Saturday, May 28, 2022

বেড নেই খাবার নেই : এরই নাম যশোর জেনারেল হাসপাতাল

 টেস্টের জন্য ছুটতে হয় ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে

সুনীল ঘোষ: ‘বেড নেই, খাবার নেই’ অবস্থায় চলছে যশোর জেনারেল হাসপাতাল। অথচ হাসপাতালটিতে প্রতিদিন ৪ শতাধিক রোগী ভর্তি থেকে চিকিৎসা নেন। এর মধ্যে ২৫০ জনের খাবার বরাদ্দ থাকে। বাকিদের বাইরে থেকে খাবার আনতে হয়। তবে খাবার পাওয়া আর না পাওয়া সব রোগী ও তাদের স্বজনদের রয়েছে নানা অভিযোগ। খাবারের মান, বাইরে থেকে খাবার আনা এবং ওষুধসহ নানা পরীক্ষা নীরিক্ষার পেছনে সবারই গুনতে হয় মোটা অংকের টাকা।

হাসপাতালের স্টুওয়ার্ড শাহাজাহান আলী বলেন, বেডের বাইরে থাকা ভর্তি রোগী হাসপাতালের খাবার পান না। তাদের বাইরে থেকে খাবার সংগ্রহ করতে হয়। এটিই হাসপাতালের নিয়ম। তিনি বলেন, ১৭ জানুয়ারি করোনারি কেয়ার ইউনিটে ২৮ বেডের বিপরীতে ৬৩ জন রোগী ভর্তি আছেন। ৪১০ জন রোগী ভর্তি আছেন ২৫০ শয্যার হাসপাতালে। দুটি বিভাগে ভর্তি থাকলেও বেড যারা পাননি, তাদের সরকারি খাবার পাওয়ার সুযোগ নেই।

খাবারের মান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পণ্যের দাম বাড়লেও খাবারের মানে ত্রুটি নেই। তিনি বলেন, প্রত্যেক রোগীর জন্য সকালের নাস্তা হিসেবে ১০০ গ্রাম পাউরুটি, একটি ডিম ও দুই পিস কলা দেয়া হয়। দুপুরে ভাতের সাথে ৮০ গ্রাম মাছ বা মাংস ও ডাল দেয়া হয়। রাতে দেয়া হয় ভাত, ডিম ও সবজি।

তিনি বলেন, সর্বশেষ ২০১২-১৩ অর্থ বছরের খাবার সরবরাহের জন্য টেন্ডার হয়। গত ১০ বছরে সব পণ্যের দাম বেড়েছে। কিন্তু টেন্ডার না হওয়ায় আগের রেইটেই খাবার সরবরাহ করে আসছেন দু’জন ঠিকাদার। তারা হলেন-শফিকুর রহমান ও হাফিজুর রহমান। উচ্চ আদালতে রিট থাকায় টেন্ডার কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। যেকারণে তারাই খাবার সরবরাহ করে আসছেন। পণ্যের উর্দ্ধগতির বাজারে কীভাবে আগের রেইটে খাবার সরবরাহ করেছেন ঠিকাদার এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তারা শুধু খাবারই সরবরাহ করেন না। ওষুধ থেকে শুরু করে নানা চিকিৎসা সামগ্রী তারাই সরবরাহ করেন। খাবারের লোকসান অন্যসব খাত থেকে পুষিয়ে নেয়ার সুযোগ আছে বলে তার ধারণা।

হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে ভর্তি কয়েকজন রোগী ও তাদের স্বজনদের সাথে কথা হয়। অধিকাংশ রোগী ও তাদের স্বজনরা ভয়ে মুখ খুলতে চান না। খাবার না পেলেও ফ্লোরে জায়গা পেয়ে চিকিৎসা পাচ্ছেন-এটাই যেন তাদের জন্য অনেক। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন রোগী বলেন, সত্যি বললে ডাক্তার তো দূরের কথা, নার্স-ওয়ার্ড বয়রাও উকি দিয়ে দেখবে না। তখন বিনা চিকিৎসায় মরতে হবে-ক্ষোভের সুরে বলেন এসব কথা। রোগীর চিকিৎসা করাতে এসে অনেক স্বজন রোগী হয়ে বাড়ি ফেরেন। অর্থাভাবে তাদের অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটাতে হয়। টয়লেট-বাথরুমের বেহালদশা। দুর্গন্ধময় বাথরুম থেকে বেরিয়ে খাবার মুখে তুলতে পারেন না অনেকে।

এদিকে বেডে ভর্তি রোগীরাও মুখ খুলতে চান না। তাদের ভয় অভিযোগ করলে বেড থেকে নামিয়ে দেয়া হবে। ঠিকঠাক চিকিৎসাসেবাও পাবেন না। খাবারের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলে বেশ কয়েকজন রোগী ও তাদের স্বজনরা অভিযোগ করেন, হাসপাতাল থেকে যেসব খাবার দেয়া হয়, তা মুখে তোলা যায় না। কক বা পাকিস্তানি মুরগীর ডিম দেয়, তাতে বিকট গন্ধ। ডাল দেখে মনে হয় হলুদ গোলানো পানি। মাছ বা মাংসের মানও ভাল না। যেকারণে অনেকেই বাড়ি থেকে, কখনো হোটেল রেস্তোরা থেকে খাবার কিনে আনতে হয়।

আর যারা বেডের বাইরে ফ্লোরে থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন, তাদের অভিযোগের অন্ত নেই। তারা বলেন, খাবার না পাওয়ার কারণে বাইরে থেকে কিনে আনতে হয়। আর রোগীর স্বজনদের দিন কাটে অনাহারে-অর্ধাহারে। সেই সাথে বেশিরভাগ ওষুধসহ চিকিৎসা সরঞ্জাম বাইরে থেকে কিনতে হয়। ইসিজির মতো ছোট-খাটো পরীক্ষা নীরিক্ষার জন্যেও ক্লিনিকে পাঠানো হয়। দুপুর ১২টার পর হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগে লোক পাওয়া যায় না। কাউকে খুঁজে পাওয়া গেলে বলা হয় আজ আর হবে না, বাইরে থেকে করিয়ে আনেন। তারা নির্দিষ্ট কিছু ক্লিনিক ও ডায়ানগস্টিক সেন্টারে পাঠান। এরফলে কাড়ি কাড়ি টাকা চলে যায় ওষুধ ও পরীক্ষা নীরিক্ষার পেছনে।

বেশি বিপাকে পড়তে হয় গ্রামাঞ্চলের রোগী ও তাদের স্বজনদের। তাদের খাবারের পেছনে চলে যায় মোটা অংকের টাকা। দু’একটি ট্যাবলেট বাদে দামী ঔষধ, ইনজেকশনসহ চিকিৎসা সামগ্রী বাইরে থেকে কিনতে হয়। পরীক্ষা নীরিক্ষার টাকা যোগাড় করতে গরু-ছাগল বিক্রি, এমনকি জমিজমা পর্যন্ত বন্ধক রাখতে হয় অনেকের।
হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরা খাজুরার আব্দুল জানান, যশোর জেনারেল হাসপাতালের নার্স ও ওয়ার্ডবয়দের আচার-ব্যবহার এতটাই খারাপ যে, তাদের কথার জবাব দিতে গেলে হাতাহাতি করতে হয়। অনেক রোগীর স্বজনরা বাকবিতন্ডাও করেন কিন্তু তাতে নিজেরাই ক্ষতিগ্রস্ত হন। রোগী অবহেলার শিকার হন।

বারবাজারের বেলাট গ্রামের বিকাশ নামে এক স্বজন জানান, তার মা ব্রেনস্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছিলেন। হাসপাতালে প্রপার চিকিৎসা না পেয়ে তাকে ক্লিনিকে চিকিৎসা করানো হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, সব রকমের টেস্ট বাইরে থেকে করতে হয়েছে। হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ ডাক্তাররা ঠিকমত রোগীর কাছে আসেন না। ইন্টার্ন ডাক্তাররা চিকিৎসা দেন। তিনি বলেন, ইন্টার্ন ডাক্তারদের পাশাপাশি নার্স-ওয়ার্ডবয়রা হাসপাতালের কার্যক্রম টিকিয়ে রেখেছেন। ইন্টার্ন ডাক্তাররা গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখছেন।

হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আক্তারুজ্জামান বলেন, বেডের বাইরে ভর্তি রোগীদের সরকারি খাবার দেয়ার সুযোগ নেই। এটি মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তে চলে।

তিনি বলেন, আমরা চেষ্টা করি ভালমানের খাবার দেয়ার। তিনি বলেন, উচ্চ আদালতে রিট থাকায় গত ১০ বছর টেন্ডার হয় না। আগের ঠিকাদাররাই খাবার সরবরাহ করেন। সময়ের ব্যবধানে পণ্যের দাম বেড়েছে কিন্তু ঠিকাদার আগের রেইটে কীভাবে ভালমানের খাবার সরবরাহ করছেন প্রশ্নোত্তরে তিনি বলেন এটা তাদের ব্যাপার। তবে আমরা নিয়মিত তদারকি করি। তিনি বলেন নিম্নমানের খাাবার সরবরাহের অভিযোগ আমার জানা নেই।
তিনি বলেন, হাসপাতালে ওষুধের সংকট নেই। অধিকাংশ পরীক্ষা-নীরিক্ষা হাসপাতালেই হয়। এ খাত থেকে সরকার ভাল রাজস্ব আয় করতে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

সর্বশেষ

প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে কটূক্তির প্রতিবাদে শার্শা ছাত্রলীগের বিক্ষোভ

নিজস্ব প্রতিবেদক: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে কটূক্তির প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল করেছে শার্শা উপজেলা ছাত্রলীগ।...

বর্ণিল আয়োজনে ‘ভোরের সাথীর’ ১৬ বছর উদযাপন

নিজস্ব প্রতিবেদক: বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা, কেক কাটা, আলোচনাসভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে যশোরে পালিত...

সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশে ভারতে স্বীকৃতি পেল যৌন পেশা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ভারতে যৌন পেশাকে আর বেআইনি বলা যাবে না। বৃহস্পতিবার (২৬ মে) এই...

বিশ্বের খর্বকায় কিশোরের স্বীকৃতি পেলেন দোর বাহাদুর

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: নেপালের ১৭ বছর বয়সি দোর বাহাদুর ক্ষেপাঞ্জিই এখন বিশ্বের সবচেয়ে খর্বকায় কিশোর।...

‘বলিউডে কাজ পেতে হলে আমাকে আরও সময় দিতে হবে’

বিনোদন ডেস্ক: টেলিভিশনের জনপ্রিয় তারকা উরফি জাভেদ। যিনি নিজের অদ্ভুত সব ফ্যাশনের জন্য পরিচিত...

টেস্টে ২ হাজারের ঘরে ছন্দে থাকা লিটন

ক্রীড়া ডেস্ক: শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে প্রথম টেস্টে ৮৮ রান করার পর, ঢাকায় দ্বিতীয় টেস্টের প্রথম...