Sunday, May 22, 2022

শতবর্ষে শত আশা: মেহবুব সাত্তার

সদ্য স্নাতক স্বপ্নবাজ তিন তরুণ আমেরিকার অর্থ আদান-প্রদানেরের বৃহৎ প্রতিষ্ঠান পেপ্যালে চাকরি করেন। মালিকপক্ষ হঠাৎ একদিন প্রতিষ্ঠানটি বিক্রি করে দেয়। অনেকের সাথে তাদেরও চাকরি চলে যায়। হায়ার এন্ড ফায়ারের দেশে এগুলো খুব স্বাভাবিক ঘটনা। বেকার জীবনে তিন বন্ধু হতাশ না হয়ে নতুন কিছু একটা করার চিন্তা করতে থাকে। ২০০৫ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি ভালোবাসা দিবসে বিশ্ববাসীর সামনে তাদের আইডিয়া তুলে ধরলেন অনলাইনে ভিডিও শেয়ারিং এর ওয়েবসাইট ইউটিউব। এই তিনি স্বপ্নবাজ তরুন হলো চাদ হার্লে, স্টিভেন চ্যান ও বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত জাবেদ করিম। ইউটিউবের প্রথম ভিডিও জাবেদ করিমের ‘চিড়িয়াখানায় আমি’ ২৩ এপ্রিল ২০০৫ সালে আপলোড করা হয়। দুই মাস পর আনুষ্ঠানিকভাবে সবার জন্য ওয়েব সাইটটি উন্মুক্ত করা হয়। ২০০৬ সালে গুগল ১.৬৫ বিলিয়ন ডলারে ইউটিউব কিনে নেয়। এখন পৃথিবীতে সবচেয়ে লাভজনক স্টার্টআপ বা নতুন উদ্যোগের একটি হলো ইউটিউব। আর এর সাথে জড়িয়ে গেলো একজন বাংলাদেশির নাম, যার বাবা নাইমুল করিম আর মা জার্মান। বড়ো কিছু করতে গেলে বড়ো স্বপ্ন দেখতে হয়। পঞ্চাশের দশকে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেছিলেন। তিনি সবার মাঝে তাঁর সেই স্বপ্ন ছড়িয়ে দিলেন, সবাইকে উদ্বুদ্ধ করলেন। তাঁর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে সমাজের সকল স্তরের জনগণ এগিয়ে এলো, দেশ স্বাধীন হলো। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হলো।

বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য উত্তরসূরি আজকের প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা ২০০৮ সালে উপলব্ধি করেছিলেন ডিজিটাল বাংলাদেশের গুরুত্ব। তাই তিনি তাঁর নির্বাচনী ইশতেহারে ডিজিটাল বাংলাদেশ, রূপকল্প ২০২১ এর স্বপ্ন দেখিয়ে ছিলেন দেশবাসীকে। ডিজিটাল টুলস ব্যবহার করে দেশ থেকে দারিদ্র্য ও বৈষম্য দূর করা এবং মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠাসহ ন্যূনতম মৌলিক চাহিদা পূরণের মাধ্যমে বিদ্যমান সমাজ ব্যবস্থাকে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থায় রূপান্তরিত করা। তাঁর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে দেশবাসী বিশেষ করে যুবসমাজ এগিয়ে এলো, রূপকল্প ২০২১ বাস্তবায়িত হলো। ডিজিটাল বাংলাদেশ এখন স্বপ্ন নয় বাস্তবতা। করোনা অতিমারি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে ডিজিটাল বাংলাদেশের সুফল। গত ১৩ বছর ধরে ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের ফলে দেশের সকল ক্ষেত্রেই আইসিটি’র প্রভাব পড়েছে। দেশের মানুষ ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহারে অভ্যস্থ হয়েছে। ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারগুলো ফাইবার অপটিক্যাল সংযোগের আওতায় এসেছে। স্কুলগুলোতে শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। হাজার হাজার ই-বুক ও ইন্টার অ্যাকটিভ কনটেন্ট ডিজাইন ও ডেভলপ করা হয়েছে। এর সুবিধা সংশ্লিষ্ট সকলেই পাচ্ছে। জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবার তাঁর দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা রূপকল্প ২০৪১ ঘোষণা করেছেন। এর ভিত্তিমূলে রয়েছে দুইটি অভিষ্ঠ, একটি হলো ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ হবে একটি উন্নত দেশ, যেখানে মাথাপিছু আয় হবে ১২ হাজার ৫ শত ডলারেরও বেশি। আর দ্বিতীয়টি হলো বাংলাদেশ হবে সোনার বাংলা, যেখানে দারিদ্র্য হবে সুদূর অতীতের ঘটনা। ২০৩১ বাংলাদেশ হবে উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশ। মাথাপিছু আয় হবে ৩ হাজার ২৭১ ডলার। বর্তমানে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ২ হাজার ৫ শত ডলারেরও বেশি। ২০৪১ সালে দেশের সম্ভব্য জনসংখ্যা হবে ২১ কোটি ০৩ লাখ। বাংলাদেশ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর পরিকল্পনা মতোই এগুচ্ছে। আয়তনের দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বের ৯৩তম অবস্থানে আছে। জনসংখ্যা বিবেচনায় আমাদের দেশের অবস্থান ৮ম। এমন একটি জনবহুল দেশের জন্য যেকোনো পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন খুব সহজ না। তদুপরি আমাদের উল্লেখযোগ্য তেমন কোনো প্রাকৃতিক সম্পদও নেই। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশও চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের ঊষালগ্নে দাঁড়িয়ে আছে। করোনা অতিমারি মোকাবিলায় সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যেভাবে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে, ফিজিক্যাল ডিসটেন্সড মেইটেন করে ভার্চ্যুয়ালি কানেক্টেড থেকে তাদের সেবা প্রদান নিশ্চিত করেছে, তেমনি করোনা পরবর্তী সময়েও এ অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার আরও বিস্তৃত করা সম্ভব হবে।
২০০৮ সালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী উপলব্ধি করেছিলেন ডিজিটাল বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে অর্থ ও পেশিশক্তির বদলে মেধা ও জ্ঞানের শক্তির প্রাধান্য লাভ করবে। কৃষিভিত্তিক সমাজব্যবস্হা থেকে পর্যায়ক্রমে দেশকে সৃজনশীল ও মেধাভিত্তিক শিল্পোন্নত দেশে পরিণত করা সম্ভব হবে। তাই তরুণ সমাজকে টার্গেট করে তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে গুরুত্ব দিয়ে এর অবকাঠামোগত উন্নয়ন, তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক মানবসম্পদ উন্নয়ন, ই-গভর্ন্যান্স প্রতিষ্ঠা এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিকাশে সময়াবদ্ধ পরিকল্পনা করে বাস্তবায়নের পদক্ষেপ গ্রহণ করলেন। তরুণ সমাজকে চাকরির পিছনে না ছুটে উদ্যোক্তা হওয়ার পরামর্শ দিলেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ক মাননীয় উপদেষ্টা ও আর্কিটেক্ট অব ডিজিটাল বাংলাদেশ সজীব ওয়াজেদ এর যথাযথ দিকনির্দেশনায় তথ্য প্রযুক্তিখাতের উন্নয়ন, কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন হচ্ছে।

সরকার অনুমোদিত স্টার্টআপ বাংলাদেশ লিমিটেড কোম্পানি দেশে দ্রুত উদ্ভাবন, নতুন কর্মসংস্থান তৈরি, প্রযুক্তিগত দক্ষতার বিকাশ এবং সম্ভাবনাময়ী ও প্রযুক্তিভিত্তিক বিভিন্ন উদ্যোগে বিনিয়োগ মাধ্যমে টেকসই ইকোসিস্টেম তৈরিতে সহায়তা করেছে। স্টার্টআপদের মাধ্যমে করোনা মহামারিকালের নানারকম চ্যালেঞ্জকে মোকাবিলা করে ১৫ লক্ষেরও বেশি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে। ২০২১ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষ্যে স্টার্টআপ বাংলাদেশ উদ্বোধন করে ‘ শতবর্ষের শত আশা’ ক্যম্পেন যার মাধ্যমে ৫০ টি স্টার্টআপ কোম্পানিতে বিনিয়োগ করা হবে সর্বমোট ১০০ কোটি টাকা। এরই ধারাবাহিকতায় প্রথম সাতটি বিনিয়োগ গ্রহণকারী স্টার্টআপ হলো পাঠাও লিমিটেড, সেবা প্লাটফর্ম লিমিটেড, চালডাল ডটকম, ইনটেলিজেন্স মেশিন, ঢাকা কাস্ট,এডু হাইভ এবং মনের বন্ধু। এ সাতটি স্টার্টআপ কোম্পানিতে প্রাথমিকভাবে ১৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে যার মাধ্যমে কোম্পানিগুলো তাদের পণ্য বা সেবার মানউন্নয়ন, উৎপাদন বৃদ্ধি, বিপণন ও সাপ্লাই – চেইন ব্যবস্হাপনার করেছে এবং করছে। এ সকল কোম্পানি নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, যোগাযোগ ব্যবস্হার উন্নয়ন, পণ্যসরবারহ, টেকনোলজি এবং শারীরিক ও মানসিক সেবার উন্নয়নে অবদান রাখছে।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি শিল্পের বিকাশে সারাদেশে ৩৯ টি হাই-টেক পার্ক নির্মাণ করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে ৫ টি পার্কে নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে। আরো ৩ টি পার্কের নির্মাণ কাজ দ্রুত শেষ হবে। এ পর্যন্ত হাই- টেক পার্কসমূহে ১১৬ টি স্থানীয়স্টার্টআপ কোম্পানিকে বিনামূল্যে স্পেস বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ সকল কোম্পানি ইতিমধ্যে ৫০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি এখাতে বিনিয়োগ করেছে। এ খাতে প্রশিক্ষিত জনবল তৈরি করতে হবে। ২০২৫ সালের মধ্যে ৫৫ হাজার এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ১ লাখ তরুণ-তরুণীকে প্রশিক্ষণ প্রদানের লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে। ইতিমধ্যে এ খাতের জন্য কমবেশি ২৯ হাজার প্রশিক্ষিত জনবল তৈরি করা হয়েছে। ৪০ হাজারেরও বেশি তরুণ-তরুণীকে প্রফেশনাল আউটসোরসিং প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। তাদের সমন্বিত উপার্জন ৩.১ মিলিয়ন ডলারের ওবেশি।

২০৪১ দেশ হবে উন্নত বাংলাদেশ। এ জন্য অনুকরণ নয় উদ্ভাবন এর মাধ্যমে দারিদ্র্য শূন্য, মেধাভিত্তিক সমাজ গঠনের লক্ষ্যে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ বলেছেন, “চতুর্থ শিল্পবিপ্লবে নেতৃত্ব দেবে বাংলাদেশ এটা কোনো স্বপ্ন নয়, বাংলাদেশের সেই সক্ষমতা আছে।” আর আমাদের সবাইকে সেই সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েই জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ গড়তে হবে।

– পিআইডি ফিচার

 

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

সর্বশেষ

যশোরে সন্ত্রাসীদের বর্বর নির্যাতনে যুবকের মৃত্যু

নিজস্ব প্রতিবেদক: যশোরে সন্ত্রাসীদের বর্বর নির্যাতনে এক যুবকের মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। আজ রোববার (২২...

যশোরে অর্ধগলিত ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার

নিজস্ব প্রতিবেদক: রাসেল হোসেন (২৪) নামে এক যুবকের অর্ধগলিত ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। আজ...

কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই এভাবে চলতে পারে না

যশোরের মণিরামপুর উপজেলার জোকা কোমলপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নবিরুজ্জামান বিদ্যালয়ে যান না...

ভোরের ঝড়ে লণ্ডভণ্ড যশোরাঞ্চল

উপড়ে পড়েছে গাছপালা ভেঙে গেছে বাড়িঘর-বিদ্যুতের খুঁটি অশনির আঘাত না কাটতেই কৃষকের ঘরে কালো থাবা শাহারুল...

যশোর প্রিমিয়ার ডিভিশন ক্রিকেট আরএন রোডের জয় ছিনিয়ে নিল হাসানুর

নিজস্ব প্রতিবেদক: শনিবার সকালে যশোর অঞ্চলের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া কালবৈশাখী দমকা হাওয়া শামস্-উল-হুদা...

সুজলপুরে দুই বন্ধুকে মারপিটের অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক: পূর্বশত্রুতার জের ধরে যশোর শহরতলীর সুজলপুরে সাকিব (২৫) ও নাহিদ (২৩) নামে...