যশোর জেলা আ.লীগে একচ্ছত্র আধিপত্যের দুর্গে ধস

আ.লীগ
নতুন নেতৃত্বের নিয়ন্ত্রণে জেলার রাজনীতি
তুষের আগুনে পুড়ছে বিরোধী শিবিরের নেতাকর্মীরা

মোল্লা মশিউর: যশোর জেলা আওয়ামী লীগে একচ্ছত্র আধিপত্যের দুর্গে ধস নেমেছে। ধীরে হলেও নতুন নেতৃত্বের হাতে চলে গেছে দলটির নিয়ন্ত্রণ। এতদিন যাকে যশোরের সব বলা হতো, ক্ষমতার ভরকেন্দ্র থেকে তিনি কার্যত ছিটকে পড়েছেন। গ্রুপ রাজনীতির হাত ধরেই বদল ঘটেছে মূল নেতৃত্বে। জেলা ও উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা এবং সর্বশেষ ইউপি নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণে এই চিত্র স্পষ্ট হয়েছে।

যশোরকে রাজনীতির উর্বর ভূমি বলা হয়। খুলনা বিভাগের একটি প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক গুরুত্বসম্পন্ন জেলা হিসেবেও বিবেচিত যশোর। উপজেলার সংখ্যানুসারে যশোর বাংলাদেশের একটি ‘এ’ শ্রেণিভুক্ত জেলা। এখান থেকেই নিয়ন্ত্রিত হয় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের রাজনীতি।

এমপি রওশন আলী বেঁচে থাকতে যশোর আওয়ামী লীগে গ্রুপিংয়ের রাজনীতির কথা শোনা যায়। ১৯৯৪ সালের ১৯ আগস্ট তার মৃত্যু হয়। এ সময় নৌকায় উঠে পড়েন দলীয় মনোনয়ন বঞ্চিত বিএনপি’র জেলা সভাপতি আলী রেজা রাজু। শুরু হয় আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ। ১৯৯৬ সালে তিনি নৌকার টিকিট বাগিয়ে এমপি নির্বাচিত হন।

সেই প্রকাশ্য গ্রুপিং এবং মেরুকরণের রাজনীতি থেকে গত দু’দশকেও বের হতে পারেনি আওয়ামী লীগ। দিনে দিনে সেই প্রভাব দলটির নতুন নেতৃত্বকেও গ্রাস করে। নানামুখী ষড়যন্ত্র ও অপরাজীতির মাধ্যমে দলে একচ্ছত্র আধিপত্য গড়ে তোলেন শাহীন চাকলাদার। তিন দফায় জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন। ২০০৯ সাল থেকে টানা ২০২০ সাল পর্যন্ত তিনি সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন। এ সময়ে দলের ত্যাগী ও বহু পৌড় খাওয়া নেতাকে পেছনে ফেলে তিনি গ্রুপ রাজনীতির শীর্ষে ওঠেন।

২০১৪ সালে নির্বাচনে যশোর সদর আসনে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় এমপি হন কাজী নাবিল আহমেদ। সে সময় শাহীন চাকলাদার মনোনয়ন চেয়ে পাননি। কিন্তু দলের মূল নেতৃত্বে থেকে তিনি গোটা জেলার রাজনীতি, সামাজিক ও ব্যবসাসহ টেন্ডার বাণিজ্যে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেন। তার গ্রুপং রাজনীতির কাছে ছিটকে পড়েন দলটির স্থানীয় অনেক ত্যাগী ও শীর্ষ নেতৃত্ব। খুনোখুনির ঘটনাও ঘটেছে প্রচুর। অকালে ঝরে গেছে দলীয় প্রতিপক্ষের অনেকের প্রাণ।

কিন্তু তার এই একচ্ছত্র আধিপত্যের দুর্গে আঘাতের চেষ্টা থেমে থাকেনি। প্রকাশ্যে না হলেও ভেতরে ভেতরে গ্রুপ রাজনীতি চালান এমপি কাজী নাবিল। একটাই টার্গেট ছিল ‘শাহীন চাকলাদারই যশোরের সব’ দুর্গ ভেঙে গুড়িয়ে দেয়ার। সেই চেষ্টায় জোয়ার আসে ২০২০ সালের দিকে। ওই বছরের ২১ জানুয়ারি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ইসমাত আরা সাদেকের মৃত্যু হলে কেশবপুর-৬ আসনটি শূন্য হয়।

উপনির্বাচনে দলীয় মনোনয়নের দৌঁড়ে জিতে ফিরেন শাহীন চাকলাদার। নৌকার টিকিটে নির্বাচিত হন এমপি। এরফলে ঝুলি হয় ভারী। কিন্তু এদিকে ডানহাত আনোয়ার হোসেন বিপুল হন বেহাত। তিনি চাকলাদার গ্রুপ ত্যাগ করে ‘একলা চল’ নীতিতে মাঠ কাঁপাতে থাকেন। জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে বিপুলের রয়েছে ক্লিন ইমেজ। যেকারণে চাকলাদার শিবিরে উপর্যুপরী আঘাত হানতে খুব বেশি বেগ পেতে হয়নি তার।

কিন্তু কে কোথায় কখন কোন ঘাটে তরী ভেড়ান তা বলা মুশকিল। বিপুলের ক্ষেত্রেও তার ব্যতয় ঘটেনি। প্রায় দু’দশক ধরে যশোর জেলা আওয়ামী লীগের দাপুটি নেতার সাথে ছিলেন যে বিপুল, সেই বছরখানেক একলা চলার পর তরী ভেড়ান নাবিল গ্রুপে।

এদিকে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসিন হন সাইফুজ্জামান পিকুল। তিনি নাবিল গ্রুপের ঠান্ডা মাথার নেতা নামে সর্বাধিক পরিচিত। পরে নুরজাহান ইসলাম নীরার দখলে আসে সদর উপজেলা পরিষদ। তিনিও নাবিল পক্ষীয় নেত্রী নামে পরিচিত ছিলেন। কিন্তু চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র ৭ মাস ১৪ দিন পর তাঁর মৃত্যু হয়। প্রায় বছরখানেক পর ২০২১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বীয় উপজেলা চেয়ারম্যন হন নাবিল গ্রুপের আরেক নেতা জেলা যুবলীগের সভাপতি মোস্তফা ফরিদ আহমেদ চৌধুরী। জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি হায়দার গনি খান পলাশ নির্বাচিত হন পৌরসভার মেয়র।

এসব জনপ্রতিনিধির ভারে নাবিলের ঝুলি এখন বেশভারি। সবশেষ ৫ জানুয়ারির ইউপি নির্বাচনে নাবিল পক্ষীয় ১০ নেতা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে ঝুলির ওজন বাড়িয়েছেন অনেকখানি। দলীয় মনোনয়ন দৌঁড়েও হার ঘটেছে এমপি শাহীন চাকলাদারে। সদরের ১৫টি ইউপি’র মধ্যে চাকলাদারপন্থীরা পান মাত্র ৪টির দলীয় টিকিট। এর ফলে নাবিল বনাম শাহীন গ্রুপের বিরোধ প্রকাশ্যরুপ নেয়।

দু’পক্ষই যেখানে নৌকা পাননি, সেখানেই একাধিক নৌকার বিদ্রোহী প্রার্থী দেন। এই দ্বন্দ্বে ৫টি ইউনিয়নে ডুবেছে নৌকা।

বিদ্রোহীদের দাপুটি প্রচার-প্রচারণার কাছে নৌকা পেয়েও জিততে পারেননি ৫ মাঝি। জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শহিদুল ইসলাম মিলনের নিজ ইউনিয়ন নওয়াপাড়ায় জিততে পারেননি নৌকার প্রার্থী রাজিয়া সুলতানা। চাঁড়ড়া ইউনিয়নে সেলিম রেজা পান্নু, দেয়াড়ায় লিয়াকত হোসেন, নরেন্দ্রপুরে মোদাচ্ছের ও রামনগরে নাজনীন নাহার দলীয় টিকিট নৌকা পেয়েও হেরেছেন গো-হারা।

এসব প্রার্থীদের পরাজয়ের নেপথ্য কারণ হিসেবে বিভক্তিকেই দুষছেন তৃণমূলের কর্মী-সমর্থকরা।
রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, স্থানীয় নির্বাচনের ফলই বলে দিচ্ছে চাকলাদারের একচ্ছত্র আধিপত্যের দুর্গে ধস নেমেছে। ধীরে হলেও ক্লিন ইমেজের নেতৃত্বের দখলে চলে এসেছে যশোর আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রণ।

রাজনীতির এই নতুন মেরুকরণ মানতে পারছেন বিরোধী শিবিরের নেতাকর্মীরা। তারা এখন তুষের আগুনে পুড়ছেন। যদিও রাজনীতিতে শেষ বলে কোন কথা নেই-এমনটিই বলছেন রাজীতি বোদ্ধারা।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে