Saturday, August 20, 2022

দলের সিদ্ধান্ত কেউ তোয়াক্কা না করলে?

“ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অনেক সদস্য ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী হয়েছেন। স্থানীয় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ এ সংস্থায় চেয়ারম্যান পদে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ বিষয়টি আওয়ামী লীগই চালু করেছে। ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য পদেও দলীয় মনোনয়ন তারা চালু করেছিল। তবে ‘অনেক জট’ তৈরি হওয়ায় তা বাতিল হয়েছে। উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের মতো স্থানীয় সরকারের স্তরগুলোতে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়। চাইলে যে কেউ কোনো দল না করেও প্রার্থী হতে পারে। তাদের পরিচয় হবে-স্বতন্ত্র।”

অজয় দাশগুপ্ত
ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অনেক সদস্য ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী হয়েছেন। স্থানীয় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ এ সংস্থায় চেয়ারম্যান পদে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ বিষয়টি আওয়ামী লীগই চালু করেছে। ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য পদেও দলীয় মনোনয়ন তারা চালু করেছিল। তবে ‘অনেক জট’ তৈরি হওয়ায় তা বাতিল হয়েছে। উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের মতো স্থানীয় সরকারের স্তরগুলোতে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়। চাইলে যে কেউ কোনো দল না করেও প্রার্থী হতে পারে। তাদের পরিচয় হবে-স্বতন্ত্র।

ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন ও প্রতীক বরাদ্দের জন্য কেন্দ্রীয় মনোনয়ন বোর্ড রয়েছে। এর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন দলের সভাপতি বঙ্গবন্ধুকন্যা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কেন্দ্রীয় মনোনয়ন বোর্ডের পক্ষে পাঁচ হাজারের মতো ইউনিয়নে দলের কে প্রার্থী হবেন, সেটা নির্ধারণ সহজ নয়। মনোনয়ন কারা চাইছেন ইউনিয়ন পরিষদে, সেটা জানতে চাওয়া হয় উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের কমিটির কাছে।

প্রতিটি ইউনিয়নে একক প্রার্থী-দলের এ প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। অনেক বিদ্রোহী প্রার্থী ‘দাঁড়িয়ে’ গেছেন বহিষ্কৃত হওয়ার ঝুঁকি জেনেও। কেন এমনটি হচ্ছে? কেন এত বিপুল সংখ্যক ‘দলীয় নেতা’ কেন্দ্রীয় পার্লামেন্টারি বোর্ডের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করার দুঃসাহস দেখাচ্ছেন?

নারয়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচন সামনে। আওয়ামী লীগ মনোনয়ন প্রদান করেছে সেলিনা হায়াৎ আইভীকে। তিনি নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করবেন। বিএনপির নেতা তৈমূর আলম খন্দকার স্বতন্ত্র হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তার পেছনে বিএনপি ও তার অঙ্গ সংগঠনগুলোর কর্মী-সমর্থকরা একজোট হয়েছেন, এমন কথা শোনা যাচ্ছে। যদিও দলের নারায়ণগঞ্জের এক নেতা প্রকাশ্যে বলেছেন যে বিএনপির যে সব নেতা তৈমূর আলম খন্দকারের হয়ে কাজ করবেন না তাদের নারায়ণগঞ্জ থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হবে। দলের হয়ে কেউ কাজ না করলে দল ব্যবস্থা নিতেই পারে। এমনকি বহিষ্কারও করা যেতে পারে। কিন্তু শহর ছাড়া করার হুমকি অগণতান্ত্রিক। বিএনপি বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করছে দাবি করে, কিন্তু দলের ভেতর গণতন্ত্র চালুর চেষ্টা করে না।

আওয়ামী লীগের শামীম ওসমান নারায়ণগঞ্জের একটি আসন থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য পদে নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি দক্ষ সংগঠক, সন্দেহ নেই। কর্মী-সমর্থকদের একটি অংশ তাকে মান্য করে। তার এক ভাই জাতীয় পার্টি থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য পদে জয়ী হয়েছেন। আরেক ভাই জাতীয় পার্টির নেতা ছিলেন, যখন এইচ এমএরশাদ ক্ষমতায়। আওয়ামী লীগ ছেড়ে তিনি জাতীয় পার্টিতে গিয়েছিলেন। তার দাপট ছিল প্রচ-। শিল্প এলাকা নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিকে পেশী শক্তির অধীনস্ত করার পেছনে তার অবদান প্রভূত, এমনটিই বলা হয়ে থাকে। তার মৃত্যুর পর এ ধারা শামীম ওসমান বহন করছেন, এমনটি একটি মহল দাবি করে। তবে শামীম ওসমান কখনও দল বদল করেননি, বরাবর আওয়ামী লীগেই রয়েছেন।

পজলা শহরের শহরের রাজনীতির কর্তৃত্ব নিয়ে তার প্রতিদ্বন্দ্বিতা সেলিনা হায়াৎ আইভীর সঙ্গে। সন্দেহ নেই, অনেক কর্মী তার সঙ্গে আছেন। কিন্তু পাবলিকের প্রশ্ন যখন আসে, তিনি পিছিয়ে পড়ছেন। বলা যায় হেরে যাচ্ছেন। শহরের মেয়র পদে একবার তিনি সেলিনা হায়াৎ আইভীর সঙ্গে লড়েছিলেন ২০১১ সালে। তখনও বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন দলটির নাম আওয়ামী লীগ। জাতীয় সংসদের দুই তৃতীয়াংশের বেশি আসন দলটির দখলে। কিন্তু মেয়র পদে শামীম ওসমান বিপুল ভোটে হেরে যান। তবে দমে যাননি। পদে পদে মেয়রের সঙ্গে তার টক্কর লেগেই ছিল। টেলিভিশনের টকশোতে তাদের মুখোমুখি করা হয়েছিল একাধিকবার। কিন্তু সংযম বজায় রাখতে পারেননি কেউ, শামীম ওসমান একটু বেশিই মেজাজ হারিয়েছেন- দর্শকরা এমন অভিমত দিয়েছেন। যদিও বলা যায়, টিভি দেখে এমন মজা তারা সচরাচর পান না।

এবারের নির্বাচনে সেলিনা হায়াৎ আইভীকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রদানের পর শামীম ওসমানের মনোভাব যে ইতিবাচক নয়, সেটা বুঝতে তেমন সমস্যা কারও হয়নি। কেউ কেউ মজা করে বলেন, দলের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে যাকে মনোনয়ন প্রদান করা হয়েছে তাকে মেনে নিতে হবে এবং তার হয়ে কাজ করতে হবে-এ দিব্যি তাকে কে দিয়েছে? সেলিনা হায়াৎ আইভী অবশ্য বলছেন-‘শামীম ওসমান বড় ভাই’। দেখা যাক বড় ভাই নির্বাচনে কী ভূমিকা গ্রহণ করেন।

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব যে শামীম ওসমানের এ যাবত ভূমিকায় সন্তুষ্ট নয় সেটা দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের স্পষ্ট করে দিয়েছেন। ৩০ ডিসেম্বর তিনি বলেছেন-‘দলের সিদ্ধান্ত সকলকে মানতে হবে।’ দলের সিদ্ধান্ত কেউ না মানলে বহিষ্কারের অনেক নজির আমরা দেখছি। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদে ‘বিদ্রোহী প্রার্থী’ হওয়ায় শত শত ‘নেতাকে’ বহিষ্কার করা হয়েছে। তাদের একটি অংশ জয়ী হয়েছেন। জয়ী হওয়ার পর তাদের দাবি- ‘আওয়ামী লীগেই আছি। দলের প্রার্থী নির্বাচন সঠিক হয়নি, সেটা নির্বাচনের ফলে প্রমাণ হয়ে গেছে।’

কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব কি বিষয়টি খতিয়ে দেখবেন? একটি বা দুটি ইউনিয়নে এমন বিপর্যয় ঘটলে তাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে উপেক্ষা করা যেত। কিন্তু যখন শত শত ইউনিয়নে এমনটি ঘটছে? আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দলীয় মনোনয়ন ও প্রতীকে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় বলেছিল- তৃণমূল পর্যায়ে রাজনৈতিক কর্মকা- ও সাংগঠনিক কার্যক্রম বাড়াতে এর প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু পর পর কয়েকটি নির্বাচনের অভিজ্ঞতা বলছে- অনেক এলাকায় সংগঠনের বিভেদ প্রকাশ্যে এসেছে। বাস্তবে কী ঘটেছে, সেটা নিয়ে কেন্দ্রীয় ও জেলা নেতৃত্বের বিশ্লেষণ-মূল্যায়ন প্রয়োজন রয়েছে।

ঠিক দুই বছর পর সাধারণ নির্বাচন। প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপি ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। একাত্তরের পরাজিত শক্তি জামায়াতে ইসলামীকে ছাড়তে তারা রাজী নয়। নারায়ণগঞ্জের মেয়র পদে নির্বাচনে হেফাজতে ইসলামী তৈমূর আলম খন্দকারকে সমর্থন দিয়েছে প্রকাশ্যে। যদিও এ ধর্মীয় সংগঠনটি বার বার দাবি করছিল যে তারা অরাজনৈতিক সংগঠন। কিন্তু প্রয়োজনের সময়ে তারা মুখোশ বজায় রাখতে চায় না। কোন দলটি তাদের আসল মিত্র, কোন দলের সঙ্গে থাকলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নস্যাতে কাজ করার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ মিলবে, সেটা তারা ভালো করেই জানে।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ফিরিয়ে আনার জন্য আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে। অনেকে জীবন দিয়েছেন। অনেকে জেল-জুলুম সহ্য করেছেন। মিথ্যাচারের জবাব দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের পর দশকের দশকের দশক জয় বাংলা নিষিদ্ধ স্লোগান ছিল। বঙ্গবন্ধুর নাম নেওয়া নিষিদ্ধ ছিল। এ অন্যায় যারা করেছে, তারা এখনও রাজনীতির অঙ্গনে সক্রিয়। স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর অনুষ্ঠান বানচালের জন্য তারা কাজ করেছে। মুক্তিযুদ্ধে ইতিহাস বিকৃত করার জন্য তাদের অপচেষ্টা সমানে চলছে।
বিএনপি টানা প্রায় ১৫ বছর ক্ষমতার বাইরে। হারানো রাজ্যপাট ফিরে পেতে তারাও মরীয়া। অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিদেশি হস্তক্ষেপ চাইছে তারা। যে যুক্তরাষ্ট্র ১৯৭১ সালে বাংলাদেশকে রুখতে ইয়াহিয়া খান ও টিক্কা খানকে অস্ত্র ও অর্থ দিয়েছে তারা বাংলাদেশের বর্তমান অগ্রযাত্রায় খুশি নয়। বিশ্বের বুকে বাংলাদেশ মর্যাদার আসনে আসীন হোক, এটা তাদের কাম্য নয়। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে তারা ‘প্রকৃত বন্ধু’ খুঁজে পেলে বিস্ময়ের কিছু থাকবে না।

কিন্তু আওয়ামী লীগের সকলে কি বিষয়টি এমন ভাবে দেখেন? সম্ভবত দেখেন না। জেলা-উপজেলা-ইউনিয়ন এমনকি খোদ রাজধানী ঢাকাতে এমন আচরণ দেখা যাচ্ছে, যা দলের স্বার্থ রক্ষা করে না। দেশের স্বার্থেরও তা পরিপন্থী। তবে তাদের জন্য স্বস্তির কথা-দলের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করেও রেহাই মেলে।
এমনটিই কি চলতে থাকবে, সে প্রশ্ন কিন্তু নানাভাবে উঠছে। তার প্রতি কি যথাযথ নজর পড়বে?
লেখক-মুক্তিযোদ্ধা ও একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

সর্বশেষ

উপকূলে ঝড়-বৃষ্টির আভাস, সাগরে তিন নম্বর সতর্ক সংকেত

কল্যাণ ডেস্ক : নিম্নচাপের প্রভাবে উত্তর বঙ্গোপসাগরে গভীর সঞ্চারণশীল মেঘমালা সৃষ্টি অব্যাহত রয়েছে এবং বাংলাদেশের...

চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা আইন না থাকায় বন্ধ ঘোষিত ক্লিনিক চলছে

গ্রাম্য কথায় আছে ‘বকো ঝকো যাই করো কানে দিয়েছি তুলো/মারো ধরো যাই করো পিঠে...
00:03:31

দুর্বলের অধিকার ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় আবির্ভূত হন যুগাবতার শ্রীকৃষ্ণ

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক : ‘তোমারে বধিবে যে, গোকুলে বাড়িয়েছে সে’ প্রসঙ্গ টেনে এমপি কাজী নাবিল আহমেদ...

যবিপ্রবিতে নানা কর্মসূচিতে শুভ জন্মাষ্টমী পালন

নিজস্ব প্রতিবেদক : আলোচনা সভা, মঙ্গল শোভাযাত্রা, পূজা অর্চনা, গীতা পাঠসহ নানা কর্মসূচিতে যশোর বিজ্ঞান...

যশোরে মাদকসহ চারজন আটক

নিজস্ব প্রতিবেদক : যশোর কোতোয়ালি থানা ও ইছালী পুলিশ ক্যাম্পের সদস্যরা পৃথক অভিযান চালিয়ে ইয়াবা...

আওয়ামী লীগ উন্নয়নের নামে দেশকে দেউলিয়া বানিয়েছে : যশোরে শামসুজ্জামান দুদু

নিজস্ব প্রতিবেদক : যশোরে স্বেচ্ছাসেবক দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর গণসমাবেশে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেছেন, আওয়ামী...