মাসব্যাপীর নামে দশকব্যাপী চলছে পুলিশের মেলা

ক্ষোভে ফুঁসছেন ব্যবসায়ীরা : প্রতিকারের আবেদন অরণ্যে রোদনে পরিণত

 করোনাবিধি না মানায় ঝুঁকিতে জনজীবন

মাসব্যাপীর নামে দশকব্যাপী চলছে পুলিশের মেলাসুনীল ঘোষ: করোনার উর্ধমুখী সংক্রমণের মধ্যেও বন্ধ হয়নি যশোর পুলিশ ক্লাব মাঠের মেলা। উল্টো স্বাস্থ্যবধি ভেঙে মেলায় জনসমাগম ঘটাতে চলছে মাইকিং। পণ্য কেনাকাটা, ফার্স্টফুড খাওয়া ও রাইডিংয়ে চড়তে রীতিমত ভিড় জমছে ওই মেলায়। অথচ ওমিক্রন রোধে ১১ দফা বিধিনিষেধ জারি করে রেখেছে সরকার।

সংক্রমণ ঠেকাতে জনসমাগমের ওপরও বিধিনিষেধ জারি হয়েছে। কিন্তু বিধিনিষেধ মানছে না পুলিশ ক্লাব। তাঁত বস্ত্র, হস্ত, কুটির শিল্প বাজার-২০২১ নামে মেলার শুরু। কিন্তু এসব পণ্য বেচাবিক্রির মধ্যে আটকে নেই মেলা। হরেক রকমের চোখ ধাঁধানো পণ্যের পসরা ক্রেতা-দর্শকদের মেলায় টানছে। ব্যবসায়ী নেতারা এই মেলাকে নজিরবিহীন দাবি করেছেন।

ক্ষোভের আগুনে পুড়ছেন স্থায়ী বাজার ব্যবসায়ীরা। তাদের অভিযোগ বছরভর চলা হরেক নামের এই মেলায় ধ্বংস হচ্ছে তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য। শহরের পুলিশ ক্লাব মাঠে ভিন্ন ভিন্ন নামে মেলার আয়োজন করা হয়। শাড়ি, কাপড়, জামা, জুতো, স্যালেন্ডলসহ সব ধরনের পণ্য মেলায় বিক্রি হয়। সেখানে রকমারি সব খাবারের দোকানও আছে। সবমিলিয়ে বাজারে পাওয়া যায় এমন সব ধরনের পণ্য নিয়ে পুলিশ ক্লাব মাঠে মেলার আয়োজন হয়। ফলে বছর জুড়ে চলা মেলায় ভিন্ন একটি বাজার গড়ে ওঠায় ব্যবসায়ীরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তাঁত বস্ত্র, হস্ত, কুটির শিল্প বাজার-২০২১ নামে এবারের মেলার আয়োজক ‘আয়োজন ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট’। ব্যবসায়িক সংগঠনগুলোর দাবি, একটি সংগঠনের সাইনবোর্ডে বছরভর মেলা করার নজির কোথাও আছে বলে জানা নেই। এই মেলাকে নজিরবিহীন দাবি করেছেন ব্যবসায়ী নেতারা। তাদের অভিযোগ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বছরের ৩৬৫ দিনই পুলিশ ক্লাব মাঠে মেলা লেগে আছে। এর ফলে কর্মচারীদের ভেতন-ভাতা দিতে তারা হিমসিম খাচ্ছেন। কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। লোকসানের পাল্লা দিনে দিনে ভারি হচ্ছে। প্রশাসন ও মেলার আয়োজক কমিটির কাছে অনুরোধ করে শুধু আশ্বাসই মিলেছে, সুরাহা হয়নি। ব্যবসায়ীক নেতাদের দাবি গত এক দশকে স্থানীয় বাজার ব্যবসায়ীদের অনেকে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গুটিয়ে চলে গেছেন। ছোট ও মাঝারি গোছের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ধবংসের পথে। তারা ক্ষোভের আগুনে পুড়ছেন কিন্তু প্রশাসনের বিরুদ্ধে মুখ খোলার সাহস নেই। যে কারণে প্রতিবাদ কর্মসূচি মাঠে গড়াচ্ছে না।

স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে বৈশ্বিক মহামারি করোনার থাবা পড়েছে সব সেক্টরে। পরিস্থিতি সামাল দিতে স্বাস্থ্যকর্মীরা এখন বেসামাল অবস্থায় রয়েছে। সেই সাথে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, অফিস আদালত, শিল্প কলকারখানা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ রুটি রুজির কাজ-কর্ম প্রায় দুই বছর ধরে বন্ধ ছিল। এর ফলে আর্থিক ক্ষতির হাত থেকে পার পাননি কেউ।

এরই মধ্যে করোনার নতুন ধরন ওমিক্রন শনাক্ত হয়েছে। সরকারের ১১ দফা বিধিনিষেধ বেশির ভাগই মানা হচ্ছে না যশোর পুলিশ ক্লাবের মেলায়। সারাদিনই মেলায় প্রচুর সংখ্যক মানুষ যাচ্ছেন-আসছেন। বিশেষ করে বিকেল ও রাতে মেলায় ভিড় জমছে বেশুমার। ফলে এই জনসমাগম থেকে ওমিক্রনও ছড়িয়ে পড়তে পারে। যশোরে ইতিমধ্যে ৩ জনের দেহে ওমিক্রন শনাক্ত হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে-তারা স্থানীয়ভাবে করোনা ভাইরাসের এই নতুন ধরণে সংক্রমিত হয়েছেন। অর্থাৎ যশোর ভাইরাসটির সোশ্যাল ট্রান্সমিশন (সামাজিক সংক্রমণ) চলছে। এমনই তথ্য পাওয়া গেছে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়ের একটি গবেষণায়।

করোনার সংত্রমণ ঠেকাতে জারিকৃত বিধিনিষেধ কার্যকরে কঠোর অবস্থানের কথা বলছে জেলা প্রশাসন। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার পাশাপাশি স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে প্রচার-প্রচারণাও চালানো হচ্ছে। মাস্কসহ সুরক্ষা উপকরণ বিতরণ চলছে। কিন্তু শহরের প্রাণ কেন্দ্রে মেলার নামে এমন জনাসমগম চোখে পড়ছে না প্রশাসনের। কিন্তু জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের কাছেপিঠেই ভিড় জমিয়ে মেলা চলছে।

পুরাতন কসবা পুলিশ ফাঁড়ির প্রাচীর ঘেঁষে মেলার মাঠ। অথচ ফাঁড়ি পুলিশের ভুমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। রহস্যজনক কারণে তারা চুপ রয়েছে।

সরেজিমন মেলায় দেখা যায়, কসমেটিক্স, ইমিটেশনের গহনা, জুতা স্যান্ডেল, কোট-বেলেজার, ক্রোকারিজ ও খেলনাসহ গৃহসজ্জাসহ এমন কোন পণ্য নেই, যার স্টল নেই এই মেলায়। আছে চটপটি, বেকারি ও ফার্স্টফুডের দোকান। স্বাস্থ্যবিধি না মেনে শিশু ও কিশোরসহ সব বয়সী মানুষ নাগর দোলায় দোল খায়।

গত বছরের ১ অক্টোবর জাকজমক পরিবেশে মেলা শুরু হয়। যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক-সার্কেল) বেলাল হোসাইন মেলার উদ্বোধন করেন। তাঁত বস্ত্র, হস্ত, কুটির শিল্প বাজার-২০২১ নাম দেয়া হয় মেলার। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি তাজুল ইসলামও উপস্থিত ছিলেন। গত সাড়ে ৩ মাস ধরে চলে আসা মেলায় ১৩২টি স্টল রয়েছে। এখানে স্বাস্থ্যবিধি ও শারীরিক দূরত্ব মেনে চলার বিষয়টি শুধুমাত্র প্রচারণার মধ্যে সীমাবদ্ধ।

মাসিক ৫৫ হাজার টাকা ভাড়ায় কেউ কেউ একাধিক স্টলের বরাদ্দ নিয়ে সাজিয়ে বসেছেন কোটি টাকার পণ্যের পসরা।

প্রতি রাতে স্টলপ্রতি (দৈনিক হিসেবে) ১ হাজার ৮৩৩ টাকা তুলে নেয় আয়োজক কমিটির লোকেরা। এই হিসেবে প্রতি মাসে পৌনে এক কোটি টাকার লেনদেন হয়। সরকারের কোন খাতে এই টাকা জমা হয় কি-না ও ভ্যাট-ট্যাক্সও দিতে হয় কিনা, তা নিয়ে ধোয়াশা রয়েছে। এই মেলার আয়ের বড় একটি অংশ আয়োজক কমিটিসহ বিভিন্ন মহলের পকেটে যায়। গত শনিবার মেলার মাঠে তদরকিতে অনেককেই দেখা যায়। কিন্তু তারা কেউই নিজেদের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেননি।

যশোর কসমেটিক্স ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ও ভিক্টোরিয়া জেনারেল স্টোরের সত্বাধিকারী নুরুজ্জামান বলেন, ডিসি-এসপি ও সাংবাদিক নেতার কাছে বহুবার আমাদের দুর্দশার কথা জানিয়েছি। তারা মেলা বন্ধের আশ^াস দিয়েছেন, কিন্তু মেলা বছরের ৩৬৫দিনই চলে আসছে। এখন মুখ বুঝে সহ্য করছি।

বস্ত্র ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ও বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সহ-সভাপতি (মনসা বস্ত্রালয়ের সত্বাধিকারী) তন্ময় সাহা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমরা ব্যবসায়ীরা এসপি প্রলয় জোয়ারদারের সাথে সাক্ষাত করে বলেছিলাম পুলিশ ক্লাব মাঠে বছরভর নানা ইস্যুতে বাজার বসছে। এখানে না আছে শিক্ষণীয় কিছু, না আছে দেশী পণ্যের প্রচারের ব্যবস্থা। অথচ সারাবছর নানা ইস্যুতে মেলার নামে রমরমা ব্যবসা হচ্ছে। এর ফলে স্থায়ী বাজার ব্যবসায়ীদের পথে বসার উপক্রম হয়েছে। সব পণ্যই পুলিশ ক্লাব মাঠে বিক্রি করা হচ্ছে। যে কারণে স্থায়ীয় বাজার প্রতিষ্ঠানে বেচাকেনা নেই। কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দেয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।

তিনি বলেন, ব্যবসায়ীদের সাথে সাক্ষাত করেছিলেন পুলিশ সুপার প্রলয় কুমার জোয়ারদার। তিনি আশ^াস দিয়েছিলেন ১৫ দিনের মধ্যে মেলা বন্ধ করে দেয়া হবে। কিন্তু সেই আশ্বাস সাড়ে ৩ মাসেও বাস্তবায়ন হয়নি।
তিনি বলেন, ২০০০ সাল থেকে মেলার নামে পুলিশ ক্লাব মাঠে নানা পণ্য সামগ্রী বিক্রি করা হচ্ছে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন আপনাদের নেতাও মেলায় জড়িত।

যশোর সিট কাপড় ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি বিশ্বনাথ দত্ত বলেন, প্রশাসনকে বারংবার জানিয়ে কোন প্রতিকার পাইনি। আমাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। কারণ মেলার নামে যে বাজার খুলে বসেছে পুলিশ ক্লাব, সেখানে সব পণ্যই বিক্রি হয়। যেকারণে ক্রেতারা সেদিকেই ঝুকছেন।

তিনি বলেন, পুলিশ ক্লাবের মেলা নজিরবিহীন। একটি সংগঠন একই মাঠে সারাবছর নানা ইস্যুতে মেলা করতে পারে কি-না তা নিয়ে সন্দেহ আছে। বছরে এক মাসের জন্য একটি মেলা হতে পারে কিন্তু সারাবছর একই মাঠে মেলা আয়োজন আইনসিদ্ধ হতে পারে না। আমাদের স্থানীয় বাজার প্রতিষ্ঠানে বেচাবিক্রি নেই বললেই চলে। মেলায় সব ধরণের পণ্য পাওয়া যায় বলেও ক্রেতারা বাজারে ঢুকছেন কম। আমাদের কথা না হয় বাদই দিলাম, কিন্তু যশোরে করোনা সংক্রমণ তো বাড়ছেই। সরকারি বিধিনিষেধ আরোপ করেছে কিন্তু পুলিশ ক্লাব মাঠে তা কার্যকর হয়নি। জনস্বাস্থ্যের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দ্রুতই মেলা বন্ধ করা উচিত -যোগ করেন এই ব্যবসায়ী নেতা।

পাদুকা ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মফিদুল ইসলাম বলেন, প্রশাসনের সাথে আমরা ব্যবসায়ীরা সাক্ষাত করে মেলা বন্ধের দাবি জানিয়েছি বহুবার। কিন্তু প্রতিকার মেলেনি। আমরা ব্যর্থ হয়েছি। তিনি মিডিয়ার পজিটিভ ভূমিকার সাথে আছেন বলেও মন্তব্য করেন।

সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট যশোর শাখার সভাপতি তরিকুল ইসলাম তারু বলেন, আমরা আগেও প্রতিবাদ জানিয়েছি, আবারও প্রতিবাদ কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামবো। প্রকৃত ঘটনা হচ্ছে আলোর গোড়ায় অন্ধকার। কিন্তু জনজীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে অবৈধপন্থায় অর্থ রোজগারের অধিকার কারো নেই।

সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক হারুন অর রশিদ বলেন, এর আগে আমরা প্রেসক্লাব যশোরে সংবাদ সম্মেলন করে পুলিশ ক্লাবের মেলার প্রতিবাদ করেছিলাম। কিন্তু সরকার আইন করে আর সরকারের লোকজনই আইন ভাঙে, একারণে আমাদের প্রতিবাদ কাজে আসে না।

যশোরের সিভিল সার্জন বিপ্লব কান্তি বিশ্বাস বলেন, আমি নতুন যোগদান করেছি। মেলা হচ্ছে জেনে বন্ধের উদ্যোগ নিয়েছি।

যশোরে করোনা প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসক তমিজুল ইসলাম খানকে ফোন করা হলে তিনি বলেন, মেলার বিষয়টি জানা নেই।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে