শনিবার, ডিসেম্বর ১০, ২০২২

নওয়াপাড়া বন্দরে অবৈধ তালিকায় ৬০ ঘাট

অবৈধভাবে গড়ে উঠা ঘাটের কারণে কমছে নদীর নাব্যতা
৫ বছরে অর্ধশত জাহাজ ডুবিতে ক্ষতিগ্রস্ত আমদানিকারকরা

কামরুল ইসলাম, অভয়নগর : 

গত ২৮ ফেরুয়ারি মোংলা বন্দর থেকে যশোরের আফিল গ্রুপের আমদানি করা এক হাজার ১৬০ টন কয়লা নিয়ে একটি জাহাজ রওনা দেয় নওয়াপাড়া নৌ-বন্দরের উদ্দেশ্য। ৪ মার্চ নওয়াপাড়ায় পৌঁছানোর পর তলা ফেটে জাহাজটি ডুবে যায়। এভাবে গত ৫ বছরে বন্দরটিতে অর্ধশত জাহাজ ডুবে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন আমদানিকারকরা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নওয়াপাড়া নৌবন্দরের অবৈধভাবে গড়ে উঠা ঘাটের কারণে নদীর নাব্যতা কমে যাচ্ছে। যেকারণে ঘন ঘন জাহাজ ডুবির ঘটনা ঘটছে।

জানা গেছে, যশোরের নওয়াপাড়া নৌবন্দরে ১৬০টি ঘাটের মধ্যে ৬০টিই অবৈধ। এসব অবৈধ ঘাট থাকায় পলি জমে নদী ভরাট হয়ে ঘনঘন ঘটছে জাহাজ দুর্ঘটনা।

খুলনার দিঘলিয়া উপজেলার মজুদ খাল থেকে যশোর সদর উপজেলা আফরা ঘাট পর্যন্ত ২৪ কিলোমিটার নদীর তীরবর্তী এলাকা নিয়ে গঠিত হয়েছে নওয়াপাড়া নদী বন্দর। নদীর পশ্চিম তীর বরাবর যশোর-খুলনা মহাসড়ক হওয়ায় বেশির ভাগ ঘাট পশ্চিম তীরে গড়ে উঠেছে। মোংলা বন্দর থেকে নদী পথে এখানে কার্গো, বার্জ, বলগেট ইত্যদি নৌযানের মাধ্যমে সার, কয়লা, সিমেন্ট, খাদ্য শস্যসহ নানা ধরনের মালামাল আমদানি ও রফতানি হয়। ঘাটকে কেন্দ্র করে নওয়াপাড়া বাজার শিল্প বাণিজ্য নগরীতে পরিণত হয়েছে।

নওয়াপাড়া নৌবন্দর সূত্রে জানা গেছে, এখানে ছোট বড় মিলে ১৬০টি ঘাট রয়েছে। এর মধ্যে ৬০টি ঘাট অবৈধ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এগুলো হচ্ছে- সরকার ট্রেডার্স, আলম ব্রাদার্স, আইয়ান ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, মাহাবুব টুলু, ফেরদৌস ফারাজী, মোস্তফা ঘাট, মিজান শেখ, তিস্তা সল্ট ইন্ডাস্ট্রিজ, সীতার ঘাট, কাজী হামিমুল কাদির (বাবু মেম্বার), রবিন বিশ্বাস, মো. হাসান, সাহারা এন্টারপ্রাইজ, দি গোল্ডেন এন্টারপ্রাইজ (রাজঘাট), নওয়াপাড়া ট্রেডিং (রাজঘাট), ব্রাইট ঘাট, লুৎফর রহমান ও ওলিয়ার রহমান, এসএল এন্টারপ্রাইজ, মোল্যা ব্রাদার্স, তালতলা স্টোন, এসএ এন্টারপ্রাইজ, মাহবুব ব্রাদার্স প্রাইভেট লিমিটেড, বিসমিল্লাহ ঘাট, তামিম এন্টারপ্রাইজ (চাপাতালা), আফসার মোল্যা ও কাছের মোল্যা, রেজোয়ান, লবণ মিল ঘাট (মহাকাল), এসএ এন্টারপ্রাইজ (চেঙ্গুটিয়া), শেখ ব্রাদার্স (চেঙ্গুটিয়া), বিদ্যুৎ ঘাট, দাদা ভাই ঘাট, দীপু স্টোন প্রাইভেট লিমিটেড, এআর সিমেন্টে মিলস লিমিটেড, মক্কা সিমেন্ট ঘাট, বেগেরঘাট, রাজ টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড, মমতাজ নাসরিন (ডলার ঘাট), এ রহমান পরশ অটো রাইস মিলস লিমিটেড, সরকার ট্রেডার্স (মশরহাটি), জয়েন্ট ট্রেডিং কর্পোরেশন, বিশ্বাস ঘাট (মালোপাড়া ঘাট), মুন ট্রেডার্স, ফজলু এন্টারপ্রাইজ, হাসিব ফারাজী, বাঘা সাহেবের ঘাট, ভৈরব ঘাট, কামরুল মোল্যা, হাসান ফারাজী ও হোসেন ফারাজী, রফিক গাজী, শহিদুল গাজী, গাজীর ঘাট, জিয়া গাজী, ইসলাম এন্ড সন্স, মাস্টার ট্রেডিং-৩, অধিকারী ট্রেডার্স, ফারাজী নাসির উদ্দীন, নুরুল আমিন, শ্রী শ্রী বিজয় কৃষ্ণ আশ্রম ঘাট, চাকলাদার স্টোন হাউজ ও আলী আকবর বাবু।

এ সব অবৈধ ঘাটের বেশিরভাগ বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নেই। তাছাড়া কিছু ঘাট আছে তারা প্রবাহমান নদীতে ইট, বালু, গাছ দিয়ে অবৈধ ঘাট করে জেটি নির্মাণ করেছে। এছাড়া অনেক শিল্প কারখানার সীমানার প্রাচীর নদী দখল করে নির্মাণ করা হয়েছে। ওই সব ঘাট ও সীমানা প্রাচীরে নদীর পানি প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে। এতে পলি জমে নদী ভরাট হচ্ছে। অবৈধ ঘাট উচ্ছেদের জন্য বন্দর কর্তৃপক্ষ বারবার নোটিশ দিয়েছে; কিন্তু কেউ কর্ণপাত করেনি। যে কারণে অবৈধ ঘাট উচ্ছেদের জন্য বন্দর কর্তৃপক্ষ উদ্যোগ নিয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য সূত্রে জানা গেছে খুব শিঘ্রই ওইসব অবৈধ ঘাট ও জেটি উচ্ছেদ করা হবে।

নৌ কর্র্তৃপক্ষের অনুমোদিত ঘাট নির্মাণের জন্য তীর ভূমি ব্যবহার বাবদ বার্ষিক ইজারার হার প্রতি শতাংশ জমির জন্য ১ হাজার ৭২৮ টাকা। এছাড়া বাঁশের জেটিতে প্রতি বর্গমিটারে ৮৪ টাকা, কাঠের জেটিতে ১৪৪ টাকা এবং পাকা জেটিতে ২৭৬ টাকা। সবমিলে প্রতিটি ঘাট থেকে সরকার বছরে ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা ইজারা পায়। কিন্তু অনেক অবৈধ ঘাট মালিক নদীর তীর ভূমি দখল করে ঘাট নির্মাণ করে দেদারছে মালামাল লোড আন লোডের কাজ করে যাচ্ছেন। এদের কাছ থেকে সরকার দুই থেকে আড়াই কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে।

বাংলাদেশ নৌ-যান শ্রমিক ফেডারেশনের নওয়াপাড়া অঞ্চলের নেতা নিয়ামুল ইসলাম রিকো বলেন, নদী দখল করে অবৈধ ঘাট নির্মাণের কারণে ঘন ঘন নৌযান দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। এ পর্যন্ত যত জাহাজ দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে তার সবকটি তলা ফেটে ডুবেছে। আর তলা ফাটার কারণ প্রবাহমান নদী দখল করে ইট, বালু, গাছ ও বিভিন্ন কারখানার সীমানা প্রাচীর নদীর মধ্যে স্থাপন করা হয়েছে। ভাটির সময় জাহাজ ওইসব স্থাপনায় ধাক্কা লেগে তলা ফেটে ডুবে যায়। আমরা দ্রুত ওই সব স্থাপনা অপসারণ চাই।

নওয়াপাড়া পৌরসভার মহরহাটি এলাকায় অবস্থিত সরকার ট্রেডার্সের ঘাট অবৈধ হিসেবে নৌ বন্দর কর্তৃপক্ষ তালিকাভুক্ত করেছে। ওই ঘাটের মালিক আলমগীর সরকার বলেন, আমার ঘাটটি যে অবৈধ তালিকায় রয়েছে তা আমি জানি না। এ ব্যাপারে আমাকে কোন নোটিশ দেয়া হয়নি। আমি নৌ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিয়ে ঘাট করেছি। নৌ কর্তৃপক্ষ যদি আমাকে উচ্ছেদ করে তা করুক।

নওয়াপাড়া নদী বন্দরের উপ-পরিচালক মাসুদ পারভেজ বলেন, বন্দরে ১৬০ টি ঘাট রয়েছে। এর মধ্যে বৈধ আছে ১০০টি এবং ৬০টি ঘাট অবৈধ। এদের অনেকের অনুমোদন নেই, আবার অনেকে নদীর বক্ষে ইট, বালু গাছ দিয়ে জেটি নির্মাণ করে পানি প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করছে। যেকারণে ঘটছে দুর্ঘটনা। আমরা অবৈধ ঘাটের তালিকা করে তাদের উচ্ছেদের জন্য নোটিশ দিয়েছি। কিন্তু কেউ কর্ণপাত করছে না। বাধ্য হয়ে আমরা ওই সব অবৈধ ঘাট উচ্ছেদের জন্য চেষ্টা করছি। রোজার ঈদের কয়েক দিন পরে উচ্ছেদের তারিখ নির্ধারণ হয়েছিলো। কিন্তু সিলেট এলাকায় বন্যা আসায় তা পিছিয়ে গেছে। আশা করছি কোরবানি ঈদের পর ওই সব অবৈধ ঘাট উচ্ছেদের জন্য অভিযান চালানো হবে।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

সর্বশেষ

ব্রাজিলের স্বপ্ন ভেঙে সেমিফাইনালে ক্রোয়েশিয়া

ক্রীড়া ডেস্ক : ব্রাজিলের সব আক্রমণ গিয়ে প্রতিহত হচ্ছিল ক্রোয়েশিয়ার দুর্ভেদ্য প্রাচীরে। সত্যিই যেন এদিন...

দুর্নীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে: ডিসি

নিজস্ব প্রতিবেদক: আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী দিবস-২০২২ উপলক্ষে যশোরে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়েছে। শুক্রবার...

যশোরে ৮ নারী পেলেন শ্রেষ্ঠ জয়িতার পুরস্কার

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক: শুক্রবার ছিল নারী জাগরণের অগ্রদূত রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের ১৪২ তম জন্মবার্ষিকী ও...

বিয়ে করতে অস্বীকার করায় কলেজছাত্রীর আত্মহত্যার চেষ্টা

নিজস্ব প্রতিবেদক: শারীরিক সম্পর্কের পর বিয়ে করতে অস্বীকার করায় এক কলেজছাত্রী হারপিক পানে আত্মহত্যার...

যশোরে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে টাকা আত্মসাত, একজন আটক

নিজস্ব প্রতিবেদক: চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে প্রতারণার মাধ্যমে টাকা আত্মসাতের অভিযোগে কোতোয়ালি থানায় মামলা হয়েছে।...

ইসলামী ধারার তিনটি ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নিচ্ছে যশোরের গ্রাহকরা

নিজস্ব প্রতিবেদক: যশোরের গ্রাহকরা ইসলামী ধারার তিনটি ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নিচ্ছে। নানা অনিয়মের...