Friday, July 1, 2022

প্রতিকূল পরিবেশ: শ্যামনগর উপকূলে শিশুদের বেড়ে ওঠার গল্প

এস এম মিজানুর রহমান, শ্যামনগর (সাতক্ষীরা): শ্যামনগর উপকূলের তৌফিক এলাহী গাবুরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র। তৌফিকের বাম হাতে একটি পানির বোতল ও ডান হাতে ছোট আকৃতির নেট । তাকে দেখা গেল ভাঙাচোরা বেড়িবাঁধ ধরে নদীর পানির দিকে তাকিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে আসতে। কি যেন খুঁজছে সে। তৌফিক হঠাৎ নদীতে নেমে পড়েই জাল দিয়ে ক্ষুদ্রাকৃতির কিছু একটা শিকারের চেষ্টা করে।

শুধু তৌফিক নয়, তার মতো একই এলাকার আবু হুরাইয়া (৮), নাইম (৫), জান্নাতিসহ (৭) অসংখ্য শিশুকে দেখা গেল একইভাবে শিকারে মেতে উঠতে।

তৌফিক বললো, আমরা পায়রা মাছের বাচ্চা। বাজারে বিক্রি করবো। প্রতিপিস দুই টাকা। টাকা দিয়ে খাবার কিনে খাই, অনেক সময় খাতা-কলম কিনি।

এ ভাবে কেউ পাঁচটা পায়, কেউ ছয়টা আবার কেউ কেউ ১৫-২০টাও পায়। এদের মধ্যে আবু হুরাইয়া গাবুরা নিজামিয়া দাখিল মাদ্রাসার সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। সে বলল, সবাই স্কুলে যায়। অবসর সময় নদীতে পায়রার বাচ্চা ও চিংড়ির রেণু ধরে। এগুলো বাজারে বিক্রি হয়। ৫-১০-১৫ টাকা যা আয় হয়। অনেক সময় বাড়ির জন্য তরিতরকারিও কেনা লাগে এই টাকায়।

আবু হুরাইয়া বললো, আমাদের এখানে সব জায়গায় পানি। পানির সাথেই বসবাস। সবাই ছোট বেলা থেকেই নদীতে ওঠানামা করে। নৌকা চালাতে পারে। আবার অন্য কোন কাজ না থাকায় নদীতে মাছ ধরেই আয় করতে হয়। আব্বা-আম্মার সাথে সবাই ছোট বেলা থেকেই রেণু ধরতে শেখে। এখানে খেলাধূলা করার জায়গা তেমন নেই। তাই অবসর কাটে নদীতে পায়রার বাচ্চা বা চিংড়ির রেণু ধরেই। আবার কারো যদি একটু খাবার খেতে ইচ্ছা করে, আব্বা-আম্মা তো টাকা দিতে পারে না, তখন আমরাই নদী থেকে পায়রার বাচ্চা ধরে বিক্রি করে খাবার খাই।

কোন প্রতিকূল পরিবেশই যেন উপকূলের শিশুদের আটকাতে পারে না। অদম্য প্রাণ শক্তিই তাদের বেড়ে ওঠার পাথেয়।

যার প্রমাণ মিললো পাঁচ বছরের শিশু নাইমকে দেখে। নাইম জন্মগতভাবে প্রতিবন্ধী। তার ডান পা নেই। দুই হাতের আঙুলগুলোও অসম্পূর্ণ। সেও দিব্যি অন্যান্য শিশুদের সাথে পায়রা মাছের বাচ্চা ধরতে ব্যস্ত।
প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিধস্থ সাতক্ষীরার দ্বীপ ইউনিয়ন গাবুরা ও পদ্মপুকুরের শিশুদের শৈশব কাটছে এভাবেই।
প্রতিকূল পরিবেশে তৌফিক, আবু হুরাইয়া, নাইমদের জীবনযাপন স্বাভাবিক মনে হলেও তাদের বিকাশ যে স্বাভাবিকভাবে হচ্ছে না, তা স্পষ্ট।

সাতক্ষীরা জেলা নাগরিক কমিটির নেতা, পরিবেশ কর্মী অধ্যক্ষ আশেক-ই-এলাহী বলেন, উপকূলের শিশুদের সবচেয়ে বড় সমস্যা তাদের খেলাধূলা ও চিত্ত বিনোদনের সুযোগ নেই। বার বার প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিধস্ত হওয়ায় তাদের খেলার মাঠগুলো যেমন নষ্ট হয়ে গেছে। তেমনি চিংড়ি ঘেরের কারণে কৃষি জমি কমে যাওয়ায় খেলার মাঠ কমে গেছে। আগে শিশুরা ধান কাটার পর কৃষি জমিতে খেলা করতে পারতো।

তিনি বলেন, নদীর পানি লবণ। আগে শিশুরা নদীতে রেণু ধরে মিষ্টি পানির খালে গোসল করে বাড়ি যেত। এখন মিষ্টি পানির খালগুলোও নেই। ফলে লবণ পানিতে দীর্ঘক্ষণ অবস্থান করা বা মিষ্টি পানির সংস্পর্শ না পাওয়ায় তাদের শরীরে নানা রকম রোগ বালাই বাসা বাধছে। একই সাথে তারা অপুষ্টিতে ভুগছে। আপাতত দৃষ্টিতে যেটা স্বাভাবিক মনে হচ্ছে, সেটা আসলে স্বাভাবিক নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তারা দিন দিন বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

সর্বশেষ

হতদরিদ্রদের চালের দামও বাড়ল ৫ টাকা

ঢাকা অফিস: খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় দেশের ৫০ লাখ হতদরিদ্র মানুষের কাছে বিক্রি করা চালের...

নির্দলীয় সরকার নিয়ে উত্তপ্ত সংসদ

ঢাকা অফিস: বৃহস্পতিবার সংসদে নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে তুমুল বিতর্ক হয়েছে। বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা...

শাহীন চাকলাদারকে ছাড়লেন একদল নেতা!

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক: যশোরে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে আবারও আলোচনায় গ্রুপ বদলের নেতাকর্মীরা। বিভিন্ন মাধ্যম থেকে...

বাজেট পাস আজ কার্যকর

ঢাকা অফিস: চোখে পড়ার মতো বড় কোনও সংশোধনী ছাড়াই পাস হয়েছে নতুন ২০২২-২৩ অর্থবছরের...

ঈদুল আজহা ১০ জুলাই

ঢাকা অফিস: বাংলাদেশের আকাশে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় জিলহজ মাসের চাঁদ দেখা গেছে। আগামী ১০ জুলাই...

পদ্মা সেতু : ইউনূসের বিরুদ্ধে অভিযোগের তথ্য উইকিলিকসে

ঢাকা অফিস: পদ্মা সেতুতে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন বাতিলের নেপথ্যে যার নাম সবার শীর্ষে, তিনি নোবেল...