Sunday, May 29, 2022

যশোর জেনারেল হাসপাতাল যেখানে স্বাস্থ্যবিধির বালাই নেই

*আড়াইশ বেডকে ঘিরে সহস্রাধিক মানুষের অবস্থান
* করোনা সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা
*সরকারি বিধিনিষেধ কার্যকরে নেই কোনো উদ্যোগ
* দালাল সিন্ডিকেটের কব্জায় হাসপাতাল

সুনীল ঘোষ: স্বাস্থ্যবিধির বালাই নেই যশোর জেনারেল হাসপাতালে। রোগীকে ঘিরে রাখছেন স্বজনরা। এক বেডে অবস্থান করছেন বহুজন। সেই সাথে রয়েছে দালাল চক্রের অবাধ বিচরণ। দিনে-রাতে ধারণ ক্ষমতার কয়েকগুণ মানুষ হাসপাতালে অবস্থান করছেন। ফলে স্বাস্থ্যসেবার প্রতিষ্ঠানটি করোনার হটস্পট হয়ে উঠতে পারে।

২৫০ শয্যার এই হাসপাতালে দ্বিগুণ রোগী ভর্তি রয়েছে। বেড না পেয়ে তাদের মেঝেতে বিছানা পেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। রোগীর শয্যায় স্বজনরা থাকছেন শুয়ে-বসে। ওয়ার্ডে যত্রতযত্র ঘোরাঘুরিও করছেন। এতে ওয়ার্ডগুলো যেন তিল ধারণের ঠাঁই নেই দশায় পৌঁছেছে। আর এত সমাগমেও মাস্ক থাকছে না অনেকের মুখে। যাদের থাকছে তারাও ঝুলিয়ে রাখছেন থুতনিতে। ভীড় এতটাই চাইলেও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার মত পরিস্থিতি নেই। ওয়ার্ড জুড়ে ঠাসাঠাসি ভীড়।

হু-হু করে করোনা সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় যশোর রেড জোন ঘোষণা হয়েছে। ১১ দফার পর শুক্রবার নতুন করে আরও কিছু বিধিনিষেধও জারি করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। জনসচেতনতায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। কিন্তু খোদ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষই রয়েছে উদাসীন। সরকারি নির্দেশ কার্যকরে হাসপাতালে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেই। এই চিত্রই জানান দিচ্ছে করোনা পরিস্থিতি ভয়াবহতার দিকে গড়াচ্ছে। এ যেন হারিকেনের নিচেই অন্ধকার।

যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় বলা হয়েছে যশোরে ভাইরাসটির সোশ্যাল ট্রান্সমিশন চলছে। শুক্রবার যবিপ্রবি সূত্র জানায়, গত ২৪ ঘন্টায় যশোরে ৯৫ জন নতুন করে করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। এ নিয়ে জেলায় ২২ হাজার ৩৯৬ জনকে ছুঁয়েছে বৈশি^ক মহামারি করোনা।

বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে যশোর জেনারেল হাসপাতাল ক্যাম্পাসে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও দালাল চক্রের তৎপরতা নজরে পড়ে। শোনা যায় তারা প্রতি এ্যাম্বুলেন্স থেকে উৎকোচ আদায় করছিলেন। এ সময় ‘নো পার্কিং’ এলাকাজুড়ে অনন্ত ১০টি এ্যাম্বুলেন্স দেখা যায় (জরুরী বিভাগের সামনে)। জরুরি বিভাগে ঢুকেই নজরে পড়ে বেশ কিছু মানুষের সমাগম। তাদের মধ্যে কারা হাসপাতালের স্টাফ, কে রোগীর স্বজন আর বহিরাগত দালাল চিনে ওঠা ছিল মুশকিল। একটু এগিয়ে হাসপাতালের ভেতরে ঢুকতেই দেখা যায় বেসরকারি একটি ব্লাড ব্যাংকে (যশোর ব্লাড ব্যাংক) জনস্রোত। একদম ঠাসাঠাসি অবস্থা। ছোট কক্ষে ১৫/১৬ জন মানুষের ভিড়। এ সময় সরকারি প্যাথলজি বিভাগ ও ব্লাড ব্যাংকের দরজায় তালা ঝুলছিল।

ভয়াবহ চিত্র দেখা যায় প্রসূতি ওয়ার্ডে। দরজা খুলতেই প্রথম বেডে দেখা যায় শুয়ে আছেন এক কিশোরী। ওই বেডে বসে আছেন আরও দুই নারী ও এক কিশোরীসহ ৩ জন। এ সময় কথা হয় তাদের সাথে। যে রোগীকে ঘিরে জমজমাট আড্ডা চলছিল তার নাম শরিফা খাতুন। তিনি অন্তঃসত্ত্বা। বারবাজারের বাদুরগাছা গ্রামের সোহাগের স্ত্রী। তিনি বলেন, ডাক্তার জানিয়েছেন সপ্তাহখানেক পর সিজার করা হবে। তার বেডে বসে আড্ডা দিচ্ছিলেন সোনিয়া নামের এক নারী। তিনি রোগীর কেউ না। অপর এক রোগীর স্বজন। অন্তঃসত্ত্বা বধূ শরিফার স্বজন ছিলেন ৯ম শ্রেণির ছাত্রী আফরিন। একই বেডে আরও দু’জন শিশুকে দেখা যায়।

রোগীদের রুম-২ নামের এই কক্ষে (প্রসূতি ওয়ার্ড) বেড সংখ্যা যাইহোক-রোগী-স্বজন, নার্স ও দালাল চক্রের প্রায় একশ’ নারী-পুরুষ ও শিশুর ভিড় দেখা যায়। তাদের মুখে যেমন ছিল না মাস্ক, তেমনি শারীরিক দূরত্ব মানতে দেখা যায়নি কাউকেই।

করোনা সংক্রমণের ভীতি কারোর ভেতরেই পরিলক্ষিত হয়নি। উল্টো করোনা নিয়ে হাসি-মস্করাা করেন অজ্ঞাত পরিচয়ের এক যুবক। পরিচয় জানতে চাইলে তিনি বলেন আমার রোগী আছে। কৌশলে পরিচয় দেয়ার বিষয়টি এড়িয়ে যান।

একই চিত্র রোগীদের রুম-১’-এ (প্রসূতি ওয়ার্ড)। রুমের দরজায় লেখা রয়েছে পুরুষের প্রবেশ নিষেধ কিন্তু সেখানে নারী-পুরুষের ভীড় সমানে সমান। দালাল চক্রের সদস্যদের উপস্থিতিও দেখা যায় এখানে।

পুরুষ ওয়ার্ডে দেখা যায়, প্রচুর রোগী-স্বজনের ভীড়। ওয়ার্ডের মাঝামাঝি স্থানে দু’জন নার্সকে খাতা-পত্র ঘাটতে দেয়া যায়। পাশেই সিস্টার কক্ষ। সেখানে এক নার্সকে মোবাইল ফোনে খোশ গল্প করতে দেখা যায়।

ওয়ার্ডের ৮ নং বেডের নিচেই দেখা যায় ‘ফ্লোর বেড’! উপরের বেডে নারী আর নিচেই মধ্যবয়সী এক পুরুষকে নাক ডেকে ঘুমাতে দেখা যায়। অভিন্ন চিত্র দেখা যায় গোটা ওয়ার্ডেই।

সামনে এগুতেই সার্জারী কক্ষের সামনে দেখা যায় ১০/১২ জন যুবকের জটলা। চৌগাছায় মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় তাদের দু’জন স্বজন আহত হয়েছেন। বেড নেই শুনে বেশ চিন্তিত দেখা যায় তাদের।

তবে শিশু ওয়ার্ডের চিত্র কিছুটা ভিন্ন। সেখানে খুব বেশি মানুষের ভীড় দেখা যায়নি। ওয়ার্ডের দায়িত্বে থাকা এক নার্স জানান, ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে গত এক সপ্তাহে ১০৩ জন শিশু ভর্তি হয়েছে। তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে।

আড়াইশ বেডের হাসপাতালে রোগী বাদে প্রতি রাতে সহস্রাধিক মানুষ অবস্থান করেন। সেই সাথে বাকিতে ঔষুধ ও টেস্ট করিয়ে দেয়া কমিশনভোগী শতাধিক দালালের বিচরণ লেগেই থাকে। এর বাইরে এ্যাম্বুলেন্স থেকে শুরু করে হাসপাতালের আশপাশের ভ্রাম্যমাণ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে দৈনিক ও সাপ্তাহিক মাসোহারা তোলায় তৎপর থাকেন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কিছু অসাধু সদস্য। এই টাকা যায় বিভিন্ন সংস্থার সদস্য পরিচয়ধারীদের পকেটেও।

গোটা হাসপাতাল চলে গেছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কিছু অসাধু সদস্য ও দালালচক্রের কব্জায়। বাকিতে ঔষুধ, টেস্ট, নির্দিষ্ট ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রোগী ভাগিয়ে নেয়াসহ নানা খাতে অনন্ত ৩শ’ দালাল কাজ করছে। এরবাইরে রয়েছে সুযোগ বুঝে ঔষধ ও রোগীর মূল্যমান জিনিসপত্র চুরির শক্তিশালী সিন্ডিকেট।
সবমিলিয়ে হাসপাতালটির ধারণ ক্ষমতার বাইরে দিনে ৫/৬ গুণ আরও রাতে অনন্ত চারগুণ মানুষের বিচরণ লেগেই থাকে। এনিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের মাথা-ব্যাথা নেই। নেই সরকারি নির্দেশনা কার্যকর করার উদ্যোগ। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকটি সূত্র জানায়, হাসপাতালে বেশ কয়েকটি সিন্ডিকেট রয়েছে। যাদের মাধ্যমে লাখ লাখ টাকার লেনদেন হয়।

যশোর সিভিল সার্জন অফিস সূত্র জানিয়েছে, শুক্রবার যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২৬৮ টি নমুনা পরীক্ষায় ৯৫ জনের শরীরে করোনার উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। এদিন আক্রান্তের হার ৩৫ দশমিক ৪৪ শতাংশ। এরআগের দিন ৬৬ জন করোনায় আক্রান্ত হন। ওইদিন আক্রান্তের হার ছিল ৩৫ শতাংশ। করোনার উর্দ্ধগতি অব্যহতি রয়েছে। এ অবস্থায় ২১ জানুয়ারি থেকে ৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সমস্ত স্কুল কলেজসহ সমপর্যায়ের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

করোনা প্রতিরোধে গঠিত জেলা কমিটির সদস্য সচিব সিভিল সার্জন বিপ্লব কান্তি বিশ্বাস জানান, করোনা পরিস্থিতির উর্দ্ধগতি অব্যাহত রয়েছে। এ অবস্থায় সবাইকে মাস্ক ব্যবহারসহ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার জন্য বলা হয়েছে। জেলা প্রশাসন থেকে মোবাইল কোর্ট পরিচালিত হচ্ছে। সর্বশেষ সরকার থেকে স্কুল কলেজ বন্ধসহ অন্যান্য যে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে তা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ইতোমধ্যে যশোরে ৩ জনের দেহে ওমিক্রন শনাক্ত হয়েছে।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রের ধারণা-তারা স্থানীয়ভাবে করোনা ভাইরাসের এই নতুন ধরনে সংক্রমিত হয়েছেন। সামাজিক সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে বলেও সূত্রে আশঙ্কা করা হয়েছে।
জনসমাগম ঠেকাতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কার্যকর ব্যবস্থা কেন নিচ্ছে না জানতে তত্ত্বাবধায়কের সাথে ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

সর্বশেষ

খুলনা-কলকাতা রুটে বন্ধন এক্সপ্রেস আজ ফের চালু

নিজস্ব প্রতিবেদক: আজ রোববার থেকে ফের কলকাতা-খুলনা রুটে ‘বন্ধন এক্সপ্রেস’ রেল চলাচল শুরু হবে।...

রসুনের গায়ে আগুন!

সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিতে বেড়েছে ৫০ টাকা ক্ষুব্ধ ক্রেতা, স্বস্তিতে নেই কিছু বিক্রেতাও জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক: এবার ভোক্তার...

আনারসের পাতা থেকে সুতা সৃজনশীল কাজে পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন

অপার সম্ভাবনার দেশ বাংলাদেশ। কিন্তু হলে কি হবে। সম্ভবনা থাকলেই তো আর আপনা আপনি...

দড়াটানার ভৈরব পাড়ে মাদকসেবীদের নিরাপদ আঁখড়া

নিজস্ব প্রতিবেদক: যশোর শহরের ঘোপ জেলরোড কুইন্স হাসপাতালের পূর্ব পাশে ভৈরব নদের পাড়ে মাদকসেবীদের...

আজকের মধ্যে অবৈধ ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক বন্ধ না হলে ব্যবস্থা

কল্যাণ ডেস্ক: দেশে অনিবন্ধিত ও নবায়নহীন অবস্থায় পরিচালিত অবৈধ বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার...

নিরপেক্ষ সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে : মির্জা ফখরুল

ঝিনাইদহ প্রতিনিধি: বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, দেশে আওয়ামী লীগের অধীনে আর...