Thursday, July 7, 2022

মানব সেবায় অনন্য ফাতিমা হাসপাতাল

জেমস রহিম রানা:
মানব সেবায় অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে চলেছে যশোরের ঐতিহ্যবাহী স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ‘ফাতিমা হাসপাতাল’। প্রতিনিয়ত নামমাত্র খরচে যশোরের বুকে লাখ লাখ মানুষকে চিকিৎসা সেবা দিচ্ছে এই হাসপাতাল। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ও দেশের মানুষের সেবার কাজে এই হাসপাতালের ভূমিকা ছিল অনেক বেশি। পাকিস্তানিদের চোখ ফাঁকি দিয়ে প্রচুর আহত মুক্তিযোদ্ধাদের বিনামূল্যে সেবা দিয়েছে এই হাসপাতাল এবং যশোর ক্যাথলিক চার্চের সদস্যরা।

বিশপ দান্তে বাত্তালিয়েন এস-এক্স’র সহযোগিতায় রেভা. ব্রাদার লিও স্টক্কো ১৯৫৭-১৯৫৮ এই হাসপাতালের কর্যক্রম শুরু করেন। প্রথমে ফাদার মারিয়েত্তির নির্মিত যশোর ক্যাথলিক গীর্জার বারান্দাকে তিনি রোগি দেখার স্থান হিসাবে ব্যবহার করতে থাকেন। তখন এটি ডিসপেনসারি হিসাবে পরিচিতি লাভ করে। ফাদারের এবং ব্রাদারের চেষ্টাই এখানে রোগি দেখা হতো এবং ওষুধ দেয়া হতো।
হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার গোড়ার কথা

১৯১৭ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় পর্তুগালের ‘ফাতিমা’ নামে একটি গ্রামে কুমারী মারীয়া তিনজন কিশোর কিশোরীর সাথে ছয়বার দেখা দেন। ১৯১৭ সালের ১৩ মে থেকে ১৩ অক্টোবর লুসি সান্তোস, জাসিন্তা এবং ফ্রান্সিসকো মার্তোর কাছে নিজেকে জপমালার বন্দিতা রাণী হিসাবে উল্লেখ করে তাদের অনুরোধ করেন জগতের ও মানুষের পাপের জন্য প্রতিদিন রোজারি মালা আবৃত্তি করতে।

১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে পোপ একাদশ পিউসের সময় ফাতিমায় মা-মারিয়ার দর্শনদানকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করে নেয়া হয়। পরবর্তীতে পোপ দ্বাদশ পিউস, পোপ ষষ্ঠ পল, পোপ দ্বিতীয় জন পল এবং পোপ ষোড়শ বেনেডিক্ট ফাতিমার দর্শনদানকে মান্ডলিক স্বীকৃতি দানের পক্ষে মত দেন।

মা মারিয়ার এই দর্শনকে স্মৃতিতে ধরে রাখার উদ্দেশ্যে ফাতিমা নগীরর নাম অনুসারে সারা বিশ্বে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন সেবামুলক প্রতিষ্ঠান। যশোর ফাতিমা হাসপাতাল তার একটি।

যশোর ফাতিমা হাসপাতালটি গড়ে উঠেছে যশোর সেক্রেড হার্ট মিশনের প্রতিষ্ঠিাতা মারিয়েত্তির কেনা জমির ওপরে। ১৮৫৫ সালে তিনি বঙ্গদেশে আসেন। এ সময় তার বয়স ছিল মাত্র ২৭ বছর। কলকাতার আর্চ-বিশপ প্রপাগান্দার আদেশ অনুসারে বহরমপুর, কৃষ্ণনগর ও যশোর এই তিনটি জেলাকে তিন পুরোহিত ফাদার আলবিনো, ফাদার লুইজি লিমানা ও ফাদার আন্তনীয় মারিয়েত্তিকে প্রচারের উদ্দেশ্যে ছেড়ে দেন।

ফাদার আন্তনীয় মারিয়েত্তি ১৮৫৬ সালের জুলাই মাসে যশোরে আসেন। তখন যশোর ছিল অস্বাস্থ্যকর স্থান। তিনি ১৮৫৬ সালের জুলাই মাসে একটি ঘর ভাড়া করে থাকতে শুরু করেন। ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে মি. এটি স্মীথ নামে যশোরের একজন ইংরেজ নীলকরের কাছ থেকে ফাদার মারিয়েত্তি ৩ হাজার টাকায় একটি কুঠি বাড়ি কেনেন।

বর্তমান ফাতিমা হাসপাতালটি এই ফাদার মারিয়েত্তির জমিতেই গড়ে উঠেছে। এরপর বহু বছর গড়িয়ে গেছে। যশোর চলে যায় কৃষ্ণনগর নগর ধর্মপ্রদেশের অধীনে।

১৯২৬ সাল থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত এখানে কর্মরত ছিলেন সালেশিয়ান পুরোহিতগণ। সালেসিয়ান পুরোহিতদের পর পরই এখানে জেভেরিয়ান পুরোহিতদের আগমন ঘটে। তারা যশোরে আসেন ১৯৫২ সালে। ওই দলের প্রধান ছিলেন দান্তে বাত্তালিয়েরেন এস-এক্স। যিনি ১৯৫৬ সালে খুলনার বিশপ পদে নিযুক্ত হয়েছিলেন।

জাভেরিয়ান সম্প্রদায়ের এই প্রথম দলের সদস্য ছিলেন ফাদার আন্তনীয় আলবার্তন, ফাদার মারিও কিওফি, ফাদার ভিত্তোরিনো দাল্লাবাল্লে এবং ফাদার আলবিনো তেসারো।

১৯৬৮ খিস্টাব্দে যশোরে আসেন ব্রাদার লিও স্টক্কো । তিনি ২য় বিশ্বযুদ্ধের কারনে চীন হতে বিতাড়িত হয়েছিলেন। কারণ ইটালিয়ানরা সে সময় ছিল চীনের বিরুদ্ধ শক্তি এবং তিনি জাতিতে ছিলেন ইটালিয়ান। তবে বলা যায় এটাই ছিল আমাদের জন্য আশীর্বাদ। সেখান থেকে তিনি বিতাড়িত হয়েছিলেন। খুলনা ধর্মপ্রদেশের তৎকালীন বিশপ দান্তে বাত্তালিয়েনের এস-এক্স’র সহযোগিতায় ও সম্মতিতে রেভা. ব্রাদার লিও স্টক্কো এস-এক্স ১৯৫৮ সালে এই হাসপাতালের কার্যক্রম শুরু করেন। প্রথম দিকে ক্ষুদ্র পরিসরে একটি ডিসপেনসারিতে এর কার্যক্রম পরিচালিত হতো।

বর্তমান খুলনা ধর্মপ্রদেশের তৎকালীন মহামান্য বিশপ দান্তে বাত্তালিয়েন এস-এক্স এর সহযোগিতায় রেভা. ব্রাদার লিও স্টক্কো ১৯৫৭-১৯৫৮ এই হাসপাতালের কর্যক্রম শুরু করেন। প্রথমে ফাদার মারিয়েত্তির নির্মীত যশোর ক্যাথলিক গীর্জার বারান্দাকে তিনি রোগি দেখার ¯‘ান হিসাবে ব্যবহার করতে থাকেন। তখন এটি ডিসপেনসারি হিসাবে পরিচিতি লাভ করে। ফাদারের এবং ব্রাদারের চেষ্টাই এখানে রোগি দেখা হতো এবং ওষুধ দেয়া হতো। ব্রাদার যশোরকেই বেছে নিলেন এবং মনপ্রাণ দিয়ে এখানেই তার ডাক্তারী প্র্যাকটিস শুরু করেন। ব্রাদার যশোরকে বেছে নেবার পেছনে কয়েকটি কারণ ছিল তা হলো :

যশোরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল প্রথম ধর্মপ্রদেশ, সুতরাং বিশপের সুনজরে যশোর ছিল ক্যাথলিকদের যাত্রার একটি প্রথম পবিত্র স্থান।

যশোর অতি পুরাতন ও ঐতিহ্যপূর্ণ শহর ছিল এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল উন্নত।

এখানেই ফাদার মারিয়েত্তি তার প্রচার জীবন শুরু করেছিলেন।
১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় দেশের মানুষের সেবার কাজে এই হাসপাতালের ভূমিকা ছিল অনেক বেশি, পাকিস্তানিদের চোখ ফাঁকি দিয়ে প্রচুর আহত মুক্তিযোদ্ধাদের বিনামূল্যে সেবা দিয়েছে এই হাসপাতাল এবং চার্চের সদস্যরা।

মুক্তি যুদ্ধের পরে যোগ দেন ব্রাদার রেমো বুখারী এবং ২০১৪ সাল পর্যন্ত ব্রাদার রেমো বুখারী তার স্বজন ছেড়ে বাংলার মানুষকে ও দেশকে ভালবেসে কাজ করে যান এবং আজ এ হাসপাতাল আধুনিক হবার পেছনে তার অবদান অনেক বেশি।

এভাবে এখনো ফাতিমা হাসপাতাল প্রতিদিন যশোরে ২০০-৩০০ রোগির সেবা দিয়ে থাকে। এখন হাসপাতালটি অনেক আধুনিক হয়েছে, বেড়েছে আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার, অনেক কম খরচে অপারেশন করা হচ্ছে। দিনে দিনে বড় হয়ে এখনও এই হাসপাতাল যশোরের বুকে লাখ লাখ মানুষকে চিকিৎসা সেবা দিয়ে যাচ্ছে।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

সর্বশেষ

ঈদের আগে আনন্দধারায় শিক্ষক-কর্মচারীরা

এমপিওভুক্ত যশোরের ৬০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিজস্ব প্রতিবেদক :  সরকার ২ হাজার ৫১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে নতুন করে এমপিওভুক্ত ঘোষণা...

নতুন রোটারী বর্ষ উদযাপন

নিজস্ব প্রতিবেদক :  রোটারী ডিস্ট্রিক-৩২৮১-এর রোটারী বর্ষের সূচনা উপলক্ষে বুধবার বিকেলে যশোর শহরের বর্ণাঢ্য র‌্যালি...

যশোর বাস মালিক সমিতির নির্বাচন : মনোনয়নপত্র কিনেই ভোটযুদ্ধে প্রার্থীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক : মনোনয়নপত্র কিনেই ভোটযুদ্ধে নেমে পড়েছেন যশোর বাস মালিক সমিতির নির্বাচনের প্রার্থীরা। শুরু...

যশোরে বিভিন্ন সহিংসতার ঘটনায় ১৫ জন আসামি

নিজস্ব প্রতিবেদক যশোর সদর উপজেলার চার এলাকায় সহিংসতার ঘটনায় কোতয়ালি থানায় আলাদা চারটি মামলা করা...

সহসা কমছে না লোডশেডিং

ঢাকা অফিস গ্যাস সংকট চলছে তাই বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিঘœ ঘটাছে। দেশজুড়ে চলছে লোডশেডিং চলছে। কবে...

অপতৎপরতা রুখতে একসাথে কাজ করতে হবে : প্রতিমন্ত্রী স্বপন

মণিরামপুর প্রতিনিধি :  পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের প্রতিমন্ত্রী স্বপন ভট্টাচার্য্য এমপি বলেছেন, শেখ হাসিনা...