Wednesday, July 6, 2022

যশোর শহরে বন্যার রূপ

ড্রেন নির্মাণের ১০০ কোটি ভেসে গেল
মানুষের কষ্টে মাথা ব্যথা নেই

সালমান হাসান:
‘ষোল আনাই মিছে’। যশোর শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থার যেন এরকমই দশা। ১০০ কোটির কাছাকাছি ব্যয়ে নির্মিত ড্রেন নিয়ে পানি নিষ্কাশন হচ্ছে না। ফলে সোমবারের দিনভর টানা বৃষ্টিতে পৌর এলাকার বেশির পানিতে তলিয়ে গেছে। সেখানে একপ্রকার বন্যা পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

জলাবদ্ধতার শিকার নগবাসীদের অভিযোগ, মূলত অপরিকল্পিত ড্রেনেজ এই জলাবদ্ধতার কারণ। বেশির ভাগ ড্রেনের স্লব (ঢাল) ঠিক নেই। যার কারণে পানি নিষ্কশন ঠিকমত হচ্ছে না। ফলে শহর জলমগ্ন হয়ে পড়ছে।
রেলরোড টিবি ক্লিনিক মোড়ের বাসিন্দা যশোর সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজের শিক্ষার্থী বিদিশা মিত্র বলেন, বাড়ির সামনে দিয়ে নদী বয়ে যাচ্ছে। মূলত অপরিকল্পিত ড্রেনেজের কারণে এই জলাবদ্ধতা। তিনি মনে করেন, বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয়ে এই ধরণের অপকল্পিত উন্নয়নের ‘ষোল আনা মিছে’!

যশোর পৌরসভার প্রকৌশল বিভাগ সূত্রে জানা যায়, গত সাত বছরে বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে শহরে প্রায় ৪০ কিলোমিটার আরসিসি ড্রেন নির্মাণ হয়েছে। সিআরডিপি (সিটি রিজন ডেভলপমেন্ট প্রজেক্ট) ও ইউজিপআইআই-৩ (তৃতীয় নগর পরিচালন ও অবকাঠামো উন্নতিকরণ সেক্টর প্রকল্প) প্রকল্পের মাধ্যমে এই ড্রেন নির্মাণ হয়। এতে ব্যয়ের পরিমাণ প্রায় ৯৫ কোটি টাকা। এছাড়াও কাঁচা-পাকা মিলিয়ে শহরে প্রায় ২৪৬ কিলোমিটার ড্রেন রয়েছে।

কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত পৌরসভার এসব ড্রেনের বেশির ভাগেরই স্লব (ঢাল) ঠিক নেই। যার কারণে এগুলো দিয়ে পানি গড়ায় না। ড্রেনের ভেতর পানি স্থির হয়ে জমে থাকে। ফলে বৃষ্টি হলে ড্রেন উপচে পড়ে। বৃষ্টির ও ড্রেনের কাদাপানি একাকার হয়ে চারপাশে ছড়িয়ে যায়। এছাড়া শহরের বেশির ভাগ বাসাবাড়ির পয়োবর্জ্যরে ট্যাংকিগুলি পাইপ দিয়ে ড্রেনের সাথে যুক্ত। ফলে যখন জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয় তখন ড্রেন থেকে কাদা ও মল মিশ্রিত বর্জ্যে রাস্তা সয়লাব হয়ে যায়।

যশোর পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী এসএম শরীফ হাসান বলছেন ভিন্ন কথা। তার ভাষ্যমতে, ড্রেনের স্লবের কোন সমস্যা নেই। নির্মাণের সময়ই ড্রেনের ঢাল শতভাগ নিশ্চিত করা হয়েছে। যাতে ড্রেনে পানির প্রবাহ ঠিক থাকে।

তিনি বলেন, শহরের একটি অংশের পানি নিষ্কাশন হয় মুক্তেশরী নদী দিয়ে। কিন্তু এটির মুখ বন্ধ হয়ে গেছে। ৪ থেকে ৫ বছর আগে একটি খাল কেটে এটির সাথে সংযুক্ত করা হয়। ক্যানেলটি দিয়ে শহরের পানি মুক্তেশরীতে গিয়ে পড়ত। খালটি কেটে আবার সংস্কার করতে হবে। তাহলে পানি নিষ্কশন সমস্যার সমাধান হবে।

শরীফ হাসান মনে করেন, নাগরিক অসচেতনতাও জলাবদ্ধাতার জন্য দায়ী। অনেকে ড্রেনে ময়লা ফেলেন। এছাড়া পাইলিংয়ের সময় পাইপ লাইন ড্রেনে যুক্ত করে দেন। বিভিন্ন নির্মাণ সামগ্রি ডেনে ফেলেন। ফলে ড্রেনের বেড উঁচু হয়ে যায়। এতে পানির প্রবাহ বিঘ্নিত হয়।

সারদিনের গড় বৃষ্টিপাত ছিলো ১২১ মিলিমিটার। এতে শহরের রেলরোড, টিবি ক্লিনিক, ফুড গোডাউন, পিটিআই রোড, ছোটনের মোড়, এমএম কলেজ দক্ষিন গেট, খড়কির কলাবাগান, জেবিন মোড়, শংকরপুর ইসহ্ক সড়ক, নলডাঙারোডসহ আরো অনেক জায়গায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। এখানকার রাস্তাগুলোয় গোড়ালি থেকে হাঁটু সমান পানি জমে যায়। কোথাও কোথাও কোমর সমান পানিও জমে। এখানকার বাসা-বাড়ির ভেতরও পানি ঢুকে যায়। ড্রেনে ফেলানো ময়লা ও পয়োবর্জ্য মিশ্রিত পানিতে ভাসছে এসব এলাকা।

যশোর পৌরসভার আট নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দারা জানান, তাদের এলাকার জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ হলো ড্রেনেজ সমস্যা। খালধার রোডের বড় ড্রেনটি দিয়ে এখানকার পানি নিস্কাসন হয়। আর সমস্যা এই দুই এলাকার দুটি ড্রেনে। ড্রেন দুটির সংযোগ স্থল রবীন্দ্রনাথ সড়কে (আরএন রোড) রানা স্টিল প্লাজার পাশে। এখানটায় বেজপাড়ার ড্রেনটি নিচু। অন্যদিকে খালধার রোডের ড্রেনটি উঁচু। ফলে পানি বের হতে সমস্যা হয়।

ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রদীপ কুমার নাথ বাবলু ড্রেনের স্লবের সমস্যার পাশাপাশি মানুষজনের অসচেতনা দায়ী বলে মনে করেন। তিনি বলেন, প্রতিনিয়ত ড্রেন পরিস্কার করা হয়। কিন্তু পরিস্কার করা ড্রেনে অনেকে ময়লা ঢালেন। যার কারণে পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্থ হয়। অস্বাভাবিক মাত্রার বৃষ্টি হয়েছে। যার কারণেও পানি বের হতে সমস্যা হচ্ছে। এছাড়া অপরিকল্পিত ড্রেনেজও সমস্যা বলে তিনি মনে করেন।

সরেজমিন দেখা যায়, শহরের চারখাম্বা, রেলরোড টিবি ক্লিনিক, ফুড গোডাউন, আনসার ক্যাম্প এলাকায় গোড়ালি থেকে হাঁটু সমান পানি। এসব এলাকার অনেক বাড়ির ভেতরও জলমগ্ন। স্থানীয় বাসিন্দা ও বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি (মার্কসবাদী) যশোর জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক জিল্লুর রহমান ভিটু বলেন, চারখাম্বা ও রেলরোডে আগে যখন ভালো ড্রেনেজ ব্যবস্থা ছিলো না তখন এখানে কোন পানি জমত না। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে ড্রেন নির্মাণের পর এখন দেখছি বৃষ্টি হলেই এই জায়গা যেন হয়ে ওঠে পদ্মানদী। তিনি মনে করেন, অপরিকল্পিত ড্রেন নির্মাণই এই জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ। ড্রেনগুলোর ঢাল ঠিক না থাকায় পানি গড়াচ্ছে না। ফলে সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতার।

শহরের খড়কির কলাবাগান, এমএম কলেজ দক্ষিন গেট, জেবিন মোড়সহ আরো কয়েক জায়গায় জলাবদ্ধতার দৃশ্য চোখে পড়ে। এর মধ্যে কলাবাগান পাড়া, খড়কি জেবিন মোড় ও এমএম কলেজ দক্ষিন গেটে আশপাশে জলাবদ্ধতা সবেচেয়ে বেশি। গোড়ালি থেকে হাঁটু অবধি পানি জমেছে। বাসাবাড়িতেও পানি ঢুকে গেছে।
জলাবদ্ধতা নিয়ে আলাপচারিতায় যশোর পৌরসভার পাঁচ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর রাজিবুল আলমও স্বীকার করেছেন, তার এলাকারও অনেক ড্রেনের স্লব (ঢাল) ঠিক নেই। যার কারণে পানি নিস্কাসনে সমস্যা হচ্ছে। এছাড়াও অনেকে ড্রেনের ভেতর বাসাবাড়ির ময়লা ফেলেন। যার কারণে পানি বের হতে সমস্যা সৃষ্টি হওয়ায় জলাবদ্ধতা হয়েছে। গতকালও ড্রেনগুলো পরিস্কার করা হয়েছে। দ্রুতই জলাবদ্ধতা দূর হবে বলে তিনি আশাপ্রকাশ করেন।

রাজিবুল আলম আরও জানান, জিলা স্কুলের সামনে থেকে সিভিল কোর্ট মোড় পর্যন্ত ড্রেন পরিস্কার করাতে গিয়ে দেখেন ভেতরে পরিষ্কার পানি। ড্রেনের মধ্যে ময়লাও তেমন ছিলো না। তার ভাষ্যমতে, ড্রেনটি দিয়ে প্রকৃত অর্থে কোন পানিই নিষ্কাশন হয় না। ‘ওয়াটার লেভেল’ (পানির স্তর) ঠিক না থাকায় এমনটি হয়েছে। এটির সমাধানে পৌরসভার প্রকৌশল বিভাগকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে অবহিত করেছেন।
যশোর পৌরসভার সচিব আজমল হোসেন বলেন, বিরতীহীন প্রচন্ড বৃষ্টিপাতের কারণে শহরে প্রচুর পরিমাণ পানি জমেছে। ড্রেনের ধারন ক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত পানির কারণে নিস্কাসন হতে সময় একটু বেশি লাগছে। বৃষ্টি কমে আসলে কয়েক ঘন্টার মধ্যে পানি বের হয়ে যাবে।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

সর্বশেষ

আলেম নামধারী এসব শিক্ষকদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা হোক

সাতক্ষীরার দেবহাটার নাজিবের ঘের স্বতন্ত্র এবতেদায়ী মাদরাসার এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে ৫ম শ্রেণির শিক্ষার্থীকে শ্লীলতাহানির...

৩ সেপ্টেম্বর প্রেসক্লাব যশোরের বিশেষ সাধারণ সভা

প্রেসক্লাব যশোরের গঠনতন্ত্র পরিবর্ধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে মঙ্গলবার ক্লাবের কার্যনির্বাহী কমিটির দিনব্যাপী...

কেন্দ্রীয় ত্রাণ তহবিলে ২০ লাখ টাকা অনুদান দিল যশোর বিএনপি

নিজস্ব প্রতিবেদক উত্তরবঙ্গে বন্যার্তদের জন্য বিএনপির কেন্দ্রীয় ত্রাণ তহবিলে ২০ লাখ টাকা অনুদান দিল যশোর...

যশোরে কলেজছাত্রীর আত্মহত্যা

নিজস্ব প্রতিবেদক মঙ্গলবার যশোরে গলায় ফাঁস দিয়ে কামরুন্নাহার কেয়া (১৮) নামে এক শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন।...

পর্যবেক্ষণে অসুস্থ বিএনপি নেতা নূর-উন-নবী

নিজস্ব প্রতিবেদক যশোর সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি নূর-উন-নবী (৬৬) ব্রেন স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে ঢাকার একটি...

জাতীয় স্কুল ফুটবলের শিরোপা যশোরে নিয়ে আসতে চায় পলাশ বাহিনী

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রথমবার অংশ নিয়েই জাতীয় স্কুল ফুটবল প্রতিযোগিতার ফাইনাল যায়গা করে নিয়েছে বেনাপোল মাধ্যমিক...