ব্র্যান্ডের বোতলে নকল মবিল 

রাজারহাটে নকল কারখানা
ভোক্তাদের স্বার্থ দেখার কেউ নেই
গাড়ির ইঞ্জিন দ্রুত নষ্ট হচ্ছে

ওয়াসিম হোসেন: যশোরের রাজারহাটে তৈরি হচ্ছে নকল লুব্রিকেন্ট অয়েল (মবিল)। ব্যবহৃত বিভিন্ন ব্রান্ডের খালি কৌটায় ভেজাল ও নিম্নমানের মবিল ভরে নতুন করে সিল দিয়ে উৎপাদন করা হচ্ছে এই লুব্রিকেন্ট অয়েল। আর এই সব নকল মবিলের ক্যান পাঠানো হচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। নকল লুব্রিকেন্ট অয়েল (মবিল) ব্যবহার করে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ভোক্তারা। এদিকে প্রশাসনের দৃশ্যমান কোন ভূমিকা নেই। যে কারণে তারা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।

দৈনিক কল্যাণের অনুসন্ধানী টিম রাজারহাটে একটি নকল লুব্রিকেন্ট অয়েল (মবিল) তৈরির কারখানার খবর পায়। অনুসন্ধানী টিম সেখানে গিয়ে দেখতে পায় নকল লুব্রিকেন্ট অয়েল তৈরির কার্যক্রম।

ঘড়ির কাটায় তখন বেলা একটা, দু’জন শ্রমিক ব্যস্ত মবিল প্যাকেটজাত করার কাজে। সাংবাদিক পরিচয় দিতেই পরিবর্তন ঘটে তাদের আচার-আচরণে। দু’জন শ্রমিকের মধ্যে একজন ১৮ বছরের কম হওয়ায় তার পরিচয় গোপন রাখার শর্তে পাওয়া গেল বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য।

নকল লুব্রিকেন্ট অয়েল (মবিল) তৈরির কারখানাটির মালিক টিটু জমাদ্দার। তিনি কল্যাণকে জানান, ৬/৭ বছর ধরে তার এই ব্যবসা। ঋণে জর্জরিত হয়ে এখন পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।

তার কথার সাথে বাস্তবতার ঢের ফ্যারাক। কেননা এখনো মাথা উচিয়ে চলছে তার কারখানা। তৈরি হচ্ছে নকল লুব্রিকেন্ট ওয়েল।

প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী জিসান বলেন, যশোরে এরকম আরও প্রতিষ্ঠান রয়েছে যেখানে বানানো হয় নকল মবিল। তিনি বলেন, রবীন্দ্রনাথ সড়ক, মোল্লা পাড়া, বারান্দীপাড়াসহ অনেক জায়গায় চলে এসব কারবার। মূলত ব্যবহৃত বিভিন্ন ব্রান্ডের মবিলের খালি কৌটা ব্যবহার করে এসব অসাধু ব্যবসায়ীরা তৈরি করছে নকল লুব্রিকেন্ট অয়েল।

যান্ত্রিক সভ্যতার যন্ত্রগুলো মিশে গেছে জীবনের সাথে। যন্ত্রের শক্তি ব্যবহার করে জীবন একদিকে হয়েছে সহজ, অন্যদিকে গতিময়। গতিশীল জীবনের গতির সাথে তাল মেলাতে গিয়ে বাড়তি আয়ের লোভে কেউ কেউ হয়ে পড়ছেন অসাধু। নকল লুব্রিকেন্ট অয়েল (মবিল) তৈরি করে ভোক্তাদের ক্ষতি করছে এসব ব্যবসায়ীরা।

ইঞ্জিনের সুরক্ষায়, নিরাপত্তায়, ক্ষয়রোধ কমানো, তাপমাত্রার ভারসাম্য রাখাসহ আরও অসংখ্য কাজে ব্যবহার করা হয় লুব্রিকেন্ট অয়েল (মবিল)।

নকল লুব্রিকেন্ট অয়েল (মবিল) ব্যবহারের ফলে ইঞ্জিন অপেক্ষাকৃত দ্রুত সময়ে নষ্ট হয়ে যায়। মান যাচাই না করে মোটরবাইকসহ বিভিন্ন ইঞ্জিন ব্যবহারকারীরা নকল মবিল ব্যবহার করে হচ্ছে ক্ষতিগ্রস্ত।

অনুসন্ধান টিম কথা বলে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন সডকের (রেল রোডে) তরুণ মটর্সের তরুণ দে’র সাথে। তিনি বলেন, মবিল মানে ইঞ্জিন অয়েল। যা গাড়ির মেরুদন্ড। ভেজাল মবিল ব্যবহারে ইঞ্জিন ড্যামেজ হয়ে যায়, গাড়ি স্থায়ীভাবে নষ্ট হয়।

রবীন্দ্রনাথ সড়কের ব্যবসায়ী জোনাকী ট্রের্ডাসের ফারহান মাহদী বলেন, নকল মবিল হচ্ছে জাল টাকার মত। যা দিয়ে গাড়ী চলবে না। এই চক্রের হাত থেকে বাঁচতে সচেতনতার বিকল্প নেই। মবিল ব্যবহারকারকে মবিল ব্যবহারের পর কৌটাগুলো নষ্ট করে ফেলতে হবে।

বিসিএমসি কলেজের প্রভাষক ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ার আসাদুজ্জামান বলেন, ইঞ্জিনে আমরা যে লুব্রিকেন্ট অয়েল ব্যবহার করি তার কয়েকটা কাজ রয়েছে। যেমন ইঞ্জিন ঠান্ডা রাখে, ইঞ্জিনের ভেতর পার্টসগুলোর ময়লা পরিষ্কার করে, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। ইঞ্জিনের দু’ধরনের লাইভ রয়েছে, ক্যানডার লাইভ ও অপারেটিং লাইভ। নকল লুব্রিকেন্ট অয়েল ব্যবহারে অপারেটিং লাইভ কমে যাবে। মবিলের গুণাগুণ সঠিক মাত্রায় না থাকলে ক্ষতিকর প্রভাবসমূহ ইঞ্জিনের উপর পড়বে। তাপে পদার্থের প্রসারণ ঘটে। নকল মবিল ব্যবহারের ফলে পিস্টনের রিং নষ্ট হবে, জ্যাম হবে। মবিলের গুনাগুণ সঠিক না থাকলে আরও বিভিন্ন ধরনের ক্ষতি হয়। মুভিং পার্টসের মুখ যখন নড়াচড়া করে তার মাঝে মবিল পর্দা সৃষ্টি করে। নকল মবিলে যা সৃষ্টি করতে পারে না। এ জন্য ইঞ্জিন নষ্ট হয়ে যাবে। ভেজাল মবিল ব্যবহারের ফলে সড়ক দুর্ঘটনাও ঘটে।

অসাধু ব্যবসায়ীদের সামাজিক অবক্ষয়ের বিষয়ে যশোর সরকারি এম এম কলেজের সহকারী অধ্যাপক হামিদুল হক শাহীন বলেন, কেউই অসাধু ব্যবসায়ী নয়। বর্তমান সমাজে পারিবারিক শিক্ষা নেই বললেই চলে। আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে পরিবারের শিক্ষা ও সামাজিকীরণের ভূমিকা অপরিসীম। এখন আমরা যন্ত্রের মতই গতিশীল হয়েছি। শুধু চাই আর চাই ? কিন্তু কিভাবে সেটা পেতে হবে ? তা নিয়ে কোন শিক্ষা নেই। প্রতিযোগিতার এই যুগে কে কার থেকে বেশি টাকার মালিক বা আয় করে তা দিয়ে সমাজে বিবেচনা করা হয়। ফলে চাওয়ার মাত্রাও তখন অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ে। তাই নৈতিক শিক্ষার উপর গুরুত্বারোপ করতে হবে।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে