মঙ্গলবার, অক্টোবর ৪, ২০২২

যোগাযোগ ব্যবস্থা, উন্নয়ন, প্রযুক্তি ও পদ্মা সেতু

হোসেনউদ্দিন হোসেন: বহু আকাক্সিক্ষত পদ্মা সেতু অতঃপর বাস্তবায়িত হয়েছে। যে বিষয়টি কিছুকাল আগে ছিল কল্পনাতীত, সেটা বর্তমান প্রত্যক্ষমান হয়ে উঠেছে। সভ্যতার বিকাশ হয়েছে নদীকে আশ্রিত করে। এক স্থল থেকে আরেকটি স্থলে গমনের জন্য জলপথ ছিল প্রধান। প্রাথমিকভাবে এই ব্যবস্থাটি নৌ-এর সাহায্যে সংগঠিত হয়। পরবর্তীকালে স্থলপথ রেলপথ ও আকাশ পথ তৈরি হলে পৃথিবীর একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত মানুষের গমনাগমন সহজ হয়ে ওঠে। পৃথিবী এখন মানুষের হাতের মুটোর মধ্যে চলে এসেছে। অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলেছে মানুষ। এখন মানুষ গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে পাড়ি দিচ্ছে।

বাল্যকালে শিক্ষকরা বলতেন-‘লেখাপড়া করে যে-গাড়ি ঘোড়া চড়ে সে’ এখানে লেখা পড়ার সঙ্গে গাড়ি-ঘোড়ার কথা উল্লেখ আছে। বর্তমান যুগকে বলা হয়, প্রযুক্তির যুগ। প্রযুক্তিই হচ্ছে রূপান্তরের মূল শক্তি। অতীতে মানুষ যে বিষয়টির উদ্ভাবন করেছিল, সেটাই ক্রমান্বয়ে মানুষের হাতে নবরূপায়নে নতুন রূপে গড়ে উঠেছে।
যারা রূপায়ন ঘটিয়েছেন এবং ঘটাচ্ছেন তারা কারা ? সহজভাবে বলা যায়, এরা হলে কর্মী মানুষ। অর্থাৎ দক্ষ মানুষ। তাদের শ্রম ও মেধা অসম্ভবকে সম্ভব করার কাজে ব্যয় করেছেন। মূল বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত থেকে যে কলা কৌশল তারা প্রয়োগ করেছেন, সেটা নির্দ্বিধায় বলা যায় প্রযুক্তি। প্রযুক্তিই হচ্ছে উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি। আমাদের দেশে প্রযুক্তি ভাবনা অতীতেও ছিল বর্তমানেও আছে।

যারা একদা আমাদের দেশে গাড়ি, গাড়ির চাকা, কৃষি উপকরণ, লাঙল, জোয়াল, ইশ্্, লোহার ফাল, আঁচড়া, মই, ঘাস উপড়ানো নিড়িন ইত্যাদি যন্ত্রপাতি এবং নৌ শিল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তাদের অবদানকে খাটো করে অবমূল্যায়ন করা হয়েছে।

বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। ভূমির উপর দিয়ে হেঁটে গেলে দৃষ্টিতে পড়ে অসংখ্য খাল, বিল, বাঁওড়, নদ-নদী জালের মত বিস্তৃত। নদীর এপার-ওপার চলাচলের জন্য খেয়া ঘাট। গাড়ি পারাপারেরও ব্যবস্থা ছিল। অর্থাৎ নৌ-এর সাহায্যে সব কিছু পারাপার হতো। ভারী বর্ষণে রাস্তা ঘাট ভেঙে গেলেও এলাকার মানুষ একত্রিত হয়ে ভেঙে যাওয়া রাস্তা মেরামত করত। সরকারের মুখাপেক্ষি হয়ে ভিক্ষা চাইত না। বাঙালি কোন কালেও ভিক্ষুক ছিল না। সমাজের সকল শ্রেণীর পেশাজীবীরা সমাজের অভ্যন্তরীণ সমস্যা সমাধান করত। চাষীরা ফসল উৎপাদন করত। তাঁতীরা বস্ত্র বয়ন করত, কামারেরা যন্ত্রপাতি তৈরি করত, কুম্ভকাররা হাড়িকুড়ি বানাতো, ছুতোররা গাড়ি, চাকা, লাঙল ইত্যাদি তৈরি করত। এক পেশাজীবীর সঙ্গে অন্য পেশাজীবীর ছিল দ্রব্য বিনিময়ের সম্পর্ক। সমাজ উন্নয়নের ব্যাপারে কেউ কারো প্রতিপক্ষ ছিলনা।

তৎকালের প্রযুক্তি নির্ভর সমাজে চাল, ডাল, তেল, বস্ত্রের অভাব না থাকলেও বর্তমান কলের যন্ত্রশিল্পের মত এত উন্নত ছিল না। ব্যক্তিস্বার্থও এত প্রবল ছিলনা। তবে সমাজ ব্যবস্থা ছিলো অত্যন্ত শক্তিশালী। সমাজই সমাজের প্রয়োজনে একটা ঐক্যমত্যের শৃঙ্খলে আবদ্ধ থাকায় সকল কর্মের সঙ্গেু যুক্ত ছিল।

যোগাযোগ ব্যবস্থার কথা বলা যায়। নদীকে তারা লোহার বেড়ি দিয়ে বাঁধেননি। নদীর প্রবাহের ওপর নির্ভর করে নৌ শিল্পের উন্নয়ন ঘটিয়েছেন। নদীর তীরবর্তী বসত বাড়িগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের ব্যবস্থা ছিল নৌকা। অর্থাৎ নৌকা ছিল যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম। ছোট ছোট নদীতে ছিল সাঁকো। কোথাও কোথাও বাঁশের সাঁকো এবং কোথাও ছিল কাঠের সাঁকো। রাস্তা-ঘাট ছিল চলাচলের অনুপযোগী। ব্যবসা-বাণিজ্য সওদাগীরি সবকিছু ছিল নৌকা নির্ভর। নদীকে কেন্দ্র করে তৎকালে হাটবার গড়ে ওঠে। গ্রামের উৎপাদিত ফসল বেচা-কেনা হতো এইসব হাট-বাজারে।

এই নদীকেন্দ্রিক বাজার ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটতে শুরু করে ৮ শতকের প্রারম্ভিককাল থেকে। ১৮ শতকের আগেই বাংলায় মূদ্রা ব্যবস্থা প্রচলন দেখা দেয়। য়ুরোপীয় বণিকরা এই বাজার ব্যবস্থা চাঙ্গা করে তোলে। তারা এ দেশের সূতিবস্ত্র, চাল, শোরা, তামাক, সুপারি তেঁতুল, নারকেল, নারকেলের তেল, ছোবড়া ইত্যাদি দ্রব্য খরিদ করে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করত।

এ দেশের বাজার ব্যবস্থার রূপান্তরের সঙ্গে নগর গড়ে ওঠার প্রক্রিয়া যখন দেখা দেয় তখন আবশ্যিক হয়ে ওঠে যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরো সহজতর করে তোলা।

বাংলায় ঔপনিবেশিক আমলে ব্রিটিশ তার স্বার্থে ইংল্যান্ডে শিল্প বিপ্লবের পর ভারতকে পুরোপুরি বাজার হিসেবে গণ্য করে। ভারত হয়ে ওঠে ইংল্যান্ডের শিল্পপতিদের কাঁচামালের জোগানদার। বিশেষ করে এদেশের তাঁত শিল্পকে তারা পঙ্গু করে দিয়ে এ দেশের উৎপাদিত তুলা নিজের দেশে নিয়ে গিয়ে সূতা ও বস্ত্র তৈরি করে ভারতের বাজারে রপ্তানি করত। তুলা ও কাঁচামাল বাংলার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করার ব্যাপারে যোগাযোগের কোনে উন্নত ব্যবস্থা ছিলনা। নৌপথে নানারকম সংকট ও বাঁধা বিপত্তি। মালামাল বহনের জন্য কোনে সুব্যবস্থা ছিলনা। উনিশ শতকের দ্বিতীয় দশকে তারা এদেশে রেলপথ নির্মাণের পরিকল্পনা হাতে নেয়। বৃটেনের শিল্প পুঁজির স্বার্থে পণ্য দ্রব্য আমদানি ও রপ্তানি করার পক্ষে এই সিদ্ধান্ত তারা বাস্তবায়িত করে উনিশ শতকের দ্বিতীয় ভাগে। শুধু রেলপথ নয়-টেলিগ্রাফ, রাস্তা, খাল ও সেতু নির্মাণ কাজে মনোযোগ দেয়। রেলপথ নির্মাণের জন্য বড় বড় ও ছোট ছোট নদীকে সঙ্কুচিত করে ব্রিজ নির্মাণ করে। ফলে নদীর গতিপ্রবাহ গতিহীন হয়ে পড়ে। ছোট ছোট নদীগুলো শুকিয়ে যায়। সেই সব মরা নদী ইদানিং ডাঙা হয়ে উঠেছে। কোনো কোনো নদীর চিহ্ন একেবারে বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

বৃটেনের মিলতন্ত্রীরা এ দেশে রেলপথ তৈরি করেছিল শুধুমাত্র এই উদ্দেশ্যে যে, তাদের কারখানার জন্য স্বল্পমূল্যে তুলা ও অন্যান্য কাঁচামাল যাতে দ্রুত বহন করে আনা যায়। স্বয়ং লর্ড ডালহাউসি বিবৃতি দিয়েছিলেন যে, তুলা ভারত কিছু পরিমানে উৎপাদন করে এবং কেবল দূরের প্রদেশ থেকে জাহাজ বোঝাই করে বন্দরে আনার জন্য উপযুক্ত যানবাহনের বন্দোবস্ত করে দিলে যা ভারত প্রচুর পরিমাণে উৎপাদন করবে, সেই তুলো ইংল্যান্ড তারস্বরে চাইছে।

সেই সময় বাংলার অর্থনীতিতে এর একটা প্রভাব পড়েছিল। কৃষকদের আঁখ উৎপাদনের জন্য উৎসাহিত করা হয়। একই সাথে লম্ব আশের তুলা চাষিরা উৎপাদন করে। ইটালি থেকে বাংলায় গুটি পোকা আমদানি করা হয়। কিন্তু কৃষকরা উৎপাদন করেও লাভবান হয়নি। কারণ সরকার ভূমিকর বাড়িয়ে দিয়েছিল। ফসল উৎপাদনে যে খরচ হয়েছিল, কৃষিপণ্যের দামের সঙ্গে তার কোন সঙ্গতি ছিলনা।

বৃটেন এদেশে যা কিছু করেছিল, তার মধ্যে ছিল শোষণ ও শাসন ব্যবস্থাকে দৃঢ় করার মনোভাব। তারা যে বৃত্তায়ন ও মানসিকতার ধারা তৈরি করেছিল তা এখনো আমরা ধারণ করে আছি। আমরা যে উন্নয়নের কথা বলি এই উন্নয়নের মধ্যেও রয়েছে ঔপনিবেশিক চেতনা। প্রযুক্তির দিকে থেকে আমাদের পূর্ব পুরুষরা নিজস্ব প্রচেষ্টায় যতটুকু অর্জন করেছিল, সেই অর্জনটুকুও আমাদের উন্নয়নের কাজে লাগাতে পারিনি। এখনো পরনির্ভরশীলতা আমাদের চরিত্রে লিপ্ত হয়ে আছে। উৎপাদনের ক্ষেত্রেও আমরা পিছিয়ে আছি। দেশের অভ্যন্তরে যোগাযোগ ব্যবস্থা এত দুর্বল যে, চলাচলের পক্ষে নিরাপদ নয়।

উন্নয়নের প্রধান শর্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা। রাস্তার অবস্থা চলাচলের জন্য আজও বিপদসঙ্কুল। এক স্থান থেকে অন্য এক স্থানে মালামাল বহন করে নিয়ে যাওয়া সাধ্যাতীত ব্যাপার। এর ফলে বাজার ব্যবস্থা ক্রমশ ধস নামছে। এই ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে কতিপয় অসাধু ব্যক্তির পরিচালনায়। এক শ্রেণীর চাঁদাবাজ নিজেদের বাহুবলে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করে নিচ্ছে। ১০ টাকার মাল ৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করছে ফোড়েলরা। গুদাম ঘরে হাজার হাজার টন মাল মজুদ করে কতিপয় ব্যবসায়ী কলাগাছ থেকে বটগাছ হচ্ছে। অর্থাৎ রাতারাতি একশ্রেণীর লোক শুধু বিত্তবান নয়-রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় ক্ষমতাবান হচ্ছে।

এই অসাধুদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে না পারলে দেশের সকল উন্নয়ন মুখ থুবড়ে পড়বে। এই আশঙ্কা থেকে মুক্ত হতে চাই। নিকট পাল্লার রাস্তা হোক কিংবা দূরপাল্লার রাস্তা হোক, কোনো রাস্তা এখন যানবাহান চলাচলের উপযোগী নয়। চামড়া ওঠা ঘেযো কুকুরের শরীরের মত দৃশ্যমান। এতে যাত্রীদের অঙ্গহানি ঘটছে। বাড়ছে মানসিক ক্লান্তি। এর থেকে মুক্তি চায় দেশের মানুষ, চায় নিরাপদ গমনাগমন। দস্যু-তস্কর মুক্ত খানা-খন্দকহীন সড়ক। গমনাগমনে শান্ত শিষ্ঠ পরিবেশ। এটাই জনগণের প্রত্যাশা। এই প্রসঙ্গে বলতে চাই-‘পদ্মা সেতু’ দক্ষিণ বাংলার আপামর জনগণের মনের আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটিয়েছে। ব্যবসা বাণিজ্যের নতুন দ্বার খুলে দিয়েছে। নিরাপত্তা সুদৃঢ় করতে পারলে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আরো সুসমৃদ্ধ হবে এতে কোনো সন্দেহ নেই।

লেখক : কথা সাহিত্যক ও গবেষক

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

সর্বশেষ

চাঁচড়ায় রনি হত্যাকাণ্ডে ১২ জনের নামে মামলা

নিজস্ব প্রতিবেদক : যশোর শহরতলীর চাঁচড়ায় রনি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় কোতোয়ালি থানায় মামলা হয়েছে। নিহত রনির...

মাতৃদেবীজ্ঞানে আসন নেয় সৃজিতা ঘোষাল

এসআই ফারদিন : সোমবারের সকালটা জেগে উঠেছে ঢাক-বাদ্যের তালে। আর এই ঢাকের তাল বলছে মহা...

এলজিইডি যশোর অফিসের মধ্যে ঠিকাদারকে লাঞ্ছিতের অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক : স্থানীয় সরকার অধিদপ্তর (এলজিইডি) যশোর অফিসের মধ্যে হারুণ অর রশিদ নামে এক...

সম্প্রীতি ধরে রাখার আহ্বান এমপি নাবিলের

নিজস্ব প্রতিবেদক : সম্প্রীতি ধরে রাখতে নৌকায় ভোট দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন যশোর-৩ আসনের সংসদ সদস্য...

যশোরে বাবা ও চাচার বিরুদ্ধে মেয়ের মামলা

নিজস্ব প্রতিবেদক : যশোর শহরতলীর শেখহাটিতে পথ রোধ করে হত্যার উদ্দেশ্যে মারপিট করে জখম, শ্লীলতাহানি...

যশোর বঙ্গবন্ধু প্রথম বিভাগ ফুটবল লিগের ‘খ’ গ্রুপের সেরা রাহুল

নিজস্ব প্রতিবেদক : গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে রেলিগেশন এলাকায় থাকা নওয়াপাড়া খেলোয়াড় কল্যাণ সমিতির কাছে...