারে যশোর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার শেখ অহিদুল আলম বলেন, এমন ঘটনা জানা নেই। যদি সত্য হয় তাহলে অবশ্যই তদন্ত করে অনিয়ম পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

সর্বশেষ

নতুন রোটারী বর্ষ উদযাপন

নিজস্ব প্রতিবেদক :  রোটারী ডিস্ট্রিক-৩২৮১-এর রোটারী বর্ষের সূচনা উপলক্ষে বুধবার বিকেলে যশোর শহরের বর্ণাঢ্য র‌্যালি...

যশোর বাস মালিক সমিতির নির্বাচন : মনোনয়নপত্র কিনেই ভোটযুদ্ধে প্রার্থীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক : মনোনয়নপত্র কিনেই ভোটযুদ্ধে নেমে পড়েছেন যশোর বাস মালিক সমিতির নির্বাচনের প্রার্থীরা। শুরু...

যশোরে বিভিন্ন সহিংসতার ঘটনায় ১৫ জন আসামি

নিজস্ব প্রতিবেদক যশোর সদর উপজেলার চার এলাকায় সহিংসতার ঘটনায় কোতয়ালি থানায় আলাদা চারটি মামলা করা...

সহসা কমছে না লোডশেডিং

ঢাকা অফিস গ্যাস সংকট চলছে তাই বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিঘœ ঘটাছে। দেশজুড়ে চলছে লোডশেডিং চলছে। কবে...

অপতৎপরতা রুখতে একসাথে কাজ করতে হবে : প্রতিমন্ত্রী স্বপন

মণিরামপুর প্রতিনিধি :  পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের প্রতিমন্ত্রী স্বপন ভট্টাচার্য্য এমপি বলেছেন, শেখ হাসিনা...

অভয়নগরে ওজনে গরু ক্রয়ে আগ্রহ বাড়ছে

কামরুল ইসলাম, অভয়নগর : অভয়নগরে ক্রেতা সাধারণের মধ্যে জীবন ওজনে গরু ক্রয়ে আগ্রহ বেড়েছে। এখানে...