Wednesday, July 6, 2022

বিনা স্বপ্নেই নামজাদা ফটো সাংবাদিক

বুলবুল আহমেদ: তিনি একজন নামজাদা ফটো সাংবাদিক। ফটো-সাংবাদিক বলে কোনো পেশা আছে, একসময়ে সেটাও জানতেন না। ‘ফটোগ্রাফার’ হবেন, কল্পনার সার্কেলে সেটাও ছিলো না।

‘দশে চক্করে ভগবান ভূত হয়’। তাঁর বেলায় উল্টো ঘটনা। ডেস্পারেট-রাজনীতি করতাম। রাজনীতিটা ভুল ছিলো না। ভুল ছিলো বিশ্বাসের জায়গাটা। একটা দুইটা ভয়ংকর অপারেশন করে ফেললে সব পাল্টে যাবে। যেমন করে চাই তেমন হয়ে যাবে দেশটা, সেই ইউটোপিয়ান চিন্তার মধ্যে শুধু ঝামেলা ছিলো।

তাতে যা ঘটবার, ঘটলো। বাড়ি থেকে বিতাড়িত হলেন। তাড়া খেলেন রক্ষী বাহিনীর। ‘মারাত্মক অবস্থা’। ইন্টারমেডিয়েড পড়ি। নেতাদের আদেশকে মনে করি ভগবানের হুকুম। এক অপারেশন করে ভাগতে হলো। সেই কাহিনী জটিল। মহাখালীর ছেলেটা পুলিশের তাড়া খেয়ে একরাতেই ঢাকা টু বরিশাল। সেখানে তিন দিন। বরিশাল থেকে খুলনা হয়ে রাজশাহী। আত্মগোপনের মধ্যে একটা জোশ আছে। সেই জিনিসটা রাজশাহী আসার পর খানিক পোতায়া গেলো।

কারণ, মনে হলো, চট করে রক্ষীবাহিনী এতদূর চেইজ করার কথা ভাববে না। দ্বিতীয়ত, ছোটবেলাটা পার হয়েছে এখানে। একাত্তরের যুদ্ধে বাবা মরেছেন এখানে, পাকিস্তানি বন্দুকের গুলি খেয়ে। সবচেয়ে বড়ো ভাই যুদ্ধে গেছে এখান থেকেই। এ শহরের গলি-ঘুপচি সব ঠোঁটস্থ। অনেক বন্ধুবান্ধব। কয়েকটা দিন শান্তি মতো খানাপিনা আর কাতচিৎ হয়ে শুয়ে ঘুমিয়ে চলে গেলো।

ছেলেবেলার বন্ধু রহমান। স্মাগলিং-এর ব্যবসা। রাতে নৌকায় গুড়া দুধের বস্তা নিয়ে পার হয়। ফেরত আসে ইলেকট্রনিকসের মাল নিয়ে। কাজটায় রহমানের আরো ম্যান পাওয়ার দরকার।

বন্ধুর বিজনেসে ফিট হয়ে গেলেন তিনি। প্রতি শটে পাঁচশো। যেতে পাঁচশো। আসতে পাঁচশো। সেই সময়ে অনেক টাকা। রিস্কের মধ্যে শুধু পুলিশের টহলে পড়লে টুপ করে জলে নেমে যেতে হবে।
অল্পদিনে হাতে হেভি মাল এসে গেলো। রহমানরে কইলাম, দোস্ত কয়টা দিন আমি ইন্ডিয়া ঘুরে আসি। বেশিদিন এক জায়গা থাকলে ভ্যাজাল আছে। রহমান-ই সব সাইজ করে দিলো।

গলা-কাটা পাসপোর্ট। রাজশাহী থেকে বহরমপুর। বহরমপুর থেকে সুপারি গোলা। সেখান থেকে ভগবান গোলা। ভরসার মধ্যে হাতে আছে কয়েক হাজার টাকা। কাউকে জানি না। কিছু চিনি না। ব্যাপারটা এতোদিন পরেও ভাবতে গেলে শরীরটা ভয়ে ঠান্ডা হয়ে আসে কথাগুলো বলে তিনি তাঁর সুসংবদ্ধ দাঁতগুলো বের করে হাসলেন।
মাসে ২০০ টাকার থোক চুক্তিতে বহরমপুরের যে হোটেলে থাকতেন, সেই হতশ্রী হোটেলের চেহারা-সুরত ছিলো আশি বছরের দাঁতপড়া খুনখুনে বুড়ির মতো। টাকা ফিনিশ হয়ে আসছিলো। কষ্টেসৃষ্টে একটা স্টেশনারি দোকানে কাজ পাওয়া গেলো। ‘শ্রীমা’ দোকানের নাম। দিন রোজ আট টাকা। সকালের জলখাবার ফ্রি।

প্রথম দিনটা পার হলো কোনো রকম। দ্বিতীয় দিনেই লাগলো গিট্টু। দোকান মালিক তাঁকে সন্ধ্যা বাতি দিতে বললেন। কথাটা শুনে হা করে তাকিয়ে থাকলেন তিনি। মালিক ভুরু কোঁচকালেন, পুজো দিতে জানো না তুমি ?.. তোমার নাম তো বুলবুল ? ঠিক বলচি ?

প্রশ্নটা শুনে তাঁর শরীরটা দলা হয়ে গেলো। ফিসফিস করে বললেন, বুলবুল ঠিক আছে। কিন্তু আমি মুসলমান। আট টাকা হাতে নিয়ে শ্রীমা থেকে বিদায় হলেন। সেদিন থেকে শুরু আরেক কঠিন জীবনের।

হোটেলে যিনি রান্না করতেন, সেই বামুন ঠাকুরের সঙ্গে আগে থেকে খাতির ছিলো। একটা সিগারেট খেতে দিলেই অনেক গল্প করা যেতো। পৈতা বানানোর নানান রকম হিশাব আছে। সাড়ে নয় পেচ, সাড়ে সাত পেঁচ, সাড়ে তিন পেঁচ। নানা অংক। একটু একটু করে বুঝে নিয়ে বাজার থেকে কিনে আনলেন সুতা। হোটেল রুমের দরজা বন্ধ করে বানানো হলো পৈতা। সেটি পরে তারপর কলকাতায় রওনা।

ট্রেনে পরিচয় এক ফ্যামিলির সাথে। তাঁদের সাথেই দমদম পর্যন্ত আসা। বিশ টাকায় একটা ঘর পাওয়া গেলো। সেই ফ্যামিলির ভদ্রলোকের গুড়া সাবানের ব্যবসা। সেই মাল বিক্রির হকারি শুরু হলো। বাইশ টাকায় এক পেকেট গুড়া-সাবানের সাথে একটা প্লাস্টিকের বালতি। এক পেকেট বেচতে পারলে চার টাকা কমিশন।

সকাল দশটার পর থেকে ঘুরে ঘুরে বেচতেন। দলবল নিয়ে মহল্লায় যেতেন। বাড়ির গৃহকর্তা বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলে মহিলাদের কাছে সস্তা দেখিয়ে মাল গছাতেন। কোম্পানি রেট আঠারো টাকা। বালতি মাত্র চার টাকা। প্রচারের জন্য এই অফার।

সস্তায় পেয়ে বাড়ির মহিলারা কিনতো।
তবে সেই পাড়ায় এক বছরের মধ্যে তাঁরা আর যেতেন না। নকল ডিটারজেন্ট। ভুয়া বালতি। আসল ইৎরমযঃ কোম্পানির জায়গায় কায়দা করে ইৎরঃব লেখাটা চট করে কেউ বুঝতে পারতো না।
এইভাবে দিনে হকারি ব্যবসা, সন্ধ্যার পরে বাড়ি গিয়ে চোলাই সেবন। চলে যাচ্ছিলো।
হকার-বন্ধু গৌরাঙ্গ। একসাথে কাজ করতে করতে ঘনিষ্ঠতা। একদিন সে বললো, এমন করে চলবে না ডিয়ার। সন্ধের পরে আয় অন্য কিছু একটা করি। আমাদের মেস্-বাড়ির পাশে দমদম ফটোগ্রাফি অ্যাসোসিয়েশন। গৌরাঙ্গর সাথে আড্ডা দিতে যাই। সমস্ত টগবগে তরুণরা আসে। ওদের পাল্লায় পড়ে দু বছরের ডিপ্লোমা কোর্সে ঢুকে গেলাম। জীবনের আরেকটা মোড় উকিঁ দিতে শুরু করলো।

হঠাৎই একদিন কলকাতা ঘুরতে আসা বাংলাদেশের এক ছেলের সাথে দেখা হলো।
পরিচয়ের পর জানা গেলো সে বাড্ডার ছেলে।
– আপনি বাড্ডা’র ? বাদলদের বাসা চেনেন ?
– হ্যা। আমাদের চার বাসার পরে।
-বাদলের ছোট ভাই বুলবুলকে চেনেন ?
– চিনবো না ক্যান ! .. সে তো মারা গেছে।
-মারা গেছে ?
– হ।
-কবে ?
– অনেক বছর। আর বইলেন না ভাই, অনেক পেথেটিক। রাজনীতি করতো। রক্ষীবাহিনী তারে পিটায়ে মেরে ফ্যালছে।

তারপর বাড্ডার সেই ছেলেটাকে নিয়ে তিনি দমদম গেলেন। ঘরে বসিয়ে যতœ করে খাইয়ে দাইয়ে বিদায় দিলেন।

তিন সপ্তাহ পরেই মেঝো ভাইকে সংগে নিয়ে ছেলেটি দমদমের বাসায় হাজির। এতো বছর পরে ভাইকে পেয়ে গলা জড়িয়ে ধরে সেকি কান্না..!! ভাই চলে গেলেন যশোর বর্ডার দিয়ে। তিনি ফিরলেন আবারো গলাধাক্কা পাসপোর্টে। ফেরার পর প্রথম জানতে পারলেন, দেশে এই ফাঁকে অনেক ঘটনা ঘটেছে।

কঠিন জীবনযুদ্ধের গ্যাড়াকলে ফেঁসে গিয়ে, দম এমনভাবে আটকা পড়েছিলো যে, একেবারেই আন্দাজ করতে পারেন নি, ‘পচাত্তর সাল’টা দমকা বাতাস হয়ে দেশে ওইরকম এসে উড়াল দিয়ে চলে গেছে।

দেশে এসে দলের বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ হলো। তারফলে সবার জানা হলো, ‘তিনি মরেন নাই’। দলের বন্ধু বান্ধবই বললেন, এবার একটা কিছু করো। কী করবেন ? এই একজীবনে জানার মধ্যে জানা হয়েছে শুধু একটাই কাজ। ছবি তোলা। ছবি তুলতে তুলতে সাংবাদিকতা। সুনাম। দেশে বিদেশে পুরস্কার। নানা সম্মান। একজীবনে নানান ঠেক। নানান বদল। তাঁর একটি মেয়ে। একটি ছেলে। পড়াশোনায় ব্যস্ত।
এখন অনেক মেধাবী ছেলেমেয়ে ফটো-সাংবাদিকতা করছে। সন্তানেরা এ পেশা বেছে নেবে কী না জানা নেই। আপত্তিও নেই। তিনি মনে করেন, প্রতিটি মানুষ আলাদা, পেশা বেছে নেয়ার অধিকারও আলাদা। সম্পূর্ণ নিজস্ব। তিনি মনে করেন, জীবন সবকিছু মিলিয়ে অনেক সুন্দর।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

সর্বশেষ

৩ সেপ্টেম্বর প্রেসক্লাব যশোরের বিশেষ সাধারণ সভা

প্রেসক্লাব যশোরের গঠনতন্ত্র পরিবর্ধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে মঙ্গলবার ক্লাবের কার্যনির্বাহী কমিটির দিনব্যাপী...

কেন্দ্রীয় ত্রাণ তহবিলে ২০ লাখ টাকা অনুদান দিল যশোর বিএনপি

নিজস্ব প্রতিবেদক উত্তরবঙ্গে বন্যার্তদের জন্য বিএনপির কেন্দ্রীয় ত্রাণ তহবিলে ২০ লাখ টাকা অনুদান দিল যশোর...

যশোরে কলেজছাত্রীর আত্মহত্যা

নিজস্ব প্রতিবেদক মঙ্গলবার যশোরে গলায় ফাঁস দিয়ে কামরুন্নাহার কেয়া (১৮) নামে এক শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন।...

পর্যবেক্ষণে অসুস্থ বিএনপি নেতা নূর-উন-নবী

নিজস্ব প্রতিবেদক যশোর সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি নূর-উন-নবী (৬৬) ব্রেন স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে ঢাকার একটি...

জাতীয় স্কুল ফুটবলের শিরোপা যশোরে নিয়ে আসতে চায় পলাশ বাহিনী

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রথমবার অংশ নিয়েই জাতীয় স্কুল ফুটবল প্রতিযোগিতার ফাইনাল যায়গা করে নিয়েছে বেনাপোল মাধ্যমিক...

যশোর বক্সিং টুর্নামেন্টে শ্রেষ্ঠ মঈন স্মৃতি সংসদ

নিজস্ব প্রতিবেদকপাঁচটি স্বর্ণ ও দু’টি সিলভার নিয়ে যশোর জেলা বক্সিং টুর্নামেন্টের শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছে...