Sunday, May 22, 2022

সংবাদপত্রের পাতা থেকে

সাজেদ রহমান :  কলকাতা থেকে প্রকাশিত যুগান্তর পত্রিকায় ১০ ডিসেম্বর যশোরের দুইটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছিল। একটির শিরোনাম ছিল ‘কপোতাক্ষ-ভৈরব-চিত্রা ঘেরা যশোরকে আবার আমরা দেখতে পাব’ ও অন্যটি ছিল ‘যশোরে ৬ হাজার টন অস্ত্রশস্ত্র।

সাংবাদিক অনিল ভট্রাচার্য লেখেন-দীর্ঘ ২৪ বছর পরে যশোর মুক্তি পেল? মাইকেল মধুসূদন এবং একদা মহারাজা প্রতাপাদিত্যের যশোর জেলা শেষ পর্যন্ত পাক হানাদারদের হাত থেকে মুক্ত হতে পেরেছে। বাংলাদেশের পশ্চিমাঞ্চলের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি যশোরের গুরুত্ব বহুবিধ দিক দিয়ে অনীস্বকার্য। যশোরের ঘাঁিটর পতনের সঙ্গে সঙ্গে কার্যত বাংলাদেশের পশ্চিমাঞ্চলের ৬টি জেলায় পাকবাহিনী মুক্ত হওয়ার পথ প্রশস্ত হয়ে গেল। বাংলাদেশের কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনা, ফরিদপুর, বাখরগঞ্জ ও পটুয়াখালি এই ৬টি জেলার পাকবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ পুরো ভেঙ্গে পড়ল।

শুধু সামরিক দিক দিয়ে নয়, ঐতিহাসিক গুরুত্বও যশোর শহর ও যশোর জেলা বিশেষ উল্লেখযোগ্য। যুক্তবঙ্গের এই প্রাচীন জেলাটি বর্তমান বাংলাদেশের পশ্চিমাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ কেন্দ্রও বটে। দক্ষিণে খুলনা ও উত্তরে কুস্টিয়ার সঙ্গে এবং পূর্বে ফরিদপুর ও ঢাকার রেল ও সড়ক যোগাযোগ এই জেলার মধ্যে দিয়ে। খুলনার আরও দক্ষিণে চালনা বন্দরের সঙ্গে বাংলাদেশের পশ্চিমাঞ্চল ও উত্তরাঞ্চলের সংযোগও এই জেলার মধ্যে দিয়ে।

বিগত ২৫ মার্চের পর থেকে যশোরও রক্তস্নান করেছে। হাজার হাজার হিন্দু মুসলমান নিঃস্ব-রিক্ত অবস্থায় ভারতে আসতে বাধ্য হয়েছেন। প্রত্যেকটি সীমান্তে বিহারী মুসলমানরা তাদের শেষ সম্বল লুট করে নিয়ে গেছে। কিন্তু তবু মুক্তিবাহিনীর অসীম সাহসী যোদ্ধা আরও বহুবার চেষ্টা করেছিল যশোরকে মুক্ত করতে। কিন্তু বর্বর পশ্চিম পাকিস্তানি সৈন্যরা আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে নিরস্ত্র যশোরবাসীর উপর যে অত্যাচার চালায় তার ইতিহাস নিশ্চয়ই একদিন প্রকাশিত হবে। এই বর্বরতার বিরুদ্ধে মুক্তিফৌজকে হঠতে হয়েছিল। কিন্তু তবুও ওরা একেবারে জমি ছাড়েনি। গেরিলা কায়দায় লড়াই চালিয়ে ছিল। মনে হচ্ছিল যশোরের মুক্তিযুদ্ধ বিলম্বিত হবে। কিন্তু সাবাস ভারতীয় জওয়ান। তারাই আজ পশ্চিম পাকিস্তানিদের বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ঘাঁটি থেকে বিতাড়িত করেছে। এ গৌরব ভারতবর্ষের, এ গৌরব মুক্তিফৌজের। আবার আমরা কপোতাক্ষ-ভৈরব-চিত্রা নদী দিয়ে সেরা সৌন্দর্যমীয় যশোরকে দেখতে পাব। আবার আমরা দেশে ফিরব এ যেন স্বপ্নের অগোচরে ছিল।
তাই এই যশোর ঘাঁটির পতনের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের এক বিস্তীর্ণ এলাকায় পাকবাহিনীর প্রতিরোধ ক্ষমতা ভেঙে পড়ল। পাকিস্তান হবার পর পাকিস্তানি সৈন্যবাহিনী যশোর শহরে গড়ে তুলেছিল তাদের একরকম দুর্ভেদ্য দুর্গ, যশোর ক্যান্টনমেন্ট। অবশ্য ক্যান্টনমেন্ট গড়ার কৃতিত্ব ওদের নয় দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ আমেরিকান বাহিনী এই ক্যান্টনমেন্ট তৈরি করেছিল। সেই পরিত্যক্ত ক্যান্টনমেন্ট ছিল পাকিস্তানের ক্যান্টনমেন্ট। সম্ভবত কুমিল্লার ময়নামতি ক্যান্টনমেন্টের পরেই যশোরের স্থান।

দেশভাগের পর প্রধানত বিহারী মুসলমানদের অত্যাচারে হাজার হাজার হিন্দু পরিবার ভারতে এসেছিলেন। তারপর পাকিস্তান হবার কয়েক বছর পর আমি যশোরে গিয়েছি কয়েকবার। যশোর আমার মাতৃভূমি। কিন্তু সেই মাতৃভূমিকে যেন চিনতে কষ্ট হয়েছিল। যেখানে ছিল বাংলা ভাষায় দোকানের সাইনবোর্ড, সেখানে দেখেছি উর্দুতে বিজ্ঞাপন। যে বাঙালি মুসলমান ছেলেরা আমার বন্ধু, সহপাঠী ছিল, তারা যেন কেমন বিমর্ষ। দেখা হলে প্রশ্ন করেছে: কেন ছেড়ে গেলি তোরা? কেন এই ধরণের প্রশ্ন করছে, জিজ্ঞাসা করতে বলেছে কোথায় আমাদের স্বপ্নের পাকিস্তান, এতো বিহারী পাঞ্জাবীদের রাজত্ব। আমরা যেন কেউ নয়। বিস্মিত হয়েছি এদের কথাবার্তায়। কেননা পাকিস্তানের জন্য এই বাঙালিরাই তো সত্যিকারের আন্দোলন করেছিল। তারপর অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে। ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে শিক্ষিত বাঙালি মুসলমান প্রথম ধাক্কা খেলো পশ্চিম পাকিস্তানী প্রশাসন ব্যবস্থার কাছে। ভাষা আন্দোলনের সময় পাকিস্তানে গিয়েছি। তখন দেখেছি শিক্ষিত বাঙালি যুবক সমাজের মধ্যে প্রাণচাঞ্চল্য, নিজেদের দাবি স্বীকার করার জন্য কি আত্মত্যাগ। সেই আন্দোলন আর আত্মত্যাগের ঢেউ যশোরেও এসেছিল। এখানেও বাঙালি মুসলমান শহীদ হয়েছে। কিন্তু তবু কোনদিন মনে হয়নি, যশোর পশ্চিম পাকিস্তানিদের হাত হতে মুক্ত হতে পারবে।’

‘যশোরে ৬ হাজার টন অস্ত্রশস্ত্র’ শিরোনামে ১০ ডিসেম্বর যুগান্তর পত্রিকায় নিউজ হয়েছিল-‘যশোর ক্যান্টনমেন্ট থেকে পালিয়ে যাবার সময় পশ্চিম পাকিস্তানিরা ৬ হাজার টনের মতো অস্ত্র ও গোলাবারুদ ফেলে পালিয়ে গেছে। এছাড়া ঝিনাইদহে পশ্চিম পাকিস্তানিদের ক্যাডেট কলেজের ৬টি কক্ষ ভর্তি অস্ত্র ও গোলাবারুদ তারা ফেলে গেছে। ঝিনাইদহের অস্ত্র ও গোলাবারুদ খুব সম্প্রতি এসেছে বলে মনে হয়। কারণ বাকসগুলি ঝক ঝক করছিল। ইস্টার্ণ কমান্ডের জিওসি ইন-সি লে: জেনারেল জেএস অরোরা ওই তথ্য সাংবাদিকদের জানান। ঝিনাইদহে পাকিস্তানি সৈন্যরা ২১ নম্বর বেলুচ রেজিমেন্টের প্রতীক চিহ্নও ফেলে গেছে।-জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

সর্বশেষ

যশোরে সন্ত্রাসীদের বর্বর নির্যাতনে যুবকের মৃত্যু

নিজস্ব প্রতিবেদক: যশোরে সন্ত্রাসীদের বর্বর নির্যাতনে এক যুবকের মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। আজ রোববার (২২...

যশোরে অর্ধগলিত ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার

নিজস্ব প্রতিবেদক: রাসেল হোসেন (২৪) নামে এক যুবকের অর্ধগলিত ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। আজ...

কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই এভাবে চলতে পারে না

যশোরের মণিরামপুর উপজেলার জোকা কোমলপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নবিরুজ্জামান বিদ্যালয়ে যান না...

ভোরের ঝড়ে লণ্ডভণ্ড যশোরাঞ্চল

উপড়ে পড়েছে গাছপালা ভেঙে গেছে বাড়িঘর-বিদ্যুতের খুঁটি অশনির আঘাত না কাটতেই কৃষকের ঘরে কালো থাবা শাহারুল...

যশোর প্রিমিয়ার ডিভিশন ক্রিকেট আরএন রোডের জয় ছিনিয়ে নিল হাসানুর

নিজস্ব প্রতিবেদক: শনিবার সকালে যশোর অঞ্চলের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া কালবৈশাখী দমকা হাওয়া শামস্-উল-হুদা...

সুজলপুরে দুই বন্ধুকে মারপিটের অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক: পূর্বশত্রুতার জের ধরে যশোর শহরতলীর সুজলপুরে সাকিব (২৫) ও নাহিদ (২৩) নামে...