Sunday, May 29, 2022

পানিতে ভাসছে ধান, শেকড় গজিয়েছে অনেক ক্ষেতে ন্যায্য দাম নিয়ে চিন্তায় কৃষক

মহিউদ্দিন সানি : ঘূর্ণিঝড় অশনির প্রভাবে গত কয়েকদিনের বৃষ্টিতে যশোর সদর উপজেলার নরেন্দ্রপুরে ফসলের ব্যাপক ক্ষতিসাধন হয়েছে। ক্ষেতে কেটে রাখা পাকা ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। শ্রমিক সংকটে অনেক জমির পাকা ধান সংগ্রহ করতে পারছে না বলে জানিয়েছেন চাষিরা। আর শ্রমিক পাওয়া গেলেও মাঠের ধান ঘরে তুলতে গুণতে হচ্ছে বাড়তি খরচ। এমন পরিস্থিতিতে কাটা ধান মাঠেই ফেলে রাখতে হচ্ছে অনেক কৃষককে। এতে লোকসানের আশঙ্কায় রয়েছেন তারা।
একই অবস্থা জেলার ৮ উপজেলায়। ঘূর্ণিঝড়ের খবর শুনে অনেক কৃষক ক্ষেতের কাচা ও আধাপাকা বোরো ধান কেটে ঘরে তুলেছেন। তবে শ্রমিক সংকট থাকায় এবং বৈরি আবহাওয়ার কারণে বেশির ভাগ ধান মাঠে থেকে যাওয়ায় তাতে শেকড় গজিয়েছে।
নরেন্দ্রপুরের কৃষক মতিয়ার রহমান কাজী বলেন, ‘আমি এবার ১ বিঘা জমিতে বোরো ধানের চাষ করেছিলাম। হওয়া ধান আমরা ঘরে তুলতে পারিনি। আমার সম্পূর্ণ ধানে শিকড় হয়ে গেছে। এ ধানে আর চাল হবে না। শ্রমিক পাইনি। বাধ্য হয়ে পরিবারের লোকজন নিয়ে ধান কাটলেও ঘরে তুলতে পারিনি। এখন আমাদের কিভাবে দিন চলবে সেই চিন্তার মধ্যে পড়ে গেছি।’
প্রতি বছর খুলনা বিভাগের বিভিন্ন জেলা থেকে রূপদিয়া বাজারে শ্রমিকেরা শ্রম বিক্রির জন্য আসে। এবারে চোখে পড়েছে ভিন্ন চিত্র। রূপদিয়ার শ্রম বেচাকেনার হাটে এবার শ্রমিকের চেয়েও শ্রমিক কিনতে আসা মানুষের সংখ্যা বেশি। বাঘারপাড়া থেকে আসা একজন কৃষক জানান, ‘৪৮ শতকের ১ বিঘা ধান কেটে, বেধে দিতে ১০ হাজার টাকা চাচ্ছেন শ্রমিকেরা। এরকম পরিস্থিতিতে ধান ও বিচালি বেঁচেও শ্রমিকের মজুরি পরিশোধ করা সম্ভব হবে না।’
খুলনা জেলার পাইকগাছা থেকে ধান কাটতে আসা শ্রমিক হাফিজুর রহমান বলেন, ‘দ্রব্যমূল্যের যে দাম তাতে এক হাজার টাকা জনের দাম না হলে চলে না। বাজারে ৭ থেকে ৮ শ টাকা জনের দাম চলছে। যদি ন্যায্য মূল্য পায় তবে বিক্রি হবো নাহলে হবোনা।’
এদিকে মৌসুমের শুরুতে ভালো মানের ধান না পেয়ে বিপাকে পড়েছেন আড়তদাররা। রূপদিয়া বাজারের আড়ত ব্যবসায়ী শান্ত সাহা বলেন, বৈরি আবহাওয়া ও শ্রমিক সংকট থাকায় কৃষকরা সঠিক সময়ে ধান বাজারে আনতে পারছে না। বর্ষায় নষ্ট হওয়া ধান আমরা কিনতে পারছি না। যে ধানের গুণগত মান খারাপ ওইসব ধান রাইস মিলের মালিকরা ফিরিয়ে দিচ্ছে। এতে আমাদের মৌসুমি ব্যবসা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। চাষির পাশাপাশি আড়তদাররাও ক্ষতিগ্রস্ত।
বাঘারপাড়া উপজেলার ধলগ্রামের কৃষক রফিকুল বিশ্বাস এবার পাঁচ বিঘা জমিতে ধানের আবাদ করেছিলেন। ফলনও হয়েছিল ভালো। কিন্তু বৃষ্টিতে সব ধান ঘরে তুলতে পারেননি। শ্রমিক সংকটে বেশিরভাগ ধান পানিতে নষ্ট হবার উপক্রম। যে কারণে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন বলে জানান। একই ধরণের কথা বলেন, ঝিকরগাছার মাটিকুমড়া গ্রামের শেখ মোস্তফা। তিনি এবার দুই বিঘা জমিতে ধান করেন। কিন্তু ৭০ ভাগ ধান পানির নীচে বলে জানিয়ে বলেন, এবারের ধানে ব্যাপক লোকসান দিতে হবে। শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না, পাওয়া গেলেও অনেক টাকা মজুরি চায়। যে কারণে শ্রমিক নিতে পারছি না।
কয়েকজন কৃষক জানান, ঈদের দিন থেকেই থেমে থেমে বৃষ্টি শুরু হয় জেলাটিতে। এর পর টানা দু’দিন কড়া তাপদাহের পর গেল পাঁচদিন ধরে থেমে থেমে মাঝারি বৃষ্টি হচ্ছে। সঙ্গে ঝড় বইছে। বৃষ্টিপাত ও ঝড়ো বাতাসে জেলার বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এতে ক্ষতির মুখে পড়েছেন জেলার কৃষকেরা।
যশোর বিমানবন্দর নিয়ন্ত্রিত আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, গত ৫ দিনে যশোরে ১০২ মিলি মিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে বুধবার ও বৃহস্পতিবার দুপুর তিনটা পর্যন্ত ৪৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এতে ফসলের মাঠগুলোতে পানি জমে পাকা কাটা ধান নষ্ট হচ্ছে। উপজেলার কৃষকদের অভিযোগ, ফসল রক্ষায় অতিরিক্ত অর্থ খরচ করেও বৃষ্টিতে মিলছে না শ্রমিক। এতে ক্ষেতেই পচে যাচ্ছে ধান। পানিতে ডুবে যাচ্ছে তাদের স্বপ্ন। সবচেয়ে বেশি মণিরামপুর, চৌগাছা, শার্শা ও সদর উপজেলায় বৃষ্টিতে বেশির ভাগই ধান পানিতে তলিয়ে গেছে বলে জানিয়েছে কৃষি কর্মকর্তারা।
মণিরামপুর উপজেলার চাঁদপুর গ্রামের কৃষক আমির হোসেন এবার সাড়ে ৮ বিঘা (৪২ শতকে বিঘা) জমিতে বোরো ধানের চাষ করেছেন। তার ক্ষেতের সব ধান পেকে গেছে। তিনি সাড়ে চার বিঘা জমির ধান কেটে ক্ষেতে শুকাতে দিয়েছিলেন। তিন দিনের বৃষ্টিতে তার ক্ষেতে প্রায় এক হাত পানি জমে গেছে। তিনি বলেন, ‘ক্ষেতে কোথাও এক হাত আবার কোথাও প্রায় হাঁটু পানি। ক্ষেতে বিছিয়ে দেওয়া ধানগাছ পচে গেছে। ধানের গাছ থেকে শিষ ভেঙে পড়ছে। পানিতে ভিজে ধানের অঙ্কুরোদগম শুরু হয়েছে। বেশি টাকা দিয়েও কোনো শ্রমিক পাচ্ছি না। খুব ক্ষতির মুখে পড়েছি।
ঝিকরগাছা উপজেলার নিশ্চিন্তপুর গ্রামের আনোয়ার হোসেন জানান, চার বিঘাধানের মধ্যে ১০ কাঠা জমির ধান বাড়িতে এনেছি। বাকি ধান মাঠে ভিজছে। বিচালি হবে না, আটি কেটে বাড়ি আনতে হবে। একই গ্রামের সেকেন্দার আলীর মাঠে একবিঘা জমির ধান কাটা ছিল। সেগুলো বাড়ি আনার জন্য স্ত্রীসহ মাঠে কাজ করতে দেখা গেছে। রাস্তার উপরে শুকিয়ে তারপর বাড়ি আনতে হবে বলে তারা জানায়। ইজ্জত আলী ও জিয়াউর রহমানকে ধানের আটি কাটতে দেখা যায়। তারা জানায়, জমিতে পানি জমে আছে। আবার ধান পেকে গেছে। যদি পানি শুকানোর জন্য অপেক্ষা করি, তাহলে ধান ঝরে যাবে। এভাবে বৃষ্টি হতে থাকলে কৃষক ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যাবে। গবাদিপশুর খাদ্য সংকটসহ কৃষক চরম লোকসানের মধ্যে পড়বে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের যশোর কার্যালয়ের উপপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) দীপঙ্কর দাশ বলেন, চলতি মৌসুমে জেলায় বোরো ধানের চাষ হয়েছে ১ লাখ ৫৮ হাজার ৫০৫ হেক্টর জমিতে। চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ লাখ ৭৮ হাজার ৪৫৯ মেট্রিক টন। বুধবার পর্যন্ত ৯৫ হাজার ১০৩ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে। জেলার ৬০ শতাংশ জমির ধান কাটা হয়েছে। এর মধ্যে ৫৫ শতাংশ জমির ধান কৃষকের ঘরে উঠে গেছে। তবে শ্রমিক সংকট না থাকলে চাষিদের তেমন ক্ষতি হতো না। বৃষ্টিতে ক্ষেতে কেটে রাখা ধানের কিছুটা ক্ষতি হয়েছে। ভিজে যাওয়া ধানের গাছ থেকে শিষ ভেঙে পড়ছে। ধানের অঙ্কুরোদগম শুরু হয়েছে। ভিজে যাওয়া ধানের দাম কম হবে।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

সর্বশেষ

খুলনা-কলকাতা রুটে বন্ধন এক্সপ্রেস আজ ফের চালু

নিজস্ব প্রতিবেদক: আজ রোববার থেকে ফের কলকাতা-খুলনা রুটে ‘বন্ধন এক্সপ্রেস’ রেল চলাচল শুরু হবে।...

রসুনের গায়ে আগুন!

সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিতে বেড়েছে ৫০ টাকা ক্ষুব্ধ ক্রেতা, স্বস্তিতে নেই কিছু বিক্রেতাও জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক: এবার ভোক্তার...

আনারসের পাতা থেকে সুতা সৃজনশীল কাজে পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন

অপার সম্ভাবনার দেশ বাংলাদেশ। কিন্তু হলে কি হবে। সম্ভবনা থাকলেই তো আর আপনা আপনি...

দড়াটানার ভৈরব পাড়ে মাদকসেবীদের নিরাপদ আঁখড়া

নিজস্ব প্রতিবেদক: যশোর শহরের ঘোপ জেলরোড কুইন্স হাসপাতালের পূর্ব পাশে ভৈরব নদের পাড়ে মাদকসেবীদের...

আজকের মধ্যে অবৈধ ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক বন্ধ না হলে ব্যবস্থা

কল্যাণ ডেস্ক: দেশে অনিবন্ধিত ও নবায়নহীন অবস্থায় পরিচালিত অবৈধ বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার...

নিরপেক্ষ সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে : মির্জা ফখরুল

ঝিনাইদহ প্রতিনিধি: বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, দেশে আওয়ামী লীগের অধীনে আর...