মঙ্গলবার, অক্টোবর ৪, ২০২২

বঙ্গবন্ধু হত্যা ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন

অধ্যাপক সুকুমার দাস :

১৯৭২ সাল। ৩০ লক্ষ শহীদের পবিত্র রক্ত, ২ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে পাওয়া স্বাধীনতার রং তখনও টকটকে লাল। বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে ডাক দিলেন দেশগড়ার। সে ডাকে সাড়া দিতে আমরা তখনকার ছাত্র-যুবকরা কল-কারখানা,কৃষিতে উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে ছাত্র-যুব ব্রিগেড গড়ে ঝাঁপিয়ে পড়লাম।

আমরা তখন কিশোর তারপরও বড়দের পিছন পিছন শহরতলীর গ্রামে, জেজেআই, নওয়াপাড়া জুট মিলে কৃষক, শ্রমিকদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে কাজ করেছি, আবার গেয়েছি দেশগড়ার লক্ষ্যে উদীচীর আয়োজনে রাস্তায়-রাস্তায়, গ্রামে-গঞ্জে উদ্দীপনামূলক গনসঙ্গীত ‘চল ভাই একসাথে যাই ক্ষেত-খামার শোনেন দেশবাসী ভাই, সোনার দেশ গড়তে হলে সোনার মানুষ হওয়া চাই’ ইত্যাদি। তখন যশোরে প্রাচীন সাংস্কৃতিক সংগঠন ছিল সুরবিতান, তাদের শক্তি তেমন ছিল না, মাইকেল অর্কেষ্ট্রা ছিল, তারা আধুনিক ও পপ গান করতো,দেশভক্তিমূলক গান গাইতো না তারা,আর ছিল স্বরলিপি, প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা টিপু সুলতান এটি গঠন করেন জাহিদ হাসান টুকুনদের বাড়িতে। এই দলের সদস্যরা সুরবিতানের অপভ্রংশ। তারা রবীন্দ্রসঙ্গীত, নজরুলগীতি, দেশের গান করতো। ৭৫ পরবর্তীকালে স্বরলিপি অস্তিত্বহীন হয়ে পড়ে।

আন্তর্জাতিকভাবে আমেরিকা ও চীন আমাদের মুক্তিযুদ্ধে বিরোধীতা করেছিল পাকিস্তানের সাথে অতি দোস্তি থাকার কারণে। এর রাজনৈতিক কারণ ছিল পাকিস্তানের দূতিয়ালিতে চীন-মার্কিন সম্পর্ক জোড়া লাগানো। আমেরিকা ইয়াহিয়া খানের মাধ্যমে চীনের সাথে বৈঠকের ব্যবস্থা করে।

সদ্য স্বাধীন দেশটা যখন সবাই মিলে গড়া উচিত ঠিক তখনই স্বাধীনতার বছর ঘুরতে না ঘুরতে আওয়ামী লীগের তরুণ কর্মীদের একটা বিরাট অংশ নিয়ে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল গঠিত হলো। বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র, সামাজিক বিপ্লব ইত্যাদি চটকদার শ্লোগানে তরুণ সমাজকে ভীষণভাবে আকৃষ্ট করলেন তারা। চীনের কমিউনিস্ট পার্টির সাথে এদেশের যে সমস্ত বন্ধুরা যুক্ত ছিলেন তাদের একটি অংশ বঙ্গবন্ধু’র মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত এ দেশকে স্বীকার করেননি। ৭১এ পরাজিত জামাত-শিবিরের সকল কর্মী সমর্থকরা যারা এতদিন লুকিয়ে ছিল, ধীরে ধীরে তারা বের হতে শুরু করলো । এই তিন অপশক্তির যুগপৎ দেশবিরোধী আন্দোলন সাথে অর্থনৈতিকভাবে বিধ্বস্ত সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ আর বঙ্গবন্ধু’র দলের মধ্যে বিশ্বাসঘাতকদের অংশ যারা ঘাপটি মেরে বসে ছিল ঝোপ বুঝে কোপ মারার লক্ষ্যে। এদের সকলের মুখপাত্র হয়ে যুক্ত হলেন তখনকার দিনের দুটি জাতীয় সংবাদপত্র ‘গনকন্ঠ’ও ‘হককথা’।

স্বাধীনতার বছর নাই পেরোতে সরকার বিরোধীই শুধু না,সরকার পতনের লড়াইয়ে নেমে পড়লেন এরা সকলে কোমর বেঁধে। এমনকি ১৯৭৪ এর ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের দিন তারা হরতাল আহ্বান করেন। সাথে ভারতবিরোধী যাবতীয় অপপ্রচার নিয়ে। একটি উদাহরণই যথেষ্ট। পাকিস্তান আমলে দিয়াশলাই এর গায়ে ইংরাজিতে লেখা থাকতো safety matches স্বাধীনতার পর দিয়াশলাই গায়ে বাংলায় লেখা হলো ‘নিরাপদ দিয়াশলাই’, একজন জাতীয় নেতা যশোর টাউন হল ময়দানে দিয়াশলাই এর একটি বাক্স দেখিয়ে বললেন,এই দেখেন স্বাধীনতার পর নিরাপদরা সব দখল করে নিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সকল অবদান নিমিষে উবে গেল।

এই অবস্থার মাঝে আমেরিকা PL-৪৮০ এর অধীনে পাঠানো খাদ্য দিতে ইচ্ছাকৃতভাবে দেরি করিয়ে কৃত্রিম খাদ্য সংকটের মাধ্যমে ১৯৭৪ সালে দূর্ভিক্ষ সৃষ্টি করে লক্ষাধিক মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়। সব মিলিয়ে চরম অস্থিরতার মাঝে বঙ্গবন্ধু বাধ্য হয়ে বাকশাল গঠন করলেন ৭৫ এর শুরুতে। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে দেশ যখন ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক ভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর পথে, ঠিক তখনই জাতীয়, আন্তর্জাতিক চক্রান্তের শিকারে জীবন দিলেন বঙ্গবন্ধু স্বপরিবারে।

সমগ্র জাতি স্তব্ধ। প্রতিবাদের ভাষা হারিয়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ে জনগণ। দেশজুড়ে শুরু হয় চরম অস্থিরতা,প্রত্যেকে প্রত্যেককে অবিশ্বাস করতে শুরু করে তখন। সারাদেশে সকল ধরনের রাজনৈতিক কর্মকা- নিষিদ্ধ। আমরা সাংস্কৃতিক কর্মীরা ওই গান শেখার উছিলায় নিয়মিত উঠাবসা করি উদীচীতে। সাংস্কৃতিক সংগঠনও তখন যশোরে হাতে গোনা,তাদের মধ্যে আবার রাজনৈতিক বা আদর্শিক ভাবনা নেই বললেই চলে। আমি তখন উচ্চমাধ্যমিক দিব। রাজনৈতিকভাবেও সচেতন। উদীচীতে নিয়মিত বসা ও আলোচনা হয়।

১৯৭৫ এর ১৬ ডিসেম্বর ডা.রবিউল হক এর পরামর্শে রবীন্দ্রনাথ সড়কের একতলা ভবনের হোমিওপ্যাথি কলেজের মাঠে (মাঠটি এখন আর খুঁজে পাওয়া যাবে না) অনুষ্ঠান হয়েছিল ‘ইতিহাস কথা কয় ‘নামে গীতি-নকশা, যার রচয়িতা ছিলেন রবিউল ভাই আর সঙ্গীত আয়োজন ছিল আমার। সেখানেই প্রথম বঙ্গবন্ধুর কথা প্রকাশ্যে বলা হলো। গান করলাম ‘লাখো লাখো হাত ভেঙেছে আজকে ভীরুতা খিল’ এই গানের এক জায়গায় আছে, ‘একটি ডাকে এতগুলো প্রাণ দিয়েছে সাড়া, ভূমিকম্পে দৈত্যপুরী দিয়েছে নাড়া’। শত শত মানুষ এই অনুষ্ঠান উপভোগ করেন সেদিন। শুরু হলো নবযাত্রা।

১৯৭৬ এর শেষে অথবা ১৯৭৭ এর শুরুতে করলাম ঐতিহাসিক গীতি আলেখ্য মাহমুদ সেলিম রচিত ‘ইতিহাস কথা কও’। এর জন্য সেলিম ভাই ‘একুশে পদক’ পেয়েছেন। সারাদেশে বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণ করার সাহস যখন কারোর নেই, সেই সময় এই গীতি আলেখ্যের মাধ্যমে আমরা শুধু বঙ্গবন্ধুর নামই না আলেখ্যের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ পর্যন্ত বাজিয়েছি।

এদিকে সাতক্ষীরা, খুলনা, ওদিকে রাজশাহী, কুষ্টিয়া। এছাড়া যশোর জেলার এমন কোনো অঞ্চল হাট-মাঠ-ঘাট নেই যেখানে এই গীতি আলেখ্য মঞ্চায়ন করিনি। অনেক জায়গায় প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও পড়তে হয়েছে। তারপরও আমরা এটিকে মানুষের কাছে নিয়ে গেছি গুরুদায়িত্ব মেনে, কারণ আমাদের সামনে একদিকে রবীন্দ্রনাথ অন্যদিকে বঙ্গবন্ধু। অর্থাৎ বাংলাদেশ, বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে এগিয়ে নিতে হলে, বাঁচিয়ে রাখতে হলে এই মুহূর্ত ‘ইতিহাস কথা কও’ এর কোনো বিকল্প নেই। তাই শত বাঁধা বিপত্তিকে মাড়িয়ে আমরা এর মঞ্চায়ন চালিয়ে গেছি।

এখন বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুদিনে কোনো রকমে একটা ছোট্ট আবৃত্তি অনুষ্ঠান, প্রতিযোগিতা সেটাও দায়সারা গোছের করে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সম্পন্ন করা হয়। হয়না গনসঙ্গীত,গণনাটক,গণনৃত্য। কিসের যেন বাঁধা,ভয়। অথচ এই গণসঙ্গীত, গণনাটক, গণনৃত্যের মাধ্যমেই আমরা বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে বিচার চেয়ে দেশব্যাপী আন্দোলন গড়ে তুলি।

দেশজুড়ে চলছে সাংস্কৃতিক বন্ধ্যাত্বতা। এ থেকে আমাদেরকে বেরিয়ে আসতেই হবে অন্যথায় এদেশ তালিবানি রাষ্ট্রে পরিণত হবেই হবে। তখন চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া কিছুই করার থাকবে না। আলামত শুরু হয়ে গেছে।

লেখক : সভাপতি, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, যশোর

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

সর্বশেষ

চাঁচড়ায় রনি হত্যাকাণ্ডে ১২ জনের নামে মামলা

নিজস্ব প্রতিবেদক : যশোর শহরতলীর চাঁচড়ায় রনি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় কোতোয়ালি থানায় মামলা হয়েছে। নিহত রনির...

মাতৃদেবীজ্ঞানে আসন নেয় সৃজিতা ঘোষাল

এসআই ফারদিন : সোমবারের সকালটা জেগে উঠেছে ঢাক-বাদ্যের তালে। আর এই ঢাকের তাল বলছে মহা...

এলজিইডি যশোর অফিসের মধ্যে ঠিকাদারকে লাঞ্ছিতের অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক : স্থানীয় সরকার অধিদপ্তর (এলজিইডি) যশোর অফিসের মধ্যে হারুণ অর রশিদ নামে এক...

সম্প্রীতি ধরে রাখার আহ্বান এমপি নাবিলের

নিজস্ব প্রতিবেদক : সম্প্রীতি ধরে রাখতে নৌকায় ভোট দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন যশোর-৩ আসনের সংসদ সদস্য...

যশোরে বাবা ও চাচার বিরুদ্ধে মেয়ের মামলা

নিজস্ব প্রতিবেদক : যশোর শহরতলীর শেখহাটিতে পথ রোধ করে হত্যার উদ্দেশ্যে মারপিট করে জখম, শ্লীলতাহানি...

যশোর বঙ্গবন্ধু প্রথম বিভাগ ফুটবল লিগের ‘খ’ গ্রুপের সেরা রাহুল

নিজস্ব প্রতিবেদক : গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে রেলিগেশন এলাকায় থাকা নওয়াপাড়া খেলোয়াড় কল্যাণ সমিতির কাছে...