মঙ্গলবার, অক্টোবর ৪, ২০২২

পদ্মা সেতু ‘সেসময়’, এসময় ও আগামীর সেতুবন্ধন

মো. হামিদুল হক: কখনো তাকে ডাকা হয় ‘স্রোতস্বিনী’ নামে, আবার কখনো তার নাম ‘কীর্তিনাশা’। বাংলাদেশের প্রধান নদী-‘পদ্মা’! এই নদীর গর্ভে যেমন আছে ‘পদ্মার ইলিশ’-নামক বাঙালির গর্বের কথামালা; তেমনি আছে হাজারো বাঙালির আক্ষেপ আর অনুযোগের বেদনা। সেই পদ্মা নদীর উপর বৃহৎ এই ‘পদ্মা সেতু’, পদ্মা-কে ঠিক কোন মাত্রা দিতে চলেছে সেটি বর্তমানের এক বিরাট প্রশ্ন। প্রায় আট বছর ধরে তৈরী হওয়া এই পদ্মা সেতু নিয়ে রয়েছে নানান অভিব্যক্তি, মতামত এবং বিতর্ক। তবে সাধারণ একজন মানুষ হিসেবে আমার চোখে পদ্মা সেতু ঠিক কী হতে চলেছে আগামী প্রজন্মের জন্য তা তুলে ধরতে- যেতে হবে খানিক পেছনে। পদ্মা নদীর সাথে আমার দুটি স্মৃতি ফিরে দেখেই গড়তে চাই পদ্মার সাথে অতিত আর বর্তমানের সেতুবন্ধন। করতে চাই খোলা চোখে পদ্মাসেতুর মূল্যায়ন।

ফিরে দেখা-০১
সাল-২০০২, মাত্র উচ্চমাধ্যমিক এর গণ্ডি পেরিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন দেখছি। সে সময় ভর্তি ফর্ম স্বহস্তে পূরণ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে জমা দেয়ার নিয়ম ছিল। যশোর থেকে ঢাকা এই দূরত্বে যাত্রার ভোগান্তি এবং ভাড়ার বিপুলত্বের জন্য আমরা নিজেরা ঢাকা যাওয়ার সাহস পাইনি।

বন্ধুরা সকলে মিলে নিজেদের ভর্তি ফর্ম পূরণ করে- বাই পোস্ট ঢাবিতে অধ্যয়নরত এক বড় ভাইয়ের কাছে পাঠিয়ে দিই। কিন্তু বিপত্তি ঘটলো ঢাকা থেকে ল্যান্ড ফোনে শাহ আলম ভাইয়ের ফোন পেয়ে। শাহ আলম ভাই নীলক্ষেত এর দোকান থেকে বেলা-৯ টায় লালনকে ফোন দিয়ে জানান-‘তোমাদের ফর্মে ভুল আছে এবং আগামীকাল ভর্তি ফর্ম জমা দেয়ার শেষ তারিখ। তোমরা যদি কাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিস বন্ধের পূর্বে এসে নিজেরা পূরণ করে দিয়ে না যাও তাহলে তোমাদের ঢাবি-র স্বপ্ন দেখা শেষ।‘ এক ভয়ানক পরিস্থিতির সম্মুখীন হলাম আমরা।

তখনকার যোগাযোগ কিংবা যাতায়াত পরিস্থিতি যে দূর্বিষহ তাতে এত স্বল্প সময়ে ঢাকা পৌঁছানো- এক অলীক কল্পনা। আবার আগে কখনো একা ঢাকা যাওয়া হয়নি, তারপরেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখতে হলে আমাদের যেতেই হবে। আমরা নির্দিষ্টভাবে জানতাম না এতগুলো ফর্মে আমাদের মধ্যে কার/কাদের পূরণে ভুল হয়েছে, তবুও সবার সিদ্ধান্তে আমি আর আমার বন্ধু লিটন তাৎক্ষণিক রওনা হই ঢাকার পথে। নভেম্বর এর কঠোর শীতে পদ্মায় তখন ঘন আর ভয়াবহ কুয়াশা। তাই ফেরী পারাপার দিনের বেলায় চললেও রাতে কুয়াশার দরুণ বন্ধ থাকে এবং ভাড়াও বেশখানিকটা বেশি। আমি আর বন্ধু লিটন তাই লঞ্চ পারাপারে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। লঞ্চে যখন উঠলাম তখন সন্ধ্যা পার হয়েছে। লঞ্চের ডেকে দাঁড়িয়ে আমি আর আমার বন্ধু লিটন। ধীরে ধীরে চারপাশ এতোটাই কুয়াশাচ্ছন্ন হয়ে গেলো যে, অল্পখানেক এর মধ্যেই খেয়াল করলাম দুহাত দূরে দাঁড়ানো লিটনকেও আর দেখতে পাচ্ছিনা কুয়াশার জন্য। এমন সময় চিৎকার কানে আসলো-‘আমি কিছু দেখতে পারছিনা, আমি কী করবো কিছুই বুঝছি না!’ দৌঁড়ে গিয়ে দেখি সারেং হাহাকার করে বলছে- ‘আমি কিছুই বুঝতে পারছিনা আমরা কোথায় আছি। পথ হারিয়ে ফেলেছি আর কোনদিকে যাবো তাও দেখতে পাচ্ছিনা।

“আমি আর লিটন স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। ইতিমধ্যেই পুরো লঞ্চ জুড়ে কান্না শুরু হয়ে গেছে বাঁচার আকুতির জন্য। সারেং কে বলা হলো আপাতত না চালিয়ে স্থির পানিতে লঞ্চ রাখা হোক। এমন সময় বিকট সাইরেন এর শব্দ শোনা গেলো, আবছা বোঝা গেলো চোঙা আকৃতির কিছু একটা আমাদের লঞ্চের দিকে ক্রমশ এগিয়ে আসছে। আমরা তাড়াতাড়ি সারেং কে বললাম দ্রুত লঞ্চ ডানে ঘোরান, আরেকটা লঞ্চ এখনি আমাদর ধাক্কা দিবে। সারেং চেষ্টা চালোনোর আগেই বিপুল জোরে সেই লঞ্চ আমাদের লঞ্চের এক কোণায় সজোরে ধাক্কা দিলো এবং সৌভাগ্যক্রমে আরেক পাশ থেকেও অন্য একটি লঞ্চ এসে আরেক পাশ ধাক্কা দিয়ে আমাদের লঞ্চ উল্টিয়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা পেলো। যাত্রীদের আর্তচিতকার এবং সেই বিকট শব্দে সাইরেন আর সজোরে ধাক্কা- কুঁড়িটা বছর পর আজও আমার কানে স্পষ্ট ভাসে। তখনকার অনুভূতি আমার আর লিটনের এমন ছিল আমরা নিশ্চিত মারা যাচ্ছি। এক ব্যাপক হাহাকার তৈরী হলো- তারমানে আব্বা আম্মার সাথে আমাদের শেষ দেখা ছিল আসার আগে, আমাদের বেঁচে ফেরার বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা পেলাম না; কারণ আমি সাঁতার জানতাম না তাই আমি খুব অল্প সময়েই মারা যাবো আর বন্ধু লিটন সাঁতার জানলেও এই বরফশীতল পানি সাঁতরিয়ে সেও বাঁচবেনা।

তাই দু’জনই ঢাবি-র ফর্ম পূরণের আশা ভুলে আপন মানুষদের শেষ বারের মতো মনে করছি। সারেং ধারণা করলেন আমাদের লঞ্চ মধ্যচরে আটকিয়ে আছে অথবা কোনো বালুচরে ঠেকে আছে। তাই সিদ্ধান্ত হলো সারারাত লঞ্চ এই জায়গাতেই স্থির থাকবে এবং তরুণ ছেলেরা ছাদের উপর বসে পাহারা দেবে যেন অন্য কিছু এসে আমাদের লঞ্চ কে ধাক্কা না দেয়। কুয়াশা সরে গেলে তখন এক ব্যবস্থা করা সম্ভব। যখন বেঁচে থাকার সম্ভাবনা পেলাম, তখন বুকের ভেতর অদ্ভূত শূন্যতা আসলো এতো অপেক্ষার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য আবেদনটাও করতে পারবোনা যাতায়াত ভোগান্তির জন্য! সকল চিন্তা বুকে চেপে আমি, লিটনসহ লঞ্চের আরো ৪/৫ জন ছেলেরা সারারাত লঞ্চের ছাদে জেগে বসে রইলাম পাহারা দেয়ার জন্য। যতোবার ওমন সাইরেন শুনেছি অন্যকোনো লঞ্চের, আমরা সমস্বরে চিৎকার করেছি- ‘পারাবাত এখানে, আমাদের ধাক্কা দিয়েন না, পারাবাত এখানে, পারাবাত এখানে’…… এভাবে রাত পেরিয়ে দিনের আলো ফুটলো কিন্তু কুয়াশা সরলো না। বেলা সাড়ে এগারোটায় কুয়াশা সরলে দেখা গেলো আমরা পদ্মা নদীর অন্য আরেক পাড়ে ঠেকে আছি এবং লঞ্চ সরানো সম্ভব হচ্ছেনা, কারণ ভাঁটা চলছে। উপায়ন্তর না দেখে আমি আর লিটন শেষ চেষ্টার জন্য লঞ্চ থেকে নেমে সাড়ে ছয় কিলোমিটার পথ টানা হেঁটেছিলাম। নির্ঘুম রাত, ক্ষুধার্ত পেট, পিঠে ব্যাগ আর একরাশ মানসিক ক্লান্তি, ভয় সবকিছু মিলিয়ে বেঁচে ফেরার আনন্দের চেয়ে বড় হয়ে দাঁডিয়েছিলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছানোর আশা। শেষ অব্দি ধূলা-কাঁদা মাখা অবস্থায়, আধামরা হয়ে আমি আর লিটন পাড়ে পৌঁছে প্রায় বিকাল নাগাদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উপস্থিত হতে পেরেছিলাম এবং ফর্ম ঠিক করে জমা দেয়া সম্ভব হয়েছিলো শেষ মুহূর্তে। এটাই আমার চোখে আর আমার মতো লাখো শিক্ষার্থীর জীবনে পদ্মা সেতু থাকা আর না থাকার পার্থক্য।

ফিরে দেখা-২
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করে ২য় কর্মজীবনে Green University তে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেছি। তারিখ- ২০১১ সালের ২৩শে নভেম্বর। যশোর থেকে ফোন আসলো- আমাদের ভীষণ কাছের বন্ধু ‘জীবন’ মারাত্মক আহত। যশোর দড়াটানায় সন্ত্রাসী হামলায় দূর্বৃত্তরা জীবন-কে ধারালো অস্ত্র দিয়ে তিনটি কোপ মেরেছে। এর মধ্যে একটা কোপ বুকের উপর, আর একটা মুখের মাঝ বরাবর এবং আর একটা ডান হাতের সরাসরি রগ-এর উপর। ফলে জীবন এর রগ ছিঁড়ে অনবরত ফিনকি দিয়ে রক্ত পড়ছে। যশোরের সকল ডাক্তার জীবন কে ফেরত দিয়ে বলেছে এই রোগী তারা বাঁচাতে পারবেনা এবং এই রগ সেলাই তখন শুধু ঢাকায় ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনেই করা হয়, ফলে অনতিবিলম্বে জীবনকে ঢাকা নেয়া লাগবে। যেহেতু রগ ছিঁড়ে রক্ত প্রবাহ চলমান আছে-তাই আরেক হাত দিয়ে রক্ত দেওয়া চলবে যাতে জীবন-এর শরীরে রক্তশূন্যতা তৈরী না হয়, সাথে অক্সিজেন সাপোর্ট। এভাবে জীবনকে ্অ্যাম্বুলেন্সে নিয়ে যশোর থেকে রওনা হলো ওর ভাই এবং আমাদের বন্ধুরা। আর ঢাকা তে আমি আরো রক্ত রেডি করা এবং ডাক্তার দের সাথে বলার জন্য ছুটলাম।

বড় বিপদ আসলো পদ্মায় ফেরী পারাপারের সময়। দ্রুতগতির অ্যাম্বুলেন্সটি থামতে হলো ঘাটের আড়াই কিলোমিটার জ্যামে। ঢাকায় অবস্থানরত আমি আর আমার বন্ধু দীপু হাউমাউ করে কাঁদছি সব রেডি করা শেষ কখন জীবনকে নিয়ে আসে। ওদিকে ঘাটে আটকিয়ে পড়া অ্যাম্বুলেন্স থেকে বন্ধু জীবনের ভাই নেমে প্রত্যেক গাড়ির ড্রাইভারের কাছে হাতজোড় করে আহাজারি করছে অ্যাম্বুলেন্সটি যেতে দেয়ার জন্য। কিন্তু মানুষ দয়া দেখালেও ঘাটের জ্যাম এতোটাই নিষ্ঠুর যে পেছনের অ্যাম্বুলেন্সটি আগে পাঠানোর সুযোগ স্বয়ং ড্রাইভারদের হাতেও থাকেনা। সামনে পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা হাজারো গাড়ি পদ্মার এপারে। মাঝে জীবন-এর অ্যাম্বুলেন্সের লাল বাতির জ্বলা-নেভার মতোই জীবনের জীবনপ্রদীপ ও প্রায় নিভু নিভু। অনবরত ফিনকি দিয়ে বের হওয়া রক্তে! পদ্মার ঢেউ এর তুমুল গর্জন ও হার মানছে জীবনের ভাইয়ের আহাজারির কাছে। পদ্মার আরেক পাশে ঢাকাতে থাকা আমি বন্ধুত্বের লাখো স্মৃতি নিয়ে বসে আছি জীবনকে জীবন্ত দেখার অপেক্ষায়। আড়াই কিলোমিটার জ্যাম ছাড়িয়ে যখন জীবনকে নিয়ে আসা হলো সে মৃতপ্রায় অবস্থা। পদ্মাসেতুর মত একটি সেতু তাই এমন হাজারো জীবনদের জীবন প্রদীপের সমান।

ফিরে দেখা এমন হাজারো আহাজারির স্বাক্ষী এই প্রমত্ত পদ্মা। কেননা এর একুল ওকুলের সেতুবন্ধন, তাও আবার এই গরীব দেশের নিজের টাকায়- আমরা ভাবতেও পারিনি! পদ্মা পার হওয়ার জন্য জ্যামে আটকিয়ে অ্যাম্বুলেন্সে জীবন হারানো মায়ের সন্তান জানে পদ্মা সেতু কী! এই ফেরীর জ্যামে আটকিয়ে ২/৪ ঘন্টা ব্যবধানে পরীক্ষা মিস করা ছাত্র জানে পদ্মা সেতু কী! ফেরী পারাপারের অপেক্ষায় পিতার দাফনে শামিল হতে না পারা ছেলে জানে এর গুরুত্ব কিংবা পদ্মার ভয়াবহ স্রোতে ডুবে যাওয়া সন্তানের বাবা জানেন পদ্মা সেতুর অবদান আর জ্যামে আটকিয়ে পরিশ্রমের ফসল বস্তায় পচতে দেখা কৃষক বোঝে এই সেতুর মূল্য। আমাদের প্রজন্মের কাছে তাই পদ্মা সেতু কোনো বিতর্কের নাম নয়, বরং হাজারো আর্তনাদ থেকে মুক্তির সূচনা। পদ্মা সেতু লাখো মানুষের হাহাকারের সামনে এক প্রশান্তির সূচনা।

অতঃপর ২০২২ পদ্মা সেতুর উদ্বোধন
পদ্মা- এটি কখনো মানুষের জীবন কেড়েছে, কখনো মানুষের সময় খেয়েছে, কখনো বা দিয়েছে অর্থনীতিতে বিপুল সুফল। এই পদ্মার ভেতর কত শত মানুষের আর্তনাদ, আহাজারি লুকিয়ে আছে-তা কেউ জানিনা। অথচ, এই পদ্মার যে ভালোবাসা, তাকে আমরা এখনো নিতে পারিনি। এই পদ্মার যে সেতু বন্ধন তাকে আমরা এখনো বাঁধতে পারিনি। অবশেষে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ আসতে চলেছে- ২৫ জুন সেতু উদ্বোধনের মাধ্যমে। বিপুল বিশালত্ব নিয়ে পদ্মা নদীর বুকে গড়ে উঠেছে এই বহুমুখী সড়ক ও রেল পদ্মা সেতু। পৃথিবীতে আমাজন নদীর পর পদ্মা সর্বোচ্চ প্রবাহমান নদী। তাই এটি তৈরিতে প্রতি ধাপেই বিশেষ সতর্কতার পরিচয় দিতে হয়েছে নির্মাণশিল্পীদের। আর এজন্যই অন্যান্য যেকোন সেতুর তুলনায় পদ্মা সেতুর বিশেষত্ব অনেক ক্ষেত্রে বেশি। যেমন- পদ্মা সেতু তৈরিতে ব্যবহার করা হয়েছে অস্ট্রেলিয়া থেকে আমদানিকৃত মিহি মাইক্রোফাইন্ট সিমেন্ট, যা সাধারণত অন্যান্য সেতুর জন্য ব্যবহার করা হয়না। আবার পদ্মা সেতুর উপরের অংশে রেল দিলে সেতুর ঢাল উঁচু করা লাগতো আর ট্রেনের গতি বাড়িয়ে উঠানো লাগতো উপরে। যা হতে পারতো দূর্ঘটনার কারণ; এজন্যই পদ্মা সেতুর উপরের অংশে সড়ক আর নিচের অংশে রেলপথ দেয়া। এছাড়াও গাড়ি চলাচল নিয়ন্ত্রণে রাখতে সেতুকে ডানে ও বামে দু’বার হালকা বাঁকিয়ে তৈরী করা হয়েছে, যাতে চালকের মনোযোগ বহাল থাকে। ঠিক এখানেই মিল রয়েছে পদ্মা সেতুর সাথে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় সেতুগুলোর। ৬.১৫ কি.মি. দৈর্ঘের এই সেতুতে বসানো হয়েছে ১৫০ মিটার দৈর্ঘ্যের ৪১টি স্প্যান। পদ্মায় প্রতি সেকেন্ডে ১ লাখ ৪০ হাজার ঘনমিটার জল প্রবাহ নিশ্চিত করতে ৪২ টি পিলার বসাতে হয়েছে ইঞ্জিনিয়ারদের, যাতে সেতুর নিচে জলযান গুলো চলাচলে কিংবা পানি প্রবাহে বিঘœ সৃষ্টি না হয়। ২০১৪ সালের নভেম্বর মাসে শুরু হওয়া এই সেতুর রক্ষণাবেক্ষণে দায়িত্বরত আছে ‘বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ’। বৃহৎ এই পদ্মা সেতুতে মোট ৪১৫ টি ল্যাম্পপোস্ট লাগানো হয়েছে, যেখানে আরো জ্বালানো হবে আর্কিটেকচারাল লাইট। ২৫ জুন- পদ্মা সেতু উদ্বোধন হচ্ছে। তার পূর্বেই কল্পনা করা যাচ্ছে স্রোতস্বিনী পদ্মার উপর এই সেতুর ওপরের স্তরে চার লেনের তৈরি সড়ক পথে ছুটছে দ্রুতগতির যানবাহন, মাঝে রইলো রেলপথ এবং নিচে চলবে জলযান! কী অপরূপ যোগাযোগের ত্রিমাত্রিক দৃশ্য।

পদ্মা সেতুর নির্মাণাধীন খরচ কিংবা নির্ধারিত টোল নিয়ে সকল রাজনৈতিক বিতর্ক রাজনীতিবীদদের উপরেই রইলো, এই সেতু অর্থনীতিতে কাংখিত জিডিপির কত শতাংশ প্রবৃদ্ধি আনবে-সে বিতর্কের ভারও অর্থনীতিবিদদের উপর থাক। কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবনে পদ্মা সেতুর গুরুত্ব যে কোন নিক্তিতেই প্রশ্নাতীত তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। সর্বোপরি, ‘পদ্মা সেতু’ নাক উঁচু করা বিশ্বব্যাংক এর অপবাদের বিরুদ্ধে পুচকে বাংলাদেশের একটি দাঁতভাঙা জবাব। ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলা বাংলাদেশও যে নিজেদের অর্থায়নে এমন একটি স্থাপনা দাঁড় করাতে পারে-তার ই সাক্ষী এই পদ্মা সেতু। যেকোন আদলেই তাই মানতে হবে- পদ্মা সেতু বাংলাদেশের জন্যে একটি বিশাল গর্ব ও সম্পদ এবং আমাদের ও আমাদের আগামী প্রজন্মের জন্য নিদারুণ এক স্বস্তির যাতায়াত ব্যবস্থা হয়ে রইলো পদ্মার বুকে।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, সমাজ বিজ্ঞান বিভাগ, সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

সর্বশেষ

চাঁচড়ায় রনি হত্যাকাণ্ডে ১২ জনের নামে মামলা

নিজস্ব প্রতিবেদক : যশোর শহরতলীর চাঁচড়ায় রনি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় কোতোয়ালি থানায় মামলা হয়েছে। নিহত রনির...

মাতৃদেবীজ্ঞানে আসন নেয় সৃজিতা ঘোষাল

এসআই ফারদিন : সোমবারের সকালটা জেগে উঠেছে ঢাক-বাদ্যের তালে। আর এই ঢাকের তাল বলছে মহা...

এলজিইডি যশোর অফিসের মধ্যে ঠিকাদারকে লাঞ্ছিতের অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক : স্থানীয় সরকার অধিদপ্তর (এলজিইডি) যশোর অফিসের মধ্যে হারুণ অর রশিদ নামে এক...

সম্প্রীতি ধরে রাখার আহ্বান এমপি নাবিলের

নিজস্ব প্রতিবেদক : সম্প্রীতি ধরে রাখতে নৌকায় ভোট দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন যশোর-৩ আসনের সংসদ সদস্য...

যশোরে বাবা ও চাচার বিরুদ্ধে মেয়ের মামলা

নিজস্ব প্রতিবেদক : যশোর শহরতলীর শেখহাটিতে পথ রোধ করে হত্যার উদ্দেশ্যে মারপিট করে জখম, শ্লীলতাহানি...

যশোর বঙ্গবন্ধু প্রথম বিভাগ ফুটবল লিগের ‘খ’ গ্রুপের সেরা রাহুল

নিজস্ব প্রতিবেদক : গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে রেলিগেশন এলাকায় থাকা নওয়াপাড়া খেলোয়াড় কল্যাণ সমিতির কাছে...