মঙ্গলবার, ডিসেম্বর ৬, ২০২২

যশোর ২৫০ শয্যা হাসপাতাল ।। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সংকট চিকিৎসায় হযবরল অবস্থা

কল্যাণ রিপোর্ট
যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সংকট দেখা দিয়েছে। এখানে চাহিদা রয়েছে ৩২ জনের অথচ কর্মরত আছেন মাত্র ৫জন। হাসপাতালের প্রধান তত্ত্বাবধায়ক ও সহকারী পরিচালকের প্রধান দুটি পদ আজও সৃষ্টি করা হয়নি। বর্তমানে একজনকে সংযুক্তি দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক পদটি চালনো হচ্ছে। চেইন অব কমান্ড দুর্বল থাকায় চিকিৎসা কার্যক্রমে হযবরল অবস্থা বিরাজ করছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সংকটের কারণে চিকিৎসাসেবায় ব্যাহত হচ্ছে। আবার যেসব বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক কর্মরত ্আছেন তারা ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ব্যক্তিগত বাণিজ্য নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। ইন্টার্নরাই ভরসা। ইন্টার্নরা ছাড়া ওয়ার্ডবয়, আয়া ও ঝাড়–দার রোগীর চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন।

প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, হাসপাতাল শুরুর সময় থেকে একই চিকিৎসা কাঠামোই চলছে। মোট চিকিৎসকের পদ রয়েছে ৫৪টি। কর্মরত আছেন ৪৯ জন। শূন্য রয়েছে ৫ চিকিৎসকের পদ। এরমধ্যে সিনিয়র কনসালটেন্ট পদ রয়েছে মাত্র ৩টি ও জুনিয়র কনসালটেন্ট পদ ২টি। অথচ ২০ বছর আগে যেখানে হাসপাতালটিতে একশ রোগী ভর্তি থাকতো, এখন সেখানে ভর্তি থাকে ৫শ থেকে সাড়ে ৫শ রোগী।
বহিঃবিভাগে চিকিৎসা নেন প্রতিদিন গড়ে ২ হাজার রোগী। যশোর জেলা ছাড়াও নড়াইল, মাগুরা ও ঝিনাইদহ জেলা থেকে হাসপাতালটিতে রোগী আসে। নতুন করে ৩২ জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের চাহিদা দেয়া হলেও তা দেয়া হচ্ছে না। যে কারণে রোগীরা সঠিক চিকিৎসা পাচ্ছেনা। জটিল রোগী আসলেই চিতিৎসকরা রোফার্ড করে দিচ্ছেন খুলনা বা ঢাকায়।

অভিযোগ উঠেছে, বর্তমানে সরকারি এই হাসপাতালে চিকিৎসাসেবায় রয়েছে নানা অনিয়ম। কর্মরত বিশেষজ্ঞরা শুধু খাতা কলমে রয়েছে। বাস্তবে তারা ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করেননা। মাঝে মাঝে ওয়ার্ড রাউন্ডে গেলেও তড়িঘড়ির কারণে রোগীরা ঠিকমতো কথা বলতে পারেন না। তাদের অনিয়মের কারণে রোগীরা সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তাই অনেকেই সরকারি হাসপাতাল ছেড়ে ক্লিনিকে চলে যেতে বাধ্য হন। এতে চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত বাণিজ্য আরও বেড়ে যায়। রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ, ক্লিনিক বাণিজ্য জমজমাট করার জন্য চিকিৎসকরা সরকারি হাসপাতালে দায়িত্ব পালনে অবহেলা করেন।

সূত্র জানায়, বর্তমানে হাসপাতাল চলছে ইনটার্ন ও অনারারী দিয়ে। সাধারণ রোগীদের সাথে তারাও খুব রুঢ় আচরণ করেন। ডা. আবুল কালাম আজাদ হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক পদে থাকাকালীন ঘোষণা দিয়ে বন্ধ করা হয়েছিলো কোন ইন্টার্ন রোগীর মৃত্যু ঘোষণা দিতে পারবেন না। এছাড়া রোগীকে রেফার্ড ও ছাড়পত্র তারা দেবেন না। কিন্তু বর্তমানে সব কিছু চলছে আগের মতোই। গত ৫ নভেম্বর ছুরিকাহত হয়ে ভর্তি হন যশোর শহরতলী শেখহাটি নিমতলার আজগর আলী (৬০)। তার বুকের আঘাতটি গুরুতর হলেও কোন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তাকে দেখতে আসেননি। পরে একজন ইন্টার্ন তাকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার্ড করে দেন। রোগীর স্বজনরা ওই সময় ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছিলেন এক মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে আরেক মেডিকেলে রেফার্ড করা সত্যিই দুঃখজনক। এতে আর্থিক ক্ষতির সাথে দুর্ভোগ বাড়ে। আজগার আলীর মতো একাধিক রোগীকে প্রতিদিন রেফার্ড করছেন ইন্টার্নরা।

চুড়ামনকাটি ইউনিয়নের ছাতিয়ানতলা গ্রামের সবজি বিক্রেতা রোকনুজ্জামান জানান, তার এক আত্মীয় কীটনাশক পান করে জেনারেল হাসপাতালের মেডিসিন ভর্তি হন। দুই হাসপাতালে থাকলেও রোগী উন্নত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। কারণ হিসেবে তিনি জানান, দুই দিনই ইন্টার্নরা তাকে চিকিৎসা দিয়েছেন। কোন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রোগীর কাছে আসেননি। বাধ্য হয়ে ওই রোগীকে অন্য হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
গত ২০ অক্টোবর শার্শা উপজেলার সাইফার রহমান নামে এক রোগীকে হাসপাতালের সার্জারী ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। রোগীর স্বজনরা জানিয়েছেন, জরুরি বিভাগ থেকে চিকিৎসা ছাড়া সারাদিনে কোন চিকিৎসক রোগীর কাছে যাননি। কোন উপায় না পেয়ে রাতে হাসপাতালের সামনের একটি ক্লিনিকে রোগীকে ভর্তি করা হয়। রোগীর স্বজনরা জানিয়েছেন, সরকারি এই হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা নেই বললেই চলে।
জরুরি মুহুর্তে রোগীর চিকিৎসাসেবায় ডাক্তার পাওয়া যায়না। কিছু কিছু সময় সিনিয়র সেবিকারা রোগীর কাছে আসেন না।

হাসপাতালে কাটা ছেড়া রোগী দেখলেই এগিয়ে আসেন ওয়ার্ডবয়, আয়া নতুবা ঝাড়–দার। রোগীর স্বজনদের হাতে চিকিৎসা সামগ্রী কেনার স্লিপ ধরিয়ে দেন। এরপর ইনজেকশন সিরিঞ্জ, স্যালাইন, সুই সুতো নিয়ে তারাই করেন চিকিৎসা। আবার ক্যানোলা, ইউরিন ব্যাগ, খাদ্য গ্রহণের পাইপ লাগানো কাজও তারা করেন। এতে তারা লাভবান হন। কেননা প্রতি রোগীর স্বজনদের জিম্মি করে হাসপাতালের কর্মীরা অর্থবাণিজ্য করেন। সার্জারী, মেডিসিন, গাইনী ওয়ার্ডে অধিকাংশ সময় চিকিৎসকের ভূমিকায় ওয়ার্ডবয় ও ঝাড়ুদারকে দেখা যায়। অর্থ ছাড়া কোন কাজই করছেন না তারা। কাজ করেই তারা বলেন আমরা বিনা বেতনে কাজ করি। এ কথা বলে তারা মোটা অংকের টাকা দাবি করেন। দাবির চেয়ে টাকার পরিমান কম হলেই বেকে বসেন।
হাসপাতালের একটি সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে হাসপাতালের চেইন অব কমান্ড দুর্বল হয়ে পড়ায় চিকিৎসক সেবিকা কর্মচারীরা যা ইচ্ছা তাই করছেন। সঠিকভাবে তদারকি ব্যবস্থা ও জবাবদিহিতা না থাকায় হাসপাতালে অনিয়ম বেড়েই চলেছে।

সূত্রটি আরও জানায়, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সংকটের অজুহাতে রোগীদের চিকিৎসাসেবা বঞ্চিত করা হচ্ছে। আর যেসব বিশেষজ্ঞ হাসপাতালে কর্মরত তারা রোগীর প্রতি উদাসিন। হাসপাতালে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন না করে ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিকে ব্যস্ত থাকেন তারা

হাসপাতালের প্রধান দুটি পদ স্থায়ী না করার ব্যাপারে মন্ত্রণালয়ের কোন সাড়া নেই। বছরের পর বছর পদ দুটিতে ওএসডি কোন কর্মকর্তাকে সংযুক্তি করে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। তত্ত্বাবধায়ক পদে একজন সংযুক্ত থাকলেও প্রায় দুই বছর সহকারী পরিচালক পদে কেউ নেই।

হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. আরিফ আহমেদ জানান, ২০০৯ সালে হাসান আল মামুনকে তত্ত্বাবধায়ক (উন্নয়ন) পদ থেকে বরখাস্ত করা হয়। এরপর থেকে আর কেউ এই পদে আসেননি। পরে স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয় উন্নয়নের তত্ত্বাবধায়ক পদটি বিলুপ্ত করে। তিনি আরও জানান, এছাড়া সহকারী পরিচালক পদ সৃষ্টি করা হয়নি। বর্তমানে তত্ত্বাবধায়ক ও সহকারি পরিচালক পদটি পরিচালনা করা হয় অন্য কাউকে সংযুক্তি করে। প্রশাসনিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ দুটি পদ সৃষ্টির জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়ে একাধিকবার চিঠি পাঠানো হয়েছে। কিন্তু সাড়া মেলেনি। আরএমও ডা. আরিফ আহমেদ জানান, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সংকট রয়েছে। নতুন করে ৩২টি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পদ সৃষ্টির ব্যাপারে একাধিকবার স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রনালয়ে একাধিকবার চিঠি দেয়া হয়েছে। তালিকায় ছিলো গাইনী বিভাগের ২ জন সিনিয়র কনসালটেন্ট, , নিউরো সার্জারী বিভাগের ২ জন সিনিয়র কনসালটেন্ট, মেডিসিন বিভাগের ২জন সিনিয়র কনসালটেন্ট, নাক কান গলা বিভাগের ২ জন সিনিয়র কনসালটেন্ট, কার্ডিওলজি বিভাগের বিভাগের ২ জন সিনিয়র কনসালটেন্ট, বিভাগের ২ জন সিনিয়র কনসালটেন্ট, অ্যানেসথেসিয়া বিভাগের ২ জন সিনিয়র কনসালটেন্ট, নিউরো মেডিসিন বিভাগের ১ জন সিনিয়র কনসালটেন্ট, ইউরোলজি বিভাগের ১জন সিনিয়র কনসালটেন্ট, নাক কান গলা বিভাগের ২জন জুনিয়র কনসালটেন্ট, অর্থোপেডিক বিভাগের ২জন জুনিয়র কনসালটেন্ট, চক্ষু বিভাগের ২জন জুনিয়র কনসালটেন্ট, জেনারেল সার্জারী বিভাগের ২জন জুনিয়র কনসালটেন্ট, নিউরো সার্জারী বিভাগের ২জন জুনিয়র কনসালটেন্ট, নিউরো মেডিসিন বিভাগের ২জন জুনিয়র কনসালটেন্ট, আবাসিক চিকিৎসক ১ জন ও অ্যানেসথেসিয়া ৩ জন। কিন্তু উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কার্যকরী পদক্ষেপ নেই। মেডিকেল কলেজের কিছু চিকিৎসক হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করার কারণে চিকিৎসা সংকট কিছুটা সামাল দেয়া সম্ভব হয়।
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক (সংযুক্তি) ডা. আখতারুজ্জামান জানান, ২৫০ শয্যার হাসপাতালে গড় ৪৯০ জন রোগী চিকিৎসাধীন থাকেন। এতো রোগী স্বল্প চিকিৎসক দিয়ে সামাল দেয়া কষ্টদায়ক। গত মাসেও চিকিৎসক জনবলের আরেকটি চাহিদা পত্র পাঠানো হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো পূরণের পাশাপাশি নতুন পদ সৃষ্টির ব্যাপারে মন্ত্রণালয়ের সচিব-উপসচিবদের সাথে ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করা হচ্ছে। তিনি আরও জানান, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা দায়িত্বে অবহেলা করলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

সর্বশেষ

মরুর বুকে সাম্বার ছন্দ

ক্রীড়া ডেস্ক : হলুদ জার্সি, নীল শর্টস। সেই চেনা সাম্বা। এই ব্রাজিলকেই তো ভালোবাসেন বিশ্বের...

টাইব্রেকারে জাপানের স্বপ্নভঙ্গ করে কোয়ার্টার ফাইনালে ক্রোয়েশিয়া

ক্রীড়া ডেস্ক : ফুটবলে নিজেদের ইতিহাস নতুন করে লেখার সুযোগ ছিল জাপানের। সে লক্ষ্যে এবার...

সাতক্ষীরায় সাবিনা ও মাসুরাকে সংবর্ধনা

সাতক্ষীরা জেলা প্রতিনিধি: সাফ চ্যাম্পিয়নশীপে বিজয়ী বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা ফুটবল দলের অধিনায়ক সাতক্ষীরার কৃতি...

বাড়ির চারপাশ কাটা দিয়ে ঘিরেছে প্রতিপক্ষ

তালা প্রতিনিধি: জমি দখলের জন্য তালার বাউখোলা গ্রামে ভ্যানচালক আয়ুব আলীর বসত বাড়ির চারপাশ...

পাইকগাছায় নিসচা’র উদ্যোগে ছাগল বিতরণ

পাইকগাছা প্রতিনিধি: নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) পাইকগাছা উপজেলা শাখার পক্ষ থেকে সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্থ...

মণিরামপুরে কাভার্ডভ্যান চাপায় নিহতদের পরিবারকে সহায়তা

মণিরামপুর প্রতিনিধি: কাভার্ডভ্যান চাপায় নিহত ৫ ব্যক্তির পরিবারের সদস্যদের হাতে জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে...