Friday, August 19, 2022

নড়বড়ে শাহীন চাকলাদারের দূর্গ

নিজস্ব প্রতিবেদক : যশোর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহীন চাকলাদার এমপি গ্রুপ ক্রমেই দুর্বল হচ্ছে। এক সময় এই অংশে সামনের কাতারে থাকা অনেকে এখন গ্রুপ পাল্টে যশোর সদর আসনের এমপি কাজী নাবিল আহমেদ শিবিরে যোগ দিয়েছেন। যারা চাকলাদার গ্রুপের প্রোগ্রামে বড় বড় মিছিল নিয়ে আসতেন তারাই চলে গেছেন নাবিল আহমেদ অংশে। সর্বশেষ শাহীন চাকলাদারকে ছেড়েছেন তারই আস্থাভাজন যশোর পৌরসভার চার নাম্বার ওয়ার্ডের কাউন্সিলর জাহিদ হোসেন মিলন। পৌরসভা নির্বাচনে যাকে বিজয়ী করতে চাকলাদারের লোকজন দিনরাত সমানতালে পরিশ্রম করেছিলেন। এসব খবরে শহরের রাজনীতি সচেতন অনেকেই বলছেন, প্রচ- দাপটের সাথে রাজনীতি করা শাহীন চাকলাদার গ্রুপ দিনে দিনে নড়বড়ে হতে চলেছে।

২০০৪ সালে দলের দুর্দিনে যশোর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন শাহীন চাকলাদার। তরুণ রাজনীতিক শাহীন চাকলাদার ক্ষমতাসীন বিএনপি জোটের সময় রাজপথ কাঁপিয়ে নজর কাড়েন কেন্দ্রের। হয়ে উঠেন তৃণমূলের আস্থার প্রতীক। এ কারণেই পাঁচ বছরের মাথায় তিনি আওয়ামী লীগ থেকে যশোর সদর উপজেলা চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করে জয়ী হন। এরপর আরো দুই মেয়াদে উপজেলা চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন। জেলা আওয়ামী লীগের গতবারের কমিটির প্রায় সব নেতাই ছিলেন তার পছন্দের। শাহীন চাকলাদারের সিদ্ধান্তেই চলতো জেলা আওয়ামী লীগ। কিন্তু সেই অবস্থা এখন নেই। দিনে দিনে তার গ্রুপ থেকে নেতাকর্মীরা চলে গিয়ে ভিড় করছেন কাজী নাবিল গ্রুপে।

আরও পড়ুন : শাহীন চাকলাদারকে ছাড়লেন একদল নেতা!

দলের নেতাকর্মীদের ভাষ্য, সদর উপজেলা চেয়ারম্যান পদ ছেড়ে ২০২০ সালের ১৪ জুলাই শাহীন চাকলাদার কেশবপুর আসনের এমপি হওয়ার পর থেকেই শহরের রাজনীতিতে প্রভাব পড়তে থাকে। গ্রুপ পরিবর্তন করতে থাকেন নেতাকর্মীরা। তার সাথে দীর্ঘ বছর রাজনীতি করে আসা সদর উপজেলা চেয়ারম্যান নুরজাহান ইসলাম নীরা (বর্তমানে প্রয়াত) এমপি নাবিল গ্রুপে যোগ দেন। সদর উপজেলা চেয়ারম্যান পদে উপ নির্বাচনে নীরা নৌকার মনোনয়ন পেতে শাহীন চাকলাদারের সমর্থন না পেয়ে হতাশ হয়েছিলেন। ‘নিজ চেষ্টায়’ নীরা নৌকা পেয়ে এমপি নাবিল গ্রুপে যোগ দেন ও বিজয়ী হয়েছিলেন। এমপি নাবিল ও উপজেলা চেয়ারম্যান নীরা একসাথে রাজনীতি করার সুবাদে শহরের রাজনীতিতে চাকলাদার গ্রুপের প্রভাব কমতে থাকে।

যশোর পৌরসভা নির্বাচনে জেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক জহিরুল ইসলাম চাকলাদার রেন্টু ফের মেয়র পদে নৌকার মনোনয়ন না পাওয়ায় শহরের রাজনীতিতে আরেকটি ধাক্কা লাগে শাহীন চাকলাদারের। রেন্টু ও শাহীন চাচাতো ভাই। তারা এক সাথেই জেলার রাজনীতি করে আসছেন। পৌরসভা নির্বাচনে নৌকার প্রার্থী হায়দার গণী খান পলাশ নিজ চেষ্টায় নৌকা বাগিয়ে নিলেও তিনি বরাবর ছিলেন চাকলাদার মেরুর বিপক্ষে। কাজী নাবিল আহমেদকে তিনি নেতা মেনে ভোটের প্রচারণা, পরামর্শ ও আশীর্বাদ চেয়েছিলেন। গুরুত্ব দেননি চাকলাদারদের।

আরও পড়ুন : নির্দলীয় সরকার নিয়ে উত্তপ্ত সংসদ

পৌরসভা নির্বাচনে কাউন্সিলর পদে আওয়ামী লীগ কাউকে সমর্থন না দিলেও বিভিন্ন ওয়ার্ডে দুই পক্ষের পৃথক প্রার্থী ছিল। ৪ নাম্বার ওয়ার্ডে এমপি নাবিল, এমপি শাহীন, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান সাইফুজ্জামান পিকুল, পৌরসভার তৎকালীন মেয়র রেন্টুসহ গুরুত্বপূর্ণ নেতার বসবাস। এই ওয়ার্ডে এমপি নাবিল পক্ষের প্রার্থী ছিলেন একাধিকবার নির্বাচিত কাউন্সিলর মোস্তাফিজুর রহমান মুস্তা ও এমপি শাহীন চাকলাদারের প্রার্থী ছিলেন জেলা যুবলীগের প্রচার সম্পাদক জাহিদ হোসেন মিলন। দুই পক্ষই সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিলেন তাদের প্রার্থীকে জেতাতে। কিন্তু এখানে এমপি নাবিল গ্রুপ এমপি শাহীন চাকলাদার গ্রুপের কাছে হেরেছিলেন। বিভিন্ন মামলার আসামি বিতর্কিত জাহিদ হোসেন মিলন মূলত চাকলাদারদের প্রভাবেই নির্বাচনী বৈতরণী পার হয়েছিলেন। সেই কাউন্সিলর জাহিদ হোসেন মিলনই চাকলাদারদের ত্যাগ করেছেন। ৩০ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি কাজী নাবিল আহমেদকে ফুল দিয়ে তার গ্রুপে যোগ দিয়েছেন। শুধু তাই নয়; ‘তিনি এতোদিন নাকি ভুল পথে ছিলেন’ বলেও বক্তব্যে উল্লেখ করেছেন। বলেছেন শাহীন চাকলাদার লুটপাট করে খাচ্ছেন।

পৌরসভার এক নাম্বার ওয়ার্ডে শাহীন চাকলাদারের দীর্ঘদিনের কাছের লোক হিসেবে পরিচিত জাকির হোসেন রাজিব। শাহীন চাকলাদারের সভা সমাবেশে মিছিল নিয়ে অংশ নিতেন তিনি। চাকলাদাররাও তাকে মূল্যায়ন করতেন। একাধিকবার কাউন্সিলর পদে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া জাকিরকে বিজয়ী করতে অর্থ ও শ্রম দিয়েছেন শাহীন চাকলাদারের লোকজন। জাকির বিজয়ী হতে না পারলেও বারান্দীপাড়ায় শাহীন চাকলাদারের প্রভাব কাজে লাগিয়েছেন। সেই জাকিরই চোখ পাল্টি দিয়ে নাবিল গ্রুপে যোগ দিয়েছেন। বৃহস্পতিবার তিনিসহ জেলা যুবলীগের অর্থ সম্পাদক ফিরোজ আলম ও জেলা ছাত্রলীগের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক শাহজাহান কবির শিপলুও যোগ দিয়েছেন। ফিরোজ আলম এর আগেও নাবিল আহমেদের সাথে রাজনীতি করেছেন। কিন্তু শিপলু প্রথম থেকেই চাকলাদার শিবিরে ছিলেন। এছাড়া যশোর শহর যুবলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক কাউন্সিলর আজিজুল হক, উপজেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আনোয়ারা বেগম, যশোর শহর মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রেহেনা পরভীন, জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা আসাদুজ্জামান আসাদ ওরফে বুনো আসাদসহ নেতৃবৃন্দ। অবশ্য যোগদান করা বেশিরভাগ নেতার নামে হত্যা, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন মামলা রয়েছে।

এর আগে শাহীন চাকলাদারকে ছেড়ে গেছেন জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি বীরমুক্তিযোদ্ধা একেএম খয়রাত হোসেন। যিনি এক সময়ে অন্যতম উপদেষ্টার মতো পাশে ছিলেন শাহীন চাকলাদারের। কারো কারো দাবি, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে নৌকার মনোনয়ন পেতে তিনি গ্রুপ পরিবর্তন করেছেন। তবে নিছক মিথ্যা বলেছেন একেএম খয়রাত হোসেন। তিনি বলেছেন, আল্লাহ কপালে লিখলে যে গ্রুপেই থাকি মনোনয়ন হবে। গ্রুপ পরিবর্তনের সাথে মনোনয়নের কোন সম্পর্ক নেই। কিন্তু গ্রুপ পরিবর্তনের কারণ কি জানতে চাইলে তিনি বলেন, শিক্ষিত, মার্জিত ও ভদ্র মানুষের সাথে রাজনীতি করে জনগণের সাথে থাকতে চাই। এছাড়া কাজী নাবিল আহমেদ সদর আসনের এমপি। তিনি সদরের মানুষের উন্নয়নে কাজ করছেন। আমিও সদরের মানুষ। তাই মনে করেছি; কাজী নাবিল আহমেদের সাথে থাকাটা ভালো।

শাহীন চাকলাদারের আরেক আস্থাভাজন ছিলেন জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আব্দুল মজিদ। এই নেতাও চুপিচুপি শাহীনকে ত্যাগ করেছেন। তবে তিনি নাবিল গ্রুপে যোগ দেননি। নিজে একটা বলায় দাঁড় করানোর চেষ্টা করছেন।

আর অনেক আগেই শাহীন চাকলাদারের সাথে সম্পর্কের ইতি ঘটেছে জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সদর উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন বিপুলের। ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচনের পর থেকেই তাদের সম্পর্কের ফাটল ধরে। শুধু তাই নয়; শত্রুতায় গড়ায়। বিপুল প্রকাশ্যে সংবাদ সম্মেলন করে শাহীন চাকলাদারের বিরুদ্ধে কথা বলেন। তাকে হত্যার চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও তিনি মিডিয়ার মুখ খোলেন। বৃহস্পতিবার তিনি ফেসবুকে ‘পতন ঘণ্টা….’ বলে স্ট্যাটাস দেন।

বক্তব্য দিতে শাহীন চাকলাদারের কাছে দৈনিক কল্যাণের টেলিফোন দিয়ে ফোন করা হয়েছিল। তিনি রিসিভ করেননি। পরে তার (শাহীন চাকলাদার) গ্রুপের যশোর সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোহিত কুমার নাথ বলেন, যারা গ্রুপ পাল্টায় তারা নিজের ভালোর জন্যই গ্রুপ পরিবর্তন করে। গ্রুপ পাল্টানোর কারণে শাহীন চাকলাদারের তেমন কিছু হবে না। আবার কাজী নাবিলেও খুব লাভ হবে না।

1 মন্তব্য

  1. রাজনিতীতে শেষ বলে কিছুই না। জনতার নেতাকে জনতাই একদিন যশোর জেলার মধ্যমনি করে ফিরিয়ে আনবে ইনশাআল্লাহ।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

সর্বশেষ

আজ যশোরের বিশিষ্ট রাজনীতিক এম রওশন আলীর মৃত্যুবার্ষিকী

নিজস্ব প্রতিবেদক : যশোরের কৃতি সন্তান, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক সহচর, সংবিধানের...

টিউমার অপরেশনের পর নাজমা এখন প্রতিবন্ধী

জিএম আল ফারুক, আশাশুনি : সাতক্ষীরার আশাশুনির সদর ইউনিয়নের শ্রীকলস গ্রামের ভ্যান ও সাইকেলের মিস্ত্রী...

তালায় এমপি রবির সাথে মতবিনিময় শিক্ষক নেতৃবৃন্দের

সাতক্ষীরা জেলা প্রতিনিধি : সাতক্ষীরা-২ আসনের সংসদ সদস্য নৌ-কমান্ডো ০০০১ বীরমুক্তিযোদ্ধা মীর মোস্তাক আহমেদ রবির...

ঝিকরগাছায় ডাকাতিকালে নৈশ প্রহরী খুনে আটক নেই

নিজস্ব প্রতিবেদক : যশোরের ঝিকরগাছায় ডাকাতিকালে নৈশপ্রহরী আব্দুস সামাদ হত্যার ঘটনায় এখনো কাউকে আটক করতে...

এদেশে সবচেয়ে বেশি মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে জিয়াউর রহমান : শাহীন চাকলাদার

নিজস্ব প্রতিবেদক : যশোর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহীন চাকলাদার এমপি বলেছেন, সরকার ভিন্ন...

যশোরে স্কুলছাত্রী ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে বৃদ্ধ আটক

নিজস্ব প্রতিবেদক : যশোরে স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণ চেষ্টার অভিযোগে কোতোয়ালি থানায় শাহ আলম (৬০) নামে এক...