বৃহস্পতিবার, ডিসেম্বর ৮, ২০২২

যশোরে শুষ্ক মৌসুমের শুরুতেই পানি সংকট

  • স্তর নেমেছে ২৬
  • দশমিক ৯ ফুট

আবদুল কাদের: যশোর শহরের বেজপাড়ার বাসিন্দা রইস উদ্দিনের বাড়ির টিউবয়েলে গত ২০ দিন ধরে পানি উঠছেনা। হুশতলার বাসিন্দা সরোয়ার হোসেনও একই কথা জানান। তারা জানান, পৌরসভার সরবরাহকৃত কলেও পানি পাচ্ছিনে। জেলার বেশিরভাগ টিউবওয়েলে পানি উঠছেনা। বিশেষ করে যশোর পৌর এলাকায় চলছে পানির জন্য হাহাকার।

যশোরে ভুস্তরের পানির সংকট দেখা দিয়েছে। অস্বাভাবিক নীচে নেমে গেছে পানির স্তর। ইতোমধ্যে অনেক টিউবওয়েলে পানি উঠা বন্ধ হয়ে গেছে। আর যেসব টিউবওয়েলে পানি উঠছে তার পরিমাণ খুবই কম। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অপরিকল্পিতভাবে স্যালো দিয়ে পানি তোলা এবং যত্রতত্রভাবে পুকুর-খালবিল ভরাট হবার কারণে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টি না হলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হবে।

যশোর বিএডিসির (সেচ) সহকারী প্রকৌশলী সোহলে রানা জানান, জানুয়ারি মাস থেকে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নামতে শুরু করে। এপ্রিল মাসে পানির স্তর সর্বোচ্চ নিচে নেমে যায়। তবে এবার একটু আগেভাগেই মার্চ মাস থেকেই ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে গেছে। সাধারণত বছরে গড় বৃষ্টিপাত হয় ২০৩ সেন্টিমিটার। তুলনামূলক কম বৃষ্টিপাত হওয়ায় পানির স্তর নামছে। বর্তমানে পানির স্তর ২৬ ফুট ৯ ইঞ্চি নীচে নেমে গেছে। ২০২০ ও ২০২১ সালে ২৫ ফুটে নেমেছিল। একারণে টিউবওয়েলে পানি ওঠা বন্ধ হয়ে গেছে।

যশোর বিএডিসির (সেচ) তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবদুল্লাহ আল রশিদ জানান, কৃষিকাজের সেচের কারণেও ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যায়। এখন চলছে বোরো ধানের মৌসুম। ভূগর্ভ থেকে গভীর নলকূপ ও স্যালো মেশিনে অপরিকল্পিভাবে পানি উঠানো হয়। বৃষ্টি শুরু হলে পানির স্তর স্বাভাবিক হয়ে যাবে। সাধারণত পানির স্তর স্বাভাবিক থাকে ১৫ থেকে ২০ ফুটের মধ্যে।

বিএডিসি অফিস (সেচ) সূত্রে জানা যায়, জেলায় গভীর নলকুপের সংখ্যা এক হাজার ৫৬৭। এসব নলকূপ দিয়ে ২৫ হাজার ২২৩ হেক্টর জমিতে পানি দেয়া হয়। অন্যদিকে স্যালো টিউবওয়েলের সংখ্যা ৬৩ হাজার ৭৯৩। এসব স্যালো টিউবওয়েল দিয়ে একলাখ ২৩ হাজার ৪৮২ হেক্টর জমিতে পানি দেয়া হয়।

কর্মকর্তারা জানান, আমাদের দেশে বোরো ধান চাষের সময় অনেক পানি অপচয় হয়। এক কেজি ধান উৎপাদন করতে আমাদের দেশে পানি লাগে ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজার লিটার। উন্নত ধান উৎপাদনকারী দেশ থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামে এর অর্ধেক পানি খরচ হয়। এসব দেশে এক কেজি ধান উৎপাদন করতে পানি খরচ হয় এক থেকে দেড় হাজার লিটার। কৃষিকাজে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে তারা পানি অপচয় রোধ করে। বারিড পাইপের মাধ্যমে মাটির নিচ থেকে থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামে জমিতে পানি দেয়া হয়। আমাদের দেশে জমিতে নালা কেটে পানি দেয়া হয়। ফলে অর্ধেক পানি মাটিতে চুষে নেয়। পানির অপচয় রোধ করতে ইতোমধ্যে বিএডিসির উদ্যোগে পরীক্ষামূলকভাবে যশোর জেলার বেশ কয়েকটি উপজেলায় উন্নত প্রযুক্তির বারিড পাইপের মাধ্যমে জমিতে পানি দেয়া হচ্ছে। এতে যেমন পানির অপচয় রোধ করা সম্ভব হচ্ছে, তেমনি জমিতে কম সময়ে দ্রুত পানি পৌঁছে যাচ্ছে। বোরো ধান চাষের কাজে অনেক পানি অপচয়ের ফলে প্রতিবছরে এসময় তীব্র খাবার পানির সংকট দেখা দেয়।

শার্শা উপজেলার শালকোণা গ্রামের সাহেব আলী জানান, বোরো ধান মূলত সেচনির্ভর। প্রচুর পানির প্রয়োজন হয়। বৃষ্টি না থাকায় পুরোটাই ডিজেল চালিত স্যালো দিয়ে ক্ষেতে পানি দিয়েছি। এতে বিঘায় ২ হাজার টাকার মত খরচ হয়ে থাকে।

শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট রোধ করতে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতর যশোর অফিস জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে কাজ করে যাচ্ছে। তারা শহর ও শহরতলিতে স্বল্পমূল্যে গভীর নলকূপ বসিয়ে খাবার পানি সংকট মোকাবিলার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতর যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী জাহিদ পারভেজ জানান, পানির স্তর নেমে যাবার কারণে পানি কম উঠছে। আবার অনেক কলে পানি উঠছেনা। যেসব এলাকায় পানির সংকট দেখা দেয়, ওইসব এলাকায় ৭ হাজার টাকার বিনিময়ে গভীর নলকূপ বসিয়ে খাবার পানিসহ গৃহস্থালির কাজে পানির ব্যবস্থা করা হয়। শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট মোকাবিলার জন্য গভীর নলকূপ বসিয়ে পানির সংকট মোকাবিলা করা হয়।
যশোর পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী কামাল হোসেন জানান, তাদের নিয়ন্ত্রণে ২৩০টি হস্তচালিত নলকূপ ও ২৯টি গভীর নলকূপ রয়েছে। প্রতিদিন পানির চাহিদা রয়েছে ২ কোটি লিটার। যার সবটাই সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে পানির স্তর নেমে যাবার কারণে অনেক কলে পানি উঠছেনা। বিশেষ করে বাড়ির কলে পানি পাওয়া যাচ্ছেনা। তবে যশোর পৌরসভায় ডিজিটাল মিটার স্থাপন হবার কারণে কখন টাকা শেষ হয়ে যাচ্ছে বোঝা যাচ্ছেনা। এতে অনেক সময় বিদ্যুৎ লাইন না থাকার কারণে গ্রাহকরা পানি পাচ্ছেনা। বিষয়টি আমরা সমাধানের চেষ্টা করছি।

এব্যাপারে যশোর সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজের ভূগোল বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ছোলজার রহমান জানান, প্রতিবছর অপরিকল্পিতভাবে পানি উঠানো হচ্ছে, সেই পরিমাণ পানি ভূগর্বোস্থ্য পৌছাচ্ছেনা। আবার বৃষ্টিপাত কম হচ্ছে প্রতিবছর। যেকারণে পানির স্তর নেমে যাচ্ছে। এটার রোধ করা প্রয়োজন। কৃষি কাজে পরিকল্পিতভাবে পানির ব্যবহার করতে না পারলে সামনে পরিস্থিতির অবনতি হবে।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

সর্বশেষ

সাগরে ঘূর্ণিঝড় ‘মানদৌস’, সতর্ক সংকেত বাড়ল

কল্যাণ ডেস্ক :  বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত গভীর নিম্নচাপটি ঘূর্ণিঝড় ‘মানদৌস’-এ পরিণত হয়েছে। দেশের চারটি সমুদ্রবন্দরে ১...

বিএনপি লাঠি দিয়ে মারতে আসলে লাঠি দিয়েই জবাব : প্রধানমন্ত্রী

কল্যাণ ডেস্ক :  কথায় কথায় বিদেশিদের কাছে ধর্ণা দিয়ে লাভ হবে না। বিএনপি লাঠি দিয়ে...

একাদশে ভর্তি শুরু, জেনে নিন ভর্তি ফি-আবেদন পদ্ধতিসহ সব তথ্য

কল্যাণ ডেস্ক :  একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির প্রথম ধাপের আবেদন শুরু হচ্ছে আজ (৮ ডিসেম্বর, বৃহস্পতিবার)।...

আইসিসি র‍্যাংকিংয়ে তিন বাংলাদেশির আধিপত্য

ক্রীড়া ডেস্ক :  ঘরের মাঠে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে ভারতকে হারিয়ে এক ম্যাচ হাতে রেখেই...

অবরুদ্ধ বিএনপি কার্যালয়, থমথমে নয়াপল্টন

কল্যাণ ডেস্ক : ১০ ডিসেম্বর বিএনপির ঢাকা বিভাগীয় গণসমাবেশকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়ছে। এর...

কাল থেকে শুরু বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল

ক্রীড়া ডেস্ক :  মরুর বুকে বিশ্বকাপের আয়জোন প্রথমবারের মতো। কাতারের মাটিতে বিশ্ব ফুটবলের এই মহাযজ্ঞ...