Sunday, May 29, 2022

ডলারের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধি বেকায়দায় আমদানিকারকরা

আবদুল কাদের: দেশে ডলারের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতিদিন ওঠানাম করছে। এতে আমদানিকারকরা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন। কেননা একটি পণ্যচালান আমদানির পর ব্যবসায়ীরা তিন মাস সময় পেয়ে থাকেন এলসির টাকা পরিশোধের জন্য। কিন্তু যে দামে ডলার কিনে এলসি করছেন ব্যবসায়ীরা, পণ্য ছাড়করণের সময় তাকে বেশি গুণতে হচ্ছে ডলারের দাম পরিশোধ করতে। এতে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন তারা।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসেই দেশের আমদানি ব্যয় ৬১ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। শুধুমাত্র বেনাপোল বন্দর দিয়ে আমদানি হয়েছে ১৫ লাখ ৬৭ হাজার ২৯৫ মেট্রিক টন পণ্য। রেকর্ড সৃষ্টি করা এ আমদানি ব্যয় চাপে ফেলেছে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে। ডলারসহ বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে সংকট তৈরি হওয়ায় অবমূল্যায়নের শিকার হচ্ছে বাংলাদেশি মুদ্রা। এ অবস্থায় ব্যক্তিগত গাড়িসহ বিলাসীপণ্য আমদানির পথ আরো কঠোর করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

নতুন নিয়ম অনুযায়ী, এখন থেকে মোটরকার (সেডান কার, এসইউভি), হোম অ্যাপ্লায়েন্স হিসেবে ব্যবহৃত ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিক্স সামগ্রীর আমদানি ঋণপত্রের ন্যূনতম নগদ মার্জিন হবে ৭৫ শতাংশ। আর নিত্যপ্রয়োজনীয় নয়, এমন পণ্যের নগদ মার্জিন নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে ৫০ শতাংশ।
শিশুখাদ্য, অত্যাবশ্যকীয় খাদ্যপণ্য, জ্বালানি, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কর্তৃক স্বীকৃত জীবন রক্ষাকারী ওষুধ ও সরঞ্জামসহ চিকিৎসা সংক্রান্ত কাজে ব্যবহৃতদ্রব্য, উৎপাদনমুখী স্থানীয় শিল্প ও রফতানিমুখী শিল্পের জন্য সরাসরি আমদানিকৃত মূলধন যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল, কৃষি খাত সংশ্লিষ্ট পণ্য এবং সরকারি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত প্রকল্পে ব্যবহারের জন্য আমদানিকৃত অত্যাবশ্যকীয় পণ্য আমদানির ঋণপত্রকে এ নির্দেশনার বাইরে রাখা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম বলেন, দেশের আমদানি ব্যয় এরই মধ্যে রেকর্ড ছুঁয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রাবাজারও অস্থিতিশীল। নতুন এ নির্দেশনা দেয়ার ফলে দেশে গাড়িসহ বিলাসপণ্যের আমদানি নিরুৎসাহিত হবে। ফলে কমে আসবে দেশের আমদানি ব্যয়। এর মাধ্যমে ডলারসহ বৈদেশিক মুদ্রার বিদ্যমান সংকটও কিছুটা কমবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রফতানি আয়ের যে প্রবৃদ্ধি, সেটি আমদানি ব্যয়ের তুলনায় খুবই কম। এ কারণে দেশের বাণিজ্য ঘাটতি রেকর্ড উচ্চতায় গিয়ে ঠেকেছে। করোনাভাইরাস-সৃষ্ট আর্থিক দুর্যোগ, ইউক্রেন যুদ্ধসহ বৈশ্বিক নানা কারণে জ্বালানি তেল-গ্যাসসহ খাদ্যপণ্যের দাম এখন আকাশচুম্বী। শিগগিরই এ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে এমন কোনো অবস্থাও দেখা যাচ্ছে না। ফলে সরকারের চলতি হিসাব ও ব্যালান্স অব পেমেন্টের বিদ্যমান ঘাটতি বছর শেষে আরো বড় হবে। আগামী দুই বছর একই পরিস্থিতি বিদ্যমান থাকলে দেশের অর্থনীতি দুর্যোগের মুখোমুখি হতে পারে।

বেনাপোল বন্দর দিয়ে যারা আমদানি করেন তারা ডলারের মূল্য বৃদ্ধিতে বেকায়দায় পড়েছেন। ২৫ হাজার ডলার যারা এলসি করবেন, তাদের দিতে হচ্ছে ৮৫ টাকা ৭৫ পয়সা, ৫০ হাজার ডলার এলসি করলে ৯৩ টাকা প্রতি ডলার এবং এর উপরে ৯৪ টাকা ৭০ পয়সা পরিশোধ করতে হচ্ছে।
যশোরের মটরসাইকেল পার্টস আমদানিকারক রিপন অটোসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এজাজ উদ্দিন টিপু বলেন, ডলারের অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধিতে আমরা এলসি করতে পারছিনা। একটি পণ্য চালান এলসি করার পর ৮০ দিন সময় পাওয়া যায় টাকা পরিশোধের। দেখা যায় টাকা পরিশোধের সময় ডলারের দাম আরও বেড়েছে। তখন সেই দামে টাকা দিতে গিয়ে লোকসানের শিকার হতে হবে। কেননা পণ্যর দাম আমরা ইচ্ছা করলেও বাড়াতে পারছিনা। এভাবে ডলারের দাম বাড়তে থাকলে আমাদের মতো আমদানিকারকদের জন্য তা হবে অশনি সংকেত।

ফারিয়া মটরসের স্বত্ত্বাধিকারী রোজোয়ান আহমদ মুরাদ জানান, এলসি করার পর ভারত থেকে পণ্য চালান আসতে দুই মাস পর্যন্ত সময় লেগে যায়। আবার ভারতের বনগাঁ কালীতলায় পার্কিংয়ের নামে গাড়ি আটকিয়ে রাখে এক মাস। তখন দেখা যায় ডলারের দাম আরও বেড়ে গেছে। এতে পণ্য বিক্রি করে লোকসান দিতে হয়।
ইউনাইটেড কমাশিংয়াল ব্যাংকের খুলনা-বরিশাল বিভাগের রিজিওনাল প্রধান ফকির আক্তারুল আলম জানান, ডলারের মূল্য বৃদ্ধির কারণে এলসির হার কমে গেছে। এতে আমদানিকারকদের পাশাপাশি ব্যাংকও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। সামনে পরিস্থিতি খারাপ হলে ডলারের দাম আরও বাড়বে।

ইসলামী ব্যাংক যশোর জোনের প্রধান শফিউল আযম বলেন, সর্বক্ষেত্রে ডলারের সংকট পড়েছে। এতে খাদ্যপণ্য বাদে অন্য আমদানিকারকরা বেশি দামে ডলার কিনতে হবে। রূপালী ব্যাংকের যশোর অঞ্চলের ডিজিএম রোকনুজ্জামান বলেন, রেমিটেন্স কমে যাবার কারণে ডলার সংকট বেশি হচ্ছে। যেকারণে অনেকে এলসি করা কমিয়ে দিয়েছেন। এখন যারা এলসি করবেন তাদের বেশি দামে ডলার ক্রয় করতে হবে।
এ ব্যাপারে যশোর চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সভাপতি মিজানুর রহমান খান জানান, সরকার ডলারের রিজার্ভ যাতে না কমে আসে সেজন্য বিলাসীপণ্য আমদানিতে নিরুৎসাতি করছে। তবে অন্যান্য পণ্য যারা আমদানি করবেন তাদেরকে বেশি দামে ডলার কিনতে হচ্ছে। আবার একটি পণ্য চালান দেশে আসতে কমপক্ষে ৩ মাস সময় লেগে যায়, তখন দেখা যায় ডলারের রেট আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। সবদিক দিয়ে ব্যবসায়ীরা আর্থিকভাবে চরম ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন। এভাবে ডলার সংকট চলতে থাকলে আগামীতে ব্যবসায়ীরা বিশেষ করে আমদানিকারকরা পথে বসার উপক্রম হবে।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

সর্বশেষ

ছাত্রনেতা শাহীর মুক্তির দাবিতে প্রধানমন্ত্রীর কাছে খোলা চিঠি 

নিজস্ব প্রতিবেদক: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি খোলা চিঠি লিখেছেন যশোর...

খুলনা-কলকাতা রুটে বন্ধন এক্সপ্রেস আজ ফের চালু

নিজস্ব প্রতিবেদক: আজ রোববার থেকে ফের কলকাতা-খুলনা রুটে ‘বন্ধন এক্সপ্রেস’ রেল চলাচল শুরু হবে।...

রসুনের গায়ে আগুন!

সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিতে বেড়েছে ৫০ টাকা ক্ষুব্ধ ক্রেতা, স্বস্তিতে নেই কিছু বিক্রেতাও জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক: এবার ভোক্তার...

আনারসের পাতা থেকে সুতা সৃজনশীল কাজে পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন

অপার সম্ভাবনার দেশ বাংলাদেশ। কিন্তু হলে কি হবে। সম্ভবনা থাকলেই তো আর আপনা আপনি...

দড়াটানার ভৈরব পাড়ে মাদকসেবীদের নিরাপদ আঁখড়া

নিজস্ব প্রতিবেদক: যশোর শহরের ঘোপ জেলরোড কুইন্স হাসপাতালের পূর্ব পাশে ভৈরব নদের পাড়ে মাদকসেবীদের...

আজকের মধ্যে অবৈধ ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক বন্ধ না হলে ব্যবস্থা

কল্যাণ ডেস্ক: দেশে অনিবন্ধিত ও নবায়নহীন অবস্থায় পরিচালিত অবৈধ বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার...