যশোর পৌরসভায় নাগরিক দুর্ভোগের নাম ‘জন্মসনদ’

যশোর পৌরসভায় নাগরিক দুর্ভোগের নাম ‘জন্মসনদ’

                                        # ‘ন’ অক্ষরটি ২ মাসেও সংশোধন হয়নি
                                       # ভুল করছেন পৌরকর্মী খেশারত দিচ্ছেন নাগরিকরা
                                       # ভুলের প্রতিবাদে জোটে দুর্ব্যবহার

সালমান হাসান
জন্মসনদের ভুল সংশোধন করতে যশোর পৌরসভায় ঘুরতে হচ্ছে মাসের পর মাস। সনদের সংশোধন ও নিবন্ধনে টাকা গুনতে হচ্ছে বারবার। প্রতিষ্ঠান কর্মীর ভুলের মাশুল গুনছেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবক। ভোগান্তির পাশাপাশি রয়েছে দুর্ব্যবহারেরও অভিযোগ। সবমিলিয়ে যশোর পৌরসভায় নাগরিক দুর্ভোগের নাম ‘জন্মনিবন্ধন’।
ইউনিক আইডি ফরম পূরণে অন্যান্য ডকুমেন্টেস’র পাশাপাশি শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের জন্মনিবন্ধন সনদ লাগছে। কিন্তু অধিকাংশ শিক্ষার্থীর শিক্ষা সনদের সাথে জন্মসনদের তথ্যের মিল নেই। কারোর পিতা-মাতার নামের বানান ভুল। মিল নেই জন্ম তারিখের। ইউনিক আইডি ফরমের সাথে অনলাইন কপি সংযুক্ত করতে হচ্ছে। তাই কারোর জন্মসনদ নিবন্ধন ম্যানুয়াল (হাতে লেখা) হলে করতে হচ্ছে ডিজিটাল (অনলাইন)। ফলে এসব কাজে ভিড় বেড়েছে যশোর পৌরসভায়।

প্রতিষ্ঠানটির ডিজিটাল কেন্দ্রের কর্মীর ভুলের খেসারত দিতে হচ্ছে। হাতে লেখা সনদের নামের বানান ডিজিটাল কপিতে ভুল আসছে। ফলে সংশোধনের জন্য ফের টাকা গুনতে হচ্ছে। আর ঘুরতে হচ্ছে দিনের পর দিন। ইচ্ছাকৃতভাবে এমন ভুল করা হচ্ছে বলছেন, ক্ষুদ্ধ অভিভাবকরা। ভুলের বিষয়ে কোন উচ্চবাচ্য করলে করা হয় দুর্ব্যবহার।

নামের ‘ন’ বানান ভুল সংশোধন করতে দ্ইু মাস ধরে ঘুরছেন ইসলাম নামে এক অভিভাবক। তিনি বলেন, হাতে লেখা জন্ম নিবন্ধন কপিতে তার মেয়ের নাম ঠিকই ছিলো। ম্যানুয়াল নিবন্ধনের কপিতে মেয়ের নাম ছিলো তাহাজ্জিন। কিন্তু অনলাইন করতে দিলে সেখানে লেখা হয়েছে তাহাজ্জিম। দুই মাস ধরে আমি ‘ন’ সংশোধন করতে গিয়ে হয়রান হয়ে গেছি। এটি ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল করেছে সংশ্লিষ্টরা বলে ক্ষোভ ঝাড়েন।

তিনি আরও বলেন, নামের এই বানান সংশোধন করতে গিয়ে হয়রানির শিকার হচ্ছেন। সংশোধন আবেদনের সাথে নানা কাগজ জমা দিতে হচ্ছে। অভিভাবকদের জন্মনিবন্ধন সনদ, পানির বিল, বিদ্যুত বিলসহ নানা ডকুমেন্টস। এক নামের বানান সংশোধন নিয়ে ভোগান্তির শেষ নেই।

যশোর পৌরসভার প্রশাসনিক কর্মকর্তা উত্তম কুন্ডু জানান, নামের বানান ভুলের বিষয়টি কর্মীদের ইচ্ছাকৃত এমনটি নয়। হাতে লেখা নিবন্ধন অনলাইন করার ক্ষেত্রে মিলিয়ে দেখে এন্ট্রি করা হয়। তিনি আরও জানান, সনদের সংশোধিত কপি স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক নিজে যাচাই-বাছাই করেন। সব তথ্যের মিল থাকলে তারপর সংশোধনের কপি সরবরাহ হয়। এ কারণে জন্মসনদের সংশোধনের প্রক্রিয়ায় দেরি হচ্ছে।
দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত ইউনিক আইডি ও প্রোফাইল তৈরির জন্য তথ্য সংগ্রহ করছে সরকার। তাই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বিভিন্ন জন্মসদনের নিবন্ধনসহ বিভিন্ন ডকুমেন্টস দিতে তাগিদ রয়েছে শিক্ষার্থীদের। তারপর থেকেই এটির অনলাইন কপি, সংশোধনের কাজে পৌরসভায় দৌঁড়ঝাপ চলছে। আর এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে চলছে অনৈতিকভাবে অর্থ আদায়। আর এই অনৈতিক টাকার ভাগ উপর মহল পর্যন্ত যায় বলে কানাঘুষা রয়েছে।
নিবন্ধন ও সংশোধনের কপি পেতে বারবার চক্কর কাটতে হয়। সার্ভার জটিলতার কারণ দেখিয়ে সনদ সরবরাহে ঢিলেমি করা হয়। তবে বাড়তি কিছু হাতে ধরিয়ে দিলে সার্ভার জটিলতা মুহূর্তে কেটে যায়। এমন অভিযোগও অনেকের।

বিকাশ শীল নামে এক অভিভাবক জানান, তার মেয়ের জন্মনিবন্ধন সনদ ম্যানুয়ালি করা। স্টুডেন্ট আইডির ফরম পূরণের সাথে অনলাইন কপি (ডিজিটাল জন্ম নিবন্ধন সনদ) জমা দিতে হবে। তার জন্য আবেদন করেন। কিন্তু নামের বানান ভুল এসেছে। তিনি দাবি করেন, এটি ইচ্ছাকৃত ভুল। হাতে লেখা নিবন্ধনে বানান ঠিকই ছিলো। অনলাইন কপিতে ভুল এসেছে। একমাস ধরে ঘুরছেন। কোন সুরাহা হচ্ছে না। তিনি জানান, সনদ ডিজিটার করতে একদফা ফিস গুনেছেন। এখন গুনতে হবে সংশোধনের জন্য। কিন্তু এই ভুল তার নয়, এই কাজে নিয়োজিতরা নামের বানান ভুল করেছেন। আর ভুগছেন তিনি।

পৌরসভায় গিয়ে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটির ডিজিটাল সেন্টারের সামনে ভিড়। এখানে ভুল সংশোধনের আবেদন নেয়া হচ্ছে। আর সংশোধিত কপি দেয়া হচ্ছে ভবনের পাশে গলির মধ্যে জানালা দিয়ে। ডিজিটাল সেন্টারে লোকবল কম থাকায় কাজে গতি নেই অভিযোগ করেন জন্মসনদ নিবন্ধন, অললাইন কপি ও সংশোধনের কাজে আসা শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।

উপশহর মহিলা কলেজের শিক্ষার্থী সামিয় আক্তার জানায়, জন্মনিবন্ধনের ডিজিটাল কপি নিতে এসে দুর্ব্যবহারের শিকার হয়েছেন। ডিজিটাল সনদ নিতে এসে জানতে পারেন অন্য একটি ইউনিয়ন পরিষদে একই নামে তার নামে জন্ম সনদ নিবন্ধন হয়েছে। আর এটির সমাধান জানতে চাইলে তার সাথে দুর্ব্যববহার করেন জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন শাখার এক কর্মী। জোস্না বেগম নামে একজন বলেন, তার ছেলের তিন সন্তানের জন্য জন্ম নিবন্ধন করাতে এসেছেন। তিনটি ফরম লিখে দিতে ৩০০ টাকা ও ফি হিসেবে ১৫০ টাকা দিয়েছেন।

পৌরসভার সচিব আজমল হোসেন জানান, নিয়মবর্হিভূত সুযোগ যারা নিতে চান তারাই কর্মচারিদের সাথে টাকার লেনদেন করে থাকেন। তার ভাষ্যমতে, অনেকে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে চান না। ভিড় ও লাইন এড়াতে টাকার বিনিময়ে কেউ কেউ জন্মসননের আবেদন ফরম জমা এবং সংশোধন কপি নিয়ে থাকেন।

তিনি আরও জানান, ইউনিক আইডি তৈরির কাজ দেশ জুড়ে চলছে। একজন শিক্ষার্থীর পাশাপাশি তার বাবা-মায়ের জন্ম নিবন্ধন সনদ লাগছে। যার কারণে ‘পিক আওয়ারে’ সার্ভার থাকে ধীরগতির। যেকারণে সনদ সরবরাহে বিলম্ব হয়। আর ভুল করছেন আবেদনেকারীরা। তার যেমন নামের বানান দিচ্ছে সেভাবে অললাইন নিবন্ধন হচ্ছে। কারোর নামের বানান তাদের ‘এডিট’ করার সুযোগ নেই।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে