Sunday, July 3, 2022

সংবাদপত্রের পাতা থেকে

সাজেদ রহমান
১৯৭১ সালের ২ ডিসেম্বর বেনাপোলে (যশোর জেলা) যশোর রোডের ডাইনে ও বাঁয়ে এক কোম্পানি পাকিস্তানি সৈন্য ঘাঁটি আগলে ছিল। কিন্তু তা সত্বেও বেনাপোলের দু’ জায়গায় মুক্তি বাহিনী বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে রেখেছিলেন। ওই দু’ জায়গার একটি হলো বেনাপোল কাস্টমস চেক পোস্টের কাছে, আর একটি হলো বেনাপোল রেল স্টেশন থেকে সিকি মাইল দূরে রেল লাইনের পাশে। যদিও ওই পতাকা দুটির অবস্থানস্থল থেকে পাকিস্তানি সৈন্যবাহিনীর কয়েকটি ঘাঁটি মোটামুটি দু’গজের মধ্যে তাহলেও বাংলাদেশের পতাকার গৌরবকে তারা মাটিতে মিশিয়ে দিতে সাহস পায়নি।

রণাঙ্গনের এমন চিত্রটি আকেন সুখরঞ্জন সেনগুপ্ত। যা প্রকাশিত হয় দৈনিক যুগান্তর পত্রিকায়। তার রিপোর্টটির শিরোনাম ছিল : ‘বেনাপোলে পাক সেনারা ঘাঁটি আগলে, কিন্তু মুক্তিফৌজের পতাকা উড়ছে’ শিরোনামে রিপোর্ট প্রকাশিত হয় ২ ডিসেম্বর। তার রিপোর্টটি পেট্রাপোল ডেলাইনে প্রকাশ হয়। ভারতীয় সেনাবাহিনীর অগ্রবর্তী ঘাঁটিগুলির একটি বাঙ্কারের ওপর দাঁড়িয়ে একজন বিদেশী সাংবাদিক জানতে চাইছিলেন, কেন ঠিক এই মুর্হুতে পাকিস্তান ভারতীয় এলাকায় গুলাগুলি ছুড়ছে না। একজন ভারতীয় গোলন্দাজ মেজর জবাব দিচ্ছিলেন, বোধ হয় আপনাদের সাদা চামড়া পাকিস্তানিরা দেখতে পেয়েছে।

ভারতীয় ও বিদেশী সাংবাদিকরা কেউ কোন আশ্রয় নেবার আগেই ভারতীয় সৈন্যবাহিনী তাদের ঘাঁটিগুলি থেকে গুলি ছুঁড়ল। গোলন্দাজ মেজর সাংবাদিকদের গুলির শব্দের ব্যাখ্যা করে বলেন যে, পাকিস্তানি সৈন্যরা ৭.৯২ মিলিমিটার চিনা সাব মেশিনগান থেকে গুলি ছুড়ছে বেনাপোলে (যশোর জেলা) যশোর রোডের ডাইনে ও বাঁয়ে এক কোম্পানি পাকিস্তানি সৈন্য ঘাঁটি আগলে রয়েছে। কিন্তু তা সত্বেও বেনাপোলের দু’ জায়গায় মুক্তি বাহিনী বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে রেখেছেন। ওই দু’ জায়গার একটি হলো বেনাপোল কাস্টমস চেক পোস্টের কাছে, আর একটি হলো বেনাপোল রেল স্টেশন থেকে সিকি মাইল দূরে রেল লাইনের পাশে। যদিও ওই পতাকা দুটির অবস্থানস্থল থেকে পাকিস্তানি সৈন্যবাহিনীর কয়েকটি ঘাঁটি মোটামুটি দু’গজের মধ্যে তাহলেও বাংলাদেশের পতাকার গৌরবকে তারা মাটিতে মিশিয়ে দিতে সাহস পায়নি।
পাকিস্তানের প্রস্তুতির নকশা

পেট্রাপোল-বেনাপোল সীমান্তে এখনো পর্যন্ত বড় রকমের যুদ্ধ হয়নি। অবশ্য ভারতীয় ও পাকিস্তানি সৈন্যরা এখানে পুলিশের গুলির আওতার মধ্যে রয়েছে। বনগাঁ শহর ও পাশর্^বর্তী গ্রামগুলি রক্ষার জন্য পেট্্রাপোলে ভারতীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কোন ত্রুুটি নেই এবং সাংবাদিকদের সঙ্গে যে সামরিক অফিসাররা ছিলেন তারা কিছু না লুকিয়েই ভারতের প্রতিরক্ষার সকল ব্যবস্থা সাংবাদিকদের দেখিয়েছেন। এই ব্যবস্থাগুলির মধ্যে পাকিস্তানি সৈন্যদের ঘাঁটির কাছে ভারতীয় সৈন্যবাহিনীর একটি আর্টিলারি ইউনিটকেও দেখানো হয়েছে। তবে সীমান্তের এই অগ্রবর্তী ঘাঁটিতে গিয়ে পাকিস্তানিদের সমর সজ্জার খসড়া ও মুক্তি বাহিনীর অগ্রগতির একটি চিত্র পাওয়া যায়। পাকিস্তানি বাহিনী এখন আর বেনাপোল কাস্টমস কলোনিতে নেই। সেখান থেকে তারা অন্তত দু’শ গজ পিছিয়ে গেছে। ওই দু’শ গজ জায়গায় মুক্তি বাহিনী। পাকিস্তান বাহিনী একটি ব্যাটালিয়ন দিয়ে এখন নাভারন রক্ষা করছে। সপ্তাহ খানেক আগে এই ব্যাটালিয়ন রঘুনাথপুর থেকে ভারতীয় গ্রাম জয়ন্তীপুরে গোলা বর্ষণ করেছিল। ভারতীয় সৈন্যবাহিনীর একজন মুখপাত্র বলেছেন যে, ওই গোলায় ভারতীয় ১০ জন গ্রামবাসী নিহত হয়েছে। শেষ পর্যন্ত ভারতীয় গোলন্দাজের ইউনিট গোলা ছুড়লে পাকিস্তান বাহিনী পশ্চাদপসরণ করে।

সীমান্তের নির্ভরযোগ্য সুত্রে জানা গেছে যে, যশোর সেক্টরে পাকিস্তানি সৈন্যবাহিনীর ৯ নম্বর ডিভিশন মুক্তি বাহিনীর সঙ্গে লড়ছে। এই ডিভিশনে আছে ২২ নম্বর ফ্রন্টিয়ার্স ফোর্স রাইফেলস, ২৫ নম্বর বেলুচ, ১২ নম্বর পাঞ্জাব ও ২৭ নম্বর বালুচ। এই ডিভিশনের অধিনায়ক মেজর জেনারেল এ এ আনসারি। ওই তিনটি রিজিমেন্টের লোকেরা মুক্তিবাহিনীর আক্রমণে খুব দুর্বল হয়ে পড়ে এবং তাদের হতাহতের সংখ্যা বেশি হওয়ায় অন্য জায়গা থেকে সৈন্য আনিয়ে এই রেজিমেন্টের অধিকাংশ লোক পশ্চিম পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেয়া হয়। নাভারন ও শার্শার মধ্যে যশোর রোড বরাবর পাকিস্তানি সৈন্যরা একটি শক্তিশালী ব্যুহ রচনা করেছে। এখানে তারা দেড় মাইল লম্বা, ২৪ ফুট চওড়া, ৫ ফুট গভীর একটি খাল কেটেছে। এছাড়া তারা ২০ থেকে ২৫টি বাঙ্কার তৈরি করেছে।

নাভারনে পাকিস্তানি সৈন্যদের যে ইউনিট আছে তাদের সঙ্গে রয়েছে কয়েকটি ৭৫ মিলিমিটার(২৫ পাউন্ড) কামান। তারা নাভারনের বুরুজবাগানে একটি হেলিপ্যাড নির্মাণ করেছে। সড়ক পথে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলে হেলিকপ্টারে অতিরিক্ত সৈন্য আনার জন্য এই ব্যবস্থা। যশোর রোডে ঝিকরগাছায় কপোতাক্ষ নদের উপর যে ব্রিজটি আছে তাকে ৪টি আর্টিলারি দিয়ে পাকিস্তান রক্ষা করছে। নাভারনের পর পাকিস্তানের আর একটি শক্তিশালী ঘাঁটি হলো ঝিনাইদহ। এখানে পাকিস্তানের ব্রিগেড হেড কোয়াটার্স। এই ব্রিগেড কমান্ডার মুনির আহমেদ। এই ব্রিগেডে ট্যাংক ও আর্টিলারি আছে। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষার এখন প্রধান চাবিকাটি হল যশোর এবং ১০৭ নম্বর ব্রিগেড এখানে মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে বিভিন্ন ফ্রন্টে সম্মুখ সংঘর্ষে লিপ্ত। খুলনা এই ব্রিগেডের অন্তর্ভূক্ত।

সীমান্তে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি মাঝে মাঝে আর্টিলারির উম্মত্ত গর্জন, মেশিনগানের গুলির আওয়াজের মধ্যে ভারতীয় এলাকার গ্রামবাসীর জীবনযাত্রা অত্যন্ত নিরুপদ্রবে চলাচলে তারা সড়কের পাশের খালে মাছ ধরছে। মাঠ থেকে শাক তুলছে, ক্ষেতে চাষ করছে। পাঠশালাগুলিতে যথারীতি ছেলেমেয়েরা যাচ্ছে এবং তারা সকলেই এখন আওয়াজ শুনে বুঝতে পারে কোনটা আর্টিলারি শেল, কোনটা মেশিনগানের গুলি।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

সর্বশেষ

রাজপথে নেই যশোর জাতীয় পার্টি 

এক বছর আগে হয়েছে সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটি দিনে দলীয় কার্যালয় থাকে বন্ধ, মাঝে মধ্যে সন্ধ্যায়...

যশোরে দৈনিক ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ঘাটতি, লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ জনগণ

নিজস্ব প্রতিবেদক :  ঋতুচক্রে এখন মধ্য আষাঢ়। কিন্তু ভ্যাপসা গরম কাটছে না। গরমে মানুষ অতিষ্ঠ...

ধর্ম-কর্মের খোঁজ নেই মসজিদ নিয়ে মারামারি

হাদিস শরিফে মসজিদকে সর্বোত্তম স্থান হিসেবে উল্লখ করা হয়েছে। এখানে মহান আল্লাহর এবাদতে যেভাবে...

সোনালি আঁশে সুদিনের স্বপ্ন দেখছেন নড়াইলের চাষিরা

নড়াইল প্রতিনিধি বোরো ধানের পর নড়াইলে পাট চাষে অর্থনৈতিক সচ্ছলতার স্বপ্ন দেখছেন কৃষাণ-কৃষাণীরা। উৎপাদন ভালো...

শিক্ষক হত্যা ও লাঞ্ছিতের প্রতিবাদে বাকবিশিস যশোরের মানববন্ধন

নিজস্ব প্রতিবেদক :  নড়াইলে কলেজ অধ্যক্ষের গলায় জুতার মালা পরানো ও সাভারে শিক্ষককে পিটিয়ে হত্যার...

বিল হরিণায় বিসিক-২ বাস্তবায়ন দাবিতে রাজপথে নেমেছেন এলাকাবাসী

নিজস্ব প্রতিবেদক : যশোর সদর উপজেলার রামনগর ইউনিয়নের বিল হরিণায় প্রস্তাবিত লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প পার্ক...