Wednesday, July 6, 2022

বীরপ্রতীক “রকেট জলিলের” কবরটি রয়েছে অবহেলায়!

বিশেষ প্রতিনিধি : যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার শিমুলিয়া ইউনিয়নের পাল্লা মোড়লপাড়ায় পারিবারিক গোরস্তানে শায়িত আছেন বীরপ্রতীক মো. আব্দুল জলিল। যিনি রকেট জলিল নামে খ্যাত।

কিন্তু অসম সাহসী এই যোদ্ধার কবরখানা বেশ অযত্নে, অবহেলায় রয়েছে।
বাঁশের চটা দিয়ে ঘেরা; যার বেশ খানিকটাই নষ্ট হয়ে গেছে। কবর সংরক্ষণে বা পাকাকরণে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

বিষয়টি নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করেন তার বড় স্ত্রী হালিমা বেগম, ছোটভাই মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল খালেক মোড়লও।
অবশ্য, উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) বলছেন, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে শহিদ মুক্তিযোদ্ধাদের কবর বাঁধানোর প্রকল্প পাশ হয়ে আসছে। খুব শিগগিরই কাজ শুরু হবে।

অসম সাহসী মুক্তিযোদ্ধা বীরপ্রতীক মো. আব্দুল জলিল ওরফে রকেট জলিল ২০১৭ সালের ৮ ডিসেম্বর তার নিজ বাড়িতে মৃত্যুবরণ করেন।

রকেট জলিল :
একাত্তরের রণাঙ্গনে হানাদার বাহিনীর কাছে ছিলেন মূর্তিমান এক আতঙ্ক! জীবদ্দশায় তিনি নিজেই এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘রকেট জলিল আমার খেতাব।’

একাত্তরে একই দিনে তিনি ৪-৫ জায়গায় অপারেশনে নেতৃত্ব দিতেন। অল্পসময়ে দ্রুত কাজ সম্পন্ন করার কারণেই খান সেনারা ওই সময় বলত, ‘রকেট হ্যায় না কিয়া হ্যায়!’ মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ ১৯৯৬ সালে তাকে ‘বীরপ্রতীক’ খেতাবে ভূষিত করা হয়।

যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার শিমুলিয়া ইউনিয়নের মনোরম একটি গ্রামের নাম পাল্লা। ১৯৪৬ সালে এই গ্রামের মহর আলী মোড়ল আর চেয়ারবানুর ঘরে জন্ম আব্দুল জলিলের। স্থানীয় স্কুলেই লেখাপড়া। ১৯৬৩ সালের দিকে তিনি মুজাহিদ কোম্পানিতে যোগ দেন। ১৯৬৫ সালের যুদ্ধে অংশ নেন। যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে মুজাহিদ কোম্পানি থেকে কেউ সেনাবাহিনী, কেউ পুলিশ কিংবা ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস-ইপিআরে যোগ দেন। আব্দুল জলিল ১৯৬৮ সালে ইপিআরে যোগ দেন সিপাহী পদে।

৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণে উজ্জীবিত হয়ে স্বাধীনতার ঘোষণা শুনেই মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন ইপিআরের রাজশাহী অঞ্চলে কর্মরত এই জওয়ান। ২৮ মার্চ তিনিসহ চারজন চারটি রাইফেল নিয়ে রাজশাহী থেকে প্রথমে যশোরে, এরপর একইদিনে বেনাপোলে ক্যাম্পে গিয়ে যোগ দেন। রাতেই মার্চ করেন যশোরের চাঁচড়া ক্যাম্পে।
তিনি সরাসরি অংশ নেন মুক্তিযুদ্ধে। ৮ নম্বর সেক্টরে মেজর আবু মঞ্জুরের নেতৃত্বে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন; টুআইসি ক্যাপ্টেন নাজমুল হুদার তত্ত্বাবধানে ছিলেন ।

জুলাই মাসে ঝিকরগাছার গঙ্গাধরপুর-দোসতিনায় পাকবাহিনীর সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হন। গুলিটি বামপায়ের হাঁটুর নিচে বিদ্ধ হয়, নিহত হয় চার পাকসেনা। এরপর ভারতের বনগাঁ হাসপাতাল থেকে গুলি বের করে ব্যান্ডেজ বাঁধা অবস্থায় নৌপথে চলে আসেন। ভারতে এক রাত ছিলেন। কারণ, তার অনুপস্থিতিতে অন্যরা হতাশ হতেন।

ঝিকরগাছার বনমান্দার এলাকায় দ্বীপের মতো একটা আস্তানাই ছিল রাধানগর ক্যাম্প। চারপাশে পানি, নৌকায় যাতায়াত করতে হতো। অনেক অপারেশনে তিনি সরাসরি অংশ নেন।

বীরপ্রতীক রকেট জলিলের ভাই আব্দুল খালেক রণাঙ্গণের স্মৃতি হাতড়ে বলেন, ‘জুলাইয়ের প্রথম দিকের ঘটনা। দোসতিনার প্রাইমারি স্কুলের মাঠ, বল ফিল্ডে ক্যাম্প করেছে পাকিস্তানিরা। ছুটিপুরে তাদের হেডকোয়ার্টার। তখন বর্ষাকাল। ক্যাম্পের সেনারা প্রতিদিন বদলি হয়। সকাল ১০টা থেকে সাড়ে দশটা নাগাদ তারা ক্যাম্প বদল করে। ভাইয়ের (রকেট) নেতৃত্বে ২০ জনের একটি টিম নিয়ে মধুখালীর শালবাগান এলাকায় বড় একটি অপারেশনের সিদ্ধান্ত হয়। রাত ৪টার দিকে ভাই (রকেট জলিল), আব্দুস সাত্তার, গোলাম মোরশেদ, রফিকুল ইসলাম, চাপাতলার সাত্তারসহ ২০জন সেখানে অ্যামবুশ করি। এরইমধ্যে রাস্তায় ১২টি এন্টি পারসোনাল জাম্পিং মাইন পুঁতে রাখা হয়। খুবই দক্ষতার সঙ্গে কাজটি সম্পন্ন করা হয়।’

সকাল ১০টা থেকে সাড়ে ১০টার মধ্যে সেনারা স্থান বদল করে। কিন্তু যথাসময়ে পাকসেনারা কেউ আসছে না। বেলা ১১টার দিকে তারা রেকি করতে বের হন। টিপ টিপ বৃষ্টি হচ্ছে। মাথায় টোকা, হাতে নিড়েন আর কাঁস্তে।
হঠাৎই আবির্ভূত হয় পাকিস্তানিরা! জিজ্ঞেস করে, ‘মুক্তি হ্যায়?’ ভাই চুপ। সেনারা ভাইকে আটক করে নিয়ে যেতে থাকে দোসতিনার মধ্য দিয়ে। বেশ বিচলিত হন তিনি! কলেমা পড়তে থাকেন; ভাবেন- রাজাকাররা যদি দেখিয়ে দেয়, তবেই শেষ!

এরপরের ঘটনা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। একই সঙ্গে সাহসিকতারও।
“রকেট জলিলের মাথায় একটা গুলির বাক্স দিয়ে তাকে হাঁটিয়ে নিয়ে যাচ্ছে সেনারা। কিছুদূর যাওয়ার পর কাদামাটিতে ইচ্ছে করেই তিনি পড়ে যান। মনে মনে ভাবেন, যদি অসুস্থ মনে করে তাকে ছেড়ে দেয় সেনারা। কিন্তু বিধি বাম! উল্টো লাথি মেরে জোর করে উঠিয়ে আবারও তার মাথায় বাক্সটি তুলে দেয়। এভাবে পৌঁছে যান দোসতিনার মোমিন মাস্টারের কাঁঠালবাগানে। সেখানে দু’জন সেনার উপস্থিতিতে গাঁইতি দিয়ে বাঙ্কার খুঁড়তে বলে সেনারা। দু’এক কোপ দেওয়ার পর জলিল দেখেন, পাকসেনারা গাছের শেকড়ের ওপরে বসে বিশ্রাম নিচ্ছে দুজন দু’দিকে মুখ করে। এই সুযোগ! আস্তে আস্তে চলে যান তাদের কাছে। গাঁইতি দিয়ে একজনের মাথা বরাবর দেন কোপ! দু’ভাগ হয়ে যায় মুহূর্তেই। শব্দ শুনে অন্যজন সামনে ফিরতেই তাকেও…। মাথার ঘিলু-রক্তের ছোপ ছিটকে মুখে লাগে। দুটি চাইনিজ রাইফেল নিয়ে দেন দৌড়। পরদিন সেই জায়গায় আবারও ১২টি মাইন স্থাপন করা হয়। সকাল সাড়ে ১০টা নাগাদ সেনা সদস্যরা সেখানে হল্ট করায় বাহিনীকে। তিন শতাধিক সৈন্য, কাদামাটিতে, অস্ত্র কাঁধে সতর্ক অবস্থায়।

জীবদ্দশায় এসব ঘটনার বর্ণনা দিয়েছিলেন রকেট জলিল। তার ভাষায়, ‘আমরা ২০ জনের মতো অ্যামবুশে। একজনের দায়িত্ব ছিল মাইনের সঙ্গে যে শক্ত সুতো বাঁধা, সেটা টান দেওয়ার। আর্মিদের উপস্থিতিতে দেখি সে আর নেই; পালিয়েছে আরও ৫-৬জন। আমি বাঙ্কারে, এসএলআর হাতে। এখান থেকে পালানো সম্ভব নয়। ইয়া আলি বলেই সুতো ধরে টান দেই। বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হয় মাইন। এসএলআর নিয়ে দাঁড়িয়ে ব্রাশ ফায়ার করি। অন্য সঙ্গীরাও ফায়ার শুরু করে দেন। ফায়ার করতে-করতে আমরা পেছাচ্ছি। লাশ পড়ছে কাদার মধ্যে। কতগুলো সৈন্য মারা গেছে দেখিনি। কিন্তু মাইন বিস্ফোরণের পর দেখি, একটি খেজুরগাছের ডালে মাথাবিহীন দু’সৈন্য ক্রস চিহ্নের মতো ঝুলে রয়েছে। গরুরগাড়িতে করে লাশগুলো নিয়ে যাওয়া হয় ঝিকরগাছা থানায়। যারা নিয়ে গিয়েছিলেন, তারা লাশ গুণে জানিয়েছিলেন, ৩২জন। পরদিন কপোতাক্ষের পানিতে পাওয়া যায় আরও ছয়টি লাশ।’

১৯৯৬ সালে ‘বীরপ্রতীক’ পদকপ্রাপ্ত এই মুক্তিযোদ্ধার ‘বীরপ্রতীক ভাতা’ ও আড়াই বিঘা জমি থেকে পাওয়া ফসল থেকেই সংসার চলছে।

তার অবর্তমানে তিন স্ত্রী যথাক্রমে হালিমা বেগম, সালেহা বেগম আর মোমেনা খাতুন রয়েছেন পাল্লা মোড়লপাড়ার একতলা বাড়িতে। বড়ঘরে ২ ছেলে এক মেয়ে, মেঝজনের এক মেয়ে আর ছোটজনের ১ ছেলে ও দুই মেয়ে। মেয়েদের সবার বিয়ে হয়ে গেছে। এক ছেলে পাল্লা বাজারে একটি ছোটখাট দোকান নিয়ে ব্যবসা করছেন। অন্যরা দেশের বাইরে।

বেশকিছুদিন আগে তার বাড়িতে (বীরপ্রতিক নীড়) কথা হয় রকেট জলিলের স্ত্রী হালিমা বেগম ও মোমেনা খাতুনের সঙ্গে।

হালিমা বেগম বলেন, যুদ্ধের সময় আমার বড়ছেলে কোলে। রকেটের জন্যে এক হাতে প্রাণ নিয়ে ছুটে গেছি তার ও তার সঙ্গীদের খাবার নিয়ে। জীবন হাতে নিয়ে পৌঁছে দিয়েছি অস্ত্র, গোলাবারুদ।

তিনি আক্ষেপ করেন, প্রায় তিন বছর তিনি গত হয়েছেন। কিন্তু তার কবরখানা সংরক্ষণে কেউ কোনও ব্যবস্থা নেয়নি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আকুল আবেদন- তিনি যেন বীরপ্রতীকের কবরখানা সংরক্ষণের ব্যবস্থা করুন। আগামী প্রজন্ম যেন জানতে পারে মুক্তিযুদ্ধে তার কীর্তি।

একই কথা বলেন বীরপ্রতীকের ছোটভাই মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল খালেক মোড়লও।
এ বিষয়ে কথা হয় বীরপ্রতীকের বড়ভাইয়ের ছেলে, ঝিকরগাছা উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার শাহজাহান আলীর সঙ্গে। তিনি বলেন, ঝিকরগাছার বেনেয়ালী থেকে পাল্লা সড়কটি রকেট জলিলের নামে নামকরণ ও তার কবর সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে গত ফেব্রুয়ারিতে উপজেলা পরিষদসহ মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে রেজুলেশন করে পাঠানো হয়েছে। এরআগের ইউএনও আরাফাত রহমানের সঙ্গে এ বিষয়ে আমাদের কথা হয়। তিনি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন বলে জানিয়েছিলেন। কিন্তু কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। নতুন ইউএনও মাহবুব-উল-হক সাহেবের সঙ্গে দু-একদিনের মধ্যে এ বিষয়ে কথা বলবো
জানতে চাইলে ঝিকরগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহবুব-উল-হক বলেন, মিনিস্ট্রি থেকে একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। গণপূর্ত অলরেডি কাজ পেয়েছে। এরআগে পরিষদের সিদ্ধান্ত মোতাবেক যেসব কবর বাঁধাইকরণের জন্যে পাঠানো হয়েছিল, সেগুলোর কাজ শুরু হবে। সেক্ষেত্রে শিগগিরই বীরপ্রতীক আব্দুল জলিলের কবরখানা পাকাকরণের কাজ হবে।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

সর্বশেষ

পিঠে ছুরিবিদ্ধ খোকন নিজেই গাড়ি ভাড়া করে আসেন যশোর হাসপাতালে

নিজস্ব প্রতিবেদক : পিঠে বিদ্ধ হওয়া ছুরি নিয়ে নিজেই যশোর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেছেন...

নায়কদের নামে কোরবানির গরু, আপত্তি জানালেন ওমর সানি

কল্যাণ ডেস্ক : আগামী ১০ জুলাই পবিত্র ঈদুল আজহা। মুসলিম সম্প্রদায় এই ঈদে পশু কোরবানির...

এশিয়ার বাইরের উইকেটের যে কারণে অসহায় মোস্তাফিজ

ক্রীড়া ডেস্ক : মোস্তাফিজুর রহমানের বোলিং দেখে ক্যারিয়ারের শুরুতে অনেকে তাকে বলতেন, 'জোর বল করা...

নতুন ২৭১৬ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত

কল্যাণ ডেস্ক : শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উভয় বিভাগের আওতায় আরও ২ হাজার ৭১৬টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করার...

নওয়াপাড়া বন্দরে অবৈধ তালিকায় ৬০ ঘাট

অবৈধভাবে গড়ে উঠা ঘাটের কারণে কমছে নদীর নাব্যতা ৫ বছরে অর্ধশত জাহাজ ডুবিতে ক্ষতিগ্রস্ত...

মণিরামপুরে জমজমাট কোরবানির পশু হাট

আব্দুল্লাহ সোহান, মণিরামপুর : দক্ষিণবঙ্গের অন্যতম হাট মণিরামপুরের গরু-ছাগলের হাট। প্রতি শনি ও মঙ্গলবার এখানে...