সংবাদপত্রের পাতা থেকে

সাজেদ রহমান
১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসের প্রথম থেকেই যশোর রণাঙ্গনে যুদ্ধ চলে প্রায় প্রতিদিন। ৩ ডিসেম্বর ‘জয়বাংলা’ পত্রিকায় রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছিল ‘ভীত সন্ত্রস্ত হানাদার সৈন্যরা মৃত্যুর দিন গুণছে’ শিরোনামে।
রিপোর্টে বলা হয়-‘ভীত সন্ত্রস্ত হানাদার সৈন্যরা মৃত্যুর দিন গুণছে। মুক্তিবাহিনীর তরুণ বীর যোদ্ধারা গত ২৩ নভেম্বর যশোর বিমান ক্ষেত্রটি প্রচন্ড আক্রমণ চালিয়ে ক্ষতিগ্রস্থ করেছে। মুক্তিযোদ্ধারা যশোর শহরের উপকন্ঠে এখন আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছেন। ভীত সন্ত্রস্ত সৈন্য, অবাঙালি অফিসার ও দালালরা এখন শহর ছেড়ে পালিয়ে যেতে শুরু করেছে। এদিকে গেরিলা যোদ্ধাদের মারাত্মক সাড়াশী আক্রমণের ফলে হানাদার বাহিনী সৈন্যরা এখন ক্যান্টনমেন্টে আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা নিয়েছে। মুক্তিযোদ্ধারা এখন যশোর শহর তিনদিক থেকে আক্রমণ চালাচ্ছে। জঙ্গী সরকার আসন্ন পরাজয়ের মুখে শহর থেকে গুরুত্বপূর্ণ দলিলপত্র ও অর্থ ঢাকায় পাচার করছে।
২৫ নভেম্বর রণাঙ্গন থেকে আমাদের প্রতিনিধি জানিয়েছেন, মুক্তিবাহিনীর প্রচন্ড আক্রমণে যশোরের দালাল, রাজাকার, অন্যান্য বেঈমান ইতররা এক্ষণে শহর ছেড়ে সেনাবাহিনীর আশ্রয় খুঁজে বেড়াচ্ছে। গেরিলা যোদ্ধাদের তীব্র আক্রমণে ইতোমধ্যে শত্রুপক্ষের একটা বিরাট অংশ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। পাকিস্তান বেতার থেকে ২৫ নভেম্বরের সংঘর্ষের খবর স্বীকৃত হয়েছে। খবরে বলা হয়, চৌগাছায় তুমুল যুদ্ধ চলছে। যশোর শহর থেকে প্রায় ১৮ মাইল উত্তর-পশ্চিমে ঝিনাইদহের পাঁচমাথার মোড় দখল করে মুক্তিবাহিনী সেখানে তাদের ঘাঁটি শক্তিশালী করেছেন। ঝিকরগাছায় যুদ্ধ অব্যাহত রয়েছে। ওদিকে মুক্তিবাহিনী জগন্নাথপুর ও চুয়াডাঙ্গা নামক দুটি গ্রাম দখল করে নিয়ে যশোর ঝিনাইদহ রোড মারফত পাক সেনাদের চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে। এই রোড বন্ধ থাকায় পাক সেনাদের ঢাকার দিকে পলায়নের আর কোন রাস্তা থাকল না। যশোর ও কুষ্টিয়া জেলায় মুক্তি বাহিনী জীবননগর, বাগআঁচড়া, শার্শা, নাভারণ থেকে শত্রু সন্যকে বিতাড়িত করেছে। ঝিনাইদহের পাঁচমাথার মোড় সামরিক দিক থেকে গুরুত¦পূর্ণ। কারণ এই মোড় থেকে কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, যশোর, খুলনা, মাগুরা ও ঢাকা যাওয়ার পথ। সুতরাং পাকিস্তানি সৈন্য পাঁচমাথার মোড় পুনরুদ্ধার করার জন্য মরণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাবার সম্ভবনা রয়েছে। মুক্তিবাহিনী ঝিনাইদহের পাঁচমাথার মোড়ে চুয়াডাঙ্গা, কুষ্টিয়া রাস্তায় বিরাট বেরিকেট দেওয়ায় ঝিনাইদহ থেকে পাকিস্তানি সৈন্যরা যশোরে ফিরতে পারছে না।

সংবাদপত্রের পাতা থেকে
দৈনিক যুগান্তর পত্রিকায় ৩ ডিসেম্বর একটি রিপোর্টের শিরোনাম ছিল ‘টাঙ্কের লড়াইয়ের প্রস্তুতি’।
রির্পোটে বলা হয়-দর্শণা হল্টে পাকিস্তানি সৈন্য বাহিনী ট্যাঙ্ক লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত। দর্শণার ৪ মাইল পূর্বে উথলীতে পাকিস্তান বৃহস্পতিবার প্রায় এক স্কোয়াড্রন ট্যাঙ্ক এনেছে বলে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে।বুধবার দর্শণা হল্টে মুক্তিবাহিনী কিছুটা এগিয়ে সুগার মিলের আড়াল নিয়ে পাকিস্তানি সৈন্যদের প্রচন্ড আক্রমণ করে। কিন্তু পাকিস্তানি সৈন্য গোলা বর্ষণ করে ওই আড়াল ভেঙে দিলে বৃহস্পতিবার সেখানে মুক্তি বাহিনী, পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে তুমুল সম্মুখ সমরে লিপ্ত হয়েছে।
অন্যদিকে যশোর সেক্টরে মুক্তিবাহিনী বেনাপোলের কোন এক স্থানে প্রচন্ড আক্রমণ চালিয়ে নাভারণ সাতক্ষীরা রোডের উপর উঠেছে। ফলে নাভারণ ও সাতক্ষীরার মধ্যে পাকিস্তানি ফৌজের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে।
যুগান্তর পত্রিকায় আরও রিপোর্ট হয়েছে ‘আজ প্রধানন্ত্রী কলকাতা আসছেন’। বিকাল ৪টায় তিনি কলকাতার ব্রিগেড ময়দানে ভাষণ দেন। রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়-বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বর্তমান পরিস্থিতি এবং পাকিস্তানি বাহিনী কর্তৃক ভারতীয় গ্রামে গোলা বর্ষণ ও বিমান হামলার পেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রীর এই সফর পশ্চিমবঙ্গের জনসাধারণ এবং এখানে থাকা শরণার্থীরা সাগৃহে প্রতীক্ষা করছেন।

চার:
ডিসেম্বর মাসে পাক হানাদার বাহিনী দিশেহারা হয়ে পড়েছিল যশোর রণাঙ্গনে। এক পা এগিয়ে যায়, তো দু’পা পিছিয়ে আসে। আর এটা হয়েছিল মুলত চৌগাছা যুদ্ধে পরাজয়ের পর। ‘জয়বাংলা’ পত্রিকা ৪ ডিসেম্বর রিপোর্ট করে ‘ভারতীয় সৈন্যরা যশোরে প্রবেশ করেছে’। রিপোর্টটি ছিল ছোট, কিন্তু গুরুত্ব অনেক। রিপোর্টে বলা হয়-‘ভারতীয় সৈন্য বাহিনী বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে এবং দ্রুত যশোরের কাছে উপনীত হয়েছে। ইস্টার্ন কমান্ডের জিওসি লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা আজ কলকাতায় ভারতীয় ও বিদেশি সাংবাদিকদের এ কথা বলেন। সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে, তিনি বলেন, আমাকে দয়া করে তিনদিন সময় দিন। এ সময় জেনারেল অরোরা আরও বলেন যে- বয়রার অদূরে ভারতীয় ঘাঁটিগুলোর শক্তি গতকাল রাতে বৃদ্ধি করা হয়েছে। আমাদের সৈন্যরা আমাদের সীমান্ত থেকে প্রায় ৫০০০ গজ এগিয়ে গেছে এবং তারা এখন যশোর থেকে প্রায় ১৮ হাজার গজ দূরে রয়েছে। তিনি আরও বলেন, গত মাসে বয়রায় সংঘর্ষের সময় পাকিস্তানের তিনখানি সাবরজেটের খতম হয়েছে। তার বিশ্বাস ভারতীয় বিমানবাহিনী আগামী ৪৮ ঘন্টার মধ্যে বাংলাদেশের জঙ্গিসাহীর যেখানে যতগুলো বিমান আছে তা খতমের কাজ শেষ করতে পারবে।
৪ ডিসেম্বর দৈনিক যুগান্তর যশোরের রিপোর্ট লিড করেছে। তাদের পত্রিকার শিরোনাম ছিল ‘ভারতীয় সৈন্যরা বাঙলাদেশে প্রবেশ করেছে: যশোরের কাছে উপনীত’। রিপোর্টে বলা হয়-ভারতীয় সৈন্যরা বাঙলাদেশে প্রবেশ করেছে এবং দ্রুত যশোরের কাছে উপনীত হয়েছে।…কলকাতায় ইষ্টার্ন কমান্ডের জিওসি লে: জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা কলকাতায় ভারতীয় এবং বিদেশী সাংবাদিকদের বলেন, ভারতীয় বিমান বাহিনী প্রধানত: সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্যবস্তু, বিশেষ করে বিমান ঘাঁটির উপর আক্রমণ চালিয়েছে। তিনি আরও বলেন, অনুমান করা হচ্ছে বাংলাদেশে ৪ ডিভিশন অর্থাৎ ৭০ থেকে ৮০ হাজার পাকিস্তানি সৈন্য আছে। এরমধ্যে দুই ডিভিশন যশোর থেকে বাংলাদেশের পশ্চিমখন্ডে এবং নাটোর অথবা বগুড়ায় আক্রমণ চালাচ্ছে, আর তৃতীয় ডিভিশনটি রয়েছে ঢাকার সামরিক সদর ঘাঁটিতে।
যশোর আক্রমণ অভিযান সম্পর্কে তার পরিকল্পনা সম্বন্ধে বিদেশী সাংবাদিকরা বার বার প্রশ্ন করতে থাকলে তিনি বলেন, আমাকে দয়া করে তিনটা দিন সময় দিন। লে: জেনারেল অরোরা আরও বলেন যে, বয়রার অদূরে ভারতীয় ঘাঁটিগুলির সৈন্য শক্তি গতকাল রাত্রে বৃদ্ধি করা হয়েছে। আমাদের জওয়ানরা আমাদের সীমান্ত থেকে প্রায় পাঁচ হাজার গজ এগিয়ে গেছে এবং তারা এখন যশোহর শহর থেকে ১৮ হাজার গজ দূরে রয়েছে।
বাংলদেশে পাক বিমান বাহিনীর শক্তি সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে লে: জে: অরোরা আরও বলেন যে, গত মাসে বয়রায় সংঘর্ষের সময় পাকিস্তানের তিনখানি স্যাবরজেট খতম হয়েছে। তার বিশ^াস ভারতীয় বাহিনী আগামী ৪৮ ঘন্টার মধ্যে বাংলাদেশের রাজশাহীর আর যে কয়খানি বিমান ঘাঁটি আছে তা খতম করতে পারবে। তিনি আরও বলেন, তার আক্রমণাত্মক পরিকল্পনাও রয়েছে। তবে তিনি এখন ফাঁস করবেন না।
লেখক : জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে