Wednesday, May 18, 2022

সংবাদপত্রের পাতা থেকে

সাজেদ রহমান :
‘প্রায় অক্ষত অবস্থায় যশোর দূর্গ দখল’ শিরোনামে ৯ ডিসেম্বর যুগান্তর পত্রিকায় একটি রিপোর্ট প্রকাশ হয়। যেটি লিখেছেন সুখরঞ্জন সেনগুপ্ত। ‘ভারতীয় বাহিনী যশোর শহরের পূর্ণ কতৃত্ব গ্রহণ করেছেন এবং অসামরিক জনগণ শহরের রাস্তায় রাস্তায় ভারতীয় জওয়ানদের হর্ষমূখর অভিনন্দন জানাচ্ছেন।

যশোর শহর পশ্চিম পাকিস্তানিদের হাত থেকে মুক্ত হবার ঠিক ২৪ ঘন্টা পরে আজ(৭ ডিসেম্বর) দুপুরে যখন যশোর ক্যান্টনমেন্টে প্রবেশ করি তখনও নড়াইল ও রুপদিয়ার সড়কে পশ্চিম পাকিস্তানিদের সঙ্গে ভারতীয় বাহিনীর যুদ্ধ হচ্ছিল।

যশোর সেক্টরে ভারতীয় বাহিনীর জিওসি মেজর জেনারেল দলবীর সিং যশোর শহরে প্রবেশকারী প্রথম ভারতীয় ও বিদেশী সাংবাদিকদের জানান যে, যশোর ক্যান্টনমেন্ট আমি প্রায় বিনা যুদ্ধেই দখল করেছি। পশ্চিম পাকিস্তানি সৈন্য বাহিনীর ৯ নম্বর আর্মাড ডিভিশনের সদর দফতর যশোর ক্যান্টনমেন্টের একটি কক্ষে দাঁড়িয়ে ভারতীয় বাহিনীর ৯ নম্বর ডিভিশনের অধিনায়ক মেজর জেনারেল দলবীর সিং বলেন, আমি প্রায় সব কিছুই অক্ষত অবস্থায় দখল করেছি। আমার সৈন্যরা ক্যান্টনমেন্টে প্রবেশ করার আগেই পশ্চিম পাকিস্তানিরা ফরিদপুর, গোয়ালন্দ ও খুলনার দিকে পলায়ন করেছে। ক্যান্টনমেন্টের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা খুবই শক্তিশালী ছিল।
পশ্চিম পাকিস্তান সৈন্যদের দুটি অতিকায় সামরিক মানচিত্রের সামনে দাঁড়িয়ে জেনারেল বলেন, সৈনিক হিসাবে আমি বলছি যে, যশোর আসার পথে যে সকল পশ্চিম পাকিস্তানিদের সঙ্গে আমাদের মোকাবিলা হয়েছে সে সকল ক্ষেত্রে তারা বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করেছে এবং ওই সকল জায়গায় তারা যুদ্ধ করার পর ঘাঁটি ত্যাগ করেছে। তবে ক্যান্টনমেন্টে কেন এমন হলো এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন আমার মনে হয় যে, এখানে পশ্চিম পাকিস্তানি সৈন্যদের পরিচালনা করার মত উর্ধতন নেতৃত্ব ছিল না। তিনি স্বীকার করেন যে যশোর ক্যান্টনমেন্টের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা খুবই শক্তিশালী ছিল।

শহরের বাড়ি ঘর অক্ষত:
যশোর শহরে প্রকৃতপক্ষে কোন যুদ্ধ না হওয়ায় ফলে শহরের প্রধান রাস্তার উপর বাড়ি ঘর গুলো অক্ষত রয়েছে। তবে লোকজনের সংখ্যা খুব বেশি নয়। বিকালের দিকে রবীন্দ্রনাথ রোড, দড়াটানা মোড়, মিউনিসিপ্যালিটি রোড, মিস্ত্রীখানা রোড়ে লোকের ভীড় দেখেছি। মুক্তি বাহিনীর লোকেরা শহরের শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য বন্দুক ও মেশিন গান নিয়ে টহল দিচ্ছে। জেনারেল দলবীর সিং বলেন যে, গতকাল রাতে শহরের দু’জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। মুক্তিবাহিনীর লোকেরা ওই দুইজনকে হত্যা করেছে বলে তার কাছে কিছু লোক জানিয়েছেন। তিনি মুক্তিবাহিনীর লোকদের আরও কাউকে খুন করতে নিষেধ করে দেন। তিনি এই হুশিয়ারি দিয়েছেন যে কাউকে খুন করলে তিনি হত্যাকারীকে নিজে গুলি করবেন। যশোরের অসামরিক অফিসারদের মধ্যে সদর এসডিও তার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। যশোরের জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট কে ও তিনি বাঙালি অফিসার কিনা এই প্রশ্ন করা হলে তিনি কিছু জানাতে অস্বীকার করেন।

আবেগের মুর্হুতগুলি:
আমরা প্রায় সকাল পৌনে নয়টা নাগাদ বেনাপোল দিয়ে বাংলাদেশের যশোর জেলার সীমানায় প্রবেশ করি। কিন্তু আবেগের মুহুর্ত আসে নাভারনে। নাভারন বাজারে বেশ কিছু লোকের ভীড়। আমাদের গাড়ি সেখানে থামলে লোকেরা আনন্দে ‘জয়বাংলা’ ধ্বনি দিতে থাকেন। আমাদের জড়িয়ে ধরেন এবং কেউ কেউ পশ্চিম পাকিস্তানিদের নির্মম অত্যাচারের কথা বলতে বলতে কেঁদে ফেলেন। সেই হত্যা, ধর্ষণ, লুন্ঠন অগ্নিসংযোগ, নিপীড়নের করুন কাহিনী যার আরম্ভ হয়েছে মার্চ মাসের শেষ থেকে এবং যা অব্যাহত ছিল মাত্র ৪৮ ঘন্টা আগেও। যাবার পথে প্রথম বড় ভীড় হয় গদখালীতে। সেখানে লোকেরা শেখ মুজিবুর রহমান ও ইন্দিরা গান্ধীর জয়ধ্বনি করেন।

নাভারন থেকে পাকিস্তানি সৈন্যরা চলে যাবার সময় নাভারনের ব্রিজটি উড়িয়ে দিয়ে যায়। ফলে আমাদের মাঠের মধ্য দিয়ে জীপ নিয়ে যেতে হলো। জওয়ানরা সেখানে বাইপাস তৈরি করেছেন। বেলা সাড়ে ৯টার দিকে যখন ঝিকরগাছা পৌঁছায়, তখন সেখানে কয়েক হাজার লোকের ভীড়। ঝিকরগাছায় কপোতাক্ষ নদের উপর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ব্রিজ ও রেল ব্রিজ সোমবার রাত্র বেলা ১টা নাগাদ পাকিস্তানি সৈন্য ভেঙ্গে দিয়ে চলে গেছে। ভারতীয় বাহিনীর আজ সকাল থেকে সেখানে রাবারের নৌকার উপর দিয়ে ব্রিজ নির্মাণের কাজ আরম্ভ করেন এবং স্থানীয় লোকেরা ও মুক্তিবাহিনী ওই কাজে সহায়তা করছেন। নৌকায় কপোতাক্ষ পার হয়ে ঝিকরগাছার পূর্ব পারে গিয়ে উঠবার পরও সেখানে আবার জনতার জয়ধ্বনি। হোটেল ওয়ালা বুড়ো নুরু মিয়া দেখেই আনন্দে কলরব করে বলে উঠলেন, বাবু আবার এসেছেন। এপ্রিল মাসের প্রথম এক সপ্তাহ ঝিকরগাছায় নুরু মিয়ার হোটেলে সাংবাদিকদের খাবার জায়গা ছিল। নুরু মিয়া চোখের জল মুছতে মুছতে বললেন, খানেরা খুব মেরে মরে গেছি মনে করে ফেলে দিয়েছিল। আগের হোটেল আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে। স্কুটারওয়ালা সহিদুল ইসলাম তার স্কুটার গাড়িতে দুইজন জওয়ান নিয়ে যাচ্ছিল। দেখা মাত্র স্কুটার থেকে এনে এসে জড়িয়ে ধরল, বাবু বেঁচে আছি। এই সহিদুল আন্দোলনের সময় আমাদের স্কুটারে করে বেনাপোল থেকে ঝিকরগাছা নিয়ে আসত। ঝিকরগাছার লোকেরা পশ্চিম পাকিস্তানি সৈন্যদের নির্যাতনের কথা জানাতে গিয়ে বলছিল, ওদের নৃশংসতার কাহিনী বলতে গেলে এক মাসেও শেষ হবে না। তারা বলেছিল যে, আজ যে এতো লোক দেখছেন এরা এত দিন সকলে দূর গ্রামের মধ্যে কোন রকম প্রাণ রক্ষা করেছে। বাজারে-গঞ্জে কোন বয়সের পুরুষ আসতে পারত না। এতোদিন পরে মুক্তির আনন্দে তারা এসে ঝিকরগাছায় ভীড় করছে। এদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে দেখছিলাম দলে দলে লোকেরা গ্রাম পথ দিয়ে মাঠ ভেঙ্গে বাকসো প্যাটরা, কাঁথা লেপ নিয়ে ফিরে আসছে ঝিকরগাছায়। ছোট শিশুরা আসছে কেউ গরু ছাগলের দড়ি ধরে, কেউবা মুরগীকে বুকে জড়িয়ে ধরে। খালি গায়ে সকালের রোদ গায়ে মেখে হাসতে হাসতে শিশু গুলি ধ্বনি তুলছে ‘জয়বাংলা’। যে মেয়েরা পশ্চিম পাকিস্তানি সৈন্যদের দেখে উর্ধশ^াসে দৌড়ে মান ও প্রাণ বাঁচাতেন তারা কাঁখে ও হাতে সংসারের জিনিষ নিয়ে ভারতীয় জওয়ানদের পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছেন। এ এক অদ্ভুদ নিরাপত্তা বোধ ও নিশ্চয়তার আশ^াস, যা না দেখলে বোঝা যায় না।

ভারতীয় বাহিনীর আক্রমণ:
ঝিকরগাছা থেকে পশ্চিম পাকিস্তানি সৈন্যরা সোমবার রাত্রে পলায়ন করে। পলায়নের পথে তারা অনেক রাজাকারদের খুন করে। পুলেরহাটের কাছে ব্রিজটিও তারা ভেঙ্গে দেয়। ভাঙ্গা ব্রিজের নিচ দিয়ে হেঁটে আবার সামরিক গাড়িতে চড়ে আমরা বেলা পৌনে একটা নাগাদ যশোর ক্যান্টনমেন্টে পৌঁছায়। সেখানে জিওসি মেজর জেনারেল দলবীর সিং বলেন যে, গত সোমবার সকালে তিনি যশোর ক্যান্টনমেন্টের প্রায় ১২ মাইল উত্তরে দুর্গাবাটি দিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানি সৈন্যদের আক্রমণ করেন। ওই জায়গায় দই পাশে পাকিস্তানিদের দুইটি ব্যাটালিয়ন ছিল। তার সৈন্যরা প্রচন্ড আক্রমণ চালালে ব্যাটালিয়ন দুইটি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ফলে তিনি যে পথ পান সেই পথ দিয়ে যশোর ক্যান্টনমেন্টের দিকে এগোতে থাকেন। পশ্চিম পাকিস্তানিদের একটি ব্যাটালিয়নের সঙ্গে তাদের প্রচন্ড লড়াই হয়। এবং পাকিস্তানিরা খুবই বীরত্বে সাথে লড়াই করেছে। কিন্তু আর একটি ব্যাটালিয়ন বিচ্ছিন্ন হওয়ায় দিশেহারা হয়ে পড়ে। তাদের উচিৎ ছিল পিছিয়ে যশোর ক্যান্টনমেন্টে ফিরে এসে ক্যান্টনমেন্ট রক্ষার জন্য যুদ্ধ করা। কিন্তু তারা তা না করে ঝিনাইদহের দিকে রাস্তা ধরেছে। কিন্তু সেখান দিয়েও তারা পালাতে পারবে না।

পাকিস্তানিদের পলায়ন:
তিনি বলেন যে, স্থানীয় লোকেরা তাকে জানিয়েছেন যে, ৬ ডিসেম্বর তিনি আক্রমণ আরম্ভ করার আগেই প্রায় ১৫০টি গাড়ি বোঝাই করে পাক সৈন্য ফরিদপুর ও গোয়ালন্দের পথে চলে গেছে। ওই কনভয়ে অনেকে পরিবারও নিয়ে গেছেন। আর অল্প কিছু সৈন্য শ’তিনেকের মতো হবে, খুলনার পথ ধরেছে। তিনি যখন আমাদের এ কথা বলছিলেন তখন মাঝে মাঝে আর্টিলারি ফায়ার ও মেশিনগানের গুলির শব্দ শোনা যাচ্ছিল। তিনি বললেন, খুলনার পথে রুপদিয়া ও নড়াইলের রাস্তায় কিছু যুদ্ধ হচ্ছে। আমরা যুদ্ধ দেখতে চাইলে তিনি তার অধিনস্থ অফিসারদের আমাদের যুদ্ধের খুব কাছে নিয়ে যেতে বললেন। যশোর শহর থেকে প্রায় ৫ মাইল পূর্বে খুলনা যাবার মোড়ে তখন যুদ্ধ চলছে। আমাদের জওয়ানরা কখনও আর্টিলারি কখনও বা ট্যাংক থেকে গোলা ছুড়ছেন। আমরা যখন ওই মোড়ে দাঁড়িয়ে তখন ভারতীয় সৈন্যদের আমর্ডি পারস্যানাল ক্যারিয়ার ও ট্যাংক কনভয় খুলনার দিকে ছুটলো। তখন বেলা প্রায় ৩টা। আর ওই জায়গা থেকে খুলনা শহরের দুরত্ব ৩৫ মাইল।

মাটির মমতা:
বেলা ৩টা নাগাদ যখন যশোর শহর ছেড়ে আসি, তখন শীতের অস্তগামী সূর্যের তীর্যক ছায়া যশোর শহরে উপর বিস্তৃত হয়েছে। রাস্তার মোড়ে মোড়ে লোকের জটলা। আমাদের দেখে ‘জয়বাংলা’ হর্ষধ্বনি। একটি বাড়ির সামনে মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে খেলছে দুটো ছেলে। আমাদের গাড়ির শব্দে চমকে উঠে আমাদের দেখে হেসে ‘জয়বাংলা’ বলেই আবার মাটিতেই গড়াগড়ি-মাটি মাটি মাটি।
-জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

সর্বশেষ

যশোরে গৃহবধূর রহস্যজনক মৃত্যু

নিজস্ব প্রতিবেদক: যশোরে সুমাইয়া খাতুন নামে এক গৃহবধূর রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে। তার ঝুলন্ত মরদেহ...

ঝিকরগাছায় সখিনা হত্যার দায় স্বীকার প্রেমিকের

নিজস্ব প্রতিবেদক: যশোরের ঝিকরগাছায় সখিনাকে হত্যার কথা স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে তার প্রেমিক...

শেখ হাসিনার ৪২তম স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসে বিভিন্ন স্থানে কর্মসূচি পালিত 

কল্যাণ ডেস্ক: বঙ্গবন্ধু কন্যা আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ৪২তম স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসে...
00:03:13

যশোরে বাপ্পি খুনের আসামিরা দুই সপ্তাহেও আটক হয়নি

নিজস্ব প্রতিবেদক: যশোর সদর উপজেলার ভায়না গ্রামের বাপ্পি হাসান (১৯) নামে এক তরুণ খুনের...

পদ্মা সেতুর টোল নির্ধারণে প্রজ্ঞাপন

কল্যাণ ডেস্ক: বহুল প্রত্যাশিত পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে চলাচলকারী যানবাহনের টোল নির্ধারণ করে প্রজ্ঞাপন...

বঙ্গবন্ধু জাতীয় গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট পৌরসভা ও দোহাকুলা ইউনিয়ন ফাইনালে 

বাঘারপাড়া (যশোর) প্রতিনিধি: উপজেলা পর্যায়ে মঙ্গলবার বাঘারপাড়ায় বঙ্গবন্ধু জাতীয় গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের সেমিফাইনাল পর্বের...